মিরপুরে জমজ দুই বোনকে রাস্তায় ফেলে বখাটে এক ছেলে পিটিয়েছে। কিন্তু লোকেরা গা করেনি। সাধ করে কে আর আগুনে ঝাঁপ দেয়, বলুন!
ভাবছেন, মেট্রোপলিটন এই নগরে কারো গোয়ালে কারো ধোঁয়া দেয়ার টাইম নাই। জ্বী না, এইখানেই একটু ভুল হয়ে গেলো। টাইমের টানাটানির চেয়ে ইচ্ছার টানাটানিটাই বেশি। চক্ষু মুদে আপনি নিজেকে জিজ্ঞেস করেন। আপনার দিল আপনাকে জানাবে যে, ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়।
উইলস লিটল ফ্লাউয়ারের ক্লাশ এইটে পড়া মেয়েটা স্কুলের কাছে ছুড়িকাহত হয়ে স্কুলের ভেতরে আশ্রয় নিয়েছিল। ওর ফুটা পেট দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়েছে। ওর পোশাক রঞ্জিত হয়েছে। বন্ধুরা স্কার্ফ দিয়ে ফুটো পেট বেঁধে দিয়েছে। কিন্তু স্কুল কর্তৃপক্ষ পেট ফুটা ওই ‘আপদকে’ হাত দিয়ে স্পর্শ-ও করেনি। ‘ঝামেলার’ ভয়ে এমনকি স্কুলের গাড়িটাও দেয়নি কর্তৃপক্ষ।
আমরা বেশিরভাগই ওরকমই, ওই বিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষেরই মতন। পরের মরা দেখার মানসিক ‘টাইম’ আমদের নাই। ‘ভদ্র মোরা শান্ত অতি’ হয়ে থাকাই আমাদের লক্ষ্য।
এই তো গতসপ্তাহে সন্ধ্যার দিকে রিকশায় করে বাড়ি ফেরার পথে গ্রীন রোডে বেপজা অফিসের সামনে দেখলাম এক পুরুষ আর এক নারী চিৎকার চেচামেচি করছে। দূর থেকে চিৎকার শুনে আসতে আসতেই হঠাত দেখি ওই পুরুষটা ওই নারীকে মারার জন্য উদ্যত হয়ে ধাওয়া দিলেন। ওই নারী কাছে থাকা একটা গাড়ীর পাশে দৌড়ে গিয়ে আশ্রয় নিলেন এবং আরো রাগ নিয়ে চিৎকার করে-করে উত্তর দিলেন। এই দেখে সেই পুরষ আবারো মারতে উদ্যত হলেন। এমন সময় আমার রিকশা তাদের পাশে এসে গেছে প্রায়। আমি রিকশা থেকেই ওই পুরুষকে ধমক দিতে থাকলাম। চিৎকার করেই। সে তাকালো। একটু থতোমতো খেলো। কিন্তু আশপাশে যে ক’জন ছিল সবাই দাঁড়িয়ে সিনেমা দেখছিল। লাইভ সিনেমা। নিরাপদ দূরত্বে থেকে পাওয়া গল্প। যেই গল্প নিয়ে পরে অফিসের কলিগের সাথে, বন্ধুদের সাথে গল্প করা যায়। চাইকি ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস-ও মেরে দেয়া যায় বুঝি।
গত পয়লা অক্টোবর সন্ধ্যার আগে-আগে কারওয়ান বাজার মোড়ের আরেকটা ঘটনা। হোটেল সোনার গাঁয়ের সামনে থেকে রাস্তা পাড় হয়ে আমি রোড ডিভাইডারের উপরে উঠতে যাচ্ছি। গন্তব্য এর পরের রাস্তাটা পাড় হয়ে বিরোত্তম সি আর দত্ত রোডে যাওয়া। ওটাই আমার প্রায় রোজকার বাড়ি ফেরার পথ। তো ডিভাইডারের ওখানে ১৫/২০ জন দাঁড়িয়ে আছেন। আমি পেছনে প্রায় রাস্তায় এক পা নামানো। এমন সময় এক পুরুষ ভীড়ের মাঝখান থেকে বেরিয়ে ঘেষে ঘেষে আমার দিকে আসতে থাকলেন। তাকে দেখে বোঝা যাচ্ছে, তিনি রাস্তা পাড় হয়ে আমার বিপরীত দিকে যাবেন।
বিপরীত দিকে যাওয়ার কথা থাকলেও তিনি শুধু ঘেষ্টে ঘেষ্টে পায়ে-পায়ে কান্নি খাওয়া ঘুড়ির মতন কয়েক ডিগ্রি এঙ্গেলে বেঁকে গিয়ে উনি আমার দিকে আসতে থাকলেন। আমি ভাবলাম, এই পাশ দিয়ে গেলে তার সুবিধা বুঝি। তাই আমি একটু সরে গেলাম। কিন্তু তিনি আরো কান্নি খেলেন। আমি আরো একটু সরলাম। তারপরো তার কান্নি খাওয়া কমলো না এবং সে দেখলাম তার শরীরটাকে এবং বাম হাতের কনুইটাকে আমার শরীরের দিকে ঝুঁকিয়ে দেয়ার চেষ্টা করলেন।
ততক্ষণে বুঝলাম, তার কান্নি খাওয়ার কারণ। আমি তারে আস্তে করে একটা গালি দিলাম। সে গালিটা হজম করে চলে যাচ্ছিলো। সে চলে যাচ্ছে দেখে আমি আবার আমার আগের জায়গায় ফিরে আসার উদ্দেশ্যে পা বাড়ালাম। এমন সময় দেখি সে ঘুরে আমার দিকে তেড়ে আসছে। এসে আমার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে তুমি তুমি করে জিজ্ঞেস করছে, ‘এই ফাজিল মহিলা, তুমি আমারে গালি দিস কেন।’ আমি বল্লাম, ‘গালি দিসি কেন বোঝেন নাই। আবার ঘুইরা আসছেন! সাহস তো কম না! রাস্তা মাপেন।’
এই কথা শোনার পর সে ভীষণ চেচামেচী শুরু করলো। আমি তখনো গলার স্বর চড়াই নাই। আস্তে করেই বল্লাম, ‘চেচামেচী না করে যা এখান থেকে। না হলে ওই যে পুলিশের কাছে নিয়ে যাবো।’
এমন সময়, ‘কী! পুলিশের কাছে লইয়া যাইবি, পুলিশের কাছে লইয়া যাইবি, যা দেখি’ বলতে-বলতে সে খপ করে আমার ডান হাতে কনুই ধরে টান দিসে! এই অবস্থায়, আমার মাথায় রক্ত উঠে যাওয়া স্বাভাবিক।
আমার হাতে তখন প্রায় ৬০০ পৃষ্ঠার একটা বই। নরম্যাল রেগুলার সাইজের বই না। বড় আকারের থান ইটের চেয়েও দেখতে মোটা একটা বই। বইটা সেকেণ্ডের ভগ্নাংশের মধ্যে ওর কপাল বরাবর উঠে যেতে যেতে আমি নিজেকে থামালাম। নিজেকে থামালাম রক্তারক্তি কাণ্ড হয়ে যেতে পারে কেবল এই ভয়ে নয়। সেদিন আমার তাড়া ছিল। তাড়ায় আছি বাড়ি ফিরবো। হাতে একগাদা কাজ। সেগুলো শেষ করে ঘুমোবো অন্তত দুই আড়াই ঘন্টা। কারণ রাতে আমার নাইট শিফট। যেদিন নাইট শিফট থাকে সেদিন সব কাজ আগে শেষ করে আমি সন্ধ্যার আগেই বাড়ি ফিরতে চাই।
ফলে, ওইখানে ওই ফ্রেকশান অফ অ্যা সেকেন্ডের মধ্যে আমার মাথায় আসলো যে, এই হারামজাদার সাথে রক্তারক্তি কাণ্ড ঘটলে একটা থানা-পুলিশের ব্যাপার হবে। এইসব করা এখন মুস্কিল। আমার বাসায় যেতে হবে। হাতের কাজগুলো শেষ করে একটু ঘুমাতে হবে। কারণ নাইট শিফটের পরের দিন ২ তারিখে আবার সারাদিন কাজ আছে।
কিন্তু এইবার আমি গলা চড়িয়ে ওর সাথে যারপরনাই রকম চেঁচামেচী শুরু করলাম। অকথ্য ভাষায় গালাগাল দিতে লাগলাম। এক সিগন্যালেই আস্ত একটা সিনেমা পেয়ে গেলো ডিভাইডারে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজন। তারা সবাই তন্ময় হয়ে আমাদের পার্টগুলো করা দেখতে লাগলো। কেউ কিছু বল্লো না।
আমরা চেঁচিয়েই যাচ্ছি। হঠাত দেখি একটা মেয়ে, আমার চেয়ে আরো ঝাড়া অন্তত আট/দশ বছর কম হবে বলেই অনুমান করি, চিৎকার করে উঠলো। আমার সঙ্গে ঝগড়ারত পুরুষকে লক্ষ্য করে সে শাষাতে শুরু করলো। বলতে শুরু করলো, ‘আপনের সাহস কত বড়! একটা মেয়েরে আপনি গায়ে হাত দিসেন!’
ওই লোকটা অবশ্য এতে দমেনি। চেঁচিয়েই যাচ্ছে। এমন সময় ওই মেয়েটার সাথে যে ছেলে বন্ধুটা ছিল, সে-ও গলার স্বর খুললো। সে-ও ধমক দিলো। আর মেয়েটা হঠাত উপস্থিত দর্শকদের বলতে লাগলো, ‘আপনারা কি দেখতেছেন না লোকটা ইচ্ছা কইরা কী সব করেতেসে! ওরে কিছু বলতেসেন না কেন! ধরেন ওরে! ধইরা ধুলাই দেন।’
মেয়েটার এই কথাটা শোনামাত্রই দেখলাম, সেই লোকটা হঠাত কোনো উপসংহার ছাড়াই কথা থামালো এবং তার যেদিকে যাওয়ার কথা সেদিকে হাঁটতে থাকলো। কিন্তু মেয়েটা চিৎকার করতেই থাকলো। বলতে লাগলো, এখন ভাইগ্যা যান কেন! ভাইগ্যা যান কেন!
পুরুষেরা রাস্তায় মেয়েদের দেখে কান্নি খাওয়া ঘুড়ির মতন হেলে পড়ার ঘটনা বাসে, রাস্তায়, গলিতে, স্টপেজে রাস্তায় হরদম ঘটে। কেউ কেউ আমার মতন রাস্তায় চেঁচানোর ঘটনায়ও ঘটায়। কিন্তু যা ঘটেনা তা হলো, ওই মেয়েটার মতন একটা মানুষের ঘটনা। আমি অন্তত দেখিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার একেবারে শুরুর দিকে একদিন দেখলাম একটা ছেলে টিএসসিতে ডাসের পাশে রাস্তার উপর একটা মেয়েকে দুই গালে সপাটে চড়াচ্ছে আর কী সব বলে যাচ্ছে। কথা থেকে বোঝা যাচ্ছিলো ছেলেটা মেয়েটার বয়ফ্রেন্ড। সবাই এই দৃশ্য দেখেছে। কিন্তু কেউ এগিয়ে গিয়ে কিছু বলেনি।
এই না বলাটাই এখন আমাদের কালচার। এই মেট্রোপলিটন নগরে, ‘মাপা হাসি চাপা কান্নার’ নাগরিক জীবনে চোখের সামনে অন্যায় ঘটতে দেখলে আমরা সটকে পড়ি। এমনকি চোখ মেলে দেখাটাও বুঝি গুরুতর হতে পারে। ভাবি, দেখারো যদি মাশুল দিতে হয়! তাই, আমরা অন্য দিকে সরিয়ে রাখি চোখ।
কিন্তু এই যে নীরবতার কুণ্ডুলি তৈরি হচ্ছে এই কুণ্ডুলিতে যে আপনিও বাঁধা সেটা জানেন তো? এই যে নিজেকে নিরাপদ দূরত্বে তুলে রাখার কৌশল এই একই হাতিয়াড়ে হবে আপনারো মরন।
আজকে আমি, কালকে গ্রীনরোডের ওই নারী, পরশু মিরপুরের দুই জমজ বোন, তারপর কে? আপনি?
আপনার পকেট থেকে মানিব্যাগ তুলে দৌড় দেবে এক যুবক। আপনি লোকজনের উদ্দেশ্যে ‘ধরেন, ধরেন’ করবেন। কিন্তু আরেকজন, যার হাতের সামনে দিয়ে যাচ্ছে পারপিট্রেটর, তাকে ধরবে কেন! সে কেন আপনার গোয়ালে ধোঁয়া দেবে! সে-ও তো আপনারই মতন নিরাপদ দূরত্বে থাকতে চায়।
আপনার ঘরে ঢুকে চাপাতি দিয়ে আপনার ছেলেকে কুপিয়ে যাবে সন্ত্রাসী। আপনি আর্তনাদ করবেন। জানালা দিয়ে সবাই বেদনার্ত হয়ে দেখবে। কেউ কেউ ভিডিও করে ছড়িয়ে দেবে ফেসবুকে। কিন্তু ‘ধর ধর’ বলে কেউ পারপিট্রেটরকে ধরতে যাবে না।
আপনার মেয়ে, আপনার স্ত্রী, আপনার বোন, আপনার মা রাস্তায় হেনস্থা হবে। সবাই দেখবে। কেউ কথা বলবে না। আর কোনো কোনো দর্শক অত্যোৎসাহী হয়ে রাস্তার সেই ঘটনার একটা ভিডিও ধারণ করে তাদের হেনস্থা হওয়ার চিত্র ছড়িয়ে দেবে ফেসবুকে, নেটে। (যে ঘটনা সাময়িক ক্ষোভ, রাগের চেচামেচী দিয়ে অবসান হতে পারতো, হয়তো তার অবসান সেখানে হবে না। নেটে এই ঘটনা ঘুরতে থাকবে। ঘুরতে থাকবে আপনার মুখ। আপনার দুর্দশা।) কিন্তু কেউ প্রশ্ন তুলবে না। জায়গায় দাঁড়িয়ে পার্পিট্রেটরের দিকে আঙুল তোলার ঝুঁকি কেউ নেবে না।
কেন নেবে? আপনি হলে কি নিতেন?
২৩.১০.১৬
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে অক্টোবর, ২০১৬ বিকাল ৩:১৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



