somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্পঃ ঘর নেই

২৬ শে জুলাই, ২০১৪ সকাল ৯:০৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

অনার্স ফাইনাল পরীক্ষার আগে মাসুদ এক কাণ্ড করে বসলো। তার মতো শান্ত শিষ্ট গোবেচারা ছেলে এমন কাজ করে ফেলবে ভাবা যায়না। সে ছিল কেমিস্ট্রির ছাত্র। অথচ এ্যাপ্লাইড ফিজিক্সের সুন্দরী ছাত্রী ফারজানাকে সে গোপনে বিয়ে করে ফেললো। কিভাবে তাদের মধ্যে ভাব ভালোবাসা হল আল্লাই মালুম। জানাজানি হওয়ার পর মাসুদ ও ফারজানার বিয়ে ভার্সিটিতে ‘টক অফ দি ক্যাম্পাসে’ পরিণত হল।
মাসুদের মা ছিল না। ফারজানাকে বিয়ে করার পর হল থেকে বাক্স পেঁটরাসহ তাকে বাসায় নিয়ে গেলে মাসুদের বাবা সদ্য অবসরপ্রাপ্ত জাঁদরেল বি সি এস (প্রাক্তন ই পি সি এস) অফিসার খোন্দকার মারুফ আলী সাহেব তাদের দুজনকে বাসা থেকে তাড়িয়ে দিলেন। এ সময় পিতা ও পুত্রের মধ্যে যে সব বাক্য বিনিময় হয়েছিল তা’ এরকমঃ-
‘তা’ হলে আমরা চলে যাবো?’
‘অবশ্যই চলে যাবে।’
‘মা বেঁচে থাকলে কি আপনি এমন নির্দয় ব্যবহার করতে পারতেন?’
‘অবশ্যই না। কারণ তোমার মা তখন কান্নাকাটি করে আমার মন নরম করার চেষ্টা করতো। আমি হয়তো তখন নরম হয়েও যেতাম। অধিকাংশ পুরুষ মানুষ মহিলাদের কান্না দেখলে নরম হয়ে যায়। কিন্তু এখন আর সেটা সম্ভব না।’
মাসুদ তার সদ্য বিবাহিতা স্ত্রীকে দেখিয়ে বলল, ‘ফারজানাও তো মেয়েমানুষ এবং দেখুন সেও কাঁদছে। তার কান্না কি আপনার মনকে নরম করার জন্য যথেষ্ট নয়?’
মারুফ সাহেবের একটা মুদ্রাদোষ ছিল কথায় কথায় ‘অবশ্যই হাঁ’ বা ‘অবশ্যই না’ বলা। তিনি বললেন, ‘অবশ্যই না। কারণ সে তোমার স্ত্রী। তার কান্নাকাটি তোমার মনকে নরম করার জন্য যথেষ্ট হতে পারে, আমার মনকে নয়।’
‘তা’ হলে আমরা চলেই যাবো?’
‘অবশ্যই যাবে।’
‘আমি কিন্তু আপনার একমাত্র পুত্রসন্তান।’
‘তাতে কিছু যায় আসে না। এই পৃথিবীতে একমাত্র পুত্রসন্তানের জন্ম দিয়ে অনেক বাবাই বিড়ম্বনায় আছে। তাদের খাতায় আমার নামটা যোগ হল এই আর কি!’
‘আমি কিন্তু ইচ্ছে করলে সিলেটে বড় আপার বাসায় গিয়ে উঠতে পারি।’
‘না, তা’ তুমি পারোনা। কারণ তোমরা এখান থেকে চলে যাবার পর আমি তোমার বড়, মেজ ও ছোটআপা সবাইকে ফোন করে জানিয়ে দেব যে তারা যেন কেউ তোমাদের আশ্রয় না দেয়।’
‘তারা আপনার কথা শুনবে কেন?’
‘এই কারণে শুনবে যে গুলশানে এই বাড়িসহ আমার অনেক সম্পদ আছে। তোমাদের আশ্রয় দিয়ে তারা বিশেষ করে তাদের স্বামীরা এই সম্পদের ভাগ হারানোর ঝুঁকি নেবে না।’
‘তা’ হলে এটাই আপনার শেষ কথা?’
‘অবশ্যই শেষ কথা। কেন, আমার কথা কি তোমার বিশ্বাস হচ্ছে না?’
‘হবেনা কেন? তবে মা হারা পুত্র সন্তানের প্রতি বাবার হৃদয়ে একটা সফট্ কর্নার থাকে। তা’ ছাড়া আমার স্ত্রী দেখতে অসুন্দর নয়। প্রত্যেক বাবাই তার ছেলের জন্য যেমন সুন্দর বউ চায়, আমার স্ত্রী একজাক্টলি সেরকম। ওদের ফ্যামিলি স্ট্যাটাসও খুব ভালো। আপনি খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন।’
‘আমি তার কোন প্রয়োজন বোধ করছি না। তোমরা এখন যেতে পারো।’
‘তা’ হলে চলেই যাই, নাকি?’
‘অবশ্যই চলে যাবে এবং এ বাড়িতে আর কখনো ঢুকবে না।’

পঁচিশ বছর পর। মাসুদ ও ফারজানার একমাত্র মেয়ে সিনথিয়া বি,বি,এর ছাত্রী। সে একদিন তার মাকে ডেকে বলল, ‘মম্, তোমাকে একটা কথা আগে বলা হয়নি। এখন বলছি। তুমি ড্যাডকে জানিয়ে দিও।’
‘কি কথা?’
‘লন্ডনে যাওয়ার আগে ক্যামেরনের সাথে আমার বিয়ে হয়ে গেছে।’
সিনথিয়া তার বয়ফ্রেন্ড কামরানকে বিখ্যাত রোমান্টিক ছবি ‘টাইটানিক’ এর ডিরেক্টর জেমস ক্যামেরন এবং ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের নামের সাথে মিল রেখে ‘ক্যামেরন’ বলে ডাকে। কামরান নামটা তার কাছে ক্ষ্যাত ক্ষ্যাত মনে হয়। তা’ছাড়া সিনথিয়া অন্য সব কিছুর মতো নামের ব্যাপারেও আধুনিকায়নে বিশ্বাসী। কামরান অতি দরিদ্র কৃষক পরিবারের সন্তান। কিন্তু দুর্দান্ত মেধার জোরে সে খেয়ে না খেয়ে বুয়েট থেকে রেকর্ড ভাঙ্গা রেজাল্ট করে পাশ করেছে এবং কয়েকদিন আগে সিনথিয়ার বাবার টাকায় উচ্চ শিক্ষার জন্য লন্ডনে গেছে। সিনথিয়ার ভাষায়, ক্যামেরন ইজ এ হাইলি এ্যামবিশাস বয়। ফারজানা বলল, ‘তোমাদের বিয়ের ব্যাপারটা তো সেটল্ হয়েই ছিল। কামরান লন্ডন থেকে ফেরার পর বিয়ে হওয়ার কথা। তাই,না? আমাদের না জানিয়ে হঠাৎ তোমরা বিয়েটা সেরে ফেললে কেন, বুঝতে পারছি না।’
‘মম্,ইউ আর টু ওল্ড! আমরা বিয়ে করেছি, যেমন তোমরাও করেছো এবং সবাই করে। খারাপ কিছু তো করিনি। প্লিজ, ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড।’
ফারজানা তার মেয়ের বিয়ের কথা মাসুদকে জানালো। খোন্দকার মারুফ আলী সাহেব ভয়ভীতি দেখালেও ছেলেমেয়েদের সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করেননি। তাঁর মৃত্যুর পর গুলশানের বাড়িটা মাসুদের ভাগে পড়েছে। মাসুদ একটি বেসরকারি কলেজে অধ্যাপনা করে। তার পক্ষে একসঙ্গে অনেক টাকা জোগাড় করা সম্ভব না হওয়ায় এই বাড়িটা মর্টগেজ রেখে কামরানের উচ্চ শিক্ষার জন্য ব্যাংক থেকে মোটা টাকা লোণ নিতে হয়েছে। কথা ছিল, কামরান পড়াশুনার ফাঁকে ফাঁকে কাজ করে লন্ডন থেকে টাকা পাঠিয়ে সেই লোণ যতটা সম্ভব শোধ করে দেবে। তাই মেয়ের বিয়ে হয়ে যাওয়ার খবর শুনে সে খুশিই হল। বলল, ‘সিনথিয়া একটা কাজের কাজ করেছে। আমার একমাত্র সম্বল এই বাড়ি বন্ধক রেখে কামরানের লেখাপড়ার খরচ দিয়েছি। বিয়ে হয়ে যাওয়ায় সে এখন একটা বাঁধনের মধ্যে থাকলো।’
‘কিন্তু বিয়ের তো একটা আনুষ্ঠানিকতা আছে। গায়ে হলুদ, পান-চিনি, কনে সাজানো......’
নিজের জীবনে হয়নি বলে মেয়ের জীবনেও এসব হবেনা, এটা মেনে নিতে পারছেনা ফারজানা। মাসুদ একটু অস্থির হয়ে বলল, ‘আরে বাবা, ওসবের সময় তো আর ফুরিয়ে যায়নি। কামরান লন্ডন থেকে ফিরলে সব হবে। সিনথিয়া আমার একমাত্র মেয়ে। তার বিয়েতে ধুমধাম হবেনা এটা একটা কথা হল? তুমি শুধু শুধু ভেবো না তো!’

আরও পাঁচ বছর পর। সিনথিয়া এম বি এ শেষ করে একটা কর্পোরেট হাউসে চাকরি নিয়ে চিটাগং চলে গেছে। সেখানে সে তার নতুন বয়ফ্রেন্ডের সাথে একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে লিভ টুগেদার না কি যেন একটা ব্যবস্থা করে থাকে। বাবা মার সাথে তার কোন যোগাযোগ নেই। জেমস/ডেভিড ক্যামেরন লন্ডন থেকে ফেরেনি। সেখানে সে এক সাদা চামড়ার মেয়েকে বিয়ে করে সিটিজেনশিপ নিয়ে সেটল্ করে ফেলেছে।
এদিকে মাসুদের গুলশানের বাড়ি মর্টগেজ রেখে যে লোণ নেওয়া হয়েছিল, তা’ সুদেমূলে দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ায় বাড়ি অকশনে উঠেছে। অকশনে বাড়ির সর্বোচ্চ দাম ব্যাংকের পাওনা টাকার থেকে কম হওয়ায় বাড়ির যাবতীয় অস্থাবর সম্পদ অর্থাৎ ফার্নিচার, টিভি, কম্পিউটার, ফ্রিজ, এসি, ওভেন সব জব্দ করা হয়েছে।
এই অবস্থায় একদিন সকালে কপর্দকশূন্য মাসুদ এক কাপড়ে ফারজানার হাত ধরে চিরদিনের জন্য চলে গেল এই বাড়ি ছেড়ে, ঠিক যেভাবে গোপনে বিয়ে করার অপরাধে ত্রিশ বছর আগে এ বাড়ি ছেড়ে বউ নিয়ে চলে যেতে হয়েছিল ওকে। ব্যাংকের কর্মকর্তাদের অনুরোধ করে মাসুদ তার চশমাটা শুধু নিতে পেরেছিল সাথে। কারণ চশমা ছাড়া আজকাল সে ভালো দেখতে পায় না।
**********
[গল্পটি মাসিক উত্তর বার্তা পত্রিকার এপ্রিল/ ২০১২ সংখ্যায় প্রকাশিত। ব্লগার বন্ধুরা যারা পড়েননি, তাদের জন্য ব্লগে প্রকাশ করলাম। ]
১৪টি মন্তব্য ১৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পরিস্থিতি কি জটিল?

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৫৯

বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে বসে আছি, অথচ বাইরে পুলিশের সাউন্ড গ্রেনেড আর টিয়ার গ্যাসের শব্দে চারদিক প্রকম্পিত! মিরপুরে আমার বাসার কাছেই মেট্রো রেলের নিচে আগুন দেওয়া হয়েছে; কিছুক্ষণের জন্য মেট্রো... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের ডায়েরী- ২০৩

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৯



খাওয়া দাওয়া করাটা আজকাল বিরক্তকর লাগে।
কিন্তু মানুষের বেঁচে থাকতে হলে- খেতে হবে। না খেলে শরীর দুর্বল হয়ে যাবে। প্রিয় খাবার গুলোও খেতে ইচ্ছা করে না। ভালো লাগে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজ আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৫৬


এই লেখাটি যখন লিখছি, তখন এই গুজবটি ছড়িয়ে পড়েছে যে, ইসরায়েল ট্রাম্পকে রাজি করিয়েছে, যাতে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই আমেরিকা ইরানে পারমাণবিক বোমা হামলা করে। বিগত বছরগুলোতে ইসরাইল সারা বিশ্বের... ...বাকিটুকু পড়ুন

Haze দমনে সিঙ্গাপুরের কুটনৈতিক দক্ষতা

লিখেছেন ঢাবিয়ান, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৩১

সিঙ্গাপুর সাম্প্রতিককালে স্মরনকালের ভয়াবহ Haze (ধোঁয়াশা ও বায়ুদূষণ) এর কবলে পড়ে। সেপ্টেম্বরের শুরুতেই সারা শহর ঘন ধোয়ার আবরনে ঢেকে যায়। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে মনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনার বেঁচে থাকাই তাদের ভয়ের কারণ॥

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ২:৫১





শেখ হাসিনার বেঁচে থাকা নিয়ে আক্ষেপ কেন? একটি রাজনৈতিক সমীকরণের বিশ্লেষণ

সম্প্রতি তারেক রহমানের উপদেষ্টা জাহেদুর রহমানের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে আলোচনা শুরু হয়েছে - "শেখ হাসিনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×