somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্পঃ বিষ

১২ ই এপ্রিল, ২০১৭ রাত ৮:২৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মেয়ের মতি গতি ভালো লাগে না জাহানারার। তাকে বহুবার সাবধান করেছেন তিনি। কিন্তু শারমিন অসম্ভব একরোখা। তার ধারণা, মা তার ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছে। মেয়ে কখন কোথায় যায়, কী করে এসব নিয়ে এ যুগের মায়েদের এত কৌতূহল থাকা উচিৎ নয়। এমন তো নয় যে, মেয়ে এখনো ছোট আছে! শারমিন এখন বিবিএর ছাত্রী। নিজের ভালো মন্দ বোঝার মতো যথেষ্ট বয়স হয়েছে তার।

কিন্তু মেয়ের এই বয়সটাই জাহানারার আতংকের কারণ। শারমিনের বাবা মারা গেছে ওর ছয় বছর বয়সের সময়। তারপর থেকে জাহানারা মেয়েকে নিয়ে প্রায় একা সংগ্রাম করে চলেছেন। আক্ষরিক অর্থেই একা। কাউকে পাশে পাননি তিনি। শ্বশুর শাশুড়ি, দেবর ননদ সবাই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। নিজের বাবা মা অনেক আগে দুনিয়া থেকে চলে গেছেন। একমাত্র ছোটভাই আফজাল মালয়েশিয়া থাকে। সে এখনো বিয়ে করেনি। ভগ্নিপতির মৃত্যুর পর সে প্রতি মাসে মালয়েশিয়া থেকে কিছু টাকা পাঠায়। সে না থাকলে যে কী হতো, ভাবলে গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে জাহানারার। কিন্তু ভাইয়েরও বয়স হয়েছে। বিয়ে-থা করে সংসার করার সময় হয়েছে তার। জাহানারা টাকা পাঠাতে নিষেধ করলেও সে শোনে না। আফজাল ভালো করেই জানে, তার ভগ্নিপতি মৃত্যুর সময় কী রেখে গেছে। ব্যাংকে সামান্য ক’টা টাকা আর কুমিল্লার গ্রামের বাড়িতে স্বার্থপর কিছু আত্মীয়স্বজন। শারমিনের পড়াশুনার জন্য তার বোনকে ঢাকায় বাসা ভাড়া করে থাকতে হয়। স্বামীর মৃত্যুর পর কিন্ডার গার্টেন স্কুলে শিক্ষকতা করে জাহানারা যে বেতন পান, তা’ বাসার ভাড়া দিতেই শেষ হয়ে যায়। ফোনে কথা বলার সময় আফজাল একটা কথাই শুধু বলে, ‘বুবু, তোমার মেয়ে লেখাপড়া শেষ করে যখন চাকরি করবে, তখন থেকে আর টাকা পাঠাবো না। তোমার ছেলে নাই তো কী হয়েছে? শারমিন তোমার ছেলের কাজ করবে, দেখো।’

জাহানারা শাড়ির আঁচলে চোখ মোছেন। ভাইটা বিদেশে থাকে। দেশে থাকা ভাগ্নির খবর সে জানে না। জাহানারা জানাতেও চান না। ক’দিন আগে ডাকযোগে একটা চিঠি পেয়েছেন তিনি। নাম ঠিকানাবিহীন কেউ একজন লিখেছে, “ আপনার মেয়ে মাদকাসক্ত। তার কিছু মাদকাসক্ত ছেলে বন্ধু আছে। তারা উত্তরার একটা বাসায় বসে একসাথে নেশা করে। এ ছাড়া, আপনি কিভাবে নেবেন জানিনা, আপনার মেয়ে নেশার টাকা জোগাড়ের জন্য আজকাল পর্ণো ভিডিও করছে। তার কিছু স্টিল পর্ণো ছবি আমি এই চিঠির সাথে পাঠাতে পারতাম। কিন্তু আপনি একজন মা বলে আপনার সম্মান রক্ষার্থে সেটা করলাম না। অতি দ্রুত আপনি যদি আপনার মেয়েকে মাদকের থাবা থেকে সরিয়ে আনতে না পারেন, তাহলে আপনার মান সম্মান এমনিতেই যাবে।”

চিঠিটা পাওয়ার পর থেকে জাহানারা একটা ঘোরের মধ্যে আছেন। সারা রাত ঘুম হয় না। এক কাজ দু’বার করে করেন, আবার জরুরী কাজের কথা ভুলে যান। কপালের দু’পাশ দপ দপ করে। স্কুলে এক সপ্তাহ ধরে যান না। ফোন করে জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি অসুস্থ। ঘরের দেয়ালে ঝোলানো স্বামীর হাস্যোজ্জল ছবির নিচে দাঁড়িয়ে তিনি নিঃশব্দে কাঁদেন।

মেয়ের খিটখিটে মেজাজের কারণে তার সাথে কথা বলতে জাহানারার ভয় হয়। তিনি মেয়ের অনুপস্থিতিতে চিঠিটা তার বিছানার ওপর রেখে এসেছেন। কিন্তু দু’দিন চলে গেলেও শারমিন চিঠির প্রসঙ্গে কিছু বলে না। তার আচরণ ও চলাফেরা আগের মতোই। সকালে বা দুপুরে বেরিয়ে যায় বাসা থেকে, ফেরে অনেক রাতে। যে বা যারা তাকে বাসার সামনে গাড়ি থেকে নামিয়ে দিয়ে যায়, তাদের একদিনও দেখতে পান না জাহানারা। তারা কেউ গাড়ি থেকে নামে না।

শারমিনের মোবাইল ফোন সারাদিন অফ থাকে। জাহানারা মেয়ের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন না। সম্ভবতঃ তার একাধিক সিম আছে, যা দিয়ে সে অন্যদের সাথে যোগাযোগ করে। রাতে শোবার ঘরের দরজা বন্ধ করে সে মোবাইল ফোনে অনর্গল কথা বলে। কোন কোন দিন সারা রাত কথা বলে। কখন ঘুমায় আর কখন ওঠে, সাত সকালে স্কুলে চলে যাওয়ার কারণে জাহানারা টের পান না। বুয়া জমিলা বলে, ‘আফা আইজ দশটায় উঠছে।’ কোনদিন বলে, ‘আমনে আওনের বিশ মিনিট আগে গ্যাছে গা। নাস্তা খায় নাই।’ জাহানারার হাতঘড়িতে তখন সাড়ে বারোটা বাজে।

এক সপ্তাহ স্কুলে না যাওয়ায় জাহানারা জমিলার কথার সত্যতা খুঁজে পান। কিন্তু মেয়েকে কিছু বলতে তাঁর ভয় লাগে। সাংঘাতিক চড়া মেজাজ তার। মাঝে মাঝে বাসা থেকে চলে যাওয়ার ভয় দেখায় সে। জাহানারা নিজে ওরকম নন। ওর বাবাও ওরকম ছিল না। রোড এ্যাকসিডেন্টে গুরুতর আহত হয়ে জ্ঞান হারানোর পর হাসপাতালে যখন তার জ্ঞান ফিরলো, তখন জাহানারাকে শিশুকন্যা কোলে নিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অত কষ্টের মধ্যেও তার মুখে মৃদু হাসি। সেই হাসি চিরতরে মিলিয়ে গেল কয়েক ঘণ্টার মধ্যে। আজও জাহানারার চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই দৃশ্য।

কিন্তু মেয়েটা এমন হলো কেন, কে জানে? তবে কী ওসব বিষ খেয়েই ওর এই অবস্থা? চিঠিতে আর যেসব কথা লেখা আছে, তা’ যদি সত্যি হয় তো...........! জাহানারার চিন্তাভাবনা ভোঁতা হয়ে যায়। কী করবেন এখন তিনি? কী করে বাঁচাবেন মেয়েকে? এসব লজ্জার কথা কারো সাথে শেয়ার করা যায় না। স্কুলের সহকর্মী শিক্ষিকারা ছাড়া শেয়ার করার মতো জাহানারার আছেই বা কে? কিন্তু তারা এসব জেনে ফেললে কী কেলেঙ্কারি হবে, কে জানে? এ ধরণের মুখরোচক কাহিনী বাতাসের আগে ছড়ায়।
দু’সপ্তাহ পর আবার একটা চিঠি এলো। “আপনি সম্ভবতঃ আমার প্রথম চিঠির কথাগুলো বিশ্বাস করেননি। তাই এবার আপনার মেয়ের কয়েকটা ছবি পাঠালাম। মনে হয়, এবার বিশ্বাস করবেন। ভয় নেই, ব্ল্যাকমেইল করার জন্য ছবিগুলো পাঠাইনি। কারণ আমি জানি, টাকা পয়সা দেওয়ার ক্ষমতা আপনার নাই। আমিও শারমিনের মতো মাদকাসক্ত। কিন্তু ওর মতো উন্মাদ নই। তাই যৎসামান্য বিবেকের তাড়নায় এই শেষ চিঠিটা পাঠালাম। আগে আমি শারমিনকে ভালবাসতাম, এখন ওকে ঘৃণা করি।”

জাহানারা তিন দিন ধরে উদভ্রান্তের মতো সিএনজি নিয়ে উত্তরার সবগুলো সেক্টর চষে বেড়াচ্ছেন। তাঁর নির্দিষ্ট কোন গন্তব্য নেই। সিএনজির ভেতর থেকে তিনি উত্তরার বিশাল বাড়িগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকেন। কখনো কখনো সিএনজি থেকে নেমে কোন বাড়ির গেটের সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকেন। তারপর আবার গাড়িতে উঠে বলেন, ‘চলো।’
সিএনজি চালক মহা বিরক্ত। বলে, ‘খালাম্মা, কই যাইবেন ঠিক মতো কন না ক্যান?’
জাহানারা নিজেই তো জানেন না, তিনি কোথায় যাবেন? আজ তিন দিন হলো শারমিন বাসায় ফেরেনি। জাহানারা শুধু এটুকু জানেন যে, তিনি মেয়ের কাছে যেতে চান।
********************************************************************************************************************
রি-পোস্ট।
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই এপ্রিল, ২০১৭ রাত ৮:২৫
৩২টি মন্তব্য ৩২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

"বহু দিন পর বন্ধু"

লিখেছেন সনজিত, ১৯ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৮:১৮


বহু বছর পর হঠাৎ তোর সঙ্গে দেখা।
প্রথমে চিনতেই পারিনি।
তারপর একচিলতে হাসি-
মনে হলো,
সময় আমাদের চেহারা বদলেছে,
কিন্তু শৈশবের মুখটা এখনো একই রয়ে গেছে।

চোখের কোণে ক্লান্তির রেখা,
চুল অর্ধেকটা সাদা রং,
কাঁধে সংসার,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাংসের ভুলচুক

লিখেছেন আলমগীর সরকার লিটন, ১৯ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১২:০৬


বারে কুত্তার চোখ রঙিন
স্বপ্ন দেখে তাই ঘিন ঘিন
তাই দেখে হাড্ডি হাসে
পিন পিন, নাকের পুহান ঘুম
রক্ত হবে সুরেশ এই চুম;
ঐ গুরুজনে কইছে কথা
কুত্তার পেটে ঘি করে ব্যথা
স্বপ্ন তো দেখবেই ভুক... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্বিচারিতার এক অদ্ভুত মহাকাব্য

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ১৯ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:২৩



দ্বিচারিতার এক অদ্ভুত মহাকাব্য

যতদিন যাচ্ছে, ততই মনে হচ্ছ -এই দেশের তরুণ প্রজন্মের একটা বড় অংশকে নিয়ে আশাবাদী হওয়াটা রীতিমতো বিলাসিতা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
সেদিন দেখলাম, এক ছাত্রশিবির নেতা মঞ্চে দাঁড়িয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

=আয় সখিরা ফিরে যাই মেয়ে বেলা=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১৯ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৪৯


যাবি নাকি তোরা সখি
আমার সাথে মেয়েবেলা;
যেখানটাতে বসতো যে রোজ
কানামাছি বউছি খেলা।

ভাইবোনেরা রোজ বিকেলে
মাঠে হতাম সমবেত,
ডাংগুলি আর গোল্লাছুটে
বিকেল-খেলায় কেটে যেত।

খেলার আসর উঠোনজুড়ে
তোরাও কী খেলতি এমন?
করলে স্মরণ অতীতের দিন
বুকে লাগে কেমন কেমন।

আয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমি মাস্টার্স পাস করে ড্রাইভিং পেশা বেছে নিয়েছি

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৪৩


পিংক বাস সার্ভিসের একজন নারী চালক, নাম রাবেয়া খাতুন। তিনি মাস্টার্স পাশ করে বাস চালাচ্ছেন। খবরটা পড়ে অনেকেই বাহবা দিচ্ছেন, কেউ কেউ বলছেন বাংলাদেশ এমন প্রতিভাকে ধরে রাখার যোগ্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

×