somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মাধবকুন্ড আর চঞ্চল ভাইয়ের আত্মার আত্মকাহিনী - শেষ পর্ব

০৮ ই মার্চ, ২০১১ রাত ৮:১২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

নীরবতা ভেঙ্গে অনীতা বলে,“অসিত, আমার মনে হয় তুমি আমার অবস্থানটা বুঝতে পেরেছো। অযথা আর এটা নিয়ে না ভেবে তুমি নুতন করে পছন্দের কাউকে খুঁজে নাও। তোমার কি নন্দিতার কথা মনে আছে? আমরা হলে একসাথে থাকতাম। তুমি বেশ ভালো করেই ওকে চেনো। জানো, ও না তোমাকে অনেক পছন্দ করত, আর আমি যতটুকু জানি, এখনও করে। বেচারী সাহস করে কখনোই তোমাকে বলতে পারেনি। আমি তোমাকে ওর বাসার ঠিকানা দিচ্ছি, এবার যেয়ে ওর সাথে দেখা কর।” অনীতার ভালোবাসায় অন্ধ অসিতের বুকে এসব কথা যেন শেলের মতো বেঁধে। সে ভেবেই পায় না, কেন তাকে এভাবে ফেরাতে চায় অনীতা, তাও আবার নন্দিতার কথা বলে। মনটা পুরোই দমে যায় তার। তারপর মন শক্ত করে ভাবে, শেষবারের মতো অনীতার সাথে এ ব্যাপারে কথা বলবে সে, পরদিন সকালে। অনীতার মনের কথা যে কি, আরো কি লুকিয়ে আছে সেখানে, পুরোপুরি জানতে চায় সে। তার দৃঢ় বিশ্বাস, অন্য কাউকে ভালোবাসে অনীতা। এভাবেই চিন্তার সুতোয় জাল বুনতে বুনতে বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে একসময় ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে যায় সে।

রাতটা খুব একটা ভালো যায় না অসিতের। নানান দুঃস্বপ্নের ভীড়ে বার বার ভোরের স্বপ্নের কথাটাই ঘুরে ফিরে মনের মাঝে এসে তাকে বিচলিত করে তোলে। স্বপ্নে সে দেখতে পায়, এক বিশাল আগুনের কুন্ড জ্বলছে, যেন বিশাল যজ্ঞ করছেন কোন এক নাম-না-জানা মুনি। কিন্ত্ত সে দেখে, অনীতা সে আগুনের কুন্ডে লাফিয়ে পড়ছে, আর বলছে,“তোমাকে বিয়ে না করে তোমার মনে অনেক কষ্ট দিচ্ছি, আর আমার দায়িত্বকেও এড়িয়ে যেতে পারছি না, আমার মরণই ভালো। অসিইইইইইইত...”স্বপ্নে অনীতার আর্ত চিৎকারে ঘুম ভেঙ্গে যায় তার। উঠে হাতে মুখে পানির ঝাপটা দেয় সে, কিন্ত্ত তাতেও অস্বস্তি যাচ্ছে না দেখে ছড়ার পানিতে গোসল সেরে নেয়। তারপর আনমনে হাটতে হাটতে গ্রামের সীমানা ছাড়িয়ে মাধবকুন্ডের কোল ঘেঁষা পাহাড় বেয়ে ওপরে উঠে যায়। ঘুরে ফিরে তার শুধুই মনে পড়ে যায় বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের কথা। অনীতার কথা। কতবার বন্ধুরা বলেছে, “এতোই যদি পছন্দ করিস, তবে বলছিস না কেন ওকে!” কিন্ত্ত অসিত তখন কেবল পড়াশোনাতেই মন ডুবিয়ে রেখেছিল, অন্য কোন কিছুর দিকে মন দেবার অবসর তখন তার ছিল না। কিভাবে বুঝিয়ে বললে যে অনীতা রাজি হবে! সে চিন্তার মহাসাগরেই হাবুডুবু খায় তার মন। ভাবতে ভাবতে কখন যে সে ঠিক জলপ্রপাতের ওপরে পৌঁছে যায়, টেরই পায় না। ঐ তো অনীতা! ঐ তো আসছে তার অনীতা! পৃথিবীর কোন কিছুই তাকে তার অনীতার কাছ থেকে আর দূরে সরিয়ে রাখতে পারবে না। প্রয়োজনে সেই থেকে যাবে তার অনীতার কাছে, ব্যাংক-সংসার-মা-বাবা সব কিছু পেছনে ফেলে। পাহাড়ের ওপর থেকে নীচে সশব্দে পানির আছড়ে পড়ায় আর কোন কিছুই কানে আসে না অসিতের। নীচ থেকে অনীতা চিৎকার করে বলে,“আর এগিয়ে যেয়ো না অসিত, তোমার সামনে দেখো। তুমি নীচে পড়ে যাবে! অসিইইইইত!”

কিন্ত্ত তখন আর সামনে দেখে না অসিত। তার মন জুড়ে তখন শুধুই অনীতা, অনীতার কথা, অনীতার হাসি। নীচে পানির আছড়ে পড়ার শব্দ, আর বাষ্পের ধোঁয়াটে উপস্থিতি যেন এক স্বর্গীয় আবহ তৈরী করে তার মনে। আর এর মাঝে সেখানে অনীতাকে দেখে কোন দেবী বলে ভুল হয় তার। কোনভাবেই আর হারানো যাবে না অনীতাকে। এগিয়ে যায় সে, অনীতাকে একটু ছোঁবে বলে। কিন্ত্ত পাহাড়ের ওপর দলিয়ে থাকা কাদার ওপর পা দেয় অসিত, আর কিছু বুঝে ওঠার আগেই পিছলে যায় তার পা। পাহাড়ের ওপর থেকে নীচে পড়তে পড়তে শুধু শুনতে পায় অনীতার আর্ত চিৎকার,“অসিইইইইইইইইইত...”অসিতের নিথর শরীর পানি থেকে উঠিয়ে আনা হয়। ডাক্তার, হাসপাতাল – কোথাও কেউ তার নিঃষ্প্রাণ দেহে প্রাণের সঞ্ছার করতে পারে না।

এ পর্যন্ত বলে চঞ্ছল ভাই চুপ করে থাকেন। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন,“আমি যখন প্রথম এখানে এলাম, তখন থেকেই দেখছি অসিত বরণ পাল বলে এক লোকের পিন্ডদানের জায়গা রয়েছে মাধবকুন্ড ঝর্ণার উল্টো দিকে। আর প্রতি সন্ধ্যায় দেখতাম এক বুড়ি এসে এ পিন্ডদানের জায়গায় মোমবাতি জ্বালাতো।” আমি এগিয়ে গেলাম অসিতের কবরের দিকে। যদিও বা তার শরীরের কোন অংশ সেখানে নেই, তবু তার আত্মার প্রতি শ্রদ্ধায় আমার মাথা নুয়ে এলো। সেদিন সন্ধ্যায় আমরা নুতন করে মোমের আলোয় আলোকিত করেছিলাম তার ভালোবাসার অধিষ্ঠান। আর অনীতার কথা...না, তার কথা আর জানা হয়নি চঞ্ছল ভাইয়ের কাছে।
১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

নস্টালজিক

লিখেছেন সামিয়া, ১৬ ই মার্চ, ২০২৬ রাত ৩:৩৩



আমার ঘরটা এখন আর আগের মতো লাগে না। দরজার লক নষ্ট, বন্ধ করলেও পুরোপুরি বন্ধ হয় না, আধখোলা হয়ে থাকে। বুকশেলফে ধুলো জমে আছে, ড্রেসিং টেবিলের পর্দাটা এলোমেলোভাবে ঝুলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্বপ্ন যখন মাঝপথে থেমে যায়: ঢাকার জলপথ ও এক থমকে যাওয়া সম্ভাবনার গল্প

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ১৬ ই মার্চ, ২০২৬ সকাল ৮:২৫

ঢাকার যানজট নিয়ে আমরা অভিযোগ করি না এমন দিন বোধহয় ক্যালেন্ডারে খুঁজে পাওয়া যাবে না। অথচ এই যানজট নিরসনের চাবিকাঠি আমাদের হাতের নাগালেই ছিল—আমাদের নদীগুলো। সম্প্রতি বিআইডব্লিউটিএ ঘোষণা করেছে যে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

কেন আমি ইরানের বিরুদ্ধে-২

লিখেছেন অর্ক, ১৬ ই মার্চ, ২০২৬ দুপুর ১:১৪



ইরান বিশ্বসভ্যতার জন্য এক অভিশাপ, এক কলঙ্ক। কাঠমোল্লারা ক্ষমতা পেলে একটি রাষ্ট্রের যে কি পরিণতি হয়, তার জ্বাজ্জল্যমান উদাহরণ ইরান। সম্পূর্ণরূপে অসভ্য বর্বর অসুস্থ রাষ্ট্র গড়ে উঠেছে সেখানে। যেখানে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভাগাভাগি

লিখেছেন সাইফুলসাইফসাই, ১৬ ই মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৩:৩৭

ভাগাভাগি
সাইফুল ইসলাম সাঈফ

এলাকায় এক ইফতার মাহফিল-এ
দাওয়াত পাই আর যথাসময় চলে যাই।
অনেক মানুষ পড়ছে দোয়া দুরুদ
ঘনিয়ে আসছে রোজা ভাঙার সময়।

তখন সবার সামনে বিলিয়ে দিচ্ছে বিরিয়ানি
আমার ভাবনা- হয়ত কেউ ভাবছে
যদি একসাথে খাওয়া... ...বাকিটুকু পড়ুন

২০২৩ এ ওয়াকআউট করেছিলেন, ২০২৬ এ তিনিই ঢাবির ভিসি ।

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৬ ই মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২২


২০২৩ সাল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সভা চলছে। একজন শিক্ষক দাঁড়িয়ে বললেন, হলগুলোতে ছাত্রলীগের গেস্টরুম নির্যাতন বন্ধ করতে হবে। কথাটা শেষ হতে না হতেই তৎকালীন ভিসি জবাব দিলেন, "গেস্টরুম কালচার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×