কিন্তু খুব কম লোকই জানেন যে, ওয়াশিংটন আরভিং কেবল একজন মহান গল্পকারই ছিলেন না, একজন বিশষ্ট জীবনীকার ও ইতিহাসবেত্তাও ছিলেন। আমেরিকানদের মধ্যে তিনিই প্রথম ইসলামের সত্যিকারের রূপটি আবিষ্কার করতে পেরেছিলেন। ওয়াশিংটন আরভিং রচিত হজরত মুহাম্মদ(সাঃ) এর জীবনী গ্রন্থটি ছিল তার সম্পর্কে আমেরিকায় প্রকাশিত প্রথম দরদি রচনা।
এ কথা সত্য যে, মহান সাহিত্যিক, পন্ডিত, দার্শনিক, কবি ও আধ্যাত্মবাদী র্যালফ ওয়ালডো এমারসন (
Ralph waldo Emerson ) ম্যান দ্য রিপর্মার,(Man The Reformer ) শীর্ষক রচনায় হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) ও খলিফা ওমর (রাঃ) এর প্রশস্তি গেয়েছেন। কিন্তু তার এই প্রশস্তি রচিত হয় ওয়াশিংটন আরভিং কর্তৃক ইসলামের বিস্তৃত গৌরব ও আদর্শকে আবিষ্কার করার বহু বছর পর। ১৮৪০ সালে এডিনবার্গে 'অন হিরোজ' হিরো ওয়ার্শিপ অ্যান্ড দ্য হিরোইকস ইন হিস্ট্রি দ্য হিরো অ্যাজ প্রফেট' ( On Heroes, Hero worship and the Heroics in History The Hero as Prophet ) শিরোনামের বক্তৃতামালায় টমাস কারলাইল ইউরোপে যে বক্তব্য পেশ করেন। তার প্রায় এক দশক আগেই আরভিং তা আমেরিকায় বলেছেন। বস্তুত ওয়াশিংটন আরভিংই প্রথম আমেরিকান, যিনি ইসলামের অন্তর্জগতে প্রবেশ করেছিলেন। এভাবে তিনি যে কেবল ধর্ম ও জাতীয়তাবোধের সঙ্কীর্ণ গন্ডির ঊর্ধ্বে উঠতে পেরেছিলেন তাই নয়, তিনি তার অনুকরণীয় ও অমূল্য সাহিত্যকর্মের মধ্য দিয়ে মুসলিম শাসিত স্পনের তুঙ্গস্পর্শী মহানুভবতা ও মহানবী (সাঃ) এর অতুলনীয় কৃতিত্বের কথাও সাফল্যের সঙ্গে তুলে ধরেছিলেন । প্রখ্যাত গবেষক ও ইতিহাসবেত্তা ডঃ হ্যারল্ড জে গ্রিনবার্গ ( Dr.harold J. Greenburg ) ১৯৫৯ সালে ইংল্যান্ডে ওয়াশিংটন আরভিংয়ের ওপর প্রকাশিত এক প্রবন্ধে মন্তব্য করেন, ক্রিস্টোফার কলম্বাস ১৪৯২ সালে গ্রনাডা থেকে যাত্রা করেন এবং মুসলিম সভ্যতার সম্মিলিত প্রজ্ঞা। এর প্রায় সাড়ে তিনশ বছর পর ওয়াশিংটন আরভিং আইবেরীয় উপদ্বীপে ভ্রমণের সময় সেই গৌরবোজ্জ্বল সংস্কৃতিকে পুনরাবিষ্কার করে পাশ্চাত্যের কাছে উপস্থাপন করেন, ।(Christopher Columbus, departing from Granada in 1492, and employing the principles of navigation developed by muslim scientists, had brought to America the accumulated wisdom of both the Christian and Muslim civilizations. Three and a half centuries later, Washington lrving while wandering through the lberian penisula, was to rediscover this proud culture and present it to America and the West Dr. Harold J.Greenburg. the First American to discover Islam. The Islamic Review, Working, England, April 1959 )
এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, ওয়াশিংটন আরভিং যখন তার লেখনীর মাধ্যমে মুসলিম স্পেনের গৌরবগাথা তুলে ধরেন, আমেরিকা তখনো খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্বের অন্ধ বিশ্বাস থেকে মুক্ত হতে পারেনি। সেই সময় ইসলামকে স্পেনের ইতিহাসে জ্ঞান ও সভ্যতা বিকাশের একটি উপাদান হিসেবে ব্যাখ্যা করা নিঃসন্দেহে একটি দুঃসাহসী এবং প্রায় ধর্মবিরোধী কাজ ছিল।
ওয়াশিংটন আরভিং ১৭৮৩ সালের ৩ এপ্রিল নিউইয়র্কে জন্মগ্রহণ করেন। তখন নিউইয়র্ক ছিল ২৩ হাজার অধিবাসীর একটি ছোট্র শহর। তরুণ ও প্রাণ প্রাচুর্য ভরা আরভিংয়ের কাছে প্রথম জীবনে আমেরিকাই ছিল গোটা পৃথিবী। কিন্তু ইতিহাস পড়তে গিয়ে তিনি অনিবার্যভাবেই পা বাড়ালেন পুরনো পৃথিবীর দিকে। পুরানো পৃথিবীকে চাক্ষুষ দেখার এক উদগ্র বাসনা, তরুন মনে দেশ ভ্রমণের তীব্র আকাঙক্ষা এবং অজানাকে জানর দুর্নিবার অনুসন্ধৎসা তাকে ইউরোপর প্রত্যন্ত এলাকায় টেনে নিয়ে যায়। ১৮০৪ সালে তিনি প্রথম বিদেশ ভ্রমণে যান এবং প্রায় দুই বছর ধরে সমগ্র ইংল্যান্ড ও ইউরোপ মহাদেশের কিংদংশে ঘুরে বেড়ান। তিনি স্বদেশে ফেরে আসেন টিকা টিপ্পনি লেখা রাশি রাশি খাতা ও বিপুল ধ্যান ধারণা নিয়ে। কিন্তু অবাক কান্ড, সাহিত্যকর্মে নিয়োজিত না হয়ে তিনি আইনের পরিমন্ডলে এক অসম্ভব ও নিরস পেশা গ্রহণের চেষ্টা করেন। এতে মনে হয় ইতিহাসবেত্তা যেন আপন ক্ষমতা সম্পর্কে তখনো পুরোপুরি সচেতন হয়ে ওঠেনি।
কিন্তু সাহিত্য জগতের আকর্ষণ ছিল আরো অনেক বেশি জাদুকরী। আর সেই আকর্ষণে ওয়াশিংটন আরভিং শিগগিরই সাংবাদিকতা জগতে প্রবেশ করলেন 'সালমাগুন্ডি' ( salmagundi ) নামে একটি সাময়িকী সম্পাদনার মধ্য দিয়ে। দুই বছর পর তিনি 'নিউইয়র্কের ঘটনাপঞ্জি' (New York's Chronicle ) শিরোনামে ব্যঙ্গরসাত্মক ভাষায় প্রতিভাদীপ্ত ও সত্যাশ্রয়ী একটি সাপ্তাহিক ঘটনাপঞ্জি রচনা করে বিশ্বকে বিস্মত ও মুগ্ধ করলেন।
কিন্তু সাহিত্যের বুনো ঘোড়াকে সাময়িকী সম্পদনার গতানুগতিক লাগামে আটকে রাখা গেল না । তিনি ছিলেন স্বাধীন ইচ্ছায় বিচরণের পক্ষপাতী।তিনি আবার পাড়ি জমালেন ইংল্যান্ডে। সে খানে গোটা দেশটি চষে বেড়ানোর সময় এই তরুন প্রতিভা যে কয়েকটি রচনা উপহার দিলেন, তা তাকে ইংল্যান্ডের পাঠকদের কাছে বিপুলভাবে পরিচিত করে তুলল। তিনিই ছিলেন প্রথম আমেরিকান লেখক যাকে ইংরেজি ভাষী 'মাতৃভূমি' সাদরে বরণ করে। এটি বিশেষ করে এমন এক সময়ে ঘটল, যখন ইংল্যান্ডে প্রচলিত ধারণা ছিল যে কোনো আমেরিকানই শুদ্ধ ইংরেজিতে সাহিত্যকর্ম তো দুরে থাক, চোস্ত ইংরেজি বাক্যালাপ করা বা লেখার কথাও আশা করতে পারেনা ।
১৮২৫ সালে ব্রিটেনবাসীর ভাষায় 'মৃদুভাষী' কৌতুকপ্রিয় ও সংস্কৃতিমনা ( mild,witty and cultured ) এই আমেরিকান আকস্মিকভাবে মাদ্রিদে আমেরিকান লিগেশনে ( American legation ) একটি নি পদে যোগ দেন। চাকরির অবসরে তিনি 'লাইফ অব কলম্বাস ' ( Life of Columbus ) শিরোনামে একটি চমৎকার গ্রন্থ রচনা করতে সমর্থ হন। ১৮২৮ সালে প্রকাশিত এই জীবনী গ্রন্থটি লেখককে স্পেনীয় ইতিহাসের আরো গভীরে টেনে নেয়ে যায়। সে সময় আইবেরিয়ান (Iberian Peninsula ) নেপোলিয়ন যুগের যুদ্ধের ক্ষত থেকে সব সেরে উঠছিল। তখনো এ অঞ্চলটি এমনকি তার পার্শ্ববর্তী দেশ গুলোর কাছেও প্রায় অচেনা ছিল। পিরিনিজ ( Pyrenees ) পর্বতমালা এক দুর্লঙ্ঘ্য প্রাচীর হিসেবে দাঁড়িয়েছিল তাদের মধ্যে। এমনকি অনেক সংস্কৃতিমনা ব্যক্তির মনেও স্পেন সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা বিরাজ করত এবং তারা স্পেনকে ধর্তব্যের মধ্যেই আনতেন না। মুসলিম স্পেনের গৌরবময় ইতিহাস ও ঐতিহ্য ছিল ঘৃণা,অজ্ঞতা ও রহস্যের আবরণে ঢাকা।
একজন প্রতিভাবান গবেষক হিসেবে তিনি বিস্মৃত স্পেনের লুপ্ত গৌরবকে উম্মোচিত করতে চষ্টার কোনো ক্রুটি করেননি। কিন্তু মাদ্রিদে অবস্থানকালে তিনি স্পেনের প্রাচীন ভুবন সম্পর্কে সামান্যই জানতে পেরেছিলেন। আন্দালুসিয়াতেই (Andalusia )দেশটির সোনালি ইতিহাস তার যথার্থরূপে তার সামনে প্রতিভাত হলো ।
আরো আছে........।
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে মে, ২০০৭ দুপুর ১:৫৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




