
ডিসক্লেইমারঃ এই লেখায় কোনভাবেই ‘মাৎস্যন্যায়’ পূর্ববর্তী,পরবর্তী অথবা সাম্প্রতিক কোন ঘটনাকে নির্দেশ করা হয় নাই। যদি কেউ ‘মাৎস্যন্যায়’কে কোন ঘটনার সাথে মিলিয়ে ফেলেন তবে তা হবে কাকতালীয় মাত্র যার সাথে লেখকের কোথাও কোন ধরনের লেনা-দেনা কিংবা সম্পর্ক নেই। লেখার উদ্দেশ্য শুধুই জনমনের ‘মাৎস্যন্যায়’ সংক্রান্ত কৌতুহল নিবারন। আর কিছুই না।
বলতে গেলে পঞ্চম এবং ষষ্ঠ শতকে দুর্ধর্ষ হুন জাতি ও মালবের যশোবর্মণের আক্রমণের ফলে ষষ্ঠ শতকের শুরুর দিকে গুপ্ত শাসনের সমাপ্তি ঘটলে পুরো উত্তর ভারতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বাধীন রাজবংশের উদ্ভব হয়। যার ধারাবাহিকতায় বাংলা দেশেও বঙ্গ ও গৌড় নামে দুটো স্বাধীন রাজ্য তৈরি হয়। ৬০০ খ্রিস্টাব্দের শেষের দিকে স্বাধীন বঙ্গ রাজ্যের পতন ঘটলেও, স্বাধীন রাজ্য হিসেবে গৌড়কে গুপ্ত রাজা শশাংক টিকিয়ে রাখেন। ধারনা করা হয় শশাংক ছিলেন মহাসেনগুপ্তের একজন ‘মহাসামন্ত’ এবং তাঁর পুত্র অথবা তার ভাইয়ের ছেলে, যার রাজ্যের বিস্তৃতি ছিল মেদিনীপুর, উড়িষ্যার উৎকল (উত্তর উড়িষ্যা) ও কঙ্গোদ (দক্ষিণ উড়িষ্যা), বিহারের মগধ, কামরুপ (আসাম) এবং পশ্চিমে বারাণসী পর্যন্ত। মোটামুটি ৬৩৭ খ্রিস্টাব্দের দিকে শশাংক মৃত্যুবরন করেন।
শশাঙ্ক মৃত্যু-পরবর্তী প্রায় একশত বছর স্থায়ী এবং যোগ্য শাসকের অভাবে বাংলায় চরম অস্থিতিশীল এবং অরাজক শাসন ব্যবস্থা পরিলক্ষিত হয়েছিল বলে ইতহাস সাক্ষ্য দেয়। সেসময় দেশটি অনেকগুলো ছোট ছোট রাজ্যে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং রাজ্যগুলোর পারস্পরিক যুদ্ধবিগ্রহে লিপ্ত হতে থাকে। আইন-শৃঙ্খলা বিধানে সক্ষম কোন শক্তির উপস্থিতি তো ছিলই না বরং দৈহিক এবং অবাধ্য শক্তির উত্থান হয়েছিল ব্যাপক এবং খুব খারাপ ভাবে। স্বাধীন ও সার্বভৌম সামন্ত প্রভুরা নৈরাজ্য সৃষ্টিতে অগ্রনী ভূমিকা পালন করা শুরু করে। যার প্রধান ভুক্তভোগী ছিল সাধারন জনতা। আইন কানুনের এমন সর্বনেশে অবস্থায় জন-মানুষের অবস্থা হয়েছিল ত্রাহি-ত্রাহি। দূর্বলের উপর সবলের অত্যাচার উঠেছিল চরমে, ব্যবসা-বাণিজ্যে চরম অধোগতি দেখা দেয়। বাড়তে থাকে অভাব আর হাহাকার। আর এই অরাজক অবস্থাটাই বাংলার ইতিহাসে ‘মাৎস্যন্যায়’ নামে পরিচিত যেখানে রুপক অর্থে জলার অপেক্ষাকৃত বড় মাছগুলো শক্তির দাপটে ছোট মাছ গ্রাস করে ফেলার বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির বয়ান রয়েছে। কৌটিল্য অর্থশাস্ত্রে ‘মাৎস্যন্যায়ম’ কে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, ‘যখন দন্ডদানের আইন স্থগিত বা অকার্যকর থাকে তখন এমন অরাজক অবস্থার সৃষ্টি হয় যা মাছের রাজ্য সম্পর্কে প্রচলিত প্রবচনের মধ্যে পরিস্ফুট।’
কথিত আছে যে, দেশে দীর্ঘদিন যাবৎ অরাজকতার ফলে জনগণের দু:খ-কষ্টের আর সীমা ছিল না। দেশের শীর্ষ স্থানীয় ব্যক্তিরা একমত হয়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য একজন ‘রাজা’ নির্বাচিত করেন। কিন্তু ‘নির্বাচিত রাজা’ রাতে এক কুৎসিত নাগ রাক্ষসী কর্তৃক নিহত হন। এরপর প্রতি রাতেই একজন করে ‘নির্বাচিত রাজা’ নিহত হতে থাকেন। এভাবে বেশ কিছু বছর কেটে গেল। অবশেষে একদিন চুন্ডাদেবীর এক ভক্ত এক বাড়িতে এসে দেখে সে বাড়ির সকলেরই মন খুব খারাপ। কারণ, ঐদিন ‘নির্বাচিত’ রাজা হবার ভার পড়েছে ঐ বাড়িরই এক ছেলের উপর। আগন্তুক ঐ ছেলের পরিবর্তে নিজে রাজা হতে রাজি হন। পরবর্তী সকালে তিনি রাজা ‘নির্বাচিত’ হন। সে রাত্রে নাগ রাক্ষুসী এলে তিনি চুন্ডাদেবীর মহিমাযুক্ত লাঠির আঘাতে রাক্ষুসীকে মেরে ফেলেন। পরের দিন তাকে জীবিত দেখে সকলেই আশ্চর্য হয়। পরপর সাতদিন তিনি এভাবে রাজা ‘নির্বাচিত’ হন। অবশেষে তাঁর অদ্ভুত যোগ্যতার জন্য জনগণ তাঁকে স্থায়ীভাবে রাজা রূপে ‘নির্বাচিত’ করে।
গোপাল(পাল বংশের প্রতিষ্ঠাতা) কিভাবে ক্ষমতায় আসেন তা নিয়ে পন্ডিতদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও পাল আমলের অনেক পন্ডিতই মনে করেন যে ‘বেপরোয়া ও স্বেচ্ছাচারী লোকদের পরাভূত করা এবং বিশৃঙ্খল অবস্থার বিনাশকল্পে জনতাই গোপালকে রাজা নির্বাচিত করেন। ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হবার পর পর-ই তিনি একশত বছর ধরে চলে আসা ‘মাৎস্যন্যায়মে’র অবসান ঘটান, যারা ‘মাৎস্যন্যায়’ অবস্থার সৃষ্টি করেছিল তাদের সমূলে উৎপাটন করেন এবং স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন। জনতা গোপালকে রাজা মনোনীত করুক অথবা না করুক তবে ‘মাৎস্যন্যায়’ সমূলে উৎপাটনের মধ্য দিয়ে তিনি যে বাংলার জন-প্রিয় রাজা হিসেবে আবির্ভূত হয়ে ছিলেন তা আর বলতে অপেক্ষা রাখেনা।
‘মাৎস্যন্যায়মে’র উপরোক্ত ইতিহাসটি বাঙ্গালী জাতির চরম ধৈর্য্য এবং সহনশীলতা আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে শেষ ‘কুট-কৌশলে’র ইতিহাস। যেখানে ‘আগামী দিনটি হয়তোবা সুন্দর হয়ে ফিরে আসবে তাদের জীবনে’ এই ভাবনা থেকে তারা সহ্য করেই গিয়েছিলেন পুরো একশতটি বছর। পরবর্তীতে কোন লড়াই-সংগ্রাম নয় বরং একজন যোগ্য নেতা নির্বাচন অথবা যোগ্য নেতার পেছনে দাঁড়িয়ে ‘মাৎস্যন্যায়মে’র বিনাশ দেখে হাতে তালি দিয়েছিলেন। বাঙ্গালী জাতটা মনে হয় এমনই………
তথ্যসূত্রঃ বাংলাপিডিয়া, বাংলাদেশের ইতিহাস ও বিশ্বসভ্যতা, উইকিপিডিয়া, ইতিহাস পুনর্পাঠ, ব্লগ এবং অন্যান্য।
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই নভেম্বর, ২০১৫ বিকাল ৫:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




