দেশপ্রেমিকদের ঐক্য সময়ের দাবী
ইবনে হাসেম
আল্লহপাক পবিত্র কোরআন শরীফে বর্ণনা করেছেন, “আল্লাহপাক নিঃসন্দেহে মশা বা তদুর্ধ্ব বস্তু দ্বারা উপমা দিতে লজ্জাবোধ করেন না......” (সূরা বাক্বারা-২৬)। মহান আল্লাহর এ পবিত্র বাণীটির গুঢ় রহস্য ভেদ করা অর্থাৎ ছোট ছোট কীটপতঙ্গকেও পবিত্র কোরআনে উপমার বিষয়বস্তু করার কারণ উপলব্ধি করার সুযোগ প্রতিটি মানুষের জীবনে একাধিকবার এসে থাকে, এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস, কারণ তা না হলে সৃষ্টিকর্তার এমন বাণীর যে কোন মূল্যই থাকেনা। স্কটল্যান্ডের রাজা রবার্ট ব্রুস এর উদাহরণই নেয়া যাক। ইংরেজ বাহিনীর সাথে লড়াইতে একে একে ষষ্ঠবার হেরে গিয়ে একদা তাঁর নিভৃত পাহাড়ের গুহায় শুয়ে আছেন তিনি। শুয়ে শুয়ে ভাবছেন তাঁর অদৃষ্টের কথা। হঠাৎ তাঁর দৃষ্টি গিয়ে পড়লো গুহামূখের ঠিক উপরে আপনমনে জাল বুননরত এক মাকড়সার প্রতি। তিনি খেয়াল করলেন কিছু সময় পর পরই মাকড়সাটি তার জালের গা হতে নিচের দিকে গড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু পরক্ষণেই সামলে নিয়ে আবার সেটি শরীরের সাথে অচ্ছেদ্য বন্ধনে আবদ্ধ সুতো বেয়ে জালে গিয়ে পৌঁছাচ্ছে এবং জালের অসমাপ্ত কাজ পূরণে নিবিষ্ট মনে লেগে গেছে। এভাবে যখন ছয়বার নীচে গড়িয়ে পড়ে সপ্তমবারে সুতো বেয়ে উঠে সে তার অসমাপ্ত কাজ সমাধানে সমর্থ হলো, এ দৃশ্য দেখে ব্রুস যেন সম্বিত ফিরে পান, ভাবেন একটি ক্ষুদ্র কীট যদি তার কাজ অধ্যবসায়, ধৈর্য্য ও একনিষ্ঠতা সহকারে করে সপ্তমবারে তাকে পূর্ণতায় পৌঁছাতে পারে তাহলে আমি বুদ্ধিমান মানুষ কেন পারবোনা আমার প্রচেষ্টায় সফল হতে? এবং মূহুর্তে তিনি তাঁর পরবর্তী অভিযানের স্ট্রাটেজি চূড়ান্ত করে ফেলেন। ইতিহাস পাঠকারী সবাই জানেন যে রবার্ট ব্রুস তাঁর এবারকার প্রচেষ্টায় ইংরেজদেরকে কি শোচনীয় ভাবে পরাজয় বরণ করতে বাধ্য করেছিলেন।
এমনি একটি ক্ষুদ্র কীটের কাজের প্রতি নিষ্ঠা, ধৈর্য্য, শৃংখলা এবং নিয়মানুবর্তিতা দেখে আমি সম্প্রতি যারপরনাই মুগ্ধ হই এবং সাথে সাথে দয়াময়ের কালামে পাকে বর্ণিত সেই পবিত্র বাণীর মর্মার্থ উদ্ধারে সমর্থ হয়ে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতায় মাথা নুয়ে আসে। এমন দৃশ্য যে নুতন দেখেছি তা নয়, তবে কোন কোন দৃশ্য এমন যে, তা কার মনে কখন, কোন পরিস্থিতিতে প্রভাব বিস্তার করবে, তা কিন্তু সেই আল্লাহই নির্দিষ্ট করে রাখেন। সকালবেলা অফিসে যাবার প্রস্তুতিপর্বে বাথরুমে গিয়েছি, দেখি কি ভেন্টিলেটর ভেদ করে বাথরুমের ছাদ বেয়ে ভেতরের দিকে প্রায় দুই ফুট দীর্ঘ একটি কালো রেখা (কোন কোন স্থলে সামান্য একেবেঁকে এগিয়ে গিয়ে) দেয়ালের সংযোগস্থলে এসে দেয়াল বেয়ে সরলরেখায় একেবারে নীচে মেঝেতে এসে মিশে গেছে। সাদা ধবধবে টাইলসে কালো দাগের মর্মার্থ উদ্ধারে যখন রেখাটির নিকটবর্তী হলাম তখনি বুঝলাম যে সেটি আমাদের অতি পরিচিত, কীটপতঙ্গের মধ্যে সবচেয়ে কাছেরজন গুঁড়ো পিঁপড়ার সারি। সরলরেখাটি নীচে যেখানে এসে শেষ হয়েছে সেখানে দেখলাম একটি বড় আকৃতির তেলাপোকা মরে পড়ে আছে, বুঝতে দেরী হলোনা, এই শ্রমিক পিঁপড়েরা ওখানে কিসের টানে গিয়ে হাজির হয়েছে। দেখলাম যদিও সারি হবার কথা দুটি, (পিঁপড়েগুলো দুই বিপরীতমূখী স্রোতে চলছে- একদল ছুটছে খাবারের দিকে আর অন্যদল খাবারের টুকরো মূখে নিয়ে তাদের আবাসের দিকে) কিন্তু মূলত: একই সারিতে তারা চলাচল করছে, এতে তাদের যাত্রাপথের কোন অসুবিধা হচ্ছেনা, একের সাথে অপরের ধাক্কাধাক্কি হচ্ছেনা, কেউ কাউকে ল্যাং মেরে ছাদ হতে ফেলে দিচ্ছেনা বা দুই বিপরীতমূখী সারির মাঝখানে কোথাও এতটুকু ফাঁক (বাফার স্টেট) খুঁজে পাইনি।
অত বড় একটি তেলাপোকা সম্পূর্ণ কেটেকুটে নেয়া শেষ করতে হয়তো ওদের ৪/৫ ঘন্টা লেগে যাবে, বা সারাদিনও হয়ত: গড়িয়ে যাবে, বিশাল বড় চ্যালেঞ্জ ওদের সামনে; তাদের এক এক জনের দেহের তুলনায় ঐ খাদ্যটি একশ গুন বা তার চেয়েও বড় হবে, তাই ওদের নেতা সে অনুপাতেই তার বাহিনী নিয়ে সেখানে হাজির হয়েছে, যাতে স্বল্পতম সময়ে, অন্য কোন শত্রুর নজরে পড়ার পূর্বেই খাদ্যটি নিয়ে গুদামজাত করা যায়। আরো একটা বিষয়ও আমার দৃষ্টি এড়াতে পারেনি। গোছলের পানির স্রোতে ভেসে যেতে পারে খাদ্য ও খাদ্য সংগ্রহকারীদের অনেকে, সে আশংকায় আমি মরা তেলাপোকাটিকে সরিয়ে নিরাপদ স্থানে প্রতিস্থাপন করি আর পিঁপড়েদের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করতে থাকি। দেখলাম ওরা ধীরে ধীরে, নিবিষ্টমনে ও সমান তালে খাবারের নূতন অবস্থানের দিকে তাদের গতি পরিবর্তন করে দেয় এবং একাজে সর্বসাকুল্যে তাদের সময় লাগে মাত্র বিশ হতে পঁচিশ মিনিট।
আমাদের অতি নিকটাত্বীয় ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র এ কীটের খাবার সংগ্রহের পরিচিত এ দৃশ্য হতে আমরা অনেকগুলো শিক্ষা পেতে পারি। যেমনঃ ক) একতা ও শৃংখলা; খ) নিয়মানুবর্তিতা; গ) কর্তব্যবোধ; ঘ) সহযোগিতা ও সহমর্মিতা; ঙ) নেতার প্রতি আনুগত্য; চ) একনিষ্ঠতা ছ) দূরদর্শিতা বা হেকমত। একতা, শৃংখলা, কর্তব্যবোধ, একনিষ্ঠতা, পারস্পরিক সহযোগিতা ও নেতার প্রতি আনুগত্যের চরম পারাকাষ্ঠা দেখিয়ে পিঁপড়েগুলো তাদের কাজের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একই নিয়মে, একই ছন্দে, একই সীমানা পরিধিতে আবদ্ধ থেকে, কেউ কাউকে এতটুকু অবহেলা ও আন্ডারমাইন না করে তাদের বিশাল কর্তব্যকর্ম সম্পাদন করে যায়।
কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, আমরা আশরাফুল মাখলুকাত টাইটেলধারী মানুষেরা কি আজো পেরেছি কোন একটা সিদ্ধান্ত নেয়ার পর এক নেতার আহ্বানে লক্ষ্যবিন্দুতে স্থির থেকে, সে লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া অবধি একই প্লাটফর্মে বসে, মিলেমিশে একমন একধ্যান হয়ে, একান্ত নিষ্ঠাসহকারে, একই সময়ে একই আওয়াজ তুলে, একে অপরের প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধসহ আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছাবার জন্যে সংগ্রাম বা প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে? এ প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত জবাব হলো ‘না’। এই তো বেশীদিনের কথা নয়, সংবাদমাধ্যমে দেখলাম জামায়াতের নেতৃবৃন্দ সরকারের ইসলামী রাজনীতি নিষিদ্ধ করার পাঁয়তারা দেখে (ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করে ১৯৭২ এর সংবিধানে ফিরে যেতেই এ সরকারের আগমন--বর্তমান আইনমন্ত্রীর দাবী) এবং সেক্যুলার শিক্ষানীতি প্রণয়নের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ইসলামী দলগুলোর সাথে মিলেমিশে কাজ করার জন্যে তাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তৌহিদী জনতা খুশী হয়ে ভাবলো, এতোদিন না বুঝলেও সরকারের নির্যাতন, নিপীড়ন ও ফ্যাসিবাদী আচরণের কারণে ইসলামপন্থী দলগুলো এবার একতাবদ্ধ হবার কারণ খুঁজে পাবে। কিন্তু ব্যস ঐ পর্যন্তই, আমাদের আশা আকঙ্খা সেই আশা আর আকাঙ্খা পর্যন্তই রয়ে গেল, তাদেরকে এক প্লাটফর্মে আসতে আর দেখলাম না।
তৌহিদবাদী দলগুলোর এই অনৈক্যের সুযোগে ৮৫ শতাংশ মুসলিমের আবাসভূমি আজ ইসলাম বিরোধী আন্তর্জাতিক শক্তিবলয়ের খেলার মাঠে পরিণত হতে চলেছে, যারা নিজ নিজ স্বার্থ হাছিলের জন্য দেশের নির্বাচিত (?) ধর্মনিরপেক্ষ সরকারের ঘাড়ে সওয়ার হয়ে যার যার পরিকল্পনা মাফিক কাজ করে যাচ্ছে। সে মোক্ষম সময়টিকে দ্রুত ঘনিয়ে আনার গোপন এজেন্ডার অংশ হিসেবে দেশীয় লেজুড় শক্তির মাধ্যমে দেশ-বিদেশে সভা সেমিনার করে ফলাও করে প্রচার করা হচ্ছে বাংলাদেশেও আলকায়দা সহসা তার গুপ্ত হত্যা, বোমাবাজি ইত্যাদি প্রোগ্রাম নিয়ে হাজির হচ্ছে। এদিকে বিরোধী দল কর্তৃক ২৭সে জুনের সফল হরতাল পালনে দিশেহারা হয়ে দেশের তৌহিদী জনতার মূখপত্র মাও. মতিউর রহমান নিজামী ও মাওলানা দেলোয়ার হোসেন সাঈদীকে মিথ্যে অজুহাতে গ্রেফতার করতঃ পূর্বের সব রেকর্ড ভঙ্গ করে ১৬ দিনের পুলিশি রিমান্ডে নিয়ে অত্যাচার শুরু করেছে। তাঁদেরকে রিমান্ডে নেওয়ার ধরন দেখলে মনে হয়, তাঁরা বুঝি চোর, বদমাশ, ডাকাত কিংবা জংগী সন্ত্রাসী। জোর করে তাঁদের থেকে জোট আমলের দশ ট্রাক অস্ত্র মামলার কানেকশন, জংগীদের অর্থায়ন ও যোগসূত্রের স্বীকারোক্তি আদায়সহ (তাঁবেদার প্রিন্ট মিড়িয়ায় প্রচারিত খবর) ছোটবড় হাস্যকর আরো ডজনখানেক অভিযোগ দিয়ে মামলা দেয়া হয়েছে। এসব চতুমূর্খী অন্যায়, অত্যাচারের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ কিংবা সমালোচনাও সরকারী দল সহ্য করছেনা, বরং যেকোন কর্মসূচীতে গেলে বিনা উস্কানিতে নারীপুরুষ কিংবা যুবক, বুড়ো নির্বিশেষে সবাইকে বেধড়ক লাঠিপেটা করা হচ্ছে, গ্রেফতার করা হচ্ছে শত শত নেতা কর্মীকে এবং জেলে পুরা হচ্ছে, অত:পর রিমান্ডের নামে গুয়ান্তানামো বে টাইপ অন্ধকুপে নিক্ষেপ করা হচ্ছে। ৩৯ বছর পূর্বে বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরে একবার মাত্র ১৯৭৫-এ বাকশাল কায়েমের প্রাক্কালে জনসাধারণের উপর এমন অত্যাচার, নিপীড়ন এবং জেল জুলুমের খড়গ নেমে এসেছিল, কিন্তু ইতিহাসের একটি অতি সত্য কথা হলো, মানুষ ইতিহাস হতে শিক্ষা নেয় না।
দেশের এমন কঠিন রাজনৈতিক দুর্যোগ, সামাজিক অসন্তোষ ও অচলাবস্থার প্রেক্ষাপটে আজ প্রয়োজন জাতীয়তাবাদী ও ইসলামী দলগুলোর সমন্বয়ে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পিঁপড়ের মড়েলে কঠোর ঐক্য, সহমর্মিতা, সমঝোতা, শৃংখলা, এবং একটি হিকমতময় ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচী প্রণয়ন। এক এগারোর সরকারের সময় জাতীয়তাবাদী শিবির ও ইসলামী শিবিরের মনোবল ভেঙ্গে দেয়ার জন্য মঈন-ফখরুদ্দিনের সরকার কি না করেছে। তার ধকল আজো এসব দলের নেতা কর্মীদের সম্পূর্ন সোজা হতে দেয়নি। এটা যেমন সত্যি কথা, তেমনি একথাও সত্য যে, দেশের বর্তমান অরাজক পরিস্থিতিতে দেশের মানুষের শান্তির জন্য কাজ করতে হলে তথা দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বকে সাম্রাজ্যবাদী শত্রুদেশের শকুনী থাবা হতে রক্ষা করতে হলে জাতীয়বাদী ও ইসলামী শক্তিকে তাদের মধ্যকার পারস্পরিক ভূল বুঝাবুঝি দূর করে একাট্টা হয়ে কাজ করতে হবে। নেতাদের বুঝতে হবে, ঐক্যের কোনই বিকল্প নেই। ক্ষুদ্র পিঁপড়েকে দেখে শিখতে হবে, কিভাবে নেতৃ আদেশ মান্য করে, উদ্ভূত নূতন পরিস্থিতিতে ধৈর্য্যহারা না হয়ে অল্প সময়ের ভেতর কাজের ষ্ট্রাটেজী বদল করে পূনরায় একযোগে কর্মক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়।
কথায় আছে সময়ের একফোঁড়, অসময়ের দশফোঁড়। দেশটাকে সাম্রাজ্যবাদের চারণভূমিতে পরিণত করার ষড়যন্ত্র যে কত গভীরে শিকড় গড়েছে তার বিশদ বর্ণনা আমরা এ পত্রিকারই গত ৩রা জুলাই সংখ্যায় প্রকাশিত ড. হোসেন খিলজীর রচনা হতে পাই। পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রে বসে হিন্দু-বৌদ্ধ-খৃষ্টান ঐক্য পরিষদের সভা, এবং সেখানে বাংলাদেশকে ইসলামীকরণের চক্রান্তের (?) বিরুদ্ধে জরুরী কর্মপন্থা নির্ধারনের প্রস্তাব; পরবর্তীতে সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে ও একই ধরণের প্রচারণা নিয়ে সভার আয়োজন, হার্ভার্ড ইন্টারন্যাশনাল রিভিউতে হাসিনাপূত্র জয়ের সে ঐতিহাসিক আর্টিকেল যাতে বাংলাদেশকে মৌলবাদী রাজনীতির চারণভূমি হিসেবে চিত্রিত করে স্বকপোলকল্পিত পরিসংখ্যানসহ পশ্চিমাদের বুঝানো হয়েছে যে তারা হস্তক্ষেপ না করলে অচিরেই বাংলাদেশ আর এক (মৌলবাদী) আফগানিস্তানে পরিণত হবে, এসব সবই একসূত্রে গাঁথা। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ভারতের প্রসিদ্ধ ইংরেজী দৈনিক ‘The Pioneer’ এর কলামিস্ট হিরম্ময় কার্লেকার তো খোলাখুলিভাবেই তার সরকারকে সাজেস্ট করেছিলেন, যদি মঊন ঈউ আহমেদের সরকারকে বৈধতা দিতে হয়, তাহলে শর্ত দিতে হবে তারা সেদেশের ইসলামী দল জামায়াতকে শায়েস্তা করাসহ তাদের অর্থনীতি ভেঙ্গে চুরমার করে দিবে। বস্তুতঃ ড. হোসেন খিলজীর প্রতিবেদনের অনুরূপ প্রতিবেদন বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমল হতে আরো কয়েকজন সুযোগ্য লিখকের লেখা হতে পাঠের সুযোগ হয়েছে। সুতরাং দেশপ্রেমিক তৌহিদী জনতাকে এখুনি এমূহুর্তে পরিস্থিতি মোকাবেলায় ঐক্যবদ্ধ পরিকল্পনা গ্রহন করতে হবে। যতো বড় বাঁধা আসুক, যত প্রতিন্ধকতা পথের পরে ভিড় করুক, সেটা কোন বাপার নয়, মূল ব্যাপার হলো, ধৈর্য¨, একতা, নেতার প্রতি আনুগত্য, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের প্রতি অবিচল থাকা এবং দূরদর্শিতা।
আর একটি বড় বিষয় হলো, যে কোন উস্কানীর মূখে কর্মীদের ধৈর্য্য ধারণ করতে হবে; কারণ, যেদেশে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তাঁর প্রশাসনের তথা পুলিশ বাহিনীর জঘন্য আচরণকে, যা নাকি ইলেক্ট্রনিক মিড়িয়ার কল্যাণে স্পষ্ট করে সবাই দেখেছে (মির্জা আব্বাস সাহেবের গৃহের নির্যাতন), উল্টো বিরোধীদলের নাটক বলে অভিহিত করেন, যিনি পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে এতগুলো বছর পর মরহুম শেখ মুজিবের হত্যায় দেশপ্রেমিক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়ার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আনেন, বেগম মতিয়া সে কারণে খালেদা জিয়াকেও হুকুমের আসামী করার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন, সেদেশে গোয়েবলসীয় মিথ্যা রাজনীতিজাত উস্কানীর ধরণ কত প্রকার, কি কি এবং কত লতাপাতায় বিস্তৃত হতে পারে, তা সবাইকে দূরদৃষ্টি দিয়ে বুঝে নিতে হবে।
বিভিন্ন ইসলামী দলের নেতাদের প্রতি আমার হাতজোড় অনুরোধ, আপনারা আপনাদের মাঝের ছোটখাট বিভেদ ভূলে গিয়ে আল্লাহর ওয়াস্তে এক হউন। আমরা সাধারণ মানুষ বুঝি জামায়াত বলুন, খেলাফত মজলিশ কিংবা শাসনতন্ত্র আন্দোলন বলুন, সবার লক্ষ্য কিন্তু এক ও অভিন্ন, সবার সমস্যাও এক; যেমন, সরকার কর্তৃক ইসলামী রাজনীতি নিষিদ্ধের পাঁয়তারা, ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষানীতির খোলসে দেশে ধর্মীয় শিক্ষার পথে প্রাচীর তুলে দেয়া, আইনমন্ত্রী কর্তৃক মাদ্রাসা শিক্ষিতদের ব্যাকডেটেড্ ও মাদ্রাসাকে জঙ্গীদের প্রজনন ক্ষেত্র বলে চিহ্নিত করা, দেশের সংবিধানকে ইসলামমুক্ত করণের ষড়যন্ত্র, ইসলামের উত্তরাধিকার আইন, শরীয়তি আইন ইত্যাদিতে হস্তক্ষেপ করা, সমাজে অশ্লীলতা, বেলাল্লাপনা ইত্যাদির পথ খোলাসাকরণ ও আকাশ সংস্কৃতির বাধাহীন চর্চা করে জাতির ভবিষ্যত প্রজম্মকে অথর্ব ও নিরেট ভোগবাদী বানানো এসবই তো, তাইনা? আপনারা কেহ নিশ্চয়ই দেশে শেখ মুজিবর রহমান প্রবর্তিত ইসলাম চান না (‘দেশে ইসলাম টিকিয়ে রেখেছে আওয়ামী লীগ। এই ইসলামের প্রবর্তক ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’ - সম্প্রতি আওয়ামী ওলামা লীগের আয়োজিত এক সভায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমামের দেয়া ভাষণ)।
আপনাদের সবার লক্ষ্য তো এসব হতে দেশ ও জাতিকে উদ্ধার করা, তাই নয় কি? তাহলে কেন আপনারা শুধু শুধু সময় ক্ষেপণ করছেন? কেন আপনারা সব মান অভিমান ভূলে বাতিলের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছেন না? পবিত্র কোরআনে বর্ণিত শীষাঢালা প্রাচীরের ন্যায় সারিবদ্ধভাবে লড়াই করতে প্রস্তুত হতে ইসলামের বিরুদ্ধে আর কতো আস্ফালন শুনতে হবে? (সূরা আস সফ্: ৪)। আজ যে সর্বজনশ্রদ্ধেয় মাওলানাদের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার মিথ্যা ও লোকহাসানো অভিযোগ এনে মামলা দেয়া হলো, এমনকি যাকাত বোর্ড হতেও যাকাতের টাকা তসরূপের অবিশ্বাস্য মামলা হলো, একইভাবে যে অন্যদলের মাওলানাদের বিরুদ্ধে কখনো একই কায়দায় মামলা হবেনা, তার কি কোন গ্যারান্টি আছে? আর এ ধরণের মামলার মূল উদ্দেশ্যই হলো, জামায়াতকে অন্য ইসলামী রাজনৈতিক দলের কাছে এবং সাধারণ জনগনের কাছে হেয় করা, তাদের মাঝে বিদ্বেষ ও দূরত্ব সৃস্টি করা, যাতে সরকারের হামলা মামলার কারণে ইসলামী দলগুলো এবং প্রধান বিরোধীদল কখনো একত্রিত হয়ে আন্দোলনের কথা চিন্তা করতে না পারে। অপেক্ষা করুন, আর কয়দিন পর আপনাদেরসহ সবাইকে মুজিব প্রবর্তিত ইসলাম প্রত্যাখ্যানের কারণে কাফের ফতোয়াও দিয়ে বসবে (আওয়ামী মুফতী লীগ অলরেডী নাকি এধরণের মহান ফতোয়া তাদের কোন এক সমাবেশ হতে জারিও করে দিয়েছে)।
ইসলামী দলগুলোর ভেতরের হানাহানি, দলাদলি এবং অন্তঃকলহ আফগানিস্তানকে আজ কোন পর্যায়ে নিয়ে পৌঁছিয়েছে তা সবাই একবার চোখ মেলে দেখবার চেষ্টা করবেন কি? দীর্ঘ প্রায় একযুগ অপর এক পরাশক্তি (প্রাক্তন) সোভিয়েত রাশিয়ার সাথে লড়াই করে ক্ষুদ্র মুসলিম রাষ্ট্র আফগানিস্তান শ্বেত ভল্লুকটিকে নিজেদের মাটি হতে বিতাড়িত করতে সমর্থ হয়েছিল। সারা বিশ্ব অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে ছিল একটি পরাশক্তিকে কিভাবে একটি অতি ক্ষুদ্র রাষ্ট্র নাকানি চুবানি খাইয়ে অবশেষে পাততাড়ি গুটাতে বাধ্য করেছে। সবাই বলেছিল এটা সম্ভব হয়েছে একমাত্র সেদেশের জনসাধারণের ইসলামের প্রতি দরদ এবং ইসলামী শাসনব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আকর্ষনের জন্য। কিন্তু মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ যখন দেখলো, দেশটিতে ইসলামী আইন কানুন প্রয়োগের কারণে রাশিয়ার মতো,তাদের স্বার্থ ও বিপন্ন হতে চলেছে, তখন তারা চাতুরতার সাথে বিভিন্ন উপজাতীয় গোষ্ঠীকে একে অন্যের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেয়। তাই এসব দল উপদলগুলোর ইসলামের প্রতি শত কমিটমেন্ট থাকা সত্ত্বেও শেষাবধি সাম্রাজ্যবাদীদের চক্রান্তের শিকার হয়ে নিজেদের মাঝে অনৈক্য ও বিভেদের দেয়াল তুলে, সুন্দর প্রতিশ্রুতিশীল একটি কল্যাণরাষ্ট্রের সূচনাতেই বিশাল হোঁচট খেলো। অবশেষে অল্প কয় বছরের ইসলামী রাষ্ট্র স্থিতি লাভের সুযোগ পাওয়ার আগেই বিন লাদেনকে হাতে তুলে না দেয়ার অজুহাতে আমেরিকা সেখানে ভয়ংকর যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায় মেতে উঠলো এবং মানবতার সব ব্যারোমিটারকে দুমড়ে মুচড়ে ফেলে, জাতিসঙ্ঘের নিষেধকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠি দেখিয়ে লাখো অসহায় মানবের রক্তের উপর প্রতিষ্ঠা করলো সেখানে এক তাঁবেদার রাষ্ট্র। কিন্তু তারপরেও সেখানে আজো ঝরে চলছে নিরীহ নিরপরাধ মানুষের (মুসলমানের) বুকের রক্ত প্রতি পলে পলে, প্রতি ক্ষণে ক্ষণে। পাকিস্তানও আজ ঐ মার্কিনীদের সাথে তাদের বন্ধুত্বের(!) চরম মূল্য দিতে গিয়ে আটকে গেছে নিজ মুসলমান ভাইয়ের রক্তে হোলি খেলার সেই একই ঘূর্নাবর্তে।
এখন আপনারাই সিদ্ধান্ত নিবেন, বাংলাদেশটাকেও সেরূপ তাঁবেদার রাষ্ট্র বানানোর চক্রান্তকারীদের সাথে থেকে অথবা নীরব থেকে তাদের হাত শক্তিশালী করবেন, দেশটাকে সন্ত্রাসমূক্ত করার নামে সাম্রাজ্যবাদীদের এদেশকে ইসলামমূক্ত করণের হাতিয়ার হবেন, দেশে শেখ মুজিবুর রহমান প্রবর্তিত(!) ও বিধিবদ্ধ ইসলাম নিয়ে সন্তুষ্ট থাকবেন, ১৯৭২ এর সংবিধানে ফিরে গিয়ে ইসলামপন্থীদের রাজনীতি করার হক্ব ছিনতাই হবার নাটকের নীরব দর্শক হবেন, নাকি জাতীয়তাবাদী ও ইসলামপন্থীদের সমন্বয়ে একটি অভূতপূর্ব ঐক্য আন্দোলনের মাধ্যমে জালিমদেরকে ক্ষমতার মসনদ হতে বিদায় করে, চরম অশান্তি, অরাজকতা আর বিভেদ দূর করে, দেশের মানুষকে একটি অসহনীয় জগদ্দল পাথরের ভার হতে মুক্ত করার ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসবেন। আর সেকাজে যদি প্রস্তুত না হন, তাহলে সাধারণ মানুষের দেয়া এ অভিযোগের সত্যতা ১০০% গ্রহনে তৈরী হোন যে- ইসলামী দলগুলোর অনৈক্য ও কাদা ছোঁড়াছুঁড়িই ইসলামের ক্ষতির জন্য সবচেয়ে বেশী দায়ী।
লেখাটির সমাপ্তি টানি টানি করছি, এমনি সময়ে, ‘সচেতন নাগরিক সমাজের’(?) ব্যানারে রাজপথের দেয়ালে একটি পোষ্টার দেখতে পেলাম, যাতে সদ্য গ্রেফতারকৃত তিন জামায়াত নেতার ছবি এবং তার নীচে সম্ভবত: টায়ারে আগুন দেয়ারত তিন চারজন লম্বা কোর্তা ও দাঁড়িধারী যুবককে camouflage এ চিত্রিত করা হয়েছে। পোষ্টারের মূল বক্তব্য হচ্ছে ঐ তিন নেতা নাকি প্রধান বিরোধীদল বি.এন.পি কর্তৃক আহুত গত ২৭শে জুন তারিখে হরতালের পুর্বদিন রাতে রাজধানীতে গাড়িতে আগুন দিয়ে নাশকতা ও মানুষ পুড়িয়ে মারায় ইন্ধন দিয়েছিলেন যার ফলশ্রুতিতেই ‘মাদ্রাসা পড়ুয়া’ ঐ ছাত্ররা আগুন নিয়ে রাজপথে খেলছে ( বা আগুন লাগাচ্ছে)। কি জঘন্য কান্ডজ্ঞানহীন প্রচারণা! সচেতন নাগরিক সমাজের আড়ালে কারা এমন গোয়েবলসীয় মিথ্যা প্রচারণা চালাতে পারে, এবং মাদ্রাসা ছাত্রদের খোলাখুলি আগুন নিয়ে খেলার মিথ্যা ছবি দিয়ে ওরা যে তাদের নেতার ঘোষিত মাদ্রাসা হলো সন্ত্রাসের প্রজননক্ষেত্র, এ থিওরীকেই হাওয়া দিচ্ছে তা কি সাধারণ জনগন বুঝেনা? এমন গাঁজাখুরি কাহিনী যদি বিশ্বাস করতে না চান, এবং যদি চান যে ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলনের নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে এমন মিথ্যা প্রপাগান্ডা শতদল বিস্তৃত হয়ে অচিরেই আপনাদেরকেও গ্রাস করতে না আসে, তাহলে সব ইসলামী দলের কান্ডারীদের প্রতি আহ্বান, আসুন আর দেরী নয়, মিথ্যার এই কুহেলিকা হতে দেশ ও দেশবাসীকে মুক্ত করতে এখনই সমবেত হই, এক পতাকাতলে, শান্তির পতাকাতলে, ইসলামের পতাকাতলে।
লেখকঃ কলামিষ্ট
Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


