somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্পঃ "বর্ষাস্নানে তোমার আমন্ত্রন" (৩য় পর্ব)

২৪ শে মার্চ, ২০১৫ বিকাল ৫:১৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



গল্পঃ "বর্ষাস্নানে তোমার আমন্ত্রন" (১ম পর্ব)
গল্পঃ "বর্ষাস্নানে তোমার আমন্ত্রন" (২য় পর্ব)

আট

অর্ক হতবিহ্বলের মতো তাকিয়ে থাকে। ঘরের কোণে কার্নিশের কাছে রুগ্নদেহ দেওয়ালটার সাথে নিজের এক অতিঅসাধারণ মিল খুঁজে পায় ও। বেশ অসহায় হয়ে পড়েছে অর্ক। ভাবনাদের সাথে বাস্তবতার দ্বৈত সংঘাতে মানব মন জানি ভাবনাদের সাথেই মিতালী গড়ে কিন্তু খোলা বাতায়নের ওপাশে বাস্তবতার রূঢ় হাসি অনাগত ভবিষ্যৎ এর কাছে হেরে যাওয়া অর্কের প্রতি যেন চরম এক ধীক্কার। ধূ ধূ মরুভূমির মাঝে ফুটন্ত অর্কিড যেমন অদ্ভুতভাবে বেমানান কিন্তু সুন্দর ঠিক তেমন ভাবেই হাজতের ধূলিময় মেঝের মাঝে অর্ক ফিরে যায় নীলাদ্রীর সাথে কাটানো কিছু সুখকর স্মৃতির দেশে। অর্ক আর নীলাদ্রীর সাথে বর্ষা মিশে আছে ঠিক চাঁদের গায়ে মেঘের চাদর হয়ে।

হাসি আনন্দে কেটে যাওয়া জীবনে অর্ক কখনোই মধ্যবিত্তের সীমানা অতিক্রমের চেষ্টা কখনোই করে নি। বাঁধাধরা জীবনে অসময়ের বর্ষা হয়ে আসে নীলাদ্রী। সেই অনাকাঙ্ক্ষিত আগমণে অর্ক নির্দ্বিধায় নিজেকে তুলে দিয়েছিল নীলাদ্রীর আবগের কাছে। আর নীলাদ্রীও নিজের কাছে জমানো ভালোবাসার চুম্বন এঁকে দিয়েছিল অর্কের ঠোঁটে।

সেই তো সেদিন। ক্যাফেটেরিয়াতে আড্ডা দিচ্ছিল অর্ক। হঠাৎ করেই তুমুল বর্ষণ। বৃষ্টি পাগল অর্ক ছুটে যায় বাইরে। কিন্তু ক্যাফেটেরিয়ার গেইট পার হয়ে সিঁড়ির কাছে পৌঁছেই থেমে যায় অর্ক। সবটুকু আকর্ষণ কেড়ে নেয় কাছেই দাঁড়িয়ে থাকা আঁধভেজা মেয়েটি। খোলা চুল। বৃষ্টির জল গড়িয়ে পড়ছে। চিবুক দিয়ে গড়িয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে উষ্ণতায়। ভেজা কাপড়ে দাঁড়িয়ে আছে ঠিক যেন পরী হয়ে। অর্ক নিজের অজান্তেই এগিয়ে যায়। চোখ চলে যায় মেয়েটির হাতের দিকে। হাত ভর্তি কাঁচের চুড়ি। কি অদ্ভুত। মেয়েটা যেন অর্কের জন্যই সেজেছে। সেজেছে এই বৃষ্টি ভেজা আকাশটাকে অর্কের হাতে তুলে দিতে। বিনিময়ে হৃদয়টা সে নিয়ে যাবে। অর্কের ঠোঁটের কোণে মুগ্ধতার হাসি। সে নির্দ্বিধায় পারে এমন কারো হাতে তার জীবন ঘুড়ির লাটাইটা তুলে দিতে। যেমন খুশি তেমন উড়াও। শুধু যদি ভালোবাসা দাও অকৃপণ ভাবে।

অর্ক খুব কাছে চলে এসেছে মেয়েটির। হঠাৎই মেয়েটি অস্ফুট ভাবে বলে উঠল
- অর্ক।
- অর্ক বেশ বড়সড় একটা ধাক্কা খেল। সেটা হজম করতে না করতেই দ্বিতীয়বারের মতো বুকে হাতুড়ির আঘাত দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করলো অর্কো।
- আমি আসলে আপনার সাথেই দেখা করার জন্য এখানে এসেছি। কাইন্ডলি একটু এদিকে আসবেন।
- আ-আমার সাথে। কেন? কোথায়? আমি কি আপনাকে চিনি?
মেয়েটির মুখে কৌতুকের হাসি। অর্কের নার্ভাসনেসটা উপভোগ করছে। আর একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে অর্কের চোখের দিকে। তীব্র দৃষ্টি। অর্ক চেষ্টা করে চোখ নামিয়ে নেবার কিন্তু পারে না। এক অমোঘ আকর্ষণে আটকে যায় ওর চোখ। ঘোর লাগা দৃষ্টি। ভালো লাগা। শুধু অপেক্ষা। ভালোবাসার।
কে জেন বলেছিল ভালোবাসার জন্য কয়েক যুগ না কয়েক মুহূর্তই অনেক বেশি সময়। কথাটা কানে বাজে অর্কের।
- আপনি কি আমার সাথে একটু হাঁটবেন?
অর্ক কোন উত্তর দেয় না। শুধু হাঁটতে থাকে মেয়েটির পাশে।
এরপর শুধু হেঁটে চলা। একসাথে। হাতে হাত রেখে। কত বর্ষার পড়ন্ত বিকেল যে পাড় হয়ে গেছে তা হিসেবের খাতায় লেখা জোকা নেই। শুধু সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে ভালোবাসা জমা হয়েছে পাজরের আড়ালে।

নয়

ইশতিয়াক সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন। সান্ধ্য আলোয় অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া নীল আকাশের সাথে খুঁজে ফিরছেন একটা শান্ত নিজেকে। বেশ নির্ভার তিনি। নীলাদ্রীর জ্ঞান ফিরেছে। কথা বলছে। অর্ক ছেলেটার কথা বার বার বলছে। দেখা করেন নি তিনি মেয়েটার সাথে। কি বলবেন। কি বলার আছে। ডুবে যাওয়া সূর্যের রেখে যাওয়া লালচে আভাটা মনে করিয়ে দেয় তার অতীতকে। তিনি কখনই চান নি বর্তমানের ইশতিয়াক আহমেদের জীবনে ফিরে আসুক সে অতীত। বার্ন ইউনিটে দগ্ধ যন্ত্রণাকাতর রোগীর মতোই তার মনের ঘরে লালন করে চলেছে বিভৎস রূপ এক স্মৃতি কে।

- সাহেব। আতিকুর স্যারে আপনের লগে দেখা করতে আইছে। হে বসার ঘরে আফনের জন্যে বইসা আছে।
রহমতের কথায় চিন্তায় ছেদ পরে। ফিরে তাকান। চেয়ে দেখেন রহমতের দিকে। বৃদ্ধ নতজানু একটা শরীর। ইশতিয়াক আহমেদের বিয়ের আগে থেকেই এ বাড়িতে আছে রহমত। নীলাদ্রীর মায়ের মৃত্যুর পর ওকে বলতে গেলে একা হাতেই বড় করেছে।
ইশতিয়াক আহমেদ এগিয়ে যান রহমতের কাছে। হাতটা ধরে নিঃশব্দে কেঁদে ওঠেন দুর্দান্ত প্রতাপশালী এই মানুষটি।

- সবই নিয়তি। আল্লাহতালার ইচ্ছা। আফনে আমি তো অভিনেতা মাত্র। আমি আল্লার কাছে দোয়া করি মামণি যেন আপনেরে ক্ষমা করে দেয়। সে আপনেরে ভালোবাসে। জন্ম দিলেই বাবা হওয়োন যায় না। আপনে তারা জন্ম দেন নাই সত্য কিন্তু আপনে যা করছেন কুনো বাপে তা করে না। সেই ছুডোকাল থেইকা দেইখা আসতেছি শতকাজের ভীড়েও আপনে তারে নিজে হাতে খাইয়িয়ে দিয়েছেন। চুল আঁচড়ে দিয়েছেন। পূরণ করেছেন তার সব আবদার। আপনে কাইন্দেন না। ওটা আপনের পাপ না। দোষ না। তাই তার দায়ও আপনের না। আপনে যান। আতিকুর স্যারে আপনের লাইগা বসে আছে। দেখা করেন।
সামান্য এক রহমতের কথায় যেন ইশতিয়াক আহমেদ শক্তি ফিরে পান। তীব্র অন্ধকারময় কোন ঘরে ছোট্ট একটা জোনাক পোকা যে আশা জাগানিয়া হয়ে উঠতে পারে তা এই বৃদ্ধ অশিক্ষিত মানুষটি বুঝিয়ে দিলেন।

আতিকুর সাহেব মতিঝিল থানার ওসি। অর্ককে ইনিই ধরে নিয়ে গেছিলেন ইশতিয়াক আহমেদের কথায়। আসলে ইশতিয়াক আহমেদ জানতে চাচ্ছিলেন অর্ক ছেলেটাকে। কতটা ভালোবাসা আছে তার মধ্যে নীলাদ্রীর জন্য। নাকি পুরোটাই শুধুমাত্র তার এই বিশাল সম্পত্তির জন্য।


- স্যার। কেমন আছেন? আপনাকে বিষন্ন লাগছে! নীলাদ্রী মা ভালো আছে তো?
- হ্যাঁ আতিকুর। নীলাদ্রী এখন অনেকটাই সুস্থ। সামনের সপ্তাহে বাড়িতে নিয়ে আসবো। অর্কের কথা বলো। ছেলেটা কেমন? কি করে? কোথায় থাকে? বাবা কি করে? ইন ডিটেইলস বলো।
- স্যার অর্ক আসলে আপনাকে চেনেই না। তাই আপনার সন্দেহ টা অমূলক। ও ঢাবিতে পড়তে। পলিটিকাল সায়েন্স। এলিফ্যান্ট রোডে একটা দোতলা বাড়ি আছে। মধ্যবিত্ত পরিবার। বাবা রিটায়ার্ড প্রফেসার। অর্ক একমাত্র ছেলে। তবে রাজনীতির সাথে কিছুটা জড়িত। একটি সংগঠনের সাথে বেশ কিছুদিন সম্পৃক্ত। ছাত্র সংগঠন। ওভার অল ভালো ছেলে বলা যায়।
- হুম।
- স্যার অর্ককে কি ছেড়ে দেব? ওর এগেইন্সটে তো কোন এফ আই আর নেই। আর তাছাড়া ওর বাবা গতকাল ওর মিসিং ডায়েরী করেছে শাহবাগ থানায়।
- না। এখন কিছু করতে হবে না। আর নীলাদ্রীর কথা ওকে কিছু বলো না। নীলাদ্রী বাসায় আসলে ওকে এখানে নিয়ে আসবে। আমি ওদের দুজনের সাথেই কিছু কথা বলবো। আর আমি জানি নীলাদ্রীও আমাকে কিছু বলবে যেটা অর্কের শোনা প্রয়োজন।


============ চলবে============
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে মার্চ, ২০১৫ রাত ১১:৩০
১৫টি মন্তব্য ১৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দেয়ালের ছবি আর বই এর পাতায় আধিপত্য দেখে ! অথচ বন্দর আর কড়িডোরের অসম চুক্তিতে সব শিয়ালের এক রা॥

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৭:১২


দেশ বিক্রির পরীক্ষিত ঠিকাদার....



দেয়ালের ছবি দেখলেই ভারতীয় আধিপত্য, আর বন্দর বেচে দিলে নীরবতা কেন?

দেয়ালে একটা ছবি আঁকা দেখলেই যাদের মুখে ফেনা উঠে যায় - "বাংলাদেশ... ...বাকিটুকু পড়ুন

মার্কিন সেনা কর্মকর্তা কর্মকর্তার মেজর নিদাল্ল হাসানের মৃত্যুদণ্ড.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ২:৩২



নিদাল হাসান (পুরো নাম: নিদাল মালিক হাসান) হলেন মার্কিন সামরিক বাহিনীর একজন সাবেক মেজর এবং মনোরোগ বিশেষজ্ঞ (Psychiatrist)।

২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের ফোর্ট হুড সামরিক ঘাঁটিতে সংগঠিত এক... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপার ফিরে আসার পদ্ধতি কি?

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:২৩



আপা কেন ভারতে বেড়াতে গেলেন সেটা সবাই জানে। আগামী ডিসেম্বরে আপা দেশে ফিরে আসার আগ্রহের কথা জানিয়েছেন সেটাও সবাই জানে। আপা কিভাবে দেশ থেকে রাষ্ট্রীয় সফরে ভারতে গেলেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কি আসলেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

লিখেছেন অন্তর্জাল পরিব্রাজক, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৮:৪৪



“রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন “, “মূর্খের দেশে আবার কীসের বিশ্ববিদ্যালয়” – এসব প্রচারণা আমাদের দেশে অনেকদিন ধরেই হয়ে আসছে। বিশেষ করে ফেসবুকে আকছারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১৯৭১ঃ নদী-নালায় ভেসে থাকা স্বদেশের কান্নাঃ শহীদদের প্রতি নিবেদিত একটি কাব্যগাথা জাতির রক্ত, অশ্রু ও স্বাধীনতার অমর ইতিহাস

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:০৫


পঁচিশে মার্চ ১৯৭১
রাত্রি তখন গভীর, নগরীর বাতিগুলো
যেন অনাগত বিপদের সামনে অসহায়
ঢাকার আকাশে হঠাৎ গর্জে উঠল কামান
ট্যাংকের চাকার নিচে কেঁপে উঠল রাজপথ
গুলি ছুটে গেল মানুষের ঘুমন্ত জানালায়
আগুন ছড়িয়ে পড়ল... ...বাকিটুকু পড়ুন

×