somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

অনুপম হাসান
শৈশব আর কৈশোর কেটেছে রংপুরে; আইএ পাসের পর কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন। পরবর্তীতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমফিল. ও পিএইচডি. ডিগ্রি লাভ। বর্তমানে শিক্ষকতা পেশায় নিযুক্ত আছি।

বিনীত কথা : ১০ । কবিতার ছন্দ প্রসঙ্গে

১২ ই জানুয়ারি, ২০১০ রাত ১২:৪৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

[ব্লগে সম্প্রতি কিছু কবিতা পাঠের পর আমার মনে যেসব প্রশ্ন উঠেছে...]

আমি ভাবনা যেভাবে করি, তা প্রকাশ করি গদ্যে। কিন্তু এই ভাবনাগুলো কি কবিতায় প্রকাশ করা যায় না। কিংবা এগুলোকে কি কবিতা বলা যায় না?

নিশ্চয়, কেউ বলবেন না আমার ভাবনার প্রকাশকে কবিতা বলা যায়! আর না বলার পক্ষে যুক্তি দেবন-- সব ভাবনাই কবিতা নয়। কবিতা হতে হলে তার বিষয় এবং বলার ধরন ভিন্ন হতে হবে। কিন্তু সেই ভিন্নতাটা কি? এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে বলবেন-- কবিতায় চিত্রকল্প, রূপক, উপমা, ছন্দ প্রভৃতি থাকে-- তা আমার প্রকাশে নেই। এজন্য আমার ভাবনারাশির প্রকাশকে কবিতা বলা যায় না। হ্যাঁ কথা ঠিক, কবিতায় চিত্রকল্প থাকবে, উপমা, রূপক প্রভৃতিও থাকবে; কিন্তু আমার গদ্যেও তো রূপক আছে-- কখনো চিত্রকল্পও নির্মিত হয়। আমার কথা না হয় বাদই দিলাম, অনেকের গদ্য তো চিত্রকল্পময়। উদাহরণ স্বরূপ ধরুন শরৎচন্দ্রের 'শ্রীকান্ত' উপন্যাসের প্রথম পর্বে অন্ধকারের যে বর্ণনা তিনি করেছেন-- তা নিঃসন্দেহে উপমায়, রূপকে চিত্রকল্পময়। তাহলে কি শরৎচন্দ্রের অন্ধকারের বর্ণনাকে আমরা কবিতা বলবো? এ প্রসঙ্গে কি বলবেন? নিশ্চয় তখন কথা তোলা হবে-- নিশ্চয় শরৎবাবুর লেখায় ছন্দ ছিল না। হ্যাঁ সেটা স্বীকার করতেই হবে যে সেখানে ছন্দ ছিল না; আর ছন্দ ছিল না বলেই তো সেটাকে গদ্য বলা হয়েছে। তাহলে একটা ব্যাপার খুব স্পষ্ট হয়ে ওঠে আমাদের কাছে যে, কবিতার ক্ষেত্রে ছন্দ একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। কবিতায় একই সাথে অর্থালংকার ও শব্দালংকার ব্যবহৃত হয়। অর্থালংকার (উপমা, রূপক, চিত্রকল্প, বাকপ্রতিমা, উৎপ্রেক্ষা প্রভৃতি) এ সময়ের কবিতায় থাকলেও শব্দালংকার কিভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে তা ঠিক আমার নিকট স্পষ্ট নয়। ত্রিশ, চল্পিশ, পঞ্চাশ, ষাট কিংবা সত্তর দশকের বাংলা কবিতায় শব্দালংকার রয়েছে। কবিতায় শব্দালংকার সৃষ্টি করা হচ্ছে-- মূলত ধ্বনির নানামাত্রিক সমন্বয় সাধন করা। যেমন ধরুন-- অনুপ্রাস সৃষ্টি করা। এটি কখনো লাইনের শেষে কখনো বা অন্তে আবার কখনো মাঝেও ব্যবহার করা হয়। উদাহরণ :
‌চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা'
--এখানে উদ্ধৃত পংক্তিতে '[আ]র' ধ্বনির অনুপ্রাস পুনঃপুন ঘটান হয়েছে। এ ধরনের অনুপ্রাস সৃষ্টিকে বলা হয়, বৃত্তানুপ্রাস। অন্তানুপ্রাস দেয়া হয় এভাবে--
কেন আমার দিন কাটে না রাত কাটে না
রাত কাটে তো ভোর দেখি না
কেন আমার হাতের মাঝে হাত থাকে না কেউ জানে না।
('যাতায়াত', হেলাল হাফিজ)
এভাবে নানা ধরনের শব্দালংকার ব্যবহৃত হয় কবিতায়। শুধু মিল দেয়াই শব্দালংকার নয়, এর আরো অনেক শ্রেণী ও রকম আছে। আগ্রহী পাঠকগণ 'অলংকার শাস্ত্র' পাঠ করলেই তা জানতে পারবেন। আমার নতুন কিছু বলার নেই। আমার বক্তব্যটা হচ্ছে--
শুধু রূপক, উপমা বা চিত্রকল্প দিয়েই কবিতা রচিত হতে পারে না। কবিতার ক্ষেত্রে ছন্দটা গুরুত্বপূর্ণ এজন্য যে তা পাঠের সময় যেন পাঠকের কিংবা শ্রোতার কানে এক ধরনের ধ্বনি সমন্বয়ের সৃষ্টি হয়। বর্তমানের অনেক কবিই গদ্যছন্দের কথা বলেন-- কিন্তু আসলে গদ্যছন্দটা কি তা ঠিক ধরিয়ে দেন না।...

আমি যতোটুকু বুঝি, কবিতায় গদ্যকেও এমনভাবে ব্যবহার করা হয়, যেখানে অনিবার্যভাবে সৃষ্টি হয় ছন্দের। আর এটা করা হয় বলেই তাকে গদ্যছন্দ আখ্যা দেয়া হয়েছে। সুতরাং গদ্যছন্দ নির্মাণের ক্ষেত্রে আছে-- তাল লয়ের প্রশ্ন, আছে মাত্রাজ্ঞানের প্রশ্ন। একথা সত্য যে, ছন্দ তাল লয় বিহীন হতে পারে না। আর ধ্বনির এই সমন্বয় সাধন করে যে ভাবনারাশির প্রকাশ ঘটে, তা কবিতা হিসেবে চিহ্নিত হয়।

আর ধ্বনির সমন্বয় সাধন করতে হলে অবশ্যই কবিতায় ব্যবহৃত শব্দরাশিকে একটি নির্দিষ্ট ছকে ব্যবহার করতে হয়। কেউ করেন, মাত্রাবৃত্তে, কেউ অক্ষরবৃত্তে আর কেউ বা স্বরবৃত্তে। স্বরবৃত্ত সাধারণত ব্যবহৃত হয় ছড়া রচনার ক্ষেত্রে। আধুনিক সময়ের কবিতায় অক্ষরবৃত্ত আর মাত্রাবৃত্তের ব্যবহারই অধিক লক্ষণীয়। গদ্যছন্দের ক্ষেত্রেও অক্ষরবৃত্ত কিংবা মাত্রাবৃত্তেই পর্ব-বিন্যাস সংঘটিত হয়। কিন্তু এ সময়ের গদ্যছন্দে রচিত কবিতার অধিকাংশই কোন ধরনের ছন্দের রীতিতে নয়। মনগড়া যে যার মতো কবিতার পংক্তিতে অসমমাত্রা ব্যবহার করছেন। একথা ঠিক গদ্যছন্দের ক্ষেত্রে অসম মাত্রা ব্যবহার করা হয়, কিন্তু তার মানে কি-- সেখানে কোনই রীতি মানা হবে না। আর যদি তাই নাই হয়-- কিন্তু সার্বিক অর্থে তো একটি ধ্বনি সমন্বয় সৃষ্টি হতে হবে। সেটাও যখন হয় না, তখন সেই রচনাটিকে আমরা কি হিসাবে ব্যাখ্যা করব তা ঠিক আমার বোধগম্য হয় না। যারা বর্তমানে গদ্যছন্দের কথা বলেন কিংবা শুধু অর্থালংকার ব্যবহার করেই কবিতা রচনা করতে চান, তাঁরা নিশ্চয় শামসুর রাহমানকে কবি হিসেবে অস্বীকার করেন না। বিনীত অনুরোধ করবো তাঁদেরকে-- একবার শামসুর রাহমান পাঠ করে দেখতে; তিনি নব্বই দশকেও কিভাবে কবিতায় মাত্রা প্রয়োগে অসামান্য কুশলী ছিলেন।

আমার একই লেখা, ব্যক্তিগতভাবে কাউকেই আক্রমণ করা নয়। সাম্প্রতিক সময়ের কবিতা পাঠে আমার মনে যেসব প্রশ্ন উঠেছে, তা উপস্থাপন করলাম আপনাদের সামনে। যদি কেউ গদ্যছন্দ কিংবা এ সময়ের কবিতার ছন্দ সম্বন্ধে আমার বক্তব্যের প্রেক্ষিতে বিন্যস্ত করে দেখাতে পারেন-- তাহলে উপকৃত হবো।
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই জানুয়ারি, ২০১০ রাত ১২:৪৭
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

গল্পঃ মোহাম্মদপুরে কখনও বিচ্ছেদ হয় না

লিখেছেন রাজসোহান, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৪





আমার দোকানের নাম নিউ শাপলা কম্পিউটার ও ফটোস্ট্যাট। সাইনবোর্ডের শাপলা ফুলটা এঁকে দিয়েছিলো তাজমহল রোডের এক সাইনম্যান, দেখতে হয়েছিলো কচুরিপানার মতো। চৌদ্দ বছর ধরে ঝুলে আছে। রোদে রঙ উঠে... ...বাকিটুকু পড়ুন

২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা তার সাথে কিছু রুঢ় সত্য যা বদলে দিয়েছিলো দেশের রাজনীতি।

লিখেছেন অন্তর্জাল পরিব্রাজক, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৩৪





২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা সম্পর্কে আমরা সবাই মোটামুটি জানি। এই হামলায় কারা জড়িত ছিল সেটাও আজকের দিনে অজানা নয় একমাত্র নিতান্ত দলকানা ছাড়া। তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধানমন্ডি ৩২ যারা ভেঙেছিল, আর যারা বিচার চাওয়ার পথ বন্ধ করে দিল- তারা কি একই?

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:৪৪



ধানমন্ডি ৩২ যারা ভেঙেছিল, আর যারা বিচার চাওয়ার পথ বন্ধ করে দিল- তারা কি একই?

ধানমন্ডি ৩২ ভাঙা হয়েছিল- কে দেখেনি, কে জানে না, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই।,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন থেকে যারা আওয়ামী লীগকে ভালোবাসেন এখন তাদেরকে আওয়ামী লীগের প্রয়োজন

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:৪০



ক্ষমতায় গেলে কোন দল যাদেরকে মনে রাখে না ক্ষমতায় গেলে তাদেরকেই তারা সবচেয়ে বেশী মিস করে। সেই নিখাঁদ দল প্রেমিকদেরকে এখন আওয়ামী লীগ খুঁজছে। তারা লগি বৈঠা নিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

৫ই আগস্ট ছিলো আরো একটি ১৫/২১শে আগষ্টের অপচেষ্টা।

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৫২



২১শে আগস্ট পালন করা অর্থে , আমার কাছে মনে হচ্ছে আবারো জঘন্য কোনো ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে। কারন আমরা ঐ নারকীয় হত্যাকাণ্ডের কোনো বিচার সম্পন্ন করতে পারিনি। আমরা যারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×