somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ধিক্কৃত !!

০৫ ই এপ্রিল, ২০০৭ ভোর ৬:৫৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমরা দু ভাই বোন। বাবা সরকারি চাকরি করেন, মা গৃহিনী। এমন একটি পরিবারের কথা ভাবলে যে কেউ এক বাক্যে বলে উঠবেন, এতো সুখী পরিবার!! কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্য যে, আমার ভিতর পারিবারিক সুখ বোধটি কখনোই তেমন ভাবে কাজ করেনি। আর দশটা পরিবারের মতো আমার পরিবার কেন সুখী নয়, এ প্রশ্নটি প্রতিনিয়ত আমাকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে।

মূলত আমাদের এই ছোট পরিবারে অসুখের সূত্রপাত ঘটিয়েছেন আমার বাবা। তিনি প্রায়ই আমার অমায়িম মায়ের গায়ে হাত তুলতেন, গালিগালাজ করতেন। অথচ মা এসব অত্যাচার নিশ্চুপ সয়ে যেতেন। আমরা দু ভাইবোন ছোট বেলা থেকেই বাবা মায়ের মধ্যে বিশাল একটা দুরুত্ব দেখে বেড়ে উঠেছি। বাবাকে আমরা যতোটা বন্ধু ভাবতে চেয়েছি তার চেয়ে বেশি রকমের বদ মেজাজি ছিলেন তিনি।তার উদ্ভট শাসন আমাদের কেবলই যন্ত্রণা দিয়েছে।

বাবা চেয়েছিলেন পুত্র সন্তানের পর ঘরে একটি মেয়ে আসবে। তখন আমার বয়স ছিলো চার কি পাঁচ বছর। মায়ের কোল জুড়ে এলো নতুন সন্তান আমার বোন। কিন্তু এতে আমার বাবার আশা মেটেনি। তিনি সন্তানের মুখের ত্রুটি দেখে নিজের মুখ ফিরিয়ে নিলেন। আমার নানা আদর করে নাতনির নাম রেখে দিলেন- আলো।নিজের মেয়েকে অস্বীকার করতে চাইলেন বাবা। কিন্তু শ্বশুর বাড়ির আকুল মিনতি ও লোক নিন্দার ভয়ে বাবা কিছুটা নমনীয় হবার অভিনয় করলেও বিকলাঙ্গ কন্যা সন্তান জন্ম দেয়ার দোষে আমার মাকে তিনি কথায় কথায় তিরস্কার করতেন।অথচ মায়ের নিপুণ দক্ষতা আর অক্লান্ত ঘরোয়া পরিশ্রমে আমরা প্রায়ই অবাক হয়ে যেতাম। আমাদের সকালের নাস্তা থেকে শুরু করে কাথা সেলাইয়ের কাজেও মা ছিলেন পারদশর্ী।

আমার বোন আলোর চাঁদ মুখে রয়েছে একটি কলঙ্ক।তার উপরে ঠোঁটের মাঝখানে কাটা পড়েছে। কাঁটা ঠোঁটের সেই বিকৃত জায়গাটুকু দিয়ে সামনের দুটো দাঁত দেখা যায়।
জন্ম থেকেই এমন দেখে আমার বাবা তার সুচিকিৎসার কোনো পদক্ষেপেই নেননি। আলো এভাবেই পরিবার, সমাজ, বন্ধু মহলে অবহেলিত হয়ে বেড়ে উঠেছে। নাকের নিচের অংশটুকু তাকে সব সময় আলাদা কাপড় দিয়ে জড়িয়ে রাখতে হয়েছে।

2
আমি যখন অনার্স থার্ড ইয়ারে পড়ি ঠিক তখন কলেজের এক অনুষ্ঠানে আমার নাটক করার সুযোগ হয়েছিলো। সেই সুবাদে পরিচয় হয়েছিলো অনার্স ফার্স্ট ইয়ারের এক মেয়ের সঙ্গে। নাম আলপনা। নাটকের মহড়া চলার সময় আমি তার প্রেমে পড়ে যাই। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত আমার ভাবনার পুরোটা জুড়ে থাকতো আলপনা। হৃদয়ের ব্যাকুল কথা গুলো এক সময় তাকে জানাতেই আমার স্বপ্নেছেদ পড়ে। বুকের গভীরে ভীষণ একটা ধাক্কা খাই। এতোটা অহংকারী উন্নাসিক আচরণ তার কাছে কখনোই আশা করিনি। সুন্দরের পুজারী হয়েও সৌন্দর্য আমাকে ধিক্কার জানালো। আমি এতে বিমর্ষ হয়ে পড়ি।

এক ধরনের অপমান বোধ থেকে আমি প্রতিশোধ প্রবণ হয়ে উঠি। বন্ধুদের কুপরামর্শেসিদ্ধান্ত নিই যে, ওই অহংকারী সৌন্দর্যকে আমি এমন ভাবে প্রতিহত করবো যাতে সারাটা জীবন তাকে অন্যের করূণার পাত্রী হয়ে থাকতে হয়।

3
বন্ধুদের সহায়তায় একদিন এসিড ভরা একটি ছোট শিশি জোগাড় করে বাসায় ফিরে আসি। আজীবন বুকের ভেতর পুষে রাখা সৌন্দর্য বোধগুলো একে একে নিষ্ক্রিয় হয়ে যেতে থাকে আমার। আমি নিজের রুমে ঢুকে বিচলিত ভাবে পায়চারী করতে থাকি।
কোথায় লুকিয়ে রাখবো এসিডের বোতল!!

মা হঠাৎ করে আমার ছোট বোন আলোকে নিয়ে আমার ঘরে এলেন। আলোর চোখে মুখে তখন চাপা উচ্ছাসের ছটা। খুশি ভরা গলায় আমাকে জানান, বড় মামা আলোর চিকিৎসার জন্য একজন ডাক্তার পেয়েছেন। আশা করা যাচ্ছে, প্লাস্টিক সার্জারির পর আর দশটা মেয়ের মতো আলোও এবার সমাজে মিলে মিশে থাকতে পারবে।

লজ্জায় কুঁকড়ে যাই আমি। কান্না পায় আমার। মনুষ্যত্বের কাছে ধিক্কৃত হয় আমার প্রতিশোধপ্রবণ পুরুষত্ব!

-গল্পটি যাযাদি ভালোবাসা সংখ্যা 2001- এ প্রকাশিত 'বিপ্রতীপ' ছদ্মনামে।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

গল্পঃ প্রত্যাবর্তন

লিখেছেন ইসিয়াক, ১৮ ই জুন, ২০২৬ ভোর ৬:৪৪


চন্দ্রা পশ্চিমের বারান্দায় উদাস হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।আকাশে ছড়ানো ছেটানো  মেঘ, সেই মেঘের মতই তার মনটা আজ  বিক্ষিপ্ত ।
ইদানীং মা কি সব সন্দেহ করে তাকে।অকারণই মনে হয় তার কাছে। তারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

যুদ্ধে কেউ জয়ী হয়না, যুদ্ধ বন্ধ হলে মানবতার জয় হয়।

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৪৩

যুদ্ধে কে জয়ী হয়েছে?

আমার উত্তর খুব সহজ- কেউ না।
যুদ্ধের প্রকৃত বিজয়ী বলে কেউ থাকে না। যুদ্ধ যখন শুরু হয়, তখন শুধু সৈনিক নয়; মায়ের বুক খালি হয়, শিশুর ভবিষ্যৎ ভেঙে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ষো-ল-ব-ছ-রঃ আর কি বর্ষপূর্তি পোস্ট লেখা হবে?

লিখেছেন আমি তুমি আমরা, ১৮ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:০৬



অবাক হয়েই চেয়ে দেখি
কখন এমন হলো?
এইতো আমার ব্লগবাড়ীটার
বয়স হল ষোল।

দুরুদুরু বুকে তখন
খুলেছিলাম ‘নিক’।
ফেলতে পলক, পেরিয়ে গেল
ষোল বছর ঠিক।

ফেসবুক আর ইউটিউবের
আছড়ে পরে ঢেউ।
সামুপাড়ায় এখন কি আর
উঁকি মারে... ...বাকিটুকু পড়ুন

কটা দুলাল

লিখেছেন শেরজা তপন, ১৮ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪১



বাল্য বন্ধু শফির ফোন পাইলেই টেনশনে থাকি। কোন একটা দুঃসংবাদ নিশ্চিত। আর সেটা যদি হয় সকাল বেলা তবে তো কথাই নেই। যদিও আমাদের মধ্যে আন্তরিকতার ঘাটতি নেই মোটেও তবুও... ...বাকিটুকু পড়ুন

জীবন পর্ব -১

লিখেছেন মায়াস্পর্শ, ১৮ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৫২



(শালবন ভ্রমণ)
২০১২ সাল। সদ্য পাশ করে বের হয়েছি। কঠিন সময় পার করছিলাম। এদিক-সেদিক স্টেজ শো করে যে পেমেন্ট পেতাম, বাড়িতে ফিরতে ফিরতেই প্রায় শেষ হয়ে যেত। সকালে মায়ের হাতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×