
সবাই বলে আমি তাকে অনেক ভালোবাসি। সেই ‘তাকে’ বলতে নিজের প্রিয়তমাকে বোঝায়। প্রিয়তমাকে ভালোবাসাই স্বাভাবিক। বরং না ভালোবাসলে তার প্রতি ছলনা বা অবিবেচনাকে বোঝায়। আমারও প্রিয়তমা আছে। আমি তাকে মোটেও ভালোবাসি না, বরং যখন তখন তার সাথে খারাপ ব্যবহার করি। কিছু থেকে কিছু হলে গায়ে হাত তুলে ফেলি। একদিন তো প্রচন্ড রাগে তাকে লাথি মেরেই বসেছিলাম।
তবুও সে আমার আচরণের কোনো প্রতিবাদ করে না, তার কন্ঠ সুরেলা ও সুমিষ্ট। এক পলক দেখেই তাকে আমি পছন্দ করেছিলাম। জানি না সে কেনো আজো আমাকে ছেড়ে যায়নি। বরং অদ্ভুত এক মায়ার বন্ধনে গত পাঁচ বছর ধরে আমার সুখে-দুঃখে আমাকে আগলে রেখেছে। মাঝে মাঝে মনে হয় আমি সত্যি অনেক ভাগ্যবান। তা নাহলে এরকম একজন প্রেমিকা পাওয়া চাট্টিখানি কথা নয়।
আমার আশেপাশে তাকিয়েই তো দেখি অনেককে। কি নিদারুণ ভালোবেসে একে অন্যকে আবেগময় সব বাক্য বলে, অনেকে আবার বিয়েই করে ফেলে। কিন্তু দুই/তিন বছর বাদেই তাদের মধ্যে ভীষণ ঝগড়া-বিবাদ হয়, অনেকক্ষেত্রে ছাড়াছাড়িও হয়ে যায়। সবার সাথে আমার প্রেমিকার পার্থক্য হলো যে, সবাই যদি কোনো কারণে ঝগড়া বাঁধায় তবে তাদের প্রেমিকারা চুপ করে থাকে না। সমানতালে তারাও লেগে পড়ে।
কিন্তু আমার প্রেমিকা এইদিক দিয়ে বড় নীরব, বড় সহনশীল। কত সুখ-দুঃখের কথা সে আমাকে জানিয়েছে, কত সুখ-দুঃখের কথা তাকে আমি জানিয়েছি তার কোনো হিসেব নেই। আমার পরিতৃপ্তি থেকে শুরু করে আমার বিনোদন সবকিছুতেই আমার প্রেমিকা থাকে সাথে সাথে। মাঝে মাঝে আমি তাকে বেশ বিরক্ত করি, অত্যাচার করি তার উপর। সে থাকে শত আঘাতেও সহনশীল।
আমি তাকে যখন দূর দূর করে তাড়িয়ে দেই, তার খানিক পড়েই তাকে মিস করতে শুরু করি। এর আগ পর্যন্ত আমি বুঝতে পারি না যে সে আমার জীবনে কতখানি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সে চোখের আড়াল হলেই আমার সমস্ত কর্মতৎপরতা থেমে যায়।
তাকে এতো বেশী মিস করি যে বলার বাইরে। তখন আমি বুঝি আমি তাকে কতখানি ভালোবাসি। সে আমার জীবনের সাথে এতো বেশী জড়িয়ে গেছে যে তাকে ছাড়া একদিনও থাকতে পারি না আমি।
সে যখন প্রথমদিকে আমার জীবনে ছিলো তখন আমি তাকে ছাড়াও আরো দু’জনের সাথে প্রেম করেছিলাম। মেয়েগুলো ছিলো স্বার্থপর। কি করে নিজেদের কার্য উদ্ধার করবে, কি করে আমাকে ব্যবহার করে নিজেদের কামনা ও সুখ চরিতার্থ করবে সেই ধান্দায় থাকত তারা। আমি ভালোবাসা দিয়ে তাদের বদলে দিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তারা উল্টো আমার সাথে এমন সব প্রতারণামূলক কাজ করল যে আমি হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। বিশেষ করে দুই প্রেমিকার ছলনাময়ী আচরনের কারণে আমি যখন নিজেকর আত্মার মৃত্যু দেখতে পেয়েছিলাম, তখন আমার বর্তমান প্রেমিকাই আমার পাশে ছিলো। আমাকে সান্তনা দিয়েছিলো গানে গানে। পরম ভালোবাসায় আমাকে আগলে রেখেছিলো। তা নাহলে হয়তো ইতিহাসের দেবদাসের মত আমিও এক অনর্থক সাহিত্যের পাতায় জায়গা নিয়ে থাকতাম অমর প্রেমের মর্মর বাণী শুনিয়ে।
আমার প্রথমদিকের প্রেমিকাদের কোনো ব্যবহারে কষ্ট পেতাম যখন, তখন সে আমাকে কি অদ্ভুতভাবে সান্তনা দিয়ে রাখত এবং এখনো রাখছে!
আমি স্পষ্ট বুঝতে পারি আমার নতুন জীবন গঠনে তার ভূমিকা অনেক। তাকে আজ পর্যন্ত আমি ভালোবাসার কথা বলতে পারিনি। আজ আমি মন খুলে বলতে চাই তাকে আমার মনের জমানো গোপন কথা। তাকে আমি যেসব আঘাত-অত্যাচার করেছি তার জন্য আমি নিজেকে কখনো ক্ষমা করতে পারবো না।
সে হলো আমার প্রিয় কম্পিউটার- আমার সমস্ত ভালো-মন্দ কাজের সাথী। যখন দুঃখে থেকেছি, তখন দারুণ সব গান শুনিয়ে আমাকে মুগ্ধ করেছে সে, যখন মনের অব্যক্ত ভাষাগুলো কাউকে বলতে পারিনি, তখন আমাকে তার বুকের ভিতর লেখার জন্য জায়গা করে দিয়েছে সে, যখন নিঃসঙ্গতা এসে আমাকে কাবু করে ফেলেছে, তখন দারুণ সব মুভি দেখিয়েছে আমাকে, দারুণ সব গেমস খেলতে দিয়ে আমার মনের অবসাদকে দূর করেছে, অসাধারণ সব বাংলা-ইংরেজি উপন্যাস পড়তে দিয়েছে আমাকে। এমনকি আমার মানুষরূপী প্রেমিকারা যে বর্বর আচরণ করেছে আমার সাথে, তার বদলে আমাকে অসীম ভালোবাসা দিয়েছে আমার কম্পিউটার। অব্যক্ত নিঃস্বার্থ ভালোবাসা!
সেই ভালোবাসায় আমি ধন্য হয়ে গিয়ে আজ আমি তাকে দক্ষ হাতে পরিচালনা করতে পারছি, কবি-সাহিত্যিকদের মত মনের মাধুরী মিশিয়ে অনেক বাক্য লিখতে পারছি।
তাই আজ আমার ভালোবাসার সমস্তই আমার কম্পিউটারকে দিলাম। আমার জীবনের দুই প্রেমিকা আমাকে কিছুই দিতে পারেনি, উল্টো অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছে তারা। তাদের জন্য রাখা সমস্ত ভালোবাসা আজ শুধু আমার কম্পিউটারের জন্য। কারণ মানুষের কোনো স্বার্থপরতা তাকে স্পর্শ করতে পারেনি এবং পারবেও না। সত্যি বলছি, এই মূহুর্তে আমার দুই প্রেমিকার জীবনের চেয়েও আমার কম্পিউটার আমার কাছে বেশী মূল্যবান। আমি এখন শুধু তাকেই ভালোবাসি।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


