somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্পঃ আমি বড় হয়ে হবো

২১ শে নভেম্বর, ২০১৬ বিকাল ৪:১১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


‘প্রিতম, বড় হয়ে কি হতে চাও তুমি?’
‘আমি? আমি বড় হয়ে মুরগিওয়ালা হবো। পাড়ায় পাড়ায় এই মুরগি, এই মুরগি, মুরগি লইবেন নি, মুরগি?-বলে বেড়াব।’
ড্রইং রুমে যারা ছিল সবাই তখন প্রিতমের উত্তর শোনার পর হো হো করে হেসে উঠল। ওদিন আবার প্রিতমদের বাসায় কিছু অতিথিও ছিল, তারাও হেসে উঠল। ছেলে মুরগিওয়ালা হতে চায় শুনে প্রিতমের বাবা-মা তখন লজ্জায় শেষ।
প্রিতমের মুরগিওয়ালা হতে চাবার কারণও আছে বটে। প্রতি দুপুরেই সে বারান্দায় খেলার সময় নিচ দিতে মুরগিওয়ালাদের যেতে দেখে। আর শুনতে পায়, এই মুরগি, এই মুরগি, মুরগি লইবেন নি, মুরগি?
এই হলো আমাদের প্রিতম। সে থাকে ধানমন্ডিতে। প্রত্যেক বারই যখন কেউ তাকে জিজ্ঞেস করত, ‘প্রিতম, বড় হয়ে কি হবে, বাবা?’
তখন প্রত্যেক বারই প্রিতম দিত আলাদা আলাদা উত্তর। এইতো সেদিনও সে বারান্দায় খেলছিল। হঠাৎ বাসার নিচ দিয়ে এক আইসক্রিমওয়ালাকে যেতে দেখল। আইসক্রিমওয়ালাটি হাঁকছিল, ‘আইসক্রিম, আইসক্রিম, মজার মজার আইসক্রিম, লাগবে নাকি আইসক্রিম?’
প্রিতম তখন ভেবেছিল, আরে, দারুণ তো! বড় হয়ে আমি আইসক্রিম বেচব। একটা বেচব আর একটা খাব।
সে তার আইসক্রিমওয়ালা হবার ইচ্ছে মা-বাবাকে জানায়। ছেলে আইসক্রিমওয়ালা হবে ভেবেই প্রিতমের মা-বাবা কি করবে বুঝে উঠতে পারল না।
একদিন প্রিতম মা-বাবার কয়েকদিনের জন্য সঙ্গে গ্রামে গেল। প্রিতমের দাদু-দীদা গ্রামে থাকেন। গ্রামে এলেই তো মজা! কোন পড়াশোনা নেই, শুধু খেলা, খেলা আর খেলা।
প্রিতম তো কখনো ধানক্ষেত দেখেনি তাই প্রিতমের দাদু প্রিতমকে নিয়ে গেলেন ধানক্ষেত দেখাতে। প্রিতম সেখানে দেখতে পেল কয়েকজন ধান নিয়ে কি যেন করছে।
প্রিতম দাদুকে জিজ্ঞেস করল, ‘দাদু, এরা কারা?’
দাদু উত্তরে বলে, ‘এরা হলো কৃষক।’
প্রিতম তো খুশি হয়ে গেল। সে এখন বড় হয়ে কৃষক হতে চায়। প্রিতম ও তার দাদু বাড়িতে ফিরলে প্রিতম সবাইকে বলে বেড়ায়, ‘আমি বড় হয়ে কৃষক হবো।’
প্রিতমের ইচ্ছার কথা জেনে সবাই তাকে নিয়ে হাসাহাসি করতে লাগল। প্রিতম তখন রেগে গিয়ে বলে, ‘তোমরা এভাবে হাসাহাসি করলে মুরগিওয়ালা আর আইসক্রিমওয়ালা হওয়াও ছাড়ব না কিন্তু বলে রাখলাম।’
সেবার আরো জোড়ে সবাই হেসে উঠে। প্রিতম তখন গাল ফুলিয়ে রাগ করে থাকে।
প্রথমবার যখন প্রিতম বাবা-মায়ের সঙ্গে সিনেমা হলে গেল, বের হয়ে প্রিতম বলে সে নায়ক হতে চায়।
একবার প্রিতমের সেকি জ্বর! হাসপাতাল পর্যন্ত নিয়ে যেতে হলো তাকে। সেরে উঠে বলে ডাক্তার হবে।
ট্রাকের ড্রাইভারকে বেদামসে ঘুমিয়ে থাকতে দেখে বলে ট্রাক ড্রাইভার হবে আর সারাক্ষণ নাক ডাকিয়ে ঘুমুবে।
একসময় রাস্তায় ঝাড়ুদাড়দের রাস্তা পরিস্কার করতে দেখে বলে ঝাড়ুদার হবে! তারপর সুপারম্যান, ইঞ্জিনিয়ার, দোকানদার, ক্রিকেটার, এমনকি ড্রেন ক্লিনারসহ আর কত কি যে প্রিতম হতে চেয়েছে তার কোন ঠিকানাই নেই।
কিন্তু একবার প্রিতমের জীবনে পরম কামনায় কুকুর হবার সাধ জাগল। সাড়া বাড়ি হামাগুড়ি দিতে লাগল, কাউকে দেখলে ঘেউ ঘেউ করে উঠত। কুকুরের ডাকটাও ভালো রপ্ত করেছিল সে।
একদিন প্রিতমকে এরকম করতে দেখে এক বৃদ্ধা মহিলা প্রিতমের মাথায় হাত বোলাতে যাবে অমনি প্রিতম প্রায় কামড়াতে যাচ্ছিল তাঁর হাত!
কুকুরের প্রায়ই সবকিছুই শিখে যাচ্ছিল, কিন্তু কুকুরের মতো কান চুলকাতে পারত না প্রিতম। সেটা রপ্ত করার জন্য প্রিতম পাশের বাসার সামনে কুকুরের পাশে গিয়ে বসেও ছিল।
ঠিক তখনই রাস্তা দিয়ে এক লোক যাচ্ছিল। পোষাক দেখেই তাঁকে আর্মি অফিসার মনে হচ্ছিল প্রিতমের।
তিনি প্রিতমকে এই অবস্থায় দেখে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি খোকা? কি করছ এখানে?’
প্রিতম স্বাভাবিকভাবে উত্তর দেয়, ‘কুকুর হচ্ছি।’
লোকটি আবারো জিজ্ঞেস করলো, ‘মানুষ হতে চাও না বুঝি?’
‘মানুষ তো অনেকদিন আগেই ছিলাম।’
‘আগে মানুষ ছিলে? কুকুরই যখন হতে পারলে না মানুষ ছিলেটা কবে?’-একটু থেমে লোকটি আবার বলল-‘ওকে কি আর মানুষ বলে?’
প্রিতম উঠে দাঁড়াল।
জিজ্ঞেস করলো লোকটিকে, ‘তাহলে কাকে মানুষ বলে?’
‘তুমি নিজেই ভেবে দেখ’ ,বলেই লোকটি চলে গেল।
প্রিতম ভাবে, আর্মি অফিসারটি একটুও ঠাট্টা করে নি। কিছুই তো বুঝিয়েই বলেনি।
কেন যেন প্রিতম কথাগুলো যতই ভাবে ততই লজ্জা পেয়ে যায়!
হঠাৎ একবার প্রিতম বুঝতে পারল, রোজ রোজ এভাবে নানান পেশায় ছোটা মোটেও কাজের কথা নয়। আর সবচেয়ে বড় কতা হলো, সে এখন ছোটো। বড় হয়ে যে কি হবে সে তো তাই জানে না।
যদি কেও এরপর থেকে জিজ্ঞেস করে, ‘বড় হয়ে কি হবে?’
তখন প্রিতমের আর্মি অফিসারটির কথা মনে পড়ে যায়। আর কক্ষনো আলাদা উত্তর তার কাছে আসত না।
সে বলে, ‘বড় হয়ে আমি মানুষ হবো।’
কেউ তখন প্রিতমকে নিয়ে হাসাহাসি করে না। অনেকেই গম্ভীর হয়ে পড়ে। তারা কেউই প্রিতমের সাথে আর ঠাট্টা করে না, সবাই ব্যাপারটা এড়িয়ে যায়।
আবার অনেকে প্রিতমকে আশির্বাদও দেন, ‘মানুষ হও বাবা, মানুষের মতো মানুষ হও।’
প্রিতমকে নিয়ে আর কেউ হাসাহাসি করে না, তাই প্রিতম এখন অনেক খুশি। প্রিতমের বাবা-মা প্রিতমকে জিজ্ঞেস করে, ‘মানুষ হবো কথাটি কে বলেছে, প্রিতম?’
প্রিতম তখন খুব আগ্রহ নিয়েই সেই আর্মি অফিসারটির কথা বলে।
সে বুঝতে পারে, বড় হয়ে কি হবে এর সঠিক উত্তর হলো মানুষ হবো। সবার আগে আমাদের হতে হবে খাঁটি মানুষ।
প্রিতম এখন আর কোনো পেশার পিছনে ছুটে না। আর্মি অফিসারটিকে একটা ‘থ্যাংক ইউ’ জানানোর জন্য সে অপেক্ষায় আছে।
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে নভেম্বর, ২০১৬ সকাল ১০:১৭
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চন্দ্রপ্রভা

লিখেছেন সাইফুলসাইফসাই, ১৬ ই অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১২:০৭

চন্দ্রপ্রভা
সাইফুল ইসলাম সাঈফ

তোমাকে দেখে মোহিত হই চন্দ্রপ্রভা
রোদ পড়লে চকচক করে
এতই সুন্দর লাগে
একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকি।
তোমাকে ছুঁতে ইচ্ছে করে
কিন্তু পাই না যে সাহস।
তুমি নাই বলে কি এত ঝড়?
তুমি পাশে নাই বলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনি কি পেলেন?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৬ ই অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৬



বাংলার দুই নোবেল জয়ী রবি ঠাকুর আর ডঃ ইউনুসের পিছনে অনেক কথাই তো বললেন।
ব্লগ লেখায় ভরিয়ে ফেললেন!
খোদা তাঁদেরকে যে জায়গা দিয়েছেন, তা থেকে এক চুল কি নিচে নামাতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

তোমরা নেহা বোরা কে বাংলাদেশের কথা বোলো না

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ১৬ ই অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ২:০২


নেহা বোরাকে তোমরা বাংলাদেশের কথা বোলো না। বোলো না যে, তিনি যখন বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ভূয়সী প্রশংসা করছেন, তখন বাংলাদেশে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুনেরা ক্যাম্পাসে গরু জবাই করে জেয়াফত খাওয়ার আন্দোলন... ...বাকিটুকু পড়ুন

জগন্নাথবাসীগণ, আমার কথা শুনছেন কি?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৬ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৯:০৩

জগন্নাথবাসীগণ,
আপনাদের গরু কোরবানি যদি হযরত জাবের (রাঃ)-এর মতো
নবীজীর সম্মানে হয়ে থাকে, তাহলে মোবারকবাদ।
আর, শুধু প্রতিবাদ দেখাতে একটি অবলা পশুকে হত্যা করে থাকলে,
তার জন্যে খোদার দরবারে বিচার দিলাম।
...বাকিটুকু পড়ুন

অভিনন্দন নাবিহা সাকলায়েন: ৩০ বছর পরের এআই পটেনশিয়াল

লিখেছেন কলাবাগান১, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৩:৩৮


কনসেপ্ট টা খুবই সোজা...পৃথিবীর তাবত মানুষ ই জানে যে আপনার বিশ বছর বয়সে শরীরে যে কোষ গুলি আছে তা আপনার ৬০ বছর বয়সের কোষ আর সেইম না ..লম্বা সময়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×