বাংলাদেশে ইদানিং কালে নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়ে গিয়েছে নাকি গণমাধ্যম আগের চেয়ে অধিক সচেতন- এই নিয়ে গতকাল এফ এম 89.2 তে অভিমত জানতে চেয়েছিলো। ইদানিংকার ফেইসবুক আর ব্লগের মতই সেই ক্ষুদে বার্তার অভিমত রূপ নিয়েছিলো- পর্দা প্রথা, নারীর পোষাকের সাথে নারীর স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ- এই দুইয়ের হিন্দি সিরিয়ালী রূপ।
রক্ষণশীলতার ধ্বজাধারী গোষ্ঠীর একমাত্র বা কদাচিত অন্য কিছু কারণ সহ মূল অভিমত-বেপর্দা নারীরাই ধর্ষণের শিকার হয় আর পর্দাই পারে পদ্মাপাড়ে পুকুরপাড়ে নদীর পাড়ে নারীর ধর্ষণ রোধ করতে। ব্যাপারটা আমার কাছে “ধর্মীয় অনুশাসনই এইডস প্রতিরোধের একমাত্র উপায়” এর মত ঠেকে। বস্তুত ধর্মীয় অনুশাসন না মেনেও যেমন লক্ষ নিযুত মানুষ এইডসে আক্রান্ত না হয়ে ভবলীলা সাঙ্গ করেছে তেমনি ধর্মীয় অনুশাসন মেনেও দূষিত রক্ত বা অসচেতনতা বা দূর্ঘটনার কারণে যে কেউ এইডসে আক্রান্ত হতে পারে।
ওড়নার প্রসঙ্গে একটু বলা যাক। বাংলাদেশে চাকমা, মারমা বা অন্যান্য আদিবাসী মেয়েরা ওড়না পরে না, থামির সাথে ওড়না পড়া আদি আদিবাসী সংস্কৃতিতে নেই। রক্ষনশীলতার সূত্রমতে তাহলে আদিবাসী নারীদের সবারই ইতোমধ্যে একবার করে ধর্ষিত হয়ে যাবার কথা। পার্বত্য এলাকার আরো ভিতরে যান। কয়েকটা আদিবাসী জাতির মেয়েরা শরীরের উর্ধাংশে কাপড়ই পরে না, সূত্রমতে তাদের প্রত্যেককে সহস্রবার ধর্ষিত হবার কথা। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ধর্ষিত হয় বেশিরভাগ গার্মেন্টসে কর্মরত মেয়েরা ( পত্রিকার খবরে বেশিরভাগ ভিকটিম হিশেবে এদেরকে দেখা যায়)- যাদের বেশিরভাগই সচারচর সেলোয়াড় কামিজই পড়ে। আমার মতে একটা নিজস্ব ঐতিহ্যের পোষাক কখনই ধর্ষনের নিয়ামক হতে পারে না। মুগদাপাড়ায় থাকতে প্রতিদিন অজস্র মেয়েকে দেখতাম গার্মেন্টসে যেতে, যাদের হয়ত দু একজনকে আধুনিক পোষাক পরতে দেখতাম। সময়টা ২০১০ হলেও ২০১৩তে এসে নিশ্চয় দ্রব্যমূল্যের মত পোশাক আশাক চেঞ্জ করে ফেলেনি মেয়েরা । আর সমাজের যে শ্রেনীতে পাশ্চাত্যের জামা কাপড় বেশি দেখা যায় তাদের কয়জন ধর্ষণের শিকার হয়? আর তাই মনে করি ধর্ষনের ক্ষেত্রে কাপড়ের ভূমিকা আসলেই নগণ্য, নিরাপত্তা তার চেয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে আমার মনে হয়।
সূর্যের তাপমাত্রা বেশি কিন্তু কত বেশি সেটা যেমন অনুভব করা যায় না, তেমনি একজন খুনি বা ধর্ষক নিশংস কিন্তু কতটা সেটাও খুব সহজেই বলা যায় না। পেশাদার খুনির মানসিকতা আসলে কেমন, তারা আসলে কি ভাবে সেটা নিশ্চয় এক কথায় বলে দেয়া যায় না। ঠিক তেমনি এক কথায় বলে দেয়া যাবে না একজন পুরুষ হঠাত কেন পুরুষ পশুতে পরিণত হয়। আইনের কড়াকড়ি আর বিচার আসলেই কি পারবে নারীকে ধর্ষনের হাত থেকে রক্ষা করতে ? একজন ধর্ষক কি ধর্ষনের সময় বিচারের কথা ভাবে ? আইন পারবে ধর্ষকের বিচার করতে, ধর্ষনের হাত থেকে নারীদের বাচাতে আরো গভীর ভাবনার অবকাশ আছে।
২০০৯ সালে মানবাধিকারের উপর ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে
ডিপ্লোমা করার সময় দেখেছি বিভিন্ন গবেষক, এনজিও যৌনকর্মী, সমকামী, হিজড়া – এইসব হট টপিক্সের উপর বই প্রকাশ করে থাকে। কেন ধর্ষন হয় তার উপর বই হয়তো আছে, কিন্তু আমার চোখে এখন পর্যন্ত একটাও পড়েনি। আমি মনে করি মনোবিজ্ঞানী আর সমাজবিজ্ঞানীদের এই ক্ষেত্রে ব্যাপক গবেষনা করা দরকার। বাংলাদেশে বিবিএর স্টুডেন্টের থেকে সমাজ বিজ্ঞানের স্টুডেন্ট কম হবার কথা নয়। সরকার এইসব নিয়ে কখনো ভাবে না, সবসময় থাকে ঠেকনা দেবার প্রবণতা, দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের উপায় খোঁজার জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে পড়াশুনা করা মানুষদের এগিয়ে আশা উচিত। সে ক্ষেত্রে সমাধান না পাওয়া যাক, একটা গাইডলাইন পাওয়া যেতে পারে। ধর্ষনের কারণ খুঁজতে হবে ধর্ষকদের পয়েন্ট অব ভিউ থেকে, স্বাভাবিক মানুষদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে না। হয়তো তাতেই নারী ধর্ষন আর শিশু ধর্ষনের ( শিশু ধর্ষনের কারন কি, রক্ষনশীল গোষ্ঠী?) কারণ কি তা আসলেই জানা যাবে।
(এটা আমি ৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ লিখেছিলাম ৬ ফেররুয়ারির একটা এফ এম রেডিওর অনুষ্ঠানের পরিপ্রেক্ষিতে।)
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই এপ্রিল, ২০১৩ ভোর ৪:৩৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



