রিমান্ডে জামাতঃ অনেক মেহনতের ফসল-১
চৌধুরী শামীম
অবশেষে মৌলবাদী রাজনীতির নাটের গুরু জামাতের দীর্ঘ তিন দশকের রাজনীতির অবসান হতে চলছে (ইংরেজী দৈনিক নিউ এইজ সম্পাদক নুরুল কবিরের ভাষায়, এদেশে ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতির সবচেয়ে বড় ও সংগঠিত পান্ডা হলো জামায়াতে ইসলামী সুত্রঃ সাপ্তাহিক বুধবার, ১৩ মে ২০১০ )। বিশেষ করে জামাতের প্রধান প্রধান নেতা নিজামী, মুজাহিদ, সাঈদী, কামারুজ্জামান, কাদের মোল্লার গ্রেফতার ও প্রত্যককে মাসাধিক কালের রিমান্ড ও ধর্মভিত্তিক মৌলবাদী রাজনীতি নিষিদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে দলটির দীর্ঘ তিন দশকের বেশী সময়ের দাপটের অবসান হলো। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির স্বাধীনতার বিরোধীতা করেও গত সাড়ে তিন দশক এরা বুক ফুলিয়ে রাজনীতি করেছে। তিন দশকে আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ বিভিন্ন প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলের অনেক কেন্দ্রীয় নেতা জেল জুলুমের স্বীকার হয়েছেন। অনেকেই প্রতিপক্ষের হাতে নিহত হয়েছেন। বিগত জ়োট সরকারের আমলে শাহ কিবরিয়া, মাষ্টার আহসানউল্লাহ, খুলনার মঞ্জরুল আলমসহ অনেকে নেতা নিহত হয়েছেন। উদিচি ও রমনার বটমুলে হামলা হয়েছে। একুশে আগষ্ট (২০০৪) পল্টনে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা করে শেখ হাসিনাসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের শেষ করার চেষ্টা করা হয়েছে। শাহরিয়ার কবিবের মত ত্যাগী, নিবেদিত প্রাণ বুদ্ধিজীবীকে রিমাণ্ডে নির্যাতন করা হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, ওয়ান ইলেভেনের (১/১১) পর বিভিন্ন দলের অনেক কেন্দ্রীয় নেতা রিমাণ্ডে গেলেও ধরা ছোয়ার বাইরে থেকেছে জামাতের কেন্দ্রীয় নেতারা। এরা হয়ত মনে করেছিল, কেউ কোন দিন তাদের গায়ে হাত দিতে পারবে না।
নিজামীদের গ্রেফতারের আগের দিন কথা হচ্ছিলো প্রবাসী এক জামাত নেতার সাথে। তিনি বললেন, আওয়ামী লীগ যতই চেষ্টা করুক, জামাত নেতাদের গায়ে হাত দিতে পারবে না, মানে গ্রেফতার করতে পারবে না। করলেও বেশী দিন জেলে রাখতে পারবে না। যেদিন গ্রেফতার হলো সেই দিন বিকেলে ঐ জামাত নেতা বললেন, গ্রেফতার হয়েছে ঠিকই, কিন্তু রিমান্ডে নিতে পারবে না। মাসাধিক কাল রিমান্ডের পর, কানাডার টরন্টো প্রবাসী ঐ নেতা এখন স্বীকার করেছেন ” জামাত আসলেই বিপদে আছে”। তাই হয়ত সাপ্তাহিক ২০০০ কভার ষ্টোরি করেছে, “রিমাণ্ডে জামাত”।
এত দিন পর তারা এখন হয়ত টের পেয়েছে, তাদের সেই দাপটের দিন শেষ। স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির অনেক আনন্দের বিষয় এটি। জাতির জনক স্বপরিবারের নিহত হওয়ার পর, এই মৌলবাদি শক্তি নানা ভাবে সুবিধা নিয়েছে। জিয়া, এরশাদ সহ সব সামরিক শাসকের আমলেই জামাত লাভবান হয়েছে। একজন তাদের রাজনীতি করার সুযোগ করে দিয়েছে। আরেক জন ইসলামকে রাষ্ট্র ধর্ম করে মৌলবাদকে আরও আস্কারা দিয়েছে।
সেই রামও নাই, অযোদ্ধ্যাও নাই। কিন্ত জামাতের এই কোন ঠাসা অবস্তা কি এক দিনেই হয়েছে? না হয়নি। এর জন্য মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তি তথা সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মী, সাংস্কৃতিক কর্মী, দেশী-বিদেশী সহযোগী শক্তি, মিডিয়া, গনমাধ্যম কর্মী, উন্নয়ন কর্মী, মানবাধিকার সংস্থা, আন্তজাতিক শক্তি সবার মেহনত ছিল। অনেক রক্ত, ঘাম, শ্রম, পরিকল্পনা লেগেছে এই অবস্থায় আসতে। বিশেষ করে ২০০১ চার দলীয় সরকার ক্ষমতায় আসার পরে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মীদের জন্য নেমে আসে আযাব। সংখ্যালঘুরা ভিটে মাঠি ছাড়া হয়। স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তির হাজারও নেতা কর্মী নিহত হন। দুই মন্ত্রীর দাপট আর জামাত নেতা কর্মীদের ভাব ছিল তারা সারা জীবনের জন্যই বাংলাদেশে রাজত্ব করার লিজ নিয়েছে।
সেই অবস্থায় স্বাধীনতার স্বপক্ষ শক্তি বুঝতে পারে, এই দানবীয় চার দলীয় জোট বিশেষ করে জামাতের হাত থেকে বাচতে হলে সুদুর প্রসারি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করতে হবে। এর জন্য চাই ব্যাপক ভিত্তিক পরিকল্পনা। সময়ের দাবিতে হাতে নেওয়া হয় দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা। বাস্তবায়নে এগিয়ে আসে কিছু ত্যাগী নেতা কর্মী। সুধু দেশের ই নয় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অনেক প্রবাসী এই পরিকল্পনায় সামিল হন। সেই মেহনত আর ত্যাগের ফল আজ স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তি ভোগ করছে। ভোগ করবে পরবর্তি প্রজন্ম ও।
মজার ব্যাপার হল, এত দিন মনে করা হতো (বলতে গেলে একটি মিথ ছিল) জামাত ও কিছু বামপন্থি দল নাকি বাংলাদেশে পরিকল্পনা করে রাজনীতি করে। এদের পরিকল্পনা সবসময় সুদূর প্রসারি ও দীর্ঘ মেয়াদি হয়। এই পরিকল্পনায় কাজে লাগানো হয় হাজারও ত্যাগী নেতা কর্মীকে। দলগুলো ক্যাডার ভিত্তিক হওয়ায় তা বাস্তবায়নও সহজ হয়। আজ এদের ত্যাগ আর সুদূর প্রসারি পরিকল্পনার মিথ (myth) আর নেই। আওয়ামী লীগের মত নন-ক্যাডার ভিত্তিক (non-cadre based) দলের মধ্যেও কিছু সংখ্যক ত্যাগি মানুষ অনেক কিছু করতে পারে, আজকের অবস্থা তাই বলে দেয়। নন-ক্যাডার ভিত্তিক কিছু মানুষের ত্যাগেই যে ক্যাডার ভিত্তিক একটি দলকে কোন ঠাসা করতে পারে, তার আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
ভবিষ্যত প্রজন্ম যাতে আমদের এই সুদুর প্রসারি পরিকল্পনা, অব্যাহত প্রচেষ্টা আর ত্যাগ-তিথিক্ষ্যার কথা জানতে পারে, তার ক্ষুদ্র প্রচেষ্টায় আমার এই লেখা। এই লেখার পরের সংখ্যা আলোচনা করতে চাই কিভাবে, কাদের মাধ্যেমে, কত মেহনতে মৌলবাদ বিরোধী এই সংগ্রাম এপর্যায়ে এসেছে। এ ইতিহাস আমাদের আগামী তরুন প্রজন্মকে মৌলবাদ বিরোধী সংগ্রামে মেহনত করার প্রেরণা দিবে বলেই আমাদের বিশ্বাস।
(চলবে)
লেখকঃ যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী গবেষক, রাজনৈতিক কর্মী, ইমেইল, [email protected]
Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


