প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা পড়ালেখা করে তারা সবাই সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মায় না। এমনও আছে যাদের একবেলা ভরপেট আর অন্য বেলা আধ-পেটে চলে।

ফুটানিমারানেওয়ালা ঘুষ-খোরের টাকায় যেমন কেউ কেউ পড়তে আসে, তেমনি সৎ রোজগারে, আঙুলের কড়ে গুণে দেয়া অর্থেও এসব প্রতিষ্ঠানে পড়ে মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্তের সন্তানেরা।
আর এমন গল্পও ভুরি ভুরি আছে যে, বাবার জমি বেচে, পুকুরের মাছ বেচে, মৌসুমে ঘরে উঠা ধান বেচে সিমেস্টারের খরচা চালায় কেউ কেউ।
কয়েক সিমেস্টার গেলে পরে, যা হোক একটা কাজ জুটিয়ে নিতে চেষ্টা করে তারা। কারো কারো জুটেও যায়। তারা সেই টাকায় পড়ে। আবার সংসারেও যা হোক কিছু একটু দেয়ারও চেষ্টা করে।
কেউ কেউ কয়েক সিমেস্টার ঠিক মতন পড়ার পর ড্রপ মারে। কাজ করে টাকা জমায়। তারপর আবার এক সিমেস্টার পড়ে আরেক সিমেস্টার ড্রপ। আবার টাকা জমায়। আবার পড়ে। আবার ড্রপ।
জামার তলে, বুকে, দুঃখ লুকিয়ে রাখাদের সাথে গাড়ি থেকে নেমে আসাদের গায়ের গন্ধের অনেক ফারাক।
জামার তলে দুঃখ লুকিয়ে থাকা মানুষেরা হাঁটে সর্ন্তপনে, এদের শরীরিভাষায়, গলার স্বরে আত্মবিশ্বাস কম। এমনকি ঠিক কথাটাও এরা ঠিক মতন জোর দিয়ে কম বলে।
আর জীবন যাদেরকে দু'হাতে দিয়েছে আশীর্বাদ, তাদের চলার ভাষা অন্যরকম। এরা হাঁটলে গ্রীবা উঁচু করে হাঁটে। এদের বডি ল্যাঙ্গুয়েজে বিশ্বাসের কোনো ঘাটতি নেই।
কিন্তু এসবের ভেতর দিয়েই দুঃখ-লুকিয়ে-রাখারাও উঠে দাঁড়ায়। তাদের কেউ কেউ খুব উজ্জ্বলও হয়ে ওঠে।
হঠাৎ কেন এদেঁর কথা বলছি?
আজ সকালে পরীক্ষায় ইনভিজিলেশান ডিউটি ছিল। তখনো শিক্ষার্থীরা দু'একজনের বেশি কেউ রুমে আসেনি। খাতা, ওএমআর শিট আর প্রশ্ন বিলি করছিলাম ডেস্কে-ডেস্কে।
খাতা রাখতে গিয়ে হঠাৎ চোখ পড়লো একটা লেখায়। খুব গাঢ় করে লেখা। লেখার উপরে বারবার ওভাররাইটিং করে ঘষতে-ঘষতে লেখাটা উজ্জ্বল হয়ে আছে।
ভালো করে পড়ে দেখি, ঈশ্বরকে উদ্দেশ্য করে কেউ একজন লিখেছেন তার মনের কথা:
"প্রভু,
কেউ কি জানবে কোন দিন
যে বাবার জমি বন্ধক আপন ভাইয়ের
কাছে রেখে পড়ালেখা করছি?"
ঈশ্বরের কাছে লেখা তার সেই বার্তা পড়ে মনে হলো, চিঠি লেখক কেবল দারিদ্রেই নয়, মনোঃপীড়াতেও ভুগছেন।
হয়তো, জমি বন্ধক রাখার কষ্ট না তাকে যতোটা পীড়িত করেছে, তারচেয়েও অধীক পীড়িত করেছে আপন ভাইয়ের 'অনাপনসুলভ' আচরণ।
চাপা কথার ভার অনেক বেশি। কথার চেয়ে, কথার চাপের ভার বোধহয় আরো বেশি। তাই, যে কথা কাউকে বলা যায় না, সে কথাই বুঝি ঈশ্বরকে বলে মানুষ হাল্কা হতে চায়। ভার মুক্ত হতে চায়।
চিঠিটা পড়ে সঙ্গে সঙ্গে আমার আরেকটা কথাও মনে এসেছিল। সেটি হচ্ছে, লেখাটা আসলে প্রথমে ছিল "প্রভু, কেউ কি জানবে কোন দিন যে বাবার জমি বন্ধক রেখে পড়ালেখা করছি?"
কিন্তু চিঠি লিখিয়ে নিশ্চয়ই লেখাটি লিখে আবার পড়ার সাথে-সাথেই বুঝতে পেরেছে যে, এখানে একটা মূল তথ্য বাদ পড়ে গেছে।
কারণ, আমি অনুমান করি, শুধু বন্ধক দেয়ার মধ্যেই তার কষ্টটা নয়। বরং কষ্টটা হচ্ছে, অন্যখানে। কষ্টটা হচ্ছে তার আপন ভাইয়ের কাছে জমিটা বন্ধক রাখা নিয়ে।
তাই, সংশোধন করতে গিয়ে 'আপন ভাইয়ের কাছে' কথাটা দ্বিতীয় লাইনের শেষে আর তৃতীয় লাইনের আগে জুড়ে দিয়েছে।
লেখাটার বাক্য বিন্যাসে একটু খাপছাড়া ভাব বোধ হয় এজন্যই এসেছে।
মনের কথা, তা অন্যের কাছে হোক আর নিজের কাছে হোক মানুষ অসূম্পর্নভাবে বা খাপছাড়াভাবে প্রকাশ করতে চায় না।
সেই কথা খাপছাড়া হয়ে গেলে বা ভুলভাবে বলা হয়ে গেলে তাই তা আমরা আবার সংশোধনের চেষ্টা করি। প্রয়োজনে চিঠির শেষে, বিশেষ দ্রষ্টব্য উল্লেখ করে দিই। আর এতেও মন স্বস্তি না পেলে খাপছাড়া বাক্যের চিঠি ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে আবার নতুন চিঠি লিখি।
জীবন সব মানুষকে সবসময় সংশোধনীর সুযোগ দেয় কিনা জানি না। তবে, টেবিলের লেখাটি পড়ে আমার কেন যেনো মনে হলো, এটি বোধ হয় কোনো পুরুষ শিক্ষার্থীর লেখা।
জানি না, কোন দুর্বল সময়ে প্রভুকে উদ্দেশ্য করে ছেলেটি এইসব লিখেছিল। জানি না, সে আজো পড়ছে, নাকি তার পড়ালেখা শেষ।
সে যেখানেই থাকুক তার অভাব ঘুচুক। ওর মুক্তি আসুক। ওর জীবন আনন্দ আর ভালোবাসায় ভরে ওঠুক।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে আগস্ট, ২০১৮ বিকাল ৫:১৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




