somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মেঘের আলো ---------------- (( একটি ছোট গল্প ))

১১ ই আগস্ট, ২০১২ সন্ধ্যা ৭:১৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমি কখনো দু’গালে হাত দিয়ে থাকিনা। বাবা এই বিশেষ ভঙ্গিমা কে খুব বড় কূ-লক্ষণ বলে মনে করেন। তবে আজ এই মুহূতে অনেক্ষণ ধরে আমি বারান্দায় অণ্ধকারে চেয়ারের উপরে দুই গালে হাত দিয়ে বসে আছি। এটা নিয়ে আমার ভেতরে কোন অপরাধ বোধ ও কাজ করছে না।আচ্ছা, মানুষের কোন কোন সময়ে সব অনূভুতি ভোতা হয়ে যায়? খুব বেশী খুশী হলে না খুব বেশী কষ্ট হলে ? নাকি দু’সময়েই? সিদ্দীক স্যার থাকলে বিষয়টির সুন্দর ব্যাখা দিতে পারতেন। জীবনের অনেক খুটিনাটি বিষয়ে উনার গভীর জ্ঞান ছিল। সিদ্দীক স্যার আমার স্কুল জীবনের টিচার ছিলেন। লালবাগ জামিলা খাতুন গালস স্কুলের এক সময়ের সুদর্শন ও প্রতাপশালী শিক্ষক ছিলেন এই সিদ্দীক স্যার ।পঞ্চায়েত থেকে ঢং ঢং শব্দ শোনা গেল। অনেক রাত হয়েছে। বাবা-মা পাশের ঘরে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছেন। উনাদের আজ নিশ্চিন্তে ঘুমাবারই কথা।রাত পোহালেই ঈদ।আমার বুদ্ধি হয়ে পর্যন্ত এই বাড়ীতে এত সচ্ছলতা, এত আনন্দের সাথে আর কখনোই ঈদ আসেনি। এই প্রথম আমরা খুব ধুমধাম করে ঈদ করতে যাচ্ছি। আমাদের সমস্ত বাড়ীটা পরিপাটী করে সাজানো হয়েছে। কচি কলাপাতা রং-এর পেইন্টিং করা হয়েছে, ঘরে মখমলের পর্দা টাঙ্গানো হয়েছে।চকবাজার থেকে লোকমান কাকা এসে সব মুদীবাজার দিয়ে গেছে। চৌরাস্তার বাবুল কসাই বিকালে বাড়ী বয়ে বস্তায় করে গরুর মাংস দিয়ে গেছে, সকালে খাসী এনে বাবার সামনে জবাই দিবেন।সব মিলিয়ে এবারের ঈদটা আমাদের কাছে একেবারে অনরকম। যার অপরিসীম ত্যাগের বিনিময়ে আমাদের এমন সুন্দর ঈদ হতে যাচ্ছে সেই দাদা ভাই-ই নিজ চোখে উছ্বাস টুকু দেখতে পারছেন না। দাদা ভাই আমার থেকে বছর পাচেকের বড়। খুব ছোট বেলায় যখন ঈদের মৌসুমে আমি আর দাদা ভাই বাবার পেছনে পেছনে উদ্দু রোডের মকবুল দর্জির দোকানে জামার মাপ দিতে যেতাম তখন দাদার মন খুব খারাপ থাকতো। দাদাভাইয়ের বেশকিছু ধনী পরিবারের বন্ধু ছিল তারা সবাই ঢাকার অভিজাত মার্কেট থেকে দামী পোশাক শপিং করতো।দাদা ভাইয়ের-ও খায়েশ হতো ঐ গুলি কেনার কিন্তু বাবাকে জানানোর কোন রকম সাহস তার ছিল না।দাদা ভাইয়ের লুকানো কষ্ট দেখে আমার নিজের-ও খুব কষ্ট হতো।আমাদের মাত্র ৪ জনের পরিবার-ও ঠিকমত কখনো চালিয়ে উঠতে পারেন নি বাবা। নুন আনতে পানতা ফুরাতো সবসময়।অথচ বাবা সারা জীবন কর অফিসে হিসাব রক্ষকের চাকুরী করে এসেছেন। একটু বুদ্ধি হলে শুনেছি ঐ অফিসের পিওনদের-ও নাকি ঢাকাতে ২/৩ টা করে ফ্লাট আছে। আমাদের এই দশা কেন তার সদুত্তর কখনো বাবার কাছে শুনিনি। মা-কেও সারা জীবন নিলিপ্ত থাকতে দেখেছি। দাদা ভাই বেশ মেধাবী ছাত্র ছিলেন। তারপরেও গ্রাজুয়েশন পরবর্তী জীবন টা দাদার খুব বেশী সুখকর হলো না। অনেক চেষ্টা করেও সরকারী চাকুরী কপালে জুটলোনা।দাদা ভাই বাধ্য হয়েই একটা বায়িং হাউজে চাকুরী নিলেন, বাসায় ফিরতেন রাত ১১/১২ টায়। যখন ফিরতেন তখন দাদার চেহারার দিকে তাকানো যেত না। ধীরে ধীরে দাদা ভাই-এর হতাশা আরো বাড়তে লাগলো।হঠাত একদিন দাদা বাসায় ফিরে জানালো সে বিদেশ যাবার চেষ্টা করছে। বাবা সবকিছু শুনে বল্লেন:”গরীবের ঘোড়া রোগ হয়েছে”।
ফেব্রুয়ারী মাসের এক ভোর বেলা দাদাভাই ব্রিটিশ এয়ার ওয়েজে চড়ে আমাদের ছেড়ে ডাচদের দেশে পাড়ি জমালেন। দেশে রেখে গেলেন মোটামুটি অংকের এক ঋণের বোঝা। দাদাকে হারিয়ে খুব বেশী একা হয়ে গেলাম আমি। বাবা-মা গোপনে সুদিনের প্রহর গুণতে লাগলেন।কিন্তু সুদিন তো সবার জীবনে খুব সহজে ধরা দেয়না ; দিলেও তা আসে অনেক বড় বিসর্জনের মধ্য দিয়ে। দাদা ওদেশে গিয়েই বুঝলেন অবস্থা ভয়াবহ। নাগরিত্ব বা ওয়ার্ক পারমিট না পেলে এখানে টিকে থাকা কঠিন। চরম কষ্টে দিনাতিপাত করতে লাগলেন দাদা ভাই।সে সময় দাদার সাথে এ বাড়ীর একমাত্র আমার ই-মেইলে যোগাযোগ হতো। দাদার কষ্টের ছিটেফোটাও আমি বাবা-মাকে বলতাম না। অবশেষে গত দু’মাস আগে এক ই-মেইল বার্তায় সুখবর টা এল। দাদা ভাই নেদারল্যান্ডের সিটিজেনশীপ পেয়ে গেছেন, বিশ্বখ্যাত ডেভিটর কোম্পনীতে চাকুরীও পেয়েছেন।মা শুনে সঙ্গে সঙ্গে দু’রাকাত নফল নামাজ পড়লেন, বাবা মহল্লার সবাইকে মিষ্টি খাওয়ানোর প্রস্তুতি নিলেন, আমাদের অবস্থা হুট করে ফিরে গেল। এই ভাগ্য ফিরাতে গিয়ে দাদাভাইকে কত বড় বিসর্জন দিতে হয়েছে এ কথা জানতে পারলাম আজ সন্ধায় দাদার ই-মেইল পাবার পর। ছোট বেলা থেকেই দাদা ভাই আমার কাছে কিছু লুকায়নি ; আজ-ও লুকালো না। দাদার ইংরেজীতে লেখা ই-মেইলের সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর এ রকম :----
“তন্দ্রা”
ভালোবাসা নিস।
বাবাকে তিন হাজার ডলার পাঠিয়েছি, ঈদের পর আবার পাঠাবো।আমাদের দু:খ এবার ঘুচে যাবে।তুই গত মেইলে জানতে চেয়েছিলি বিষয়টা কিভাবে ঘটলো? তোকে সব খুলে বলছি , বিষয়টা গোপন রাখবি। বেশ কয়েকদিন ধরে অনাহারে দিন কাটাচ্ছিলাম, দেশে ফিরে যাওয়া ছাড়া আর কোন উপায় ছিলনা।ঠিক সেই সময় ফিলিপ নামের এক ডাচ যুবকের সাথে আমার পরিচয় হয়। সে পেশায় একজন ওয়েব ডেভলপার। ফিলিপ নিজেই আমাকে প্রথম প্রস্তাবটি দেয়।এভাবে অনেক ইন্ডিয়ান এদেশে সিটিজেনশীপ নিয়ে আছে।ব্যাপারটি এদেশে খুবই সাধারণ ও বৈধ।আরো সহজ করে বলি।এ দেশে সমকামীতা বৈধ। ফিলিপ আমাকে তার গে পার্টনার হবার প্রস্তাব দেয়। আমি রাজী হলে ফিলিপ আমাদের কিছু অন্তরঙ্গ মুহুর্তের ভিডিও চিত্র ঐ দেশের মন্ত্রালয়ে জমা দিয়ে আমার নাগরিকত্ব চেয়ে আবেদন করে। গত জুন মাসে আমি সিটিজেনশীপের সমস্ত কাগজপত্র পেয়ে যাই। পেয়ে যাই স্বপ্নের চাকুরিও। আমি কি কাজচা খারাপ করলাম? ধর্ম, জাত, পাত কি বিসর্জন দিলাম। তৃতীয় বিশ্বের নিম্ন মধ বিত্ব পরিবারের কোন ছেলের কি এ গুলো থাকতে হয় ? তন্দ্রা, এবার একটা ভাল ছেলে দেখে খুব ধুমধাম করে তোর বিয়ে দেব। বাবাকে লালমিয়া বাবুর্চিকে বুকিং দিয়ে রাখতে বলিস, তারতো আবার টাইট সিডিউল।
ভালো থাকিস।

ইতি----
তোর দাদা ভাই।।।।

ই-মেইল টা পাওয়া মাত্র আমার ভেতরে কেমন জানি ঘিন ঘিন করছে। মনে হচ্ছে আজ এই রাত্রিতেই দাদা ভাই-এর মৃত্য হয়েছে। আজিমপুরের মত কোন এক কবর স্খানে দাদা ভাইএর আত্বা সমহিত করা হচ্ছে। আমি বাতাসে আগর বাতির সুবাস পাচ্ছি।
শেষ রাতের আকাশে বোধ হয় কিছুটা মেঘ জমেছে। ছিপ ছিপ করে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। এরকম রাতে দাদা প্রায়ই একটা হিন্দী রবীন্দ্র সংগীত শুনতো। মেয়ে কন্ঠে মিন মিন সুরে দাদার শিউরে বাজতে থাকতো :
“ শাবন-ও গাগনে ঘোর-ও ঘন ঘটা----------আগলা কামিনীরে “
রাতের নিকষ আধার কেটে চারিদিকে আলোর বলি রেখা ফুটে উঠছে। আকাশে যথারীতি মেঘের আনাগোনা। তবে কি মেঘের আলোয় আলোকিত হতে যাচ্ছে পৃথিবী ?????

সর্বশেষ এডিট : ১১ ই আগস্ট, ২০১২ রাত ৮:৩৭
১৯টি মন্তব্য ১২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সাইয়েমা হাসানের ‘ফ্রেন্ডলি ফায়ার’

লিখেছেন নান্দনিক নন্দিনী, ৩০ শে মার্চ, ২০২০ রাত ৮:২৯



এদেশের সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিরাপদ রাখতে সরকার সরকারি-বেসরকারি অফিসগুলোতে দশদিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছেন। যেহেতু কোভিড-১৯ বা করোনা ভাইরাস জনিত রোগ তাই দশদিনের সাধারণ ছুটির মূল উদ্দেশ্য জনসাধারণ ঘরে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিশ্বের রাজধানি এখন করোনার রাজধানি।( আমেরিকা আক্রান্তের সংখ্যায় সবাইকে ছাড়িয়ে প্রথম অবস্থানে চলে এসেছে)

লিখেছেন রাফা, ৩০ শে মার্চ, ২০২০ রাত ১০:৪৫



যে শহর ২৪ ঘন্টা যন্ত্রের মত সচল থাকে।করোনায় থমকে গেছে সে শহরের গতিময়তা।নিস্তব্দ হয়ে গেছে পুরো শহরটি।সর্ব বিষয়ে প্রায় প্রথম অবস্থানে থেকেও হিমশিম খাচ্ছে সাস্থ্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

কারো লেখায় মন্তব্যে করার নৈতিক মানদন্ড। একটু কষ্ট হলেও লেখাটি পড়ুন।

লিখেছেন সৈয়দ এমদাদ মাহমুদ, ৩০ শে মার্চ, ২০২০ রাত ১১:০২

সম্মানিত ব্লগারদের দৃষ্টি আকর্শন করে বলছি ব্লগারদের লেখা পড়ে মন্তব্য করবেন শিষ্টাচারের সঙ্গে। মন্তব্য যেন কখনো অন্যকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য না হয়। মন্তব্য হবে সংশোধনের লক্ষ্যে। কারো কোন... ...বাকিটুকু পড়ুন

করোনাময় পৃথিবিতে কেমন আছেন সবাই?

লিখেছেন রাফা, ৩০ শে মার্চ, ২০২০ রাত ১১:২৪



পোষ্ট লিখলাম একটা ক্ষুদ্র কিন্তু প্রথম পাতায় এলোনা ।সেটা জানতে এটা পরিক্ষামূলক পোষ্ট।সব সেটাপ'তো ঠিকই আছে তাহলে সমস্যা কোথায় ? আমি কি সামুতে নিষিদ্ধ নাকি?

ধন্যবাদ। ...বাকিটুকু পড়ুন

পোষ্ট কম লিখবো, ভয়ের কোন কারণ নাই

লিখেছেন চাঁদগাজী, ৩১ শে মার্চ, ২০২০ সকাল ৮:০১



আপনারা জানেন, নিউইয়র্কের খবর ভালো নয়; এই শহরে প্রায় ৫ লাখ বাংগালী বাস করেন; আমিও এখানে আটকা পড়ে গেছি; এই সময়ে আমার দেশে থাকার কথা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×