somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মাধবকুন্ড আর চঞ্চল ভাইয়ের আত্মার আত্মকাহিনী - ৩

০৭ ই মার্চ, ২০১১ দুপুর ১:২৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

খেতে বসে কোন ভাষা খুঁজে পায় না অসিত। অনীতাও চুপচাপ খেয়ে ওঠে। খাবার পর্ব সেরে উঠোনে বসে তারা। অমাবস্যার ঘোর অন্ধকারে মুখোমুখি বসেও যেন কেউ কারো চোখের আলো দেখতে পায় না। ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক আর নিশাচর প্রাণীদের চলাফেরা জীবনের জানান দেয় শুধু। নীরবতা ভেঙ্গে অসিত বলে,‍“তাহলে আমি কেবল একজন ভালো বন্ধু,এর চেয়ে বেশী কিছু না, তাই না অনীতা?” দীর্ঘশ্বাস ফেলে অনীতা উত্তর দেয়,“আমরা একসাথে অনেকটা সময় বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে পার করেছি, অনেকটা সময় আমি তোমাকে দেখার, জানার সুযোগ পেয়েছি। তোমাকে পেয়ে যে কোন মেয়েই সুখের জীবন পাবে। কিন্ত্ত সে জীবন হয়তো কোন শহুরে মেয়ের জীবন, যার বেড়ে ওঠা, স্বপ্ন দেখা – সবই শহরকে ঘিরে। সেখানে আমি এ গ্রামের আলো-বাতাসে মানুষ হয়েছি। সত্যি বলতে কি জানো, শহুরে জীবনে আমি অনেক নূতন নূতন স্বপ্নের হাতছানি পেয়েছি। চাইলে নিজেকে তাতে তৃপ্ত আর অভ্যস্ত করে তুলতে পারতাম। কিন্ত্ত আমার মায়ের চিঠি আর আমার গ্রামের মানুষের কথা সব সময় আমাকে আমার দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দিত।” এ পর্যন্ত বলে থামে অনীতা। তারপর আবার শুরু করে,“আমার গ্রামে তুমি মাত্র দু’দিন হল এসেছো, তাই তোমার চোখে এর সৌন্দর্যই ধরা পড়েছে। এর মাঝে আমরা প্রতিনিয়ত কত যে সমস্যা নিয়ে বেঁচে থাকার সংগ্রাম করে চলেছি, তা জানলে তোমার আর এই ভালো লাগাটা থাকবে না, অসিত। আমরা তোমাদের সাথে, বাঙালীদের সাথে অনেক সমঝোতা...না, যুদ্ধ করেই টিকে আছি। ভূমি আইনের ফেরে পড়ে আমরা আমাদের নিজেদের জায়গাটুকুও ভোগ-দখল করতে পারি না। এ সবুজ বনানী – প্রাণের উৎস, আমাদের জন্য এক চরম ভোগান্তির কারণ। বাঙালীরা প্রায়ই আমাদের গাছ কাটার জন্য উৎসাহ দেয়, হাত লাগাতে বলে। তাতে সায় দেয়নি বলে এ গ্রামের অনেকেই আজ ফেরারী আসামী। জুমের চাষ করে আমরা আমাদের খাবার কষ্ট কিছুটা কমাতে চেষ্টা করি, কিন্ত্ত তার মাঝেও আছে বাঙালীদের ভাগ বসানোর অন্যায় আবদার। জমি, গাছপালা, জুমের ফসল, পানের বরজ – আমাদের বেঁচে থাকাটাই একটা সমস্যা। এজন্যই আমার মা আমাকে শিক্ষিত করে তুলতে চেয়েছেন, যাতে করে আমি আমাদের সমস্যাগুলো ভালোভাবে বুঝতে পারি, আর আমাদের বেঁচে থাকার সংগ্রাম ভালোভাবে চালিয়ে যেতে পারি।”

“রাণী হবার পর এসব সমস্যার মুখোমুখি আমি। এদের নিয়েই আমার প্রতিদিনের জীবন। শহরে মানুষের ঘর-বাড়ী অনেক বড়, তাতে ঘরের সংখ্যা অনেক, সেই সাথে আছে অনেক সমস্যা, অনেক সংকীর্ণতা। সেই তুলনায় আমার গ্রামের মানুষ অনেক সহজ, তাদের একটাই ঘর, একটাই চাল। আর এর মাঝেই রয়েছে তাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার আশা। এ আশায় বুক বেঁধে তারা প্রতিদিন পাহাড়ে পাহাড়ে কাজ করে, পানের চাষ করে, জুমের আবাদ করে। এদের মনের মাঝে সারল্য ছাড়া আর কোন কিছুর স্থান নেই। এই যে দেখছো, উঠোনে যে ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা খেলা করছে, হেসে আর আনন্দ করে পাড়া মাথায় করছে, এদের জন্য আমার স্কুলের ব্যবস্থা করতে হবে। আর স্কুল-কলেজের গন্ডি পেরিয়ে ওরা যখন আমার মতো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে গ্রামে ফিরে আসবে, তখন দেখবে আমাদের এ গ্রামে আর এতো অন্ধকার থাকবে না। আর এতসব কাজ ফেলে আমি যদি তোমার সাথে ঘর বাঁধি, আমার গ্রামের সবার জীবন অন্ধকার আর হতাশার অমানিশায় ঢেকে আমাকে তোমার সাথে শহরে যেতে হবে। হয়তো রাণীর পদটা ততটা মানায় না আমার। কিন্ত্ত আমার পদের চেয়ে আমার কাছে আমার দায়িত্বটা অনেক বড়। আর এ কারণেই আমি আমার নিজের সুখ-শান্তির কথা বড় করে ভাবতে পারছি না। এখন তুমিই আমাকে বলো, এতকিছু ফেলে আমি কিভাবে তোমার হাত ধরি ?”

অসিত মুখ বুজে ঠায় বসে থাকে। অনীতার দায়িত্ব কতটা বড়, তা বোঝার চেষ্টা করে সে। প্রেমিক অসিতের মন ভেবে পায় না, তার মতো ছেলেকে অনীতা কেন গ্রহণ করছে না। তার অশান্ত মন আরো বিচলিত হয়ে ওঠে। দূরে পাহাড়ে জ্বলা জোনাকী পোকাগুলো অমাবস্যার ঘোর আঁধারে যেন বিন্দু বিন্দু আলোর রশ্মি হয়ে তার কাছে ধরা দেয়। তার ভাবনাগুলো অনীতার অন্ধকার মনে ভালোবাসার আলোর বিন্দু হাতড়ে বেড়ায়। (চলবে)
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

নস্টালজিক

লিখেছেন সামিয়া, ১৬ ই মার্চ, ২০২৬ রাত ৩:৩৩



আমার ঘরটা এখন আর আগের মতো লাগে না। দরজার লক নষ্ট, বন্ধ করলেও পুরোপুরি বন্ধ হয় না, আধখোলা হয়ে থাকে। বুকশেলফে ধুলো জমে আছে, ড্রেসিং টেবিলের পর্দাটা এলোমেলোভাবে ঝুলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্বপ্ন যখন মাঝপথে থেমে যায়: ঢাকার জলপথ ও এক থমকে যাওয়া সম্ভাবনার গল্প

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ১৬ ই মার্চ, ২০২৬ সকাল ৮:২৫

ঢাকার যানজট নিয়ে আমরা অভিযোগ করি না এমন দিন বোধহয় ক্যালেন্ডারে খুঁজে পাওয়া যাবে না। অথচ এই যানজট নিরসনের চাবিকাঠি আমাদের হাতের নাগালেই ছিল—আমাদের নদীগুলো। সম্প্রতি বিআইডব্লিউটিএ ঘোষণা করেছে যে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

কেন আমি ইরানের বিরুদ্ধে-২

লিখেছেন অর্ক, ১৬ ই মার্চ, ২০২৬ দুপুর ১:১৪



ইরান বিশ্বসভ্যতার জন্য এক অভিশাপ, এক কলঙ্ক। কাঠমোল্লারা ক্ষমতা পেলে একটি রাষ্ট্রের যে কি পরিণতি হয়, তার জ্বাজ্জল্যমান উদাহরণ ইরান। সম্পূর্ণরূপে অসভ্য বর্বর অসুস্থ রাষ্ট্র গড়ে উঠেছে সেখানে। যেখানে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভাগাভাগি

লিখেছেন সাইফুলসাইফসাই, ১৬ ই মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৩:৩৭

ভাগাভাগি
সাইফুল ইসলাম সাঈফ

এলাকায় এক ইফতার মাহফিল-এ
দাওয়াত পাই আর যথাসময় চলে যাই।
অনেক মানুষ পড়ছে দোয়া দুরুদ
ঘনিয়ে আসছে রোজা ভাঙার সময়।

তখন সবার সামনে বিলিয়ে দিচ্ছে বিরিয়ানি
আমার ভাবনা- হয়ত কেউ ভাবছে
যদি একসাথে খাওয়া... ...বাকিটুকু পড়ুন

২০২৩ এ ওয়াকআউট করেছিলেন, ২০২৬ এ তিনিই ঢাবির ভিসি ।

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৬ ই মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২২


২০২৩ সাল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সভা চলছে। একজন শিক্ষক দাঁড়িয়ে বললেন, হলগুলোতে ছাত্রলীগের গেস্টরুম নির্যাতন বন্ধ করতে হবে। কথাটা শেষ হতে না হতেই তৎকালীন ভিসি জবাব দিলেন, "গেস্টরুম কালচার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×