somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্পঃ সায়েন্স প্রজেক্ট

২২ শে নভেম্বর, ২০১৬ সকাল ১০:২৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


১.
মিতু মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। আপাতত উপরে তাকাবার কোন ইচ্ছে নেই মিতুর। মনে মনে ভাবল, তাজুল স্যারের বিদঘুটে পান চিবানোর দৃশ্য দেখার চেয়ে নিচে মোজাইকগুলো দেখা আরো ভালো।নিচে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই মিতু দেখতে পেল পানের রস চুইয়ে পড়ছে। মিতু তাজুল স্যারকে না দেখলেও তাজুল স্যার ঠিক চশমার উপরে অনাগ্রহের চোখে তাকিয়ে আছে মিতুর দিকে।
মিতুকে তাজুল স্যার জিজ্ঞেস করলেন, "তুই স্যায়েন্স ফেয়ারে প্রজেক্ট দিতে চাস?"
মিতু কোন কথা না বলে শুধু মাথা নাড়ল, সে আসলেই দিতে চায়। তাজুল স্যার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "আচ্ছা, টিফিন পিরিয়ডে আমার সাথে দেখা করিস।"
মিতু চুপচাপ নিজের সিটে গিয়ে বসল, কক্ষনো ভাবেনি যে তাজুল স্যারের মতো রাগী স্যার এতো সহজেই রাজি হয়ে যাবে। ব্যাপারটা ভারী অদ্ভুত লাগল মিতুর।
মিতু যদি স্যারকে বলত, স্যার, আমি আপনার কোচিং-এ পড়তে চাই। সঙ্গে সঙ্গে স্যার খুশি হয়ে লাফিয়ে উঠতেন, অবশ্যই, অবশ্যই, কেন নয়?
এত্তোসব কিছু ভাবতে ভাবতেই স্যারের সেই ঐতিহাসিক বিরক্তিকর লেকচার দেওয়া শুরু হয়ে গিয়েছে। হঠাৎ হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন, "পাঁচ মিনিটে এই অধ্যায়টা মুখস্থ দিবি সবাই। একদম দাঁড়ি-কমা সহ চাই। সবাইকে জিজ্ঞেস করা হবে।"
যখন সবাই মাথা দুলিয়ে দাঁড়ি-কমা সহ মুখস্থ করবে ঠিক তখনই তাজুল স্যার আবার তার ঐতিহাসিক বিরক্তিকর লেকচার শুরু করে দিলেন। ঠিক তখনই ক্লাস শেষ হবার ঘন্টাটা বাজল। স্যার মুখকালো করে ক্লাস থেকে বেড়িয়ে গেলেন, লেকচার দিতে পছন্দ করেন কিনা তাই।
২.
মিতু শিক্ষক মিলনায়তনের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে। তার সামনে তাজুল স্যার একটি আলমারি ঘাঁটাঘাঁটি করছেন। তাজুল স্যার ভুঁড়ির ওপর হাত রেখে ঘুমাচ্ছিলেন, মিতু এসে ঘুমটা দিল ভাঙিয়ে। সোজা হয়ে মিতুকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, "কিরে, কি চাস?"
মিতু ভয়ে ভয়ে বলেছিল, "স্যার, সায়েন্স ফেয়ারে প্রজেক্ট দিতে.........আপনি আসতে বলেছিলেন।"
এরপর থেকেই স্যার কি যেন একটা জিনিস আলমারিতে ঘাঁটছেন। হটাৎ তিনি একটা খাতা বের করে তার উপর লাল কালি দিয়ে শূন্য লিখে দিলেন।
মিতুকে নরম গলায় জিজ্ঞেস করলেন, "এটা কি?"
মিতু তাকাল। মুখে বলল, "স্যার, এটা শূন্য।"
তাজুল স্যার বললনে, "না, না"-মিতুকে আবারো জিজ্ঞেস করলেন, "এটা কিসের খাতা?"
মিতু এবারে ভাল করে তাকাল। অনেক হাবিজাবি অংক করা। একটা অংকও হয়নি। খাতার উপরে মিতু দেখতে পেল, ওর নাম-রোল-ক্লাস লেখা। নিজের অজান্তেই জিভ কাটল মিতু, এটা ওর মিডটার্মের অংক খাতা। শূন্য পেয়েছে সে।
মিতু কেন জিভ কাটল তা তাজুল স্যার বুঝতে পেরেছেন। তাও তিনি বললেন, "এটা তোর অংক খাতা। শূন্য পেয়েছিস তুই। এখনো বলতে চাস সায়েন্স ফেয়ারে তুই প্রজেক্ট জমা দিতে চাস? পড়ালেখার নাম নাই, ইনি নাকি প্রজেক্ট দিবে। যা দূর হো"
কিন্তু মিতু যে দিতে চায়। জোর গলায় বলে উঠল সে, "কিন্তু স্যার এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রজেক্ট, স্যার। ম্যানহোল প্রজেক্টটা সায়েন্স ফেয়ারে দিতে দিন না স্যার।"
তাজুল স্যার ভ্রু কুঁচকে বললেন, "ম্যানহোল প্রজেক্ট?"
মিতু মাথা নেড়ে বলল, "জ্বী স্যার, ম্যানহোল প্রজেক্ট। নাম এখনো ঠিক করিনি, এটা প্রাথমিক নাম আরকি।"
মিতু আবারো মাথা নিচু করে ফেলল। তাজুল স্যার কৌতূহল গলায় বললেন, "দেখি তো, শুনি তোর প্রজেক্টটা কেমন?"
মিতু ছোট্ট একটি নিঃশ্বাস ফেলে বলা শুরু করে দিল, "স্যার, আমাদের স্কুলের বাহিরে অনেকগুলো ম্যানহোল ঢাকনা ছাড়া পড়ে আছে, চুরি হয়ে যায় আরকি। বর্ষাকালে সেইসব ম্যানহোলগুলো থেকে পানি-টানি বের হয়ে একেবারে যাচ্ছেতাই অবস্থার সৃষ্টি করে।"
তাজুল স্যার মিতুকে থামিয়ে বললেন, "আহা, তোর প্রজেক্ট কি সেটা বল।"
মিতু বলল, "জ্বী স্যার, তো, প্রজেক্ট হলো সিকিউরিটি এলার্ম সিস্টেম। এমন একটি পদ্ধতি, ম্যানহোলের ঢাকনা খোলার সাথে সাথেই নিকটস্থ দারোয়ানের ঘরে এলার্ম বেজে উঠবে। এতে আর কোনোদিন ঢাকনা চুরি হবে না। কেউ ম্যানহোলে আর পড়েও যাবে না। কোমলমতি শিশুরাও সহজেই আসতে পারবে। এখন স্যার, যদি একটু সাহায্য করেন......"
তাজুল স্যার ঠান্ডা গলায় বললেন, "তোর গার্ডিয়ানের নাম্বার দে।"
স্যারের কথা শুনেও মিতু জিজ্ঞেস করল, "জ্বী স্যার?"
তাজুল স্যার আবারো বললেন, "তোর গার্ডিয়ানের নাম্বার দে।"
মিনমিনে গলায় মিতু বলল, "ইয়ে-মানে, কেন স্যার?"
তাজুল স্যার এবারে রেগে গিয়ে বললেন, "আমাকে কি তুই তোর ফেসবুক ফ্রেন্ড মনে করেছিস, বেয়াদপ মেয়ে? এতগুলো সিরিয়াস সমস্যা আছে, সেগুলো বাদ দিয়ে তুই কিনা এইসব আলতু-ফালতু জিনিস নিয়ে সায়েন্স ফেয়ারে যাবি? সবাই এখন ভাবে ড্রোন নিয়ে, আর তুই কিনা ভাবছিস ড্রেন-ম্যানহোল নিয়ে? ছিঃ! তাড়াতাড়ি আমাকে তোর গার্ডিয়ানের লিখে দে। তোর মতো বেয়াদপগুলোকে কি করে টাইট করতে হয় তা আমার জানা আছে, যলদি লিখ।"
তাজুল স্যার মিতুকে একটা কাগজ দিলেন। মিতু কাঁপা হাতে মায়ের নম্বরটি লিখল। বেচারি মিতুর মনটাই গেল খারাপ হয়ে। আগেই অবাক লেগেছিল তাজুল স্যারের মতো একজন রাগী স্যার কেন এতো সহজে প্রজেক্ট দেওয়ার কথায় রাজী হয়ে গিয়েছিলেন।
৩.
আজ শুক্রবার। মিতু ঢক ঢক করে দুধের গ্লাসটা শেষ করে যেই না পাউরুটির এক স্লাইস নিতে যাবে অমনি মিতুর মা মিতুকে বললন,"কাল তোমাদের তাজুল স্যার আমাকে কল করেছিলেন। তোমাকে বলতে ভুলেগিয়েছিলাম। তুমি নাকি একটা সিরিয়াস প্রজেক্ট জমা দিচ্ছ, বলেছেন সেটা তাড়াতাড়ি শুরু করে দিতে। উনি কয়েকদিন ছুটি নিয়েছেন, ছুটি শেষ হলেই তোমার প্রজেক্ট দেখবেন।"
মিতু মায়ের কথায় প্রায় চমকে উঠল। এই কয়েকদিন তাজুল স্যারের ধমকের কথা ভুলেও গিয়েছিল সে। মায়ের কথায় ওই ধমকটা মনে পড়ল। হঠাৎ এমন কি হলো যে তাজুল স্যার রাজীও হয়ে গেলেন। মিতু ভাবল কাউকে কল করলে হয়ত জানা যাবে। মাকে বলল সে, "মা, তোমার মোবাইলটা একটু দাও তো।"
মা জিজ্ঞেস করলেন, "কি করবে মোবাইল নিয়ে?"
উত্তরে মিতু বলল, "প্রজেক্ট নিয়ে এক বন্ধুর সাথে কথা বলব।"
মা বললেন, "যা, ড্রইং রুমে আছে।"
মিতু পাউরুটির এক স্লাইস মুখে দিয়ে ড্রইং রুমে গেল। মোবাইলটা নিয়ে ঐশীকে কল দিল সে। ঐশী তাজুল স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়ে, নিশ্চয়ই সে জানবে।
কল ধরেই ওপাশ থেকে ঐশী বলে উঠল, "হ্যালো, মিতু নাকি?"
এপাশে মিতু বলে, "হুম"
এই হয়েছে, এবার এক নাগাড়ে ঐশী কথা বলতে থাকবে। অনেক্ষণ ঐশীর কথা শোনার পর মিতু তাকে থামিয়ে দিল, "আচ্ছা, তাজুল স্যারের কি হয়েছে, জানিস নাকি কিছু? শুনলাম ছুটিও নিয়েছেন।"
ওপাশ থেকে ঐশী অবাক গলায় বলল, "সেকি রে, তুই জানিস না কি তাজুল স্যারের হয়েছে? আরে, স্যার পরশু দিন স্কুলের সামনে পা পিছলে একটি ম্যানহোলে পড়ে গিয়েছিলেন। হি হি হি হি। চিন্তা করে দেখ......"ঐশী কথা বলতেই থাকল।
এদিকে মিতুর আর কথা বলায় মনোযোগ নেই। তার সাধারণ প্রজেক্টটা হঠাৎ কি কারণে "সিরিয়াস" প্রজেক্ট হয়ে উঠেছে তা সে পুরোটাই ভালভাবে বুঝে গিয়েছে।
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে নভেম্বর, ২০১৬ সকাল ১০:১৬
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একটি মেয়ের দৌড়াদৌড়ি ও একটি মায়ের অপেক্ষা

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৮:১৭

একটি মেয়ের দৌড়াদৌড়ি ও একটি মায়ের অপেক্ষা

মঙ্গলবার রাত ১০টা ২৭ মিনিট। গুলশানের একটি হাসপাতালে থেমে গেল ব্যারিস্টার তৌফিক নেওয়াজের হৃদয়- দীর্ঘদিনের অসুস্থতার পর।

আর ঠিক তখন, শহরের অন্য প্রান্তে, মুন্সিগঞ্জ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিকাশ নূরা এবং হিরো আলমকে যারা প্রধানমন্ত্রী ভাবতেন ;)

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ২:৩২



একজন মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি, শিক্ষা-দীক্ষা থাকার চাইতেও জরুরী বিষয় হচ্ছে তার অন্তর্দৃষ্টি থাকা। অন্তর্দৃষ্টি, অন্তরচক্ষু বা জ্ঞানচক্ষু সম্পন্ন একজন ব্যক্তিকে কখনোই ধোঁকা দেওয়া বা ধোঁকায় ফেলানো সম্ভব নয় কারণ এরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাঙ্গালী কেন মুসলমান হতে পারে না?

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৫

অনারব টার্কিশ, কুর্দি আর ইরানিয়ানরা তাদের নিজ নিজ ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষন করে ও তা ধারন করেও তারা মুসলিম, পাকিস্তানের পাঞ্জাবীরাও যখন নিজেদের পাঞ্জাবী জাতি হিসেবে অহংকার করে, তখনও তারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ মোহাম্মদপুরে কখনও বিচ্ছেদ হয় না

লিখেছেন রাজসোহান, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৪





আমার দোকানের নাম নিউ শাপলা কম্পিউটার ও ফটোস্ট্যাট। সাইনবোর্ডের শাপলা ফুলটা এঁকে দিয়েছিলো তাজমহল রোডের এক সাইনম্যান, দেখতে হয়েছিলো কচুরিপানার মতো। চৌদ্দ বছর ধরে ঝুলে আছে। রোদে রঙ উঠে... ...বাকিটুকু পড়ুন

২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা তার সাথে কিছু রুঢ় সত্য যা বদলে দিয়েছিলো দেশের রাজনীতি।

লিখেছেন অন্তর্জাল পরিব্রাজক, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৩৪





২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা সম্পর্কে আমরা সবাই মোটামুটি জানি। এই হামলায় কারা জড়িত ছিল সেটাও আজকের দিনে অজানা নয় একমাত্র নিতান্ত দলকানা ছাড়া। তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×