মূলত আমাদের এই ছোট পরিবারে অসুখের সূত্রপাত ঘটিয়েছেন আমার বাবা। তিনি প্রায়ই আমার অমায়িম মায়ের গায়ে হাত তুলতেন, গালিগালাজ করতেন। অথচ মা এসব অত্যাচার নিশ্চুপ সয়ে যেতেন। আমরা দু ভাইবোন ছোট বেলা থেকেই বাবা মায়ের মধ্যে বিশাল একটা দুরুত্ব দেখে বেড়ে উঠেছি। বাবাকে আমরা যতোটা বন্ধু ভাবতে চেয়েছি তার চেয়ে বেশি রকমের বদ মেজাজি ছিলেন তিনি।তার উদ্ভট শাসন আমাদের কেবলই যন্ত্রণা দিয়েছে।
বাবা চেয়েছিলেন পুত্র সন্তানের পর ঘরে একটি মেয়ে আসবে। তখন আমার বয়স ছিলো চার কি পাঁচ বছর। মায়ের কোল জুড়ে এলো নতুন সন্তান আমার বোন। কিন্তু এতে আমার বাবার আশা মেটেনি। তিনি সন্তানের মুখের ত্রুটি দেখে নিজের মুখ ফিরিয়ে নিলেন। আমার নানা আদর করে নাতনির নাম রেখে দিলেন- আলো।নিজের মেয়েকে অস্বীকার করতে চাইলেন বাবা। কিন্তু শ্বশুর বাড়ির আকুল মিনতি ও লোক নিন্দার ভয়ে বাবা কিছুটা নমনীয় হবার অভিনয় করলেও বিকলাঙ্গ কন্যা সন্তান জন্ম দেয়ার দোষে আমার মাকে তিনি কথায় কথায় তিরস্কার করতেন।অথচ মায়ের নিপুণ দক্ষতা আর অক্লান্ত ঘরোয়া পরিশ্রমে আমরা প্রায়ই অবাক হয়ে যেতাম। আমাদের সকালের নাস্তা থেকে শুরু করে কাথা সেলাইয়ের কাজেও মা ছিলেন পারদশর্ী।
আমার বোন আলোর চাঁদ মুখে রয়েছে একটি কলঙ্ক।তার উপরে ঠোঁটের মাঝখানে কাটা পড়েছে। কাঁটা ঠোঁটের সেই বিকৃত জায়গাটুকু দিয়ে সামনের দুটো দাঁত দেখা যায়।
জন্ম থেকেই এমন দেখে আমার বাবা তার সুচিকিৎসার কোনো পদক্ষেপেই নেননি। আলো এভাবেই পরিবার, সমাজ, বন্ধু মহলে অবহেলিত হয়ে বেড়ে উঠেছে। নাকের নিচের অংশটুকু তাকে সব সময় আলাদা কাপড় দিয়ে জড়িয়ে রাখতে হয়েছে।
2
আমি যখন অনার্স থার্ড ইয়ারে পড়ি ঠিক তখন কলেজের এক অনুষ্ঠানে আমার নাটক করার সুযোগ হয়েছিলো। সেই সুবাদে পরিচয় হয়েছিলো অনার্স ফার্স্ট ইয়ারের এক মেয়ের সঙ্গে। নাম আলপনা। নাটকের মহড়া চলার সময় আমি তার প্রেমে পড়ে যাই। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত আমার ভাবনার পুরোটা জুড়ে থাকতো আলপনা। হৃদয়ের ব্যাকুল কথা গুলো এক সময় তাকে জানাতেই আমার স্বপ্নেছেদ পড়ে। বুকের গভীরে ভীষণ একটা ধাক্কা খাই। এতোটা অহংকারী উন্নাসিক আচরণ তার কাছে কখনোই আশা করিনি। সুন্দরের পুজারী হয়েও সৌন্দর্য আমাকে ধিক্কার জানালো। আমি এতে বিমর্ষ হয়ে পড়ি।
এক ধরনের অপমান বোধ থেকে আমি প্রতিশোধ প্রবণ হয়ে উঠি। বন্ধুদের কুপরামর্শেসিদ্ধান্ত নিই যে, ওই অহংকারী সৌন্দর্যকে আমি এমন ভাবে প্রতিহত করবো যাতে সারাটা জীবন তাকে অন্যের করূণার পাত্রী হয়ে থাকতে হয়।
3
বন্ধুদের সহায়তায় একদিন এসিড ভরা একটি ছোট শিশি জোগাড় করে বাসায় ফিরে আসি। আজীবন বুকের ভেতর পুষে রাখা সৌন্দর্য বোধগুলো একে একে নিষ্ক্রিয় হয়ে যেতে থাকে আমার। আমি নিজের রুমে ঢুকে বিচলিত ভাবে পায়চারী করতে থাকি।
কোথায় লুকিয়ে রাখবো এসিডের বোতল!!
মা হঠাৎ করে আমার ছোট বোন আলোকে নিয়ে আমার ঘরে এলেন। আলোর চোখে মুখে তখন চাপা উচ্ছাসের ছটা। খুশি ভরা গলায় আমাকে জানান, বড় মামা আলোর চিকিৎসার জন্য একজন ডাক্তার পেয়েছেন। আশা করা যাচ্ছে, প্লাস্টিক সার্জারির পর আর দশটা মেয়ের মতো আলোও এবার সমাজে মিলে মিশে থাকতে পারবে।
লজ্জায় কুঁকড়ে যাই আমি। কান্না পায় আমার। মনুষ্যত্বের কাছে ধিক্কৃত হয় আমার প্রতিশোধপ্রবণ পুরুষত্ব!
-গল্পটি যাযাদি ভালোবাসা সংখ্যা 2001- এ প্রকাশিত 'বিপ্রতীপ' ছদ্মনামে।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



