ফকির লালন ও রবীন্দ্রনাথ ভক্তদের তর্ক বহু কাল ধরে চলে আসছে। কুতর্কের দোকান না খুলে নিজেই খুঁজে দেখার চেষ্টা করলাম আসল বিষয়বস্তু কি? কিছু গবেষকদের বই মারফত যা জানতে পারলাম তাতে তর্কের বিষয়টি নিয়ে কথা বলা নিছক বোকামি ছাড়া আর কিছু না।
শিলাইদাহে থাকা কালীন প্রায়ই রবীন্দ্রনাথের সাথে বাউলদের দেখা ও আলোচনা হতো। বাউল গান রবী ঠাকুরকে বেশ প্রভাবিত করেছিল। এসব বাউল মারফত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পরিচিত হন মরমি কবি বাউল সাধক ফকির লালনের সুর বানীর সাথে। যদিও ব্যাক্তিগত জীবনে তারা দুজন কখনো পরস্পরের মুখোমুখি হননি।
লালনের বানী ভাল লাগার থেকে রবীন্দ্রনাথ বেশ কিছু লালন সাঁইজীর বানী সংগ্রহ করেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেন,
"আমার লেখা যারা পড়েছেন, তারা জানেন,পদাবলীর প্রতি আমার অনুরাগ আমি অনেক লেখায় প্রকাশ করেছি। শিলাইদহে যখন ছিলাম, বাউল দলের সঙ্গে আমার সর্বদাই দেখা-সাক্ষাৎ ও আলাপ-আলোচনা হত। আমার অনেক গানে আমি বাউলের সুর গ্রহণ করেছি। এবং অনেক গানে অন্য রাগরাগিণীর সঙ্গে আমার জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে বাউল সুরের মিল ঘটেছে।"
১৩১২ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর "প্রবাসী" পত্রিকার আশ্বিন সংখ্যায় "হারমনি" বিভাগে তার সংগ্রহ করা লালনের ২০টি গান প্রকাশ করেন। যার ফলস্বরূপ ব্রিটিশ শহরের মানুষদের মাঝে লালনের বানী ছড়াতে শুরু করে ও তারা এই মরমি কবি সাথে পরিচিত হয়ে উঠতে শুরু করে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেন, আমার নবীন বয়সে শিলাইদহ (কুষ্টিয়া) অঞ্চলের এক বাউল কোলকাতায় একতারা হাতে বাজিয়ে গেয়েছিল,
'আমি কোথায় পাবো তারে
আমার মনের মানুষ যেরে।
হারায়ে সেই মানুষে, তার উদ্দেশ্যে,
দেশবিদেশে বেড়াই ঘুরে॥"
এই গানের ছন্দ, সুর ও বানী রবীন্দ্রনাথকে এতটাই মুগ্ধ ও আকৃষ্ট করে যে পরবর্তীতে তিনি একই ছন্দ ও সুরে নিজের পদ বাঁধেন,
'আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি।
চিরদিন তোমার আকাশ, তোমার বাতাস
আমার প্রানে বাজায় বাঁশি।'
যা পরবর্তীতে আমাদের জাতীয় সংগীত হয়।
রবীন্দ্রনাথের গাওয়া এই সুর উনি যার মারফত শুনতে পান, তিনি মূলত পেশায় একজন ডাক পিয়ন। যার নাম গগণ হরকরা। কুষ্টিয়ার শিলাইদহের আদিবাসী, পুরো নাম গগণ চন্দ্র দাস। গগণ ছিলেন ফকির লালন সাঁইজীর ভক্ত বা ভাবশিষ্য। গগণ লালন সাঁজীর গাওয়া সুরে বেঁধেছিল তার নিজের রচিত ওই চরণগুলি।
লালনের সুরে রবীন্দ্রনাথের শব্দে আমাদের জাতীয় সংগীত।
আর গগণ ? সে তো সেই সিড়ি, লালন সাঁইজীর একটা বানি মনে পড়ে গেল,
"ভক্তের ডোরে বাঁধা আছেন সাঁই,
হিন্দু কি যবন বলে তার জাতের বিচার নাই।'
একজন গুরু যেমন তার শিষ্যকে উচ্চতায় নিয়ে যায়, তেমনি একজন ভক্ত শিষ্যের মহত্বে গুরু হন আরও সম্মানিত।
লালন সাঁজীর বানিতে,
"যে জন শিষ্য হয়, গুরুর মনের খবর লয়।
এক হাতে যদি বাজতো তালি
তবে দুই হাত কেন লাগায়।।"
শুধু জাতীয় সংগীতের সুর নয়, এমনি অনেক সুর বানী চক্রাকারে ঘুরে ঘুরে ভক্ত-শিষ্যের ভালবাসার মধ্য দিয়ে আজ সাঁইজীকে পৌঁছে দিয়েছে আমাদের সকলের মাঝে। যার মাঝে কবি গুরু রবীন্দ্রনাথও তার ভাল লাগা ও ভালবাসার স্থান থেকে নিজস্ব ভুমিকা রেখেছেন।
প্রতিভা এমনই এক জিনিস যা কেউ কখনো কারো কাছ থেকে চুরি করতে পরে না। আপনার হাতে থাকা মোবাইল ফোনের মতই প্রতিভা আপডেট হয়। যার প্রতিভা নেই সে যতই চুরি করুক না কেন একসময় পিছিয়ে পড়ে ধীরেধীরে কালের গর্ভে তলিয়ে মায়ের ভোগে যায়।
এই চক্র শিকলের তিনটি স্তর ঘুরে তিনজন গুণীজনের গুনের, প্রতিভার কদর ও ব্যবহার দেখে নিজের মাঝে এই উপলব্ধি জাগে, আমাদের অহংকার এবং নিন্দাচর্চার মনভাবে নিজেদের আমরা এক অন্ধকারের চাদরে মুড়িয়ে রাখছি।
লালন ও রবীন্দ্রনাথ দুই জন-ই বাংলা শিল্প সংস্কৃতির মহা গুণীজন ইহাতে কোন দ্বন্দ্ব নাই। গুণীজন কাহাকে বলে, কেমন হন? তাদের জীবনযাত্রা আমাদের চেনায়। তারা দুজনেই তাদের নিজ নিজ জায়গায় থেকে কীভাবে জ্ঞানের চর্চা ও গুণীদের কদর করতে হয় তার অনেক দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন।
শুধু আমার সেসবের পাশ কাটিয়ে মেতে আছি তর্কে আর তুচ্ছতাচ্ছিল্যতায়।
- লিংকন
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে অক্টোবর, ২০২৪ দুপুর ১:৫৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




