somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ভূমিকম্প, শহরাঞ্চলের ভবন ও আমরা

২১ শে মে, ২০১৫ দুপুর ১২:১৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ভূমিকম্প, শহরাঞ্চলের ভবন ও আমরা


ভূমিকাঃ
সাধারনতঃ বাংলাদেশে একটি ভূমিকম্প হবার পর পরই পত্রপত্রিকায় কতগুলি নিবন্ধ প্রকাশিত হয় । এগুলির মধ্যে থাকে, ভূমিকম্প কেন কিভাবে হয় তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা, বিভিন্ন মাত্রার ভূমিকম্প হলে ঢাকা শহরে কি ধরনের ক্ষতি হতে পারে তার প্রাণ কাঁপানো ও ভীতিকর বর্ননা, ভূমিকম্প হলে কি ভাবে প্রাণ বাঁচানো যাবে তার দায় সারা কিছু উপায় বাতলানো ইত্যাদি । সেই সঙ্গে কেউ কেউ হিসাব দিয়ে থাকেন, ভবনকে ভূমিকম্প নিরোধক করতে হলে প্রতি বর্গফুটে কত খরচ পড়বে ইত্যাদি । ভূমিকম্পে ভারী ভারী ভবনগুলি ভেঙ্গে মাথায় পড়লে মূহুর্তে কি অবস্থা হবে সে কথা ভেবে মানুষের চোখে যখন ঘুম থাকে না তখন এ সব নিবন্ধ তাদের কোন শান্তি বা আশ্বাস দিতে পারে না । এর মধ্যে আবার কিছু মানুষের ব্যবসা প্রস্তাব তাদের গায়ে জ্বালা ধরালে সে জন্য তাদের দায়ী করা যায় না ।
ভূমিকম্প সম্বন্ধে যে কথা সত্যি তা হলো, ভূমিকম্প আগে ছিল এখন আছে, আর ভবিষ্যতেও থাকবে । প্রাচীন যুগে মানুষ কাঠ, টিন ইত্যাদি দিয়ে তৈরী যে সব অপেক্ষাকৃত খারাপ ধরনের ভবন তৈরী করতো সেগুলি ভূমিকম্পে ছিল নিরাপদ। কারন এগুলি ছিল হালকা এবং ভূমিকম্প সাধারনতঃ মাটিতে যে ধরনের কম্পন সৃষ্টি করে এগুলি তা সহ্য করতে পারতো । পরে মানুষ ইট, কংকৃট বা স্টীল দিয়ে এর চেয়ে অনেক ভালো ভবন নির্মান করেছে এবং স্থান সংকুলানের জন্য শহরাঞ্চলে অল্পস্থানে অনেক সুউচ্চ ভবন নির্মান করেছে । কিন্তু এই উন্নত ভবন ভূমিকম্পে নিরাপদ নয় । তাছাড়া শহরে একেবারে কাছাকাছি স্থানে ভবন নির্মান করার ফলে একটি অনিরাপদ ভবন তার পাশের নিরাপদ ভবনগুলিকেও অনিরাপদ করে তুলেছে । এমন বাস্তবতা স্বত্তেও আমাদের আর টিন কাঠের বাড়ীর যুগে ফিরে যাবার পথ নেই । বরং কিভাবে এই সমস্যা মোকাবেলা করে টিকে থাকা যায় সেটাই এখন আমাদের ভাবতে হবে ।
ইট, কংকৃট ও স্টীলের ভবনঃ
ইট-সিমেন্ট এর ভবন স্থিতিস্থাপক নয়, তাই এই ভবন ভূমিকম্পের বড় কম্পন অল্পক্ষন বা ছোট কম্পন বেশীক্ষন সহ্য করতে পারে না । কংকৃটের ভবন নির্মানে কংকৃটের সাথে লোহা ব্যবহার করা হয় । লোহা বেশ স্থিতিস্থাপক । তাই এর ব্যবহার ভবনকে কিছুটা স্থিতিস্থাপকতা দিয়ে থাকে । তার মানে হলো ভূমিকম্পের সময় এই ভবন কিছুটা কাঁপলেও চট করে ভেঙ্গে পড়ে না । বলা যায় এই ধরনের ভবন কিছু মাত্রার কম্পন সহ্য করতে পারে । তবে কম্পনের মাত্রা বেশী হলে বা ছোট কম্পন অনেকক্ষন ধরে চলতে থাকলে ভবন তা সহ্য করতে পারে না । কারন-
(০১) ভূমিকম্পে ভবন যখন কাঁপে থাকে তখন স্থিতিস্থাপকতার কারনে লোহার রড একটু বেড়ে পরক্ষনেই তা আবার সংকুচিত ও স্বাভাবিক হয়ে যায় । বেশী কম্পনের কারনে এই প্রসারন বেশী হয়ে গেলেই কংকৃটে বড় বড় ফাটল দেখা দেবে ।
(০২) আবার সামান্য কম্পনে যে প্রসারণ হয় একটু পরেই তা স্বাভাবিক হলেও অনেক সময় ধরে বার বার এই সংকোচন প্রসারন চলতে থাকলে লোহা আর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যেতে পারে না । ফলে ফাটল বাড়তে থাকে এবং ভবন ভেঙ্গে পড়ে ।
স্টীলের ভবন তূলনামূলক ভাবে কংকৃটের চেয়েও বেশী স্থিতিস্থাপক । স্টীলের ভবনের মূল শক্তি স্টীলের কাঠামোতেই থাকে । তাই এই ভবন অনেক বেশী কম্পন সহ্য করতে পারে। তার মানে ভূমিকম্পের সময় স্টীলের ভবন অনেক বেশী দুলতে পারে, কিন্তু তাতে সে ভেঙ্গে পড়বে না । কিন্তু এই দুলুনীর ফল কি হতে পারে তা দেখা দরকার। এর ফলেঃ
(১) মানুষ মানসিক যন্ত্রনায় ভুগবে, বিশেষতঃ হার্টের রোগীদের অবস্থা মারাত্মক হতে পারে,
(২) ভবনের ভঙ্গুর জিনিসগুলি ভেঙ্গে যেতে পারে,
(৩) ভেতরের দেয়াল ভেতরে এবং বাইরের দেয়াল ভেতরে বা বাইরে ভেঙ্গে পড়তে পারে,
(৪) লিফট অকেজো হতে পারে,
(৫) মূল্যবান জিনিস ক্ষতিগ্রস্থ হরে পারে, ইত্যাদি ।

ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে বাস্তব সমস্যাঃ
পৃথিবীর সব দেশেই ভূমিকম্প নিরোধক ভবন ডিজাইনের ক্ষেত্রে কতকগুলি বাস্তব সমস্যা আছে । এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা এই যে, ভূমিকম্প যে কবে কখন কত শক্তি নিয়ে আসবে তা কারো জানা থাকে না । এই শক্তি খুব ছোট হতে পারে আবার খুব বড়ও হতে পারে । ধরা যাক, প্রকৌশলীরা একটি নির্দিষ্ট মাত্রা সহনশীল করে একটি ভবন ডিজাইন করলেন । এখন ভূমিকম্পের মাত্রা এই সীমা অতিক্রম করলেই এই ভবন ভেঙ্গে পড়ার কথা । আবার ধরা যাক, এই ভবনটি নির্মানের দশ বতসর পর এই মাত্রার ভূমিকম্প হলো । এতেও ভবন ভেঙ্গে পড়ার কথা, কারণ ইতিমধ্যে বয়সের কারনে এই ভবনের সক্ষমতা কমে গেছে । নীচে আমরা সমস্যাগুলি পয়েন্ট আকারে লিখছি ।
(০১) কবে কখন কত মাত্রার ভূমিকম্প হবে তা জানা নেই, তবে ভূমিকম্প যে হবেই তা ঠিক জানা আছে । এবং এটি যে কোন দিন বা যে কোন সময় আসতে পারে ।
(০২) নিজেদের বসবাসের ভবনটি খুব শক্ত হলেও একেবারে পাশের ভবনটি ভূমিকম্প সহনশীল না হলে ভূমিকম্পে নিরাপত্তা পাওয়া যাবে না । কারনে খারাপ ভবনটি নিজে ধংস হয়ে ভালো ভবনটিকেও ধংস করে দিতে পারে ।
(০৩) ধরা যাক, একটা নির্দিষ্ট মাত্রার ভূমিকম্পের জন্য সহনশীল করে একটি ভবন তৈরী করা হয়েছে । এই মাত্রার চেয়ে বেশী মাত্রার ভূমিকম্প হলে তখন এই ভবন আর নিরাপদ থাকবে না ।
(০৪) ধরা যাক, একটা নির্দিষ্ট মাত্রা সহনশীল একটি ভবন তৈরী করা হয়েছে । আজ এটি এই মাত্রার জন্য নিরাপদ হলেও কিছু বৎসর পরে আর তা থাকবে না । কারন ভবনের বয়স বাড়ার সাথে সাথে এর সব ধরনের শক্তি কমতে থাকে ।
(০৫) একটা নির্দিষ্ট মাত্রার জন্য সহনশীল ভবন তৈরী করার পর ভূল ভাবে ব্যবহারের কারনে তা অনিরাপদ হতে পারে । যেমন, বহুতল ভবনের নীচের তলায় কলামের ফাঁকে ফাঁকে দেয়াল নির্মান করা না হলে তা দূর্বল হয়ে পড়ে । ভবনের উপরের কোন তলায় ভারী জিনিসপত্র বা ভারী নির্মান সামগ্রী ব্যবহার করলে তা ভূমিকম্পের সময় ক্ষতিকর ভূমিকা রাখবে। ভূমিকম্পের সময় ছাদের পানির ট্যাঙ্ক ভরা থাকলে এটিও ক্ষতিকর হতে পারে।
(০৬) ভবনের আশে পাশের মাটি ভূল ভাবে ব্যবহারের কারনে সঠিকভাবে ডিজাইন করা ভবনও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে । যেমন ভবনের পাশে গর্ত করা হলে, কোন গর্ত ভালোভাবে ভরাট করা না হলে, ভবনের পাশের মাটি সরে গেলে ভবন ক্ষতিগ্রস্থ হবে ।

পরিত্রানের উপায়ঃ
এই সামগ্রিক পরিস্থিতিতে আমাদের কি করা উচিত ? প্রথমেই বলা ভালো আজকের এই ব্যবসার যুগে দেশের অধিকাংশ মানুষই ব্যবসা ছাড়া কিছু ভাবতে পারে না । ভূমিকম্প থেকেও তাই কে কি ভাবে ব্যবসা করবে তা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে । যেমন আমরা ইতিমধ্যেই শুনতে পাই, বিশেষ ধরনের রড বা সিমেন্ট ব্যবহার করা হলে বা প্রতি বর্গফুটে কিছু টাকা খরচ করলেই ভবন ভূমিকম্প সহনশীল হয়ে যাবে ইত্যাদি । এসব কথা চট করে সত্যি বলে মেনে নেবার কোন কারণ নেই ।
কথায় বলে, যত গুড় তত মিষ্টি । আসলে গুড় বেশী দেয়া হলে মিষ্টি হবে, তবে স্বাদ হবে কি না তা বলা যায় না । ভবন নির্মানের ক্ষেত্রেও এ কথা বলা চলে । অনেক টাকা খরচ করলেই, বা বেশী পরিমানে দামী রড বা সিমেন্ট ব্যবহার করলেই ভবন শক্ত বা ভূমিকম্প সহনশীল হবে এমনটা সত্যি নয় । রান্নার স্বাদ যেমন নির্ভর করে রাধুনীর হাত যশের উপর, ভবনের ভূমিকম্প সহনশীলতা তেমনই নির্ভর করে ভবনের ডিজাইনের উপর । তবে শহরাঞ্চলে ভবনের নিরাপত্তা শুধুমাত্র একক কোন ভবনের ডিজাইনের উপর নির্ভর করে না, বরং এটির আশে পাশের ভবনের অবস্থান ও তাদের ডিজাইনের উপরও নির্ভর করে । যেমন ধরা যাক, একট ভবন একটি বিশেষ মাত্রার ভূমিকম্প নিরোধক ভাবে ডিজাইন করা হলো । কিন্তু এর পাশেই আছে একটি দুর্বল বা ভূল ডিজাইনের ভবন, যা অনেক অল্প মাত্রার ভূমিকম্পেই ভেঙ্গে পড়ার সম্ভাবনা । এক্ষেত্রে ঐ সঠিক ডিজাইনের ভবনটির কোন ভাবেই নিরাপদ থাকবে না ।
ভূমিকম্প নিরোধক ভবন ডিজাইন করা তাই এক অত্যন্ত কঠিন সমস্যা । ভূমিকম্প আগে ছিল এখন আছে আর ভবিষ্যতেও থাকবে, এবং এটি যে কখন কোন মাত্রার শক্তি নিয়ে আসবে তা কারো জানা নেই । এক্ষেত্রে করনীয় কাজ কি ? সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হলো, সবচেয়ে বড় শক্তির ভূমিকম্প সহনশীল করে ভবন ডিজাইন করা । কিন্তু এ কাজ এতই খরচ সাপেক্ষ এবং আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে অপ্রচলিত যে আমাদের দেশে তা ভাবাই যায় না । বর্তমানে পৃথিবীতে সবচেয়ে নিরাপদ ভূমিকম্প সহনশীল ভবন যেভাবে ডিজাইন করা হয় তার একটি হলো, ভবনটি একটি শক্ত প্লেটের উপর বসানো থাকে । ভবনটির নীচে থাকে ফুটবলের মতন গোলাকার কতকগুলি চাকা। এই চাকাগুলি যে কোন দিকে নড়াচড়া করতে পারে । এর ফলে যত বড় মাত্রার ভূমিকম্পই হোক না কেন, ভুমিকম্পে যখন মাটি কাঁপে তখন ভবন থাকে প্রায় স্থির । আমাদের দেশে অত্যন্ত খরচ সাপেক্ষ এই ধরনের ভবন ডিজাইন বা তৈরীর কোন ব্যবস্থা এখনও নেই ।
একেবারে কম খরচে যেমন ভূমিকম্প নিরোধক ভবন নির্মান সম্ভব নয়, তেমনি ডিজাইনের যদি সঠিক নিয়ম জানা না থাকে তাহলে অনেক বেশী টাকা খরচ করেও ভবন ভূমিকম্প নিরোধক ডিজাইন পাওয়া সম্ভব হয় না । খুব বেশী মাত্রার ভূমিকম্পের জন্য সহনশীল বাড়ি তৈরী করতে গেলে যে বিপুল খরচ পড়বে তাতে আমাদের দেশে বাড়ী নির্মান প্রায় বন্ধ হয়ে যাবে । আমাদের দেশে বর্তমানে যে সব ভবন তৈরী হচ্ছে তা আমাদের বর্তমান আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট এবং দেশে প্রাপ্ত জ্ঞান ও টেকনোলজীর উপর ভিত্তি করেই হচ্ছে । এর বেশী কিছু করা বর্তমান অবস্থায় সম্ভব নয় । তবে বাস্তবে দেখা যায়, অজ্ঞানতা বা ভূল ডিজাইন বা নির্মানের কারনে নির্দিষ্ট বাজেটের একটি ভবনের যে ভূমিকম্প নিরোধক শক্তি পাবার কথা ছিল তা সে পাচ্ছে না । আমরা বিবেচনা করে দেখতে পারি, এই ভূলগুলি কি ধরনের এবং এই গুলি সংশোধন করে ভবনটি যে শক্তির জন্য ডিজাইন করা হয়েছে সেই শক্তি পাওয়া যায় কি না । এর বাইরেও আমরা দেখতে পারি, অনেকে আগে ভূমিকম্পের কথা চিন্তা না করেই ভবন তৈরী করেছেন, কিন্তু এখন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তাদের অনেক কিছু ভাবতে হচ্ছে । এ অবস্থায় তারা কম খরচে কিছু করতে পারেন কি না, ইত্যাদি ।
ভূল কিভাবে এবং কেন হয়?
ধরা যাক, একজন মালিক একটি বহুতল ভবন নির্মান করতে চান, কিন্তু তার টাকার অভাব আছে । সেক্ষেত্রে তিনি বিকল্প কিছু করতে পারেন । যেমন, সঠিক ডিজাইনের বহুতল ভবনের ডিজাইন করে মাত্র কয়েকটি তলা তৈরী করলেন । কিন্তু তিনি কখনই ঐ টাকায় দূর্বল ভবন নির্মান করবেন না, কারন এটি তারই ভবন । বর্তমানে এই বহুতল ভবন নির্মানের কাজটি করে থাকে ডেভেলপারেরা, যারা পরবর্তীতে আর ভবনের মালিক থাকে না । তারা বিভিন্ন মালিকদের কাছে ফ্লাট বিক্রয় করে চলে যায়, বা ব্যবসা পালটে ফেলে । এই ভবন যখন তৈরী করা হয় তখন পরবর্তী মালিকেরা অনেক সময়ই এর মূল কাঠামো নির্মানের কাজ দেখার সুযোগ পায় না । এক্ষেত্রে মূল ভবনটি শক্ত ও নিরাপদ হলে যাদের স্বার্থ রক্ষা হয় তারা তা দেখতে পায় নি, আর এই ভবন ভেঙ্গে গেলে যাদের কিছুই যায় আসে না তারা তা দেখেছে । বলা বাহুল্য, এক্ষেত্রে ভুল বা ইচ্ছাকৃত প্রতারনার সুযোগ থেকেই যায় ।

এবারে আমরা দেখবো, আমাদের দেশে ইতিমধ্যেই যে সব কংকৃট বা স্টীলের ভবন তৈরী করা হয়েছে তাতে কি ধরনের ভূল করা হয়েছে । ইটের ভবন ভূমিকম্প নিরোধী নয় বলে সঙ্গতঃ কারনেই সেগুলি এই আলোচনার বাইরে রাখা হবে । প্রথমে আমরা ভূমিকম্প কি ভাবে ভবনকে আক্রমন করে এবং ভবন কিভাবে তা মোকাবেলা করে তার একটি সাধারন আলোচনায় যাবো। কোথাও ভূমিকম্প হলে তা উৎপত্তিস্থল থেকে ঢেউএর মতন বৃত্তাকারে তা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন ভবনগুলি কাঁপিয়ে তোলে। আমাদের ভবনগুলির প্লান সাধারনতঃ আয়তাকার বা বর্গাকার । ভূমিকম্প যে দিক থেকেই আসুক না কেন, আয়তকার প্লানের ক্ষেত্রে এগুলি পাশের দিকে, বর্গাকারের ক্ষেত্রে যে কোন এক দিকে আর গোলাকার হলে যে দিক থেকে কম্পন আসে সেই দিক বরাবর কাঁপতে থাকে । কংকৃটের ফ্রেম-স্ট্রাকচারের ভবনে এই কম্পন সবার আগে এসে লাগে কলামে । ডিজাইনার ভবন এমন ভাবে ডিজাইন করেন যাতে কলাম যেন বিমকে সাথে নিয়ে এই কম্পনের বিরুদ্ধে দাড়াতে পারে । কলাম এবং বিমের সাথে লাগানো স্ল্যাব এবং দেয়াল এ সময় ভূকম্পের দুলুনীর সাথে সাথে নিজের ওজনের কারনে দুলতে থাকে । এই দুলুনীকে বলা যেতে পারে "ইনার্সিয়ার কারনে দুলুনী" । স্ল্যাব ও দেয়ালের ওজন যত বেশী হবে ইনার্সিয়ার কারনে দুলুনীও তত বেশী হবে । আবার এই ওজন পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে যত উচ্চতায় হবে, দুলুনীও তত বাড়বে । এই কারনেই ছাদের ভারী পানির ট্যাঙ্ক ভূমিকম্পে অত্যন্ত বিপজ্জনক। তাই ডিজাইনার চেষ্টা করেন, ভবনের ওজন এবং বিশেষতঃ স্ল্যাব, দেয়াল ইত্যাদির ওজন যেন যথাসম্ভব কম থাকে । এই বিশ্লেষন থেকে বোঝা যায়, কঙ্কৃট ফ্রেম স্ট্রাকচারের একটি ভবন ভূমিকম্প প্রতিরোধক বা কম্পন প্রতিরোধী হবে যদি তারঃ
(০১) কলামগুলি হয় মোটা,
(০২) বিম হয় ডীপ (নিচের দিকে ঝুলানো),
(০৩) ভবনের প্রতিটি তলার বিশেষতঃ উপরের তলাগুলির ওজন হয় যথাসম্ভব কম,
(০৪) ভবন যে দিকে কাঁপছে সে দিকের কলামের সংখ্যা হয় বেশী,
(০৫) কলাম-বীমের মাঝে থাকে শক্ত ফিলার দেয়াল ইত্যাদি।

আমরা উপরের বিষয়গুলি ডিজাইনের দৃষ্টিকোন থেকে সংক্ষেপে আলোচনা করবো ।

(০১) মোটা কলামঃ কলাম ভবনের ওজন বা ভার বহন করে থাকে । ভালো মানের সিমেন্ট, শক্ত পাথর এবং ভালো মানের রড ব্যবহার করে খুব ছোট মাপের কলামকেও প্রচুর ওজন বহনক্ষম করা যেতে পারে । কিন্তু উচ্চ শক্তির রড ব্যবহার করা না হলে এই কলাম ভূমিকম্পের কম্পন নিরোধক হবে না । কলামের রডগুলি কলামের কেন্দ্র থাকে যথাসম্ভব দূরে থাকলে এগুলি কম্পননিরোধক হিসেবে কাজ করবে । আমাদের দেশে ১০ইঞ্চি চওড়া ইটের দেয়াল নির্মান করা হয় । এর সাথে মিল রেখে অনেকে ১০ইঞ্চি বাই ১০, ২০, ২৫, ৩০ ইঞ্চি কলাম রাখতে পছন্দ করেন । বলাবাহুল্য এখানে কলামের একদিকের রডের সর্বোচ্চ দুরত্ব হবে ১০ ইঞ্চির চেয়েও কম । এটি ভূমিকম্পে বিপজ্জনক।

(০২) ডীপ বিমঃ বিম যত ডীপ হবে, ভূকম্পনের সময় কলাম তা থেকে তত বেশী শক্তি পাবে, এবং পরিনামে ভবন কম কাঁপবে । সাধারনতঃ কলামের মাঝের দূরত্ব বাড়লে বিমের ডেপথও বাড়ে । কলামের মতই ভালো মানের সিমেন্ট, শক্ত পাথর এবং ভালো মানের রড ব্যবহার করে খুব কম ডেপথের বিমের মাধ্যমে অনেক বেশী ওজন বহন করা সম্ভব। কিন্তু উপরে বর্ণিত কারনে এই বিম ভূকম্পনে কোন সুবিধা দেবে না।

(০৩) ভবনের তলার তলার ওজনঃ একটা প্রচলিত কথা আছে, ভারী জিনিস কম কাঁপে । মানুষের তাদের সাধারন শক্তি বিবেচনা করে একথা তৈরী করেছে । ভূমিকম্প যে প্রবল শক্তি নিয়ে আসে তাতে সে যে কোন জিনিসকে যতটুকু কাঁপাতে চাইবে ততটুকুই কাঁপিয়ে ছাড়বে । এই কাঁপানোর পর জিনিসটা কাঁপবে তার নিজের ওজন বা ইনার্সিয়ার কারনে । ভূমিকম্পের কারনে তাই ভারী জিনিস বেশী কাঁপে । এই পরিপ্রেক্ষিতে বোঝা যায়, ভবনের ওজন যত কম হবে তা ততই ভূমিকম্পরোধী হবে।

(০৪) কাঁপার দিকের কলামের সংখ্যা বাড়ানোঃ আসলে কম্পন যে কখন কোন দিক থেকে আসবে এটা কারো জানা থাকে না । তাই ডিজাইনার চেষ্টা করে থাকেন যাতে ভবনের উভয় দিকেই বেশী সংখ্যক কলাম থাকে । ভূমিকম্পরোধী হবার জন্য বহুতল ভবনে কোন দিকেই কলাম তিন সারির কম হওয়া উচিত নয় ।

(০৫) কলাম-বীমের মাঝের ফিলার দেয়ালঃ এটা সাধারন জ্ঞানেই বোঝা যায়, কলাম-বীমের মাঝে ফাঁকা থাকলে ভূকম্পনে তা বেশী কাঁপবে । তবে বিশেষ জ্ঞান বলে, আসলে তা কমও কাঁপতে পারে, কারন, দেয়াল না থাকার কারনে ওজন কম থাকবে । আসলে এই কাঁপার পরিমান নির্ভর করে কলাম-বিমের বন্ধন জনিত শক্তি বেশী না দেয়ালের ওজন বেশি তার উপর ।

উপরে প্রাপ্ত জ্ঞান থাকে এখন আমরা ঢাকা বিভিন্ন ভবনের কিছু কিছু ভূলের কথা আলোচনা করতে পারি । যেমন,
(০১) ঢাকা শহরে বিম-বিহীন যেসব ভবন তৈরী করা হয়েছে সেগুলি ভূমিকম্পের সময় মরনফাঁদ ছাড়া আর কিছুই নয় । এধরনের ভবন কোন কোন বিশেষ কারনে (বিশেষতঃ যেখানে বড় গাড়ী পার্কিং করার প্রয়োজন হয়) তৈরী করা হয় । সেখানে গাড়ীর প্রয়োজনে খুব পুরু স্ল্যাব ব্যবহার করার প্রয়োজন হয় । এক্ষেত্রে ডিজাইনেরা স্ল্যাবের বিশেষ স্থানে কিছু বেশী রড ব্যবহার সেগুলিই বিম হিসেবে ব্যবহার করে । এসব ক্ষেত্রে স্ল্যাব এত পুরু করতে হয় যেন দুই কলামের মাঝে সাধারন অবস্থায় সবচেয়ে কম ডীপ যে বিম ব্যবহার করার প্রয়োজন হতো, স্ল্যাব যেন কমপক্ষে ততটা পুরু হয়। এই ভবনে আবার স্ল্যাবের ওজন বেড়ে যাবার কারনেই স্ল্যাব আরো কিছু বেশী পুরু করার প্রয়োজন হয় । আবার এই ভারী স্ল্যাবের কারনে ইনার্সিয়া বেড়ে যাওয়ায় তাকে আয়ত্তাধীনে রাখার জন্য বেশ মোটা কলাম ব্যবহার করতে হয় । বিম বিহীন কলাম-স্ল্যাবের ভবন ভূমিকম্পের সময় নিজের এবং আশে পাশের ভালো ভবনের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক । এই ধরনের ভবন ভূমিকম্পে নিরাপদ করার কোন সংশোধনী এখন পর্য্যন্ত আমাদের জানা নেই ।
(০২) ভবনের কলামগুলি ভূকম্পনের ধাক্কা সবার আগে বিমগুলিতে ছড়িয়ে দেয় । অন্যভাবে বলা যায়, কলামগুলিকে কম্পনের হাত থেকে বাচাতে সবার আগে এগিয়ে আসে বিমগুলি । তবে এ কাজে সফল হতে হলে বিমগুলিকে সরাসরি কলামের সোজা লাইনে থাকতে হবে, এই লাইনের ডানে বা বাঁয়ে নয় । ঢাকায় অনেক ভবনে এই লাইন ঠিক না রেখে ভূল করা হয়েছে । ধরা যাক, পাচটির ক্ষেত্রে লাইন ঠিক আছে, একটির নেই । ভূকম্পনের সময় এই কলামটি স্ল্যাব ভেঙ্গে ভেতরে চলে যেতে পারে । অবস্থা আরো মারাত্মক হবে যদি ছাদে এই অবস্থানে থাকে পানির ট্যাঙ্ক বা ভারী কোন জিনিস । তবে এই ত্রুটিটি সংশোধনযোগ্য । এসব স্থানে নতুন বিম বসিয়ে নিলেই চলে । এধরনের বিম মূল বিমের মতন শক্ত হবে না একথা সত্য। কিন্তু এই ভবনটি একটি বিশেষ মাত্রার ভূমিকম্প সহ্য করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছিল, কারও ভুলে বা অজ্ঞানতায় তাতে একটি ত্রুটি রয়ে গেছে এবং ভবন তার ইপ্সিত গুন পায় নি । এখন ঐ বিমটি যোগ করা হলে ভবনটি সেই শক্তি ফিরে পাবে ।
(০৩) ফিলার দেয়ালের ক্ষেত্রে ঢাকার ভবনগুলিতে যে সমস্যা দেখা দিয়েছে তা হলো, সাধারনতঃ বহুতল ভবনে গাড়ী পার্কিং এর জন্য নীচের তলা ফাঁকা রাখা হয় । এখন উপরের তলাগুলিতে ফিলার দেয়াল থাকায় এগুলি ভূকম্পনে তেমন কাঁপবে না । অথচ নীচের তলায় ফিলার দেয়াল নেই, বা দেয়াল বানানোর উপায়ও নেই । এক্ষেত্রে উপরের সবগুলিতলা একটি একক বাক্সের মতন কাজ করবে এবং একটি মাত্র ভারী বস্তু কাপবে । এই কাঁপার ধরন কোন নরম বাঁশের কম্পনের মতন নয়, বরং একটি লম্বা এবং অনড় বাক্সের একেবারে সোজা অবস্থানে থেকে ডানে বাঁয়ে কাঁপার মতন । এই ধরনের কম্পন নীচের তলার মুক্ত কলামগুলিকে প্রবলভাবে ঝাঁকাবে । এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক । আসলে এই বিবেচনা থেকে এধরনের ভবনের নীচের তলার কলাম আগে থেকেই মোটা করে ডিজাইন করা প্রয়োজন । তবে যেখানে তা করা হয় নি সেখানে তা সংশোধন করা যেতে পারে । এক্ষেত্রে নীচের তলার মুক্ত কলাম গুলিকে স্টার কলামে পরিনত করা যেতে পারে । এ কাজ করার জন্য কলাম যেদিকে সরু তার দুই পাশে কংকৃট ঢালাই করে নিতে হবে । এই ঢালাইএর সময় কিছু স্থান পর পর নতুন ঢালাইএর রড মূল কলামের, বিমের বা ফুটিং-এর রডের সাথে যুক্ত করে দিতে হবে । ধরেই নিতে হবে, এই কলাম কোনক্রমেই মূল কলামের মতন শক্তি পাবে না, তবে উপরে ভূমিকম্পের কারনে যে সমস্যাটির কথা বলা হয়েছে এ পদ্ধতি সেই সমস্যার সমাধান করবে। যেহেতু এই কাজটি করা হচ্ছে ভূমিকম্প নিরোধের জন্য তাই এক্ষেত্রে আনুভূমিক রডগুলি বেশ শক্ত আর কেন্দ্র থেকে যথাসম্ভব দূরে রাখার চেষ্টা করতে হবে ।

উপরে আমরা আসলে তেমন নতুন কোন কথা বলিনি । মানুষ তার সীমিত সম্পদ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নানাভাবে তাদের ভবন ডিজাইন ও নির্মান করেছেন । যিনি যতটা পেরেছেন তিনি ততটা করেছেন, এর বেশী তার পাবার কথা নয় । তবে যারা সংশ্লিষ্ট লোকদের অজ্ঞানতা বা প্রতারনার কারনে ভবনে যে শক্তি বা গুন পাবার কথা তার চেয়ে কম পেয়েছেন, তারা কি ভাবে সেগুলি সংশোধন করতে পারেন আমরা শুধু তাই এখানে আলোচনা করেছি।

এবারে অন্য কথায় আসা যাক । আসলে আগে আমরা ভূমিকম্পকে তেমন গুরুত্ব না দিলেও এখন সঙ্গতঃ কারনেই এখন তা দিতে বাধ্য হচ্ছি । এখন সবাই এখন চাচ্ছে নিরাপদ ভবনে থাকতে । অথচ রাতারাতি সব অনিরাপদ ভবন ভেঙ্গে তা নতুন করে করার কোন পথ নেই । অনেক ভবনের ক্ষেত্রে শুরুতে ভূমিকম্পের যে মাত্রার শক্তির সাথে লড়াই করে টিকে থাকার জন্য ডিজাইন করা হয়েছিল পুরানো হয়ে যাবার কারনে তাদের এখন আর সেই শক্তি নেই । এমন অবস্থায় সবারই ইচ্ছা হতে পারে একটু নিরাপদ ভবনে থাকার, অর্থাৎ তাদের বর্তমান ভবনই যেন আর একটু নিরাপদ হয় তার ব্যবস্থা করার । এটা করা হলেই যে তাদের সর্বাঙ্গীন উপকার হবে তা বলা যাচ্ছে না । কারন ভূমিকম্প যদি আরো বেশী শক্তি নিয়ে আসে তাহলে তা থেকে তো বাঁচা যাবে না । তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে পুরানো ভবনগুলির প্রতিরোধ ক্ষমতা কিছুটা বাড়িয়ে নেয়া সম্ভব । যেমন উপরে যে দুটি সংশোধনীর কথা বলা হয়েছে তা অনেক ভবনের উপকারে আসতে পারে। এর পরেও যেসব উপায়ে কিছু বাড়তি নিরাপত্তা পাওয়া যেতে পারে তা হচ্ছে সম্ভাব্য সব উপায়ে ভবনের ওজন কমিয়ে ফেলা । এটা করার কিছু উপায় নীচে বর্ননা করা হলো।

(০১) ভবনের ছাদে যে পানির ট্যাঙ্ক থাকে তা ভরা অবস্থায় বেশ ভারী এবং ভূমিকম্পের সময় এই ওজন অত্যন্ত বিপজ্জনক। ঢাকায় অনেকেই দেখে থাকবেন, ভূমিকম্পের পর ছাদের পানির ট্যাঙ্কের আশে পাশে ফাটল দেখা দিয়েছে । উঁচুতল ভবনের বিভিন্ন তলায় ভাগ ভাগ করে ছোট ছোট পানির ট্যাঙ্ক নির্মান করে ছাদের পানির ট্যাঙ্কটি যথাসম্ভব ছোট করে ফেললে প্রকারান্তরে এর ওজন কমে যাবে এবং ভবনটি ভূমিকম্পে কিছুটা নিরাপদ হবে।

(০২) ফ্লাটের বাইরের দেয়াল এবং দুই পরিবারের মাঝের বিভাজন দেয়াল অক্ষুন্ন রেখে ফ্লাটের অন্য ইটের দেয়ালগুলি কোন হালকা জিনিস দিয়ে তৈরী করে নিলে ভবনের ওজন কমবে । চার ইঞ্চি পুরু থার্মোকুলের উপর সিমেন্টের প্লাস্টার বা ভিনিয়ার্ড উড দিয়ে এ ধরনের হালকা দেয়াল নির্মান করা যেতে পারে। বাইরে ১০ইঞ্চি পুরু ইটের দেয়াল থাকলে তার বদলে ইঞ্জিনীয়ারিং ব্রিক (ছিদ্রযুক্ত এবং হালকা) এর দেয়াল অথবা বাইরে পুরু মেটাল সিট, ভেতরে থার্মোকুল এবং প্লাস্টার ব্যবহার করা যেতে পারে । আর সি সি কাঠামোর পুরানো ভবনের দেয়াল এভাবে বদলে হালকা করে নিলে ভূমিকম্পে এই ভবনের কম্পন অনেক কমে যাবে, বা অন্য কথায়, এই ভবনের ভূকম্পন সহনশীলতা বেড়ে যাবে ।

স্টীলের ভবনঃ
আগেই বলা হয়েছে, ভুমিকম্পে স্টীলের ভবন ভাঙ্গার সম্ভাবনা একেবারে কম । কম্পন বা চাপে স্টীল বেঁকে যেতে পারে কিন্তু এটি ফেটে বা ভেঙ্গে যাবার ভয় নেই । তাছাড়া স্টীলের ভবন একেবারে হালকা, যা ভূমিকম্পে খুবই উপযোগী । স্টীলের ভবনের অসুবিধা হচ্ছে, সাধারনভাবে এটি ভূকম্পনে প্রবলভাবে দুলতে থাকে । এর ফলে মানুষের অসুস্থ হওয়া, জিনিসপত্র ভাঙ্গা ছাড়াও লিফট অকেজো হবার সম্ভাবনা থাকে । ভূমিকম্পনিরোধী স্টীলের ভবন ডিজাইন করতে হলে তাকে যথা সম্ভব হালকা করতে হবে এবং কম্পন কমাতে হবে । ফিলার দেয়াল হিসেবে ভারী ইটের দেয়াল তাই এক্ষেত্রে কোন সমাধান নয় । এক্ষেত্রে সমাধান হচ্ছে ক্রস ব্রেসিং ব্যবহার করা । তবে এটি অনেক ক্ষেত্রেই দৃষ্টি কটু ।

এখানে আমরা ভুমিকম্পের পরিপ্রেক্ষিতে বানিজ্যিক ভবন আর আবাসিক ভবনের একটি তূলনা করবো। বানিজ্যিক ভবনে সাধারনতঃ রাতে মানুষ থাকে না । আবার এই ভবনে যারা থাকে তারা সবাই প্রধানতঃ মধ্যবয়স্ক এবং বিপদে দ্রুত ভবন ত্যাগ করতে পারে । এই তূলনায় আবাসিক ভবনে সব বয়সের লোক সকল সময় বসবাস করে । তাই আবাসিক ভবন বানিজ্যিক ভবনের চেয়ে বেশী ভুমিকম্প নিরোধী হওয়া প্রয়োজন । আবাসিক ভবনে ছোট ছোট রুম থাকে, ভেতরে থাকে প্রচুর দেয়াল । এর ফলে ঘন ঘন কলাম ব্যবহার এবং দেয়ালে ক্রস ব্রেসিং ব্যবহার করার সুযোগ থাকে । এই ভবনে হালকা দেয়াল ব্যবহার করা হলে ভবন আরো নিরাপদ হয়ে উঠবে । তুলনায় বানিজ্যিক ভবনে ঘন ঘন কলাম, প্রচুর বিভাজন দেয়াল দেয়ার সুযোগ থাকে না । এর ফলে ক্রস ব্রেসিং ব্যবহার করারও সুযোগ থাকে না । এই যুক্তি থেকে এই দুই ধরনের ভবন ভুমিকম্প নিরোধক করার জন্য যে ধরনের ডিজাইন করা যায় তা হলো ঃ

(ক) বানিজ্যিক ভবনঃ (কংকৃটের) মোটা কলাম, ভারী বিম, পাতলা স্ল্যাব এবং হালকা দেয়াল ব্যবহার করা ।
(খ) আবাসিক ভবনঃ (স্টীলের) স্টীলের কলাম বিম, পাতলা স্ল্যাব, ক্রস ব্রেসিং, ঘন ঘন কলাম এবং হালকা দেয়াল ব্যবহার করা ।

উপসংহারঃ
ভূমিকম্প বন্ধ করার কোন উপায় আমাদের জানা নেই । সীমিত শক্তি ও সামর্থ নিয়ে সর্বোৎকৃষ্ট ভূমি কম্পনিরোধক ভবন ডিজাইন বা নির্মানও আমাদের সাধ্যের বাইরে । যেসব ভবন ভূমিকম্পে ভেঙ্গে পড়বে (যেমন ইটের বহুতল ভবন) সেগুলি ক্রমান্বয়ে ভেঙ্গে সেখানে আর সি সি ফ্রেমের ভবন বা স্টীলের ভবন নির্মান করা ছাড়া উপায় নাই । যেসব আর সি সি নির্মিত ভবন ভারী দেয়াল এবং বয়সে পুরানো হবার কারনে ভূমিকম্পে খুব বেশী কাঁপে সেগুলিকে হালকা করার জন্য হালকা দেয়াল ব্যবহার করা যেতে পারে । সেই সঙ্গে ছাদের পানির ট্যাঙ্কের ওজন কমানোর ব্যবস্থা, ভূলে বাদ পড়া বিম পুনঃ স্থাপন, নীচ তলার কলাম সংস্কারের কথাও বলা হয়েছে । তবে এধরনের ভবন সংস্কারের সাথে সাথে তাদের উচিত তাদের একেবারে কাছে ভূমিকম্পে বিপজ্জনক কোন ভবন আছে কি না তা দেখে নেয়া । থাকলে তাদের কাজ হবে, বিষয়টি যথাযথ কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে নিজেদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা ।

পুরানো ভুল আমাদেরকে নতুন পথের সন্ধান দিয়ে থাকে । এখানে ডিজাইনের ক্ষেত্রে যে সব ভুলের উল্লেখ করা হয়েছে নতুন ভবনে যেন সে ধরনের ভুল না থাকে তা দেখা মালিক বা বসবাসকারীদের কর্ত্যব্য । স্টীলের ভবন ঢাকায় এখনও পরীক্ষামূলক ভাবে তৈরী হচ্ছে । তবে এই পরীক্ষার জন্য তারা যে ধরনের ভবন বেছে নিয়েছে সেটা সঠিক নয় বলেই মনে হয় । আমাদের দেশে স্টীলের ভবন সবচেয়ে বেশী উপযুক্ত আবাসিক ভবন হিসেবে । তবে এ বিষয়ে এখনো গবেষনা বা পরীক্ষা নিরীক্ষার প্রয়োজন আছে । ভূমিকম্পের কথা মনে হলেই আমাদের সবার অন্তরাত্মা কেপে ওঠে । “টেবিলের নীচে আশ্রয় নেয়া” এক্ষেত্রে একটা ঠাট্টা ছাড়া কিছুই নয় । ভবন যদি সামান্য কাপে কাঁপুক, সাধারনতঃ যে মাত্রার ভুমিকম্পের ভয় আমরা করছি তাতে এটা নিরাপদ এই বোধটাই বর্তমানে আমাদের জন্য যথেষ্ট । “ভুমিকম্প এক অজানা অচেনা শত্রূ”। এই শত্রুর বিরুদ্ধে প্রস্তুতি হিসেবে (০১) বর্তমানের ত্রুটিপূর্ন এবং সংশোধন যোগ্য ভবনের ত্রুটীগুলি সংশোধন করা, (০২) সঠিক ডিজাইনের পুরানো ভবনের ওজন কমিয়ে কার্য্যতঃ তাদের শক্তি বৃদ্ধি করা, (০৩) সংশোধন অযোগ্য ভবনগুলিকে পুনঃ নির্মান করা আর (০৪) দেশ ও জনগনের স্বার্থে নতুন ভবন নির্মানের ক্ষেত্রে বুদ্ধিমত্তার পরচয় দেয়া, এর বাইরে এ যুগে আমরা আর কিই বা করতে পারি ।
সমাপ্ত

অধ্যাপক বিজন বিহারী শর্মা









৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মুহাম্মদ আলি জিন্না

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১১:৩৫



১৮৭৬ সালে করাচিতে এক দুষ্ট বালকের জন্ম হয়।
এবং ৭৬ বছর বয়সে দীর্ঘদিন যক্ষা রোগে ভূগে- দেশ ভাগের পরের বছর মারা যান। এই দুষ্ট বালক'ই পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা। নাম তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

মতামত পোস্ট: ২২ সালে লিখেছিলাম: যে শঙ্কা ছিলো তা আজকের বাস্তবতা

লিখেছেন অর্ক, ০৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১:৩১



আমাদের কওমি জননী সত্যি কি অসাম্প্রদায়িক? হলে কতোটা? প্রশ্ন থাকলো সবার কাছে। তেতুল হুজুর মাওলানা শফি খুব ভক্তিভরে তাকে কওমি জননী উপাধি দিয়েছিলেন। এমনি এমনি তো আর নয়। অত্যন্ত মহব্বত... ...বাকিটুকু পড়ুন

"রিকন্সিলিয়েশান"....ইহা কি খায় নাকি মাথায় দেয়?

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ০৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:০০



সত্যি সত্যিই তাদের সুযোগ ছিলো ২৫ শে মার্চ এর পর যাবতীয় অপকর্ম জনগণের কাছে স্বীকার পূর্বক,
/মুক্তিযুদ্ধে তাদের দ্বারা নৃশংসতার শিকার জনগণের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা,
/তাদের ক্ষতিপূরণ দিয়ে এবং,
/সব... ...বাকিটুকু পড়ুন

সেরা লেখক

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৮:৪৭



বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ভালো লেখক এক কথায় - হুমায়ূন আহমেদ। হুমায়ূন আহমেদের লেখা উপন্যাস মধ্যাহ্ন বা দেয়াল - এর পাশাপাশি রাখার মতো বাংলাদেশে আর কোনো উপন্যাস আছে কিনা আমার জানা... ...বাকিটুকু পড়ুন

=ডায়াটে একদিনের খাবার=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:৫১

ডায়াটের প্রথম দিকে-একদিনের খাবার। বর্তমানে আমাদের দেহে রোগসুগের অভাব নাই। ডায়াবেটিস, প্রেসার, ক্যান্সারসহ নানাবিধ রোগ বলা নাই কওয়া নাই শরীরে এসে বাসা বাঁধে।

আর এসব রোগের একমাত্র কারণ আনহেলদি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×