somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দ্য ব্লাইন্ড স্পট

২৩ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৩৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



ঘন কুয়াশার চাদর আর আঁকাবাঁকা সড়কের আড়ালে ‘পদ্মাডাঙা’ গ্রামটা দেখতে আর দশটা নীরব, নিরুপদ্রব পল্লীর মতোই। কিন্তু সাইবার অপরাধের মানচিত্রে এই জায়গার পরিচয় ভিন্ন। ফিশিং, ব্যাংক ফ্রড আর আইডেন্টিটি থেফটের এক অদৃশ্য সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে এই শান্ত জনপদের ভেতরেই।

আর এই সিন্ডিকেটের মূল নিয়ন্ত্রক রিয়াজুল ইসলাম।

স্থানীয় থানা ও অপরাধ দমন সংস্থার খাতায় রিয়াজুলের নাম দীর্ঘদিন ধরেই মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায়। কিন্তু প্রতিবারই কোনো টিম অভিযানে গেলে দেখা যেত—বাড়ি একেবারে ফাঁকা! যেন কোনো অদৃশ্য বার্তা আগেভাগেই রিয়াজুলকে সতর্ক করে দেয়।

কেসটা যখন পিবিআই-এর (পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন) স্পেশাল সেল ইনভেস্টিগেটর আরিয়ানের টেবিলে এলো, তখন সে কোনো ব্যস্ততা দেখাল না। হোয়াইটবোর্ডে ঘটনার একটা ব্লু-প্রিন্ট তৈরি করতে শুরু করল।

"লোকটা সাধারণ কোনো অপরাধী নয়, স্যার," টেকনিক্যাল অ্যানালিস্ট শাফিন স্ক্রিনে একটা ডিজিটাল স্কেচ ফুটিয়ে তুলে বলল, "গ্রামের প্রধান প্রবেশমুখ থেকে রিয়াজুলের একতলা পাকা বাড়ি পর্যন্ত প্রায় পৌনে দুই কিলোমিটারের পাকা-কাঁচা রাস্তায় বসানো আছে ২২টি নাইট-ভিশন সিসিটিভি ক্যামেরা। প্রতিটি মোড় নজরদারিতে ঢাকা। কোনো অপরিচিত মুখ গ্রামে ঢুকলেই সেই লাইভ ফিড সরাসরি ওর কাছে পৌঁছে যায়।"

আরিয়ান কফির কাপে চুমুক দিয়ে একটু ভাবল। "২২টি ক্যামেরা... এত বেশি সিকিউরিটি লজিক্যাল নিরাপত্তার চেয়ে পার্সোনাল প্যারানয়া নির্দেশ করে। রিয়াজুল মানুষকে বিশ্বাস করতে পারে না, কেবল প্রযুক্তির ডেটাতে ভরসা পায়। একটা মানুষ যখন নিজের চারপাশে এত নিরাপত্তার স্তর তৈরি করে, তখন সেই দেয়ালগুলোই তার দৃষ্টিকে অন্ধ করে ফেলে। কিন্তু শাফিন, লজিস্টিকস কী বলছে? ওর বিদ্যুৎ বা ডাটা ট্রাফিক?"

"সেখানেই তো খটকা, স্যার," শাফিন চার্ট দেখিয়ে বলল, "রিয়াজুল ভুয়া পরিচয়ে তোলা অজস্র সিম কার্ড অদলবদল করে চালায়। কিন্তু ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী, প্রতিটি রেইডের সময় ঘর ফাঁকা পাওয়া গেলেও ওই বাড়ি আর তার আশপাশের মিটারে বিদ্যুৎ ব্যবহারের একটি অদ্ভুত ধারাবাহিকতা দেখা গেছে। বিশেষ করে, যেটাকে সাধারণ কবুতরের খামার বলা হচ্ছে, সেটির প্রাঙ্গণে।"

আরিয়ান পেনসিলটা টেবিলে ঠুকে বলল, "ঠিক এখানেই গড়মিল। একটা সাধারণ কাঠের কবুতরের ঘরে কয়েক শ সিরাজী আর গিরিবাজ কবুতর থাকার কথা। সেখানে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা নির্দিষ্ট পরিমাণ বিদ্যুৎ টানা খরচ হওয়া এবং কাঠামোগত ব্যাপ্তি বাড়ার কোনো যুক্তি নেই। মানুষটা প্রযুক্তির সবচেয়ে আধুনিক স্তরে লুকিয়ে নেই, শাফিন। সে লুকিয়ে আছে সবচেয়ে প্রাচীন ও চোখ এড়িয়ে যাওয়া আড়ালে।"

মঙ্গলবার শেষ রাত। কুয়াশায় পুরো পদ্মাডাঙা যখন নিঝুম, তখন নীরব প্রস্তুতিতে নেমেছে পিবিআই-এর স্পেশাল টিম।

আরিয়ান এবার প্রচলিত কোনো মহড়া অনুসরণ করেনি। রিয়াজুলের ২২টি নজরদারি ক্যামেরার সাইকোলজিক্যাল সুবিধা নিতে টিমটি স্থানীয় কৃষকের ছদ্মবেশে পণ্যবাহী সাধারণ যানবাহনের স্বাভাবিক প্রবাহকে কাজে লাগাল। একই সাথে, স্থানীয় নেটওয়ার্ক সার্ভিস প্রোভাইডারের একটি স্বাভাবিক কারিগরি মেইনটেন্যান্স ডাউনটাইম-এর সুযোগ নিয়ে কয়েক মিনিটের জন্য সিসিটিভি সিগন্যাল লুপে ফেলে রাখা হলো—যাতে মনিটরে সব শান্ত দেখায়।

সেই সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে আরিয়ান, শাফিন এবং পিবিআই-এর চারজন অফিসার রিয়াজুলের উঠোনে কোনো শব্দ না তুলে প্রবেশ করে।

বাড়ির মূল ঘরের ভেতরটায় কেবল সিসিটিভি মনিটরের নীলচে আলো জ্বলছিল। কোনো মানুষ নেই। কিন্তু আরিয়ানের নজর চলে গেল ছাদের কাঠের বিশাল কবুতরের ঘরের দিকে।

বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে কেবলই কয়েক শ দামি জাতের কবুতরের থাকার সাধারণ খামার। বাকবাকুম শব্দ আর বিচালির গন্ধ।

আরিয়ান দেয়ালের কাঠে হাত রেখে থামল। হাতের তালুতে খুব সূক্ষ্ম একটা কম্পন ধরা পড়ল—যা সাধারণ কাঠের ঘরে থাকার কথা নয়। সাথে যুক্ত হয়েছে এক ধরনের অসামঞ্জস্যপূর্ণ শীতল হাওয়ার প্রবাহ।

"কাঠের পেছনে ইনসুলেশন করা হয়েছে, শাফিন," আরিয়ান নিচু স্বরে বলল, "ভেতরে ভারী এয়ার কন্ডিশনিং আর ব্যাকআপ জেনারেটরের হালকা ভাইব্রেশন এটা।"

খামারের এক কোণে জমিয়ে রাখা শুকনো খড়ের স্তূপ সরাতেই বেরিয়ে এলো একটি ফাইবার গ্লাসের স্লাইডিং সিক্রেট ডোর।

দরজাটা ঠেলতেই খুলে গেল এক ভিন্ন জগৎ।

কবুতরের ঘরের ভেতরেই তৈরি করা হয়েছে সাউন্ডপ্রুফ, ফুললি এয়ারকন্ডিশনড এক গোপন বাঙ্কার। দেয়ালজুড়ে ঝুলছে ২২টি ক্যামেরার লাইভ ফিড মনিটর, আর পাশে সাজানো বিশেষ এনক্রিপ্টেড ডিভাইস, মেমোরি কার্ড ও সুবিন্যস্ত সিম হোল্ডার।

বিছানায় শুয়ে থাকা রিয়াজুল মনিটরের দিকে তাকিয়ে নিশ্চিন্ত ছিল—স্ক্রিনে দেখায় রাস্তা ফাঁকা। সে বুঝতেও পারেনি, তার নিজের তৈরি প্রযুক্তির বিশ্বস্ততা তাকে বাইরের জগতের বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে।

হঠাৎ ঘরে পিবিআই টিমের উপস্থিতি দেখে চমকে উঠে বসল রিয়াজুল। চোখ জোড়া ছানাবড়া!

শাফিন ডিজিটাল আলামত, কায়দা করে রাখা ভুক্তভোগীদের অ্যাকাউন্টের সাংকেতিক খাতা ও এনক্রিপ্টেড ড্রাইভগুলো পলিথিন ব্যাগে জব্দ করতে লাগল। রিয়াজুল তখনও বিশ্বাস করতে পারছিল না, তার তৈরি নিরাপত্তা প্রাচীর এভাবে ব্যর্থ হতে পারে।

রিয়াজুল বিড়বিড় করে বলল, "মনিটরে তো কাউকে দেখালো না..."

আরিয়ান ওর দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় শুধু বলল, "যে দেয়াল দিয়ে তুমি বিশ্বকে দেখতে চেয়েছিলে রিয়াজুল, সেই দেয়ালটাই তোমাকে অন্ধ করে রেখেছিল। ক্যামেরা কখনো মানুষের বুদ্ধি মাপতে পারে না।"

পদ্মাডাঙার আকাশে তখন ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। রাতের ঘন কুয়াশা কাটিয়ে ওঠা ভোরের সেই স্নিগ্ধ আলোয় পিবিআই-এর গাড়িটি যখন শহরের দিকে রওনা হলো, তখন কবুতরের ঘরের বাকবাকুম শব্দ ছাপিয়ে আইনশৃঙ্খলা ও আইনি প্রক্রিয়ার এক নিঃশব্দ জয় ঘোষিত হলো।
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৩৭
৩টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মহিউদ্দিন মোহাম্মদের জেন জি নিয়ে মূল্যায়ন এবং জেন জি'কে নিয়ে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, মূল্যায়ন

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৩৯



লেখক মহিউদ্দিন মোহাম্মদের এইসব কথার সাথে একটু দ্বিমত আছে। কারণটা বলছি..

২০১৯ থেকে আমার যে বিপুল সংখ্যক নারীদের সাথে সুন্দর, নির্ভেজাল ও পরিচ্ছন্ন বন্ধুত্ব হয়েছে, এর ৬০%-ই হচ্ছে জেন জি... ...বাকিটুকু পড়ুন

সর্বজনীন পেনশন: সুবিধা বাড়ছে, ভবিষ্যৎ কতটা নিশ্চিত ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৩ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৩:৪৪


সরকারের মনোভাব সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা কঠিন। ফ্যাসিস্ট আমলের বিতর্কিত 'সর্বজনীন পেনশন' প্রকল্পটি বাতিল না করে বর্তমান সরকার উল্টো নতুন নতুন স্কিম চালু করছে এবং এর সুযোগ-সুবিধা দিন দিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

১৯৭১ এর পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে পাকিস্তান কি বাংলাদেশে জঙ্গি নেটওয়ার্ক গড়ছে?

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ২৩ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ভোর ৬:৫৪


পাকিস্তানের জঙ্গি গোষ্ঠী লস্কর-ই-তৈয়বার সহযোগী সংগঠন জামাত-উদ-দাওয়ার কয়েকজন নেতা দাবি করেন, হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পেছনে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। এই জঙ্গি সংগঠনটির নেতা সাইফুল্লাহ কাসুরি বলেন, তারা ১৯৭১ সালে... ...বাকিটুকু পড়ুন

অচেনা মাটিই আমার শেষ ঠিকানা !

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ২৩ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:৫১

অচেনা মাটিই আমার শেষ ঠিকানা !



পাথর বা গ্রানাইটে বেঁধো না তো আমার শেষ শয্যা,
নাম খোদাই করে রেখো না আমায়, দিতে একা থাকার লজ্জা।
চাই না উপাধি, চাই না তারিখ, ধূসর... ...বাকিটুকু পড়ুন

কাতুকুতু'র কাহিনীনামা

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৩ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:১৭

কাতুর সাথে কুতু দিয়ে হচ্ছো পগারপাড়,
ফের যদি আসো কাছে বলবো- 'খবরদার!'
একটু হেসে, কাছে এসে, দিচ্ছো বুঝি কাশি,
ঝুলিয়ে দাড়ি, যাচ্ছো বাড়ি, যেথায় আছেন মাসি।

তোমার সাথে, দুধে-ভাতে, গপ্প করছি কত,
তবু কেন, ঘন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×