ভোর ৬.৩০। আবীর ঘুমাচ্ছে। এর মাঝেই সে তার বাবার কন্ঠ শুনতে পেল।
-বাবা তোর কাছে ভাংতি টাকা হবে?
চোখ না খুলেই আবীর বলল, টেবিলের ড্র্যয়ারে মানিব্যাগ আছে।
-গ্রামে যাচ্ছিরে বাপ। সাথে তোর চাচা আছে। দোয়া করিস।
আবীর ঘুমের ঘোরেই বলল "আচ্ছা"
সকাল ৭.৩০। আবীর তখনও উঠেনি। সদ্য কেনা নেহাত সস্তা মোবাইলটার কর্কশ শব্দ কানে লাগছে। সে ভাবল, দামি মোবাইল হলে বোধহয় সুশ্রী কোন রিং টোনে তার ঘুম ভাঙ্গত। পরক্ষণেই ভাবল বাবার যে অর্থনৈতিক অবস্থা যাচ্ছে তাতে যে সে এই মোবাইলটা কিনে দিয়েছে এই তো বেশী। তার বাবার আপাতত চাকরি নেই। গত ছয় মাস ধরে সে সাময়িক বরখাস্ত। কি ছিল তার বাবার অপরাধ? সে পুরোপুরি জানেও না। যা জানে তার সারমর্ম হল তার বাবা বিদ্যুৎ মম্ত্রীর পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দেয়নি। সে নাকি মম্ত্রীর বিরুদ্ধে নানা রকম কথাও বলেছে। আবীরের মাঝে মাঝে অনেক রাগ হয় তার বাবার উপড়। কি দরকার ছিল এতসব ঝামেলা করার! চুপচাপ কাজ করে গেলেই তো হয়। কি দরকার দেশের দিকে তাকিয়ে নিজের ক্ষতি করার!! এর মধ্যে তার বাবা মামলাও করেছে Power Development Board (PDB) এর বিরুদ্ধে। সেই মামলা চলাতে এখন হিমশিম খেতে হচ্ছে। জমি বিক্রি করতে এখন সে গ্রামে যাচ্ছে। তার মা বলতে গেলে এই ছয় মাস কথাই বলে না বাবার সাথে। তার নানা ধরনের অভিযোগ। নিজের সংসার চলে না, আর চুপিসারে সে তার ভাইদের অর্থ সাহায্য দেয়। সামান্য টাকা জমতে ধরলেই গ্রামের ধানি জমি কেনা... ব্যাংকে টাকা পয়সা নাই বললেই চলে। এরমধ্যে বিদ্যুৎ মম্ত্রীর সাথে সে মুখোমুখি সংঘর্সে জড়িয়ে গেছে। এসবের মানে কি!! আবীর তার মা'র সাথে প্রায় সব বিষয়েই একমত। তবে তার মা'র আচরনে সে যার পর নাই বিরক্ত। সংসারে ঝগড়া তার একদম পছন্দ না।
শত অনাগ্রহ নিয়ে সে মোবাইলটি হাতে তুলে নিল। সে ভেবেছিল হয়ত তার দেরি দেখে তার নতুন কোন বন্ধু ফোন করেছে। আজ তার মেডিক্যাল জীবনের দ্বিতীয় দিন। না, তার ধারনা ঠিক না। মোবাইলের স্কিনে বাবার নাম্বার ভেসে আছে। তরিঘরি করে সে ফোনটি ধরল। উল্টো দিকে তার চাচার কন্ঠ -
-তোমার বাপকে নিয়ে আমি ল্যাবএইড হাসপাতালে যাইতাছি। তুমি তারাতারি আহ
আবীর হকচকিয়ে জিঙ্গাসা করল, কি হয়েছে আব্বুর?
-কমলাপুর ষ্টেশনের সামনে আসতেই বুকে ব্যাথা শুরু হইছে। জ্ঞান হারায়ে ফেলছে
-কতক্ষণ আগে?
-১৫/২০ মিনিট হইব
-medicine দেন নাই কোন?
-পকেটে একটা ঔষধ ছিল, খাওইয়া দিছি
-জিহবার নিচে দেন নাই?
-না, খাওইয়া দিছি
আবীরের পচন্ড মেজাজ খারাপ হল। যে medicine জিহবার নিচে দিতে হয় তা খাইয়ে দিলে কি কাজ করবে!!
সে এক লাফে বিছানা থেকে নেমে বোনকে ডেকে তুলল। মা ও বোনকে বলল, আব্বু হাসপাতালে, যেতে হবে। তার মা বলল-
-আমি যাব না, তোরা যা
-মা, তুমি বুঝছ না। আব্বুর অবস্থা খারাপ
-আমি যাব না
-এইটা রাগ করার সময় না, তুমি বুঝতেছ না কেন!!
-না বুঝলে তো আর জোর করে বুঝানো যাবে না, আমি যা বলেছি তাই।
আবীর জীবন সংসারের উপড় চরম বিরক্ত নিয়ে রাস্তায় নেমে এল। রাস্তায় নেমেই প্রথম CNG টা তে উঠে বসল।
ল্যাবএইড কার্ডিয়াক হাসপাতাল। দ্বিতীয় তলা
আবীর এক কোণে চুপচাপ দাড়িয়ে। একবার তার বোনের দিকে তাকালো। দু'চোখে শ্রাবণ ধারা বইছে সেখানে। কেন তার চোখে পানি নেই? কোন অনুভূতিই যে তাকে স্পর্শ করছে না। নিজেকে তার দোষী মনে হল। কিছুক্ষনের মধ্যেই ঢাকায় তার নিকট আত্বীয়রা এসে উপস্থিত হল। সবাই নানা রকম সান্তনার কথা শুনাতে শুরু করেছে। কিন্তু কোন কথাই তার কানে ঢুকছে না। হঠাৎ একজন ডাক্তার বের হয়ে এল। আবীর শুনতে পেল-
-আমরা শেষ একটা চেষ্টা করতে পারি, বেশ ব্যায় সাপেক্ষ
আবীর তার uncle এর গলা শুনল -
- সব চেষ্টাই করুন ডাক্তার সাহেব। টাকা পয়সার চিন্তা করবেন না।
টাকা পয়সার চিন্তা করার কথা না থাকলেও আবীরের চিন্তা হল। কিভাবে চলবে তারা? কি খাবে, কই থাকবে? শেষ পর্যন্ত কি মানুষের কাছে হাত পাততে হবে! ঐ সব সংসারেরই বা কি দশা হবে যাদের তার বাবা লুকিয়ে লুকিয়ে সাহায্য করত? উদাস দৃষ্টিতে সে তাকিয়ে রয় জানালার দিকে। দেখে কি পরম মমতায় একটি কাক তার বাচ্চাকে খইয়ে দিচ্ছে...
হঠাৎ কোলাহলের শব্দে ঘোর ভাঙ্গে। ফিরে তাকিয়ে দেখে, তার বাবার দেহটি একটি ট্রলিতে। একজন ডাক্তার অনবরত বুকের বাম পাশটা চাপ দিচ্ছে। আর একজন ট্রলিটা ঠেলে নিচ্ছে। সে লক্ষ করল চোখের কোণে অনবরত পানি জমছে। কিছুতেই আটকে রাখা যাচ্ছে না...

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


