somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শিশুতোষ গল্পঃ টোপনের টোপ

২০ শে অক্টোবর, ২০১৫ রাত ১১:০৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



গ্রামের কোন গাছে যদি অনেকগুলা আম থাকে আর সেগুলো পাকার আগেই যদি হাওয়া হয়ে যায় অথবা কারো বেড়া দেওয়া সবজি ক্ষেতে যদি কোন ছাগলকে সবজি খেতে দেখা যায় কিংবা এই রকম আরও কোন প্রকার উল্টা-পাল্টা কিছু দেখা যায় তাহলে বুঝতে হবে কাজটা আর কারো নয়, টোপনের। পুরো গ্রামে দুষ্টুর হাড্ডি একটা। কাউকে শান্তি দিতে চায় না। প্রতিদিন বাড়িতে ৫/৬ টা করে নালিশ আসবেই তার নামে। ওর নালিশ শুনতে শুনতে কাহিল ওর বাবা-মা। তাই তো যারাই আসে নালিশ করতে সবাইকেই একই কথা বলে, ‘এরপর যদি উলটা-পাল্টা কিছু করে নালিশ করতে আসতে হবে না। ধামুর ধুমুর পিটুনি দিবেন।’ যারা নালিশ করতে আসে তাদের সাথে যদি আবার কিছু করে থাকে তাহলে দ্বিতীয়বার আর টোপনের বাড়ি গিয়ে নালিশ করতে যায় না, পিটুনিও দেয় না। দশ বছরের ওইটুকুন ছেলেকে কি আর পিটুনি দিবে। তাই সবাই হাল ছেড়ে দেয়। সুযোগ পেয়ে টোপন আরও দুষ্টামির মাথায় চরে বসে।

কয়দিন থেকে টোপনদের গ্রাম থেকে বাচ্চা উধাও হয়ে যাচ্ছে। এই নিয়ে তিনজন নিখোঁজ। কিভাবে যে উধাও হয়ে গেল এখন পর্যন্ত সুরাহা করা গেলনা। পুলিশ এসে তদন্ত করেও কিছু বের করতে পারলনা। টোপনকে নিয়ে ওর বাবা-মা তাই সেই চিন্তায় থাকে।এমনিতে তাদের ছেলে যেভাবে টো টো করে বেড়ায়। এত করে তাকে বলা হল গ্রামের অবস্থা ভাল না, স্থির হয়ে তাই ঘরে থাকতে।কিন্তু কে শোনে কার কথা?বাবা-মা একটু চোখের আড়াল হলেই টোপন বেরিয়ে পরে।

আজ টোপন এসেছে রতনদের আম বাগানে হানা দিতে। আমগুলো এখনও সেইভাবে পাকেনি।এমনিতেও ওর আধা কাঁচা-আধা পাকা আম খেতে ভাল লাগে।তাইতো আসা। আম পাড়ার পর যখন বাগান থেকে বের হবে তখন দেখা এক লোকের সাথে।গ্রামে আগে কখনও দেখেছে বলে মনে হয়না। টোপন ভাবল বাগান দেখাশোনার জন্য বোধ হয় লোকটিকে নতুন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। টোপন তাই দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করতে যায়। কিন্তু তার আগেই লোকটা ওকে ডাক দিয়ে বসে। টোপনও থেমে যায়। লোকটা ওর কাছে এসে বলে, ‘তুমি এই গ্রামেই থাকো?’ টোপন মাথা নিচু করে আস্তে করে বলে, ‘জী’। লোকটা তখন টোপনকে বলে, ‘এইগুলা কি আম পেড়েছ তুমি? তোমাকে অন্য একটা বাগানের আম দেই চলো। ঐ বাগানের আম অনেক ভাল,অনেক বড়।’ হটাৎ করেই লোকটার এমন কথা শুনে মন আনন্দে ভরে উঠল টোপনের। সরল মনে লোকটির সাথে আম পারতে যায় টোপন। কিছু দূর যাওয়ার পর হটাৎ করে লোকটি একটি রুমাল দিয়ে ওর মুখ চেপে ধরে। অনেক ভাবে ছাড়াতে চেষ্টা করে টোপন। কিন্তু আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে যেতে থাকে টোপন। তারপর আর কিছুই মনে নেই ওর।

যখন জ্ঞান ফিরল নিজেকে তখন আবিষ্কার করলো একটা স্যাঁতস্যাঁতে রুমের ভেতর যেখানে সূর্যের আলো প্রায় পৌঁছায় না বললেই চলে। টোপন আশেপাশে তাকিয়ে দেখল রুমে সে একাই না, তার সমবয়সী অথবা তার চেয়ে ছোট আরও অনেক ছেলে-মেয়ে আছে। টোপন তখন বুঝল আসলে তাকে কিডন্যাপ করা হয়েছে, সেই সাথে এইটাও বুঝল গ্রাম থেকে যে বাচ্চা নিখোঁজ হয়েছে সেগুলো আসলে নিখোঁজ হয়নি, ওরই মতো কিডন্যাপ করা হয়েছে তবে।

কিছক্ষন পর সেই লোকটি রুমে ঢুকল, টোপনের জ্ঞান ফিরতে দেখে ওর কাছে এসে বলল,‘বাড়ি ফিরতে চাস নাকি টুকরা টুকরা হয়ে বিদেশে যেতে চাস?’ টোপন আগে থেকেই জানত যে বাচ্চাদের ধরে ধরে বিদেশে পাচার করে তাদের কিডনিসহ অন্যান্য জিনিস বিক্রি করে দেওয়া হয় অনেক বেশী দামে। সেই কথা মনে হতেই টোপন হাউমাউ করে কান্না জুড়ে দিয়ে বলল, ‘বাড়ি ফিরতে চাই।’ লোকটি তখন বলল, ‘বাড়ি ঠিক মতো পৌঁছাতে হলে তো একটা দাম দিয়ে যেতে হবে। বাড়ির নাম্বার বল। তোর দাম এখন অন্তত পাঁচ লক্ষ টাকা।’ লোকটার কথা শুনে হড়হড় করে নাম্বার বলে দেয় টোপন। বাসায় লোকটা ফোন করেই অপর পক্ষ থেকে কিছু বলার আগেই হরবর করে বলে,‘আপনাদের ছেলে এখন আমাদের জিম্মায়। যদি ফেরত পেতে চান আগামি দশ ঘণ্টার ভেতর পাঁচ লক্ষ টাকা নিয়ে চলে আসবেন।’ এইটুকু বলেই কোন ঠিকানার কোথায় টাকা রেখে আসতে হবে সেটা বলে দেয় লোকটা, সেই সাথে এটাও বলে দেয় কোনভাবেই যেন পুলিশে খবর দেওয়া না হয়। তাহলে ছেলে আর আস্ত থাকবেনা।

লোকটা তার এক সহযোগীকে জায়গা মত পাঠিয়ে দেয়। সহযোগীও ঠিক মত জায়গায় গিয়ে ঘাপটি মেরে থাকে। একটু পর দেখল, এক লোক একটা পাটের ব্যাগ টোপলা করে রেখে চলে গেল। লোকটি দূরে চলে যেতেই সহযোগী লোকটি ব্যাগটি হাতে নেয়।ব্যাগটি হাতে নিতেই হটাৎ করে কে যেন পেছন থেকে জাপটে ধরল তাকে।চারপাশ থেকে আরও অনেক লোক এগিয়ে আসলো। তারা আসলে সাধারণ মানুষ নয়, তারা পুলিশ। শুধু সাধারণ মানুষের মত ছব্দবেশে ছিল । সহযোগী ধরা পড়ার পর ধরা পড়ল পুরো পাচারকারী দলটাই।
অবশেষে টোপন বাড়ি ফিরে এল। কয়েকদিন নিখোঁজ থাকার পর বাবা-মা তাকে পেয়ে আত্মহারা। ধীরে ধীরে সবাইকে জানালো কিভাবে সে শিশু পাচারকারীর হাতে পড়ে এবং পুলিশের কাছে ধরিয়ে দেয়। আসলে পাচারকারী লোকটা যখন টোপনের কাছে বাড়ির নাম্বার চায় টোপন তখন তাকে বাড়ির নাম্বার না দিয়ে পুলিশের নাম্বার বলে দেয় আর তাতেই হয়ে যায় আসল কাজ।

টোপনের এই বুদ্ধিমত্তার খবর ছড়িয়ে পড়ে ধীরে ধীরে। প্রায় প্রতিদিনই কোন না কোন টিভি চ্যানেল অথবা খবরের কাগজের লোক আসে ওর ইনটারভিউ নিতে। সামনের মাসে তার এই সাহসিকতার জন্য পুলিশ ডিপার্টমেনট থেকে অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হবে।
এত কিছু হয়ে যাওয়ার পরও টোপনের দুষ্টুমি কিন্তু কমেনি বরং বেড়েছে বহুগুণ। তবুও গ্রামের মানুষ কিছুই বলেনা ওকে। যে এত বড় একটা সাহসী কাজ করেছে, যার জন্য গ্রামটা সবার নজরে এসেছে তাকে আর কি বা বলবে?

সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা এপ্রিল, ২০১৬ রাত ১২:২৯
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাঞ্জাবিস্তান

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ১৪ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:৪০

পাকিস্তা/নের পাঞ্জাবিরা হলো পাকি/স্তানের বাকি সব জাতিসত্তার মানুষদের জন্য অভিশাপ। এদের জাত্যভিমানের কারনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগন স্বাধীনতার ডাক দিতে বাধ্য হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তানের প্রদেশগুলো যেরকম অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জিন্নাহর ছবি প্রশ্ন জাগে, আমরা কোন দেশে বাস করি?

লিখেছেন রাবব১৯৭১, ১৪ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:৫৯

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জিন্নাহর ছবি প্রশ্ন জাগে, আমরা কোন দেশে বাস করি?
যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত, যে বাংলাদেশ রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন হয়েছে সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু... ...বাকিটুকু পড়ুন

এগারটি বছর পার হয়ে গেল…. কিছু পরিসংখ্যান নিয়ে একাদশতম বর্ষপূর্তি পোস্ট

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:৪১



পূর্বের বর্ষপূর্তি পোস্টের লিঙ্কঃ দশম বর্ষপূর্তি পোস্ট

সামহোয়্যরইনব্লগে গত ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৫ তারিখ রাত ১১টা ২৬ মিনিটে প্রকাশিত হয় আমার প্রথম কবিতা, বক্ষমাঝে থাকবে তুমি। বলা যায় খুব দ্রুতই, মাত্র তৃতীয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দুঃখ খচিত পতাকা আমার

লিখেছেন এম ডি মুসা, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:২৪


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পবিত্র প্রাঙ্গণে
আজ হঠাৎ কার ছায়া নামে?
কার দুঃসাহসী কালো হাত
ইতিহাসের বুকের ওপর আঁকে পরাধীনতার নাম?

যে নাম একদিন ভাষার কণ্ঠ রুদ্ধ করতে চেয়েছিল,
যে শাসন একাত্তরে ছড়িয়েছিল মৃত্যুর অন্ধকার
আজ কেন তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশ হতো হায়দ্রাবাদ

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৫৫

।।হায়দারাবাদের নিজাম।।


১৯৪৭ সাল ভারতবর্ষের মুসলমানরা যখন নির্যাতনের শিকার অনেকগুলো গণহত্যা হয়েছিল দাঙ্গা হয়েছিল। ১৯৪৬ সালে বা তারও আগে এই মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ রাজনীতি শুরু করেছিল কংগ্রেসের রাজনীতি দিয়ে তিনি কংগ্রেসের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×