somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

এই শীত-ঘ্রাণে

৩০ শে ডিসেম্বর, ২০১৬ রাত ৮:২৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

শীত আমার শত্রু নয়। বন্ধুও ছিল না কোনো দিন। একটা মুখ-ব্যাদান-করা সম্পর্কই আমার শীতের সাথে। আজীবন। কিন্তু জীবনে এই প্রথম টের পেলাম শীত আমার প্রেমিক। গোপন প্রণয় তার সাথে হয়েছিল আর জনমে।

আর জনমের সেই প্রেম, সেই স্মৃতি আজ দু’দিন হলো এই জনমে এসে আবার আমাকে মনে করিয়ে দিয়ে গেছে কুয়াশার ঘ্রাণ।

ফলে, প্রাণ আমার উচাটন। আনচান। কাতর।

আনচানের কারণ কতটা শীত, কতটা স্মৃতি আর কতটা নিজের কাছে নিজে ফিরতে না পারার সত্য তা জানি না। তবে, আজ ভোরে মন বড় আনচান হয়েছে। মনে হয়েছে, আহা! এই জৌলুস ছেড়ে, জাদু মন্ত্রে ভরা এই কামরূপ-কামাক্ষাসম নগর ছেড়ে যদি আরবার, যদি আরবার ফিরে যাওয়া যেতো সেই কুয়াশার ভেতর! অমল ধবল মোহময় কুয়াশার ভেতর অবর্ণনীয় শীত-ঘ্রাণের মায়া নিয়ে যদি আবার হারিয়ে যাওয়া যেতো ধানকাটা এক আদিগন্ত মাঠের ভেতর!

সেই মাঠ আছে। স্মৃতির ভেতর। সেই স্মৃতি জমেছিল আমার নানুবাড়িতে। শীতের ভোর, ভোরের কুয়াশায় ভেজা খড়, বিচালি, গাছ, মরিচের সাদা ফুল, লাউয়ের সবুজ ডগা, বড়ই গাছের খাঁজকাটা পাতা সব কেমন সদ্য স্নান সেরে পুকুর থেকে উঠে আসা নতুন বৌয়ের মতন ভেজা! যেনো বৌয়ের ভেজা চোখের পাতা। যেনো বৌয়ের ভেজা চোখের ভ্র। যেনো বৌয়ের ভেজা কেশরাশী। যেনো বউয়ের ভেজা অঙ্গ জুড়ে কত রকম মায়া!

কুয়াশায় মাখামাখি হয়ে থাকা এই জগত থেকে কেমন একটা অদ্ভুত ঘ্রাণ তৈরি হয়। ভিজে চুপচুপা হয়ে থাকা ঘাসের গালিচায় যে ঘ্রাণ, ভেজা ধানের ক্ষেতে যে ঘ্রাণ তার কোনো ডাক নাম আমি জানি না।

টিনের চালে টুপটাপ করে রাতভর ঝরতে থাকা শিশির, ভোরের ঘন কুয়াশার ভেতর প্যাক-প্যাক করে ডেকে উঠা হাঁস, কক-কক করে ডেকে উঠা মুরগি, হাম্বাআআআআ বলে ডেকে উঠা গরু, ওয়াঁয়াঁয়াঁ বলে মিহি স্বরে কেঁদে ওঠা দুধের শিশুর আওয়াজ আমার সেই জীবনের সাথী। তারা আমার গল্পের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে থাকা চরিত্র।

তাদের সবার আছে নিজস্ব ঘ্রাণ। সেইসব ঘ্রাণের সাথে মাখামাখি হয়েছে কুয়াশা; মাখামাখি হয়েছে গোয়াল ঘর থেকে আসা ধোঁয়ার গন্ধ; আগুন পোহানোর জন্য বাড়ির উঠোনে জ্বালানো অগ্নিকুন্ডের ধোঁয়ার গন্ধ; হেঁসেল থেকে আসা রান্নার খড়-কাঠ-বাঁশ আগুনের ধোঁয়ার গন্ধ। এইসব গন্ধেরা কুয়াশার সাথে মাখামাখি হয়ে যে গন্ধের জগত তৈরি করে তা অবর্ণণীয়। সেই বর্ণনাতীত জাদুর জগত আমার স্মৃতির ভেতর ঢুকে আমাকে আমার থেকে হঠিয়ে দিয়ে নিয়েছে আমার দখল। অথচ আমি তা জানি না! আমি তা জানিনি! আমি তা জেনেছি এই মাত্র দু’দিন!

সেই দু’দিনের কথা বলতে বসার আগে এইখানে গেয়ে রাখা ভালো যে, কর্মস্থল ধানমন্ডি থেকে বনানী পাড়ায় বদল হবার পর থেকেই শেষ রাত বা ভোর নাগাদ ঘুমোতে গিয়ে বেলা করে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাসটার ছুটি হয়েছে। স্কুল পড়ুয়া মেয়ের মতন 'আর্লি টু বেড আর্লি টু রাইজ' এখন জীবনের ব্রত।

তারই ধারাবাহিকতায় ভোরবেলায় গত দু’দিন ফাঁকা রাস্তায় যখন বেরোই তখন কেমন যেনো চারপাশ থেকে একটা গন্ধ এসে আঁকড়ে ধরতে থাকে। আমি নেশাতুরের মতন সেই গন্ধ বুকে টেনে নিই। লম্বা দমে আমি এই ঘ্রাণ টেনে নিই আমার ভেতর। এই ঘ্রাণ টানতে টানতে আমার মনে হয়েছে আরে! কেমন যেনো চেনা চেনা! তারপর এক ঝটকাঁয় আহা! আমার সেই মায়ার জগত কেমন উন্মোচিত হয়ে যায়।

আশৈশব শীত মানে নানুবাড়ি। নভেম্বর-ডিসেম্বর নানুবাড়ি। ধানকাটা মাঠ, শীতের বিকেল, শীতের সন্ধ্যা, শীতের রাত, শীতের রাতের ওয়াজ, শীতের রাতের যাত্রা, শীতের রাতে রাতভর টিনের চালে টুপটুপাটুপ শিশির ঝরার সঙ্গীত, শীতের ভোরে পসর হওয়ার আগেই জেগে ওঠা, শীতের ভোরে অগ্নিকুন্ডের চারিপাশে গোল হয়ে আগুন পোহানো, আগুনে আলুসিদ্ধ দেয়া, আগুনে ডিমের ভাঙা খোসার ভিতর কয়েকদানা চাল ও খানিক পানি ভরে দিয়ে ভাত রেঁধে খাওয়া, বাটিতে করে মুড়ি বা খইয়ের সাথে গুড় নিয়ে পুকুর পাড়ে বসে রোদ পোহাতে পোহাতে দূর হতে দেখা ভোরের ট্রেন! এইসবই আমার শীত। শীতের গন্ধ। আমার নানুবাড়ি।

ঢাকা শহরে ভোরের কুয়াশার গন্ধেই কি-না জানি না ভোরটা আজ দু’দিন হলো বড় মায়াময় লাগছে।একি মায়া না জাদু আমি জানি না। কিন্তু এর ঘোর বড় তীব্র। এর ঘাত বড় বেশি। আজ ভোরে নগরের এই কুয়াশার গন্ধ এতো তীব্রভাবে আমাকে মনে করিয়ে দিল আমার নানুবাড়ির কুয়াশাময় শীতের ভোর, ভোরের পুকুর, পুকুরের পাড়ে বড়ই গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে পুকুরের জলে পড়া রোদ আর হাতে মুড়ি বা খইয়ের বাটি নিয়ে পুকুর পাড়ে বসে রোদ পোহাতে পোহাতে দূর থেকে হুঁইসেল বাজিয়ে আসা আচনক রেলগাড়ির অপেক্ষায় থাকা সেই ছোট্ট মেয়েটির কথা।

মেয়েটির বয়স বেড়েছে। ক্লাস ওয়ান থেকে বাড়তে বাড়তে ক্লাস এইটে ওঠেছে। তবু, প্রতিবছর স্কুল পরীক্ষা শেষে নানুবাড়ি ছিল তীর্থস্থল। সেই সময় থাকতো শীত। শীত ক্রমে গাঢ় হয়েছে। কুয়াশা ক্রমে গাঢ় হয়েছে। মায়ার জগত ক্রমে গাঢ় হয়েছে। ক্লাশ এইটের পর নিয়ম করে এই শীতে নানুবাড়িও আর যাওয়া হয়নি কখনো। কিন্তু আজ ঢাকা শহরের এই কুয়াশার সাদৃশ্যময় গন্ধ তাকে মনে করিয়ে দিল মেয়েটির বয়স বাড়েনি! সে হাতে গুড়সহ মুড়ি বা খইয়ের বাটি নিয়ে পুকুর পাড়ে বসে রোদ পোহাচ্ছে। আর অপেক্ষা করছে কখন আসবে ট্রেন! কখন বাজবে হুইসেল!

কিন্তু জীবনের কত কত শীত তো আমার নিজের বাড়িতেও গেছে। সেই শীতের স্মৃতি ফিঁকে কেন! কেন এতো মায়াময় নয়! নিজেকে নিজেই এই প্রশ্ন করে বোকা বনেছি। নানুবাড়ি! আহা! আমার তীর্থস্থল। বই নেই। পড়া নেই। তাড়া নেই। মায়ের শাসন-বকুনি নেই। শুধু প্রশ্রয়। শুধুই খোলা মাঠ! আর আমার বাড়িতে শীতেও স্কুল, কলেজ, প্রাইভেট এইসব যত না-পছন্দ কাজ। কিন্তু নানুবাড়ি! আহা! সেখানে শীত ও কুয়াশা নিয়ে আমার জন্য আজো স্মৃতির ভেতর অপেক্ষা করে পুকুরঘাট, রোদ, ও রেলগাড়ি; সেখানে পুকুরপাড়ে বসে হুঁইসেলের অপেক্ষায় রত তখনো ট্রেনে না চড়া এক ছোট্ট মেয়ে।

কিন্তু হুঁইসেল বাজে না। বাজবে না। নাকি হুঁইসেল বাজে? বাজছে? আর তা শুনতে পেয়েই সে মেয়ে হয়েছে কাতর! কী জানি!
তবে, আজ এই সকালে কাতর মেয়েটির মনে হয়, আহা! আহা! যদি এমন হতো! এক জীবনের বদল দিলে যদি আরেক জীবন হতো! তাহলে এই কেতাবী বিদ্যার মায়া, গোলক ধাঁধাঁর এই নগর, কেতা করে পড়া এই বাহারী শহুরে পোশাকের জীবন বদলে আরেকটিবার যেতো সে সেই পুকুর পাড়ে।

পুকুর পাড়ে এসে পড়তো এক চিলতে রোদ। রোদের মধ্যে গুড়সমেত খই বা মুড়ির বাটি নিয়ে বসে থাকতো মেয়ে। বসে বসে সে করতো দূর থেকে হুঁইসেল বাজিয়ে আসা একটা ট্রেনের অপেক্ষা। অপেক্ষার সেই সময়টুকুতে সে দেখতো, পুকুরের জলে বড়ই পাতার ছায়া পড়েছে। পুকুরের পাড়ে নোয়ানো তাল গাছের উপর উঠে খেলছে একটা শিশু। পুকুরের ঘাটে থালা-বাসন মাজতে নেমেছে এক নারী। গঞ্জে যাবে বলে নাইতে নেমেছে এক পরুষ। সে শুনতো, হাম্বাআআআ রবে ডাকছে গাই। সে টের পেতো পুকুরের পানি থেকে কেমন আসছে একটা জলো গন্ধ। সেই গন্ধের সাথে শীতের রোদ মিশে তৈরি হচ্ছে আরেকটা অন্য ঘ্রাণ। কিন্ত সেই ঘ্রাণকে যায় না করা বর্নণা। তাকে শুধু টের পেতে হয়। শ্বাসে টেনে নিলে তাকে বুকে ভরা যায়। আর বর্ণনায় সে হারায়। হারায়। হারায় ...

২৯.১২.১৬
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে ডিসেম্বর, ২০১৬ রাত ৮:২৪
৭টি মন্তব্য ৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বিকাশ নূরা এবং হিরো আলমকে যারা প্রধানমন্ত্রী ভাবতেন ;)

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ২:৩২



একজন মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি, শিক্ষা-দীক্ষা থাকার চাইতেও জরুরী বিষয় হচ্ছে তার অন্তর্দৃষ্টি থাকা। অন্তর্দৃষ্টি, অন্তরচক্ষু বা জ্ঞানচক্ষু সম্পন্ন একজন ব্যক্তিকে কখনোই ধোঁকা দেওয়া বা ধোঁকায় ফেলানো সম্ভব নয় কারণ এরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাঙ্গালী কেন মুসলমান হতে পারে না?

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৫

অনারব টার্কিশ, কুর্দি আর ইরানিয়ানরা তাদের নিজ নিজ ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষন করে ও তা ধারন করেও তারা মুসলিম, পাকিস্তানের পাঞ্জাবীরাও যখন নিজেদের পাঞ্জাবী জাতি হিসেবে অহংকার করে, তখনও তারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ মোহাম্মদপুরে কখনও বিচ্ছেদ হয় না

লিখেছেন রাজসোহান, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৪





আমার দোকানের নাম নিউ শাপলা কম্পিউটার ও ফটোস্ট্যাট। সাইনবোর্ডের শাপলা ফুলটা এঁকে দিয়েছিলো তাজমহল রোডের এক সাইনম্যান, দেখতে হয়েছিলো কচুরিপানার মতো। চৌদ্দ বছর ধরে ঝুলে আছে। রোদে রঙ উঠে... ...বাকিটুকু পড়ুন

২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা তার সাথে কিছু রুঢ় সত্য যা বদলে দিয়েছিলো দেশের রাজনীতি।

লিখেছেন অন্তর্জাল পরিব্রাজক, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৩৪





২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা সম্পর্কে আমরা সবাই মোটামুটি জানি। এই হামলায় কারা জড়িত ছিল সেটাও আজকের দিনে অজানা নয় একমাত্র নিতান্ত দলকানা ছাড়া। তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধানমন্ডি ৩২ যারা ভেঙেছিল, আর যারা বিচার চাওয়ার পথ বন্ধ করে দিল- তারা কি একই?

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:৪৪



ধানমন্ডি ৩২ যারা ভেঙেছিল, আর যারা বিচার চাওয়ার পথ বন্ধ করে দিল- তারা কি একই?

ধানমন্ডি ৩২ ভাঙা হয়েছিল- কে দেখেনি, কে জানে না, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই।,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×