কম্পিউটারে বাংলা লেখা
কম্পিউটারে বাংলার আনুষ্ঠানিক প্রবেশ ঘটে 1986 সালে শহীদ লিপি'র মাধ্যমে। এটির উদ্ভাবক ড. সাইফ উদ দোহা শহীদ। সেসময় মেকিন্টোশ কম্পিউটারে বাংলা ব্যবহারের জন্য এই সফটওয়্যারটি তৈরি করা হয়েছিলো। তবে বেশি দুর আগায়নি শহীদ লিপি। তার জায়গায় স্থান নিতে থাকে বিজয়। বাংলা কম্পিউটিংয়ের অন্যতম পুরোধা, বিজয়ের উদ্ভাবক মোসত্দফা জব্বার ডিজিটাল বাংলার সুচনা প্রসঙ্গে বলেন: কম্পিউটারে মাধ্যমে বাংলা ব্যবহারের শুরম্ন হয় 1987 সালে 16 মে সাপ্তাহিক আনন্দপত্র প্রকাশের মাধ্যমে। সেসময় মাইনুল লিপি ও কলকাতার একটি প্রতিষ্ঠানের তৈরি বঙ্কিম ফন্ট দিয়ে তৈরি হয় আনন্দপত্র। পরবতর্ীতে 1988 সালের 16 ডিসেম্বর সৃষ্টি হয় বিজয় বাংলা সফটওয়্যার। সেসময় আমি বিজয় কিবোর্ড এবং তন্বী সুনন্দা ফন্ট প্রকাশ করি। তিনি জানান, ওই সময় ডস অপারেটিং সিস্টেমের জন্যও তৈরি হয় বেশ কিছু বাংলা সফটওয়্যার। এগুলোর মধ্যে ছিলো দোয়ান জান, আবহ, বর্ন ইত্যাদি। 1993 সালের আগ পর্যনত্দ মেকিন্টোশ ও ডসের জন্য আলাদা আলাদা বাংলা সফটওয়্যার নিয়ে কাজ চলতে থাকে। 1993 সালের 26 মার্চ পিসি তথা উইন্ডোজের জন্য বিজয় বাংলা সফটওয়্যার তৈরি করা হয়। সেসময় একমাত্র বিজয়ই মেকিন্টোস ও উইন্ডোজে সমানভাবে কাজ করতো। 1988 সাল থেকে আজ পর্যনত্দ বিভিন্ন সময়ে উন্নয়ন সাধন করা হয়েছে বিজয়ের। বর্তমান বাজারে বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবহারকারীর জন্য বিজয় 2000, বিজয় 2003, বিজয় ক্লাসিক প্রো এবং বিজয় একুশে চালু রয়েছে।
বর্ণ: 1992 সালে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের দুই ছেলে অংক ও সোহেল বর্ণ সফটওয়্যারটি তৈরি করেন। তাদের প্রতিষ্ঠানটি ছিল সেইফওয়ার্ক্স। তাদের এই স্বয়ং সম্পূর্ণ ওয়ার্ড প্রসেসরটি ছিল সম্পূর্ণ ডস ভিত্তিক। সেই সময় এই ওয়ার্ড প্রসেসরটি বাংলাদেশে অনেক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। তবে পরবতর্ীতে বর্ণ সফটওয়্যারটির আর কোন আপডেট বের হয়নি।
প্রশিকাশব্দ: প্রশিকাশব্দ একটি উইন্ডোজ ভিত্তিক বাংলা সফটওয়্যার। এটি শুধু উইন্ডোজ 95, 98, এনটি এবং 2000 সংস্করণে চলে। এর নির্মাতা হচ্ছে প্রশিকা কম্পিউটার সিস্টেম্স। সফটওয়্যারের সাথে অনেকগুলো আসকি বাংলা ফন্ট পাওয়া যায়।
অৰর বাংলা: সফটওয়্যারটির জন্ম 2003 সালে। সেসময় 18 বছরের কিশোর খান মোহাম্মদ আনোয়ারম্নস সালাম সফটওয়্যারটি তৈরি করেন। ডিজিটাল বাংলা প্রসঙ্গে তিনি জানান, বাংলা কম্পিউটিং এর ৰেত্রে বিভিন্ন অসুবিধা দুর করার জন্য অৰর সফটওয়্যারটি তৈরি হয়েছে। অৰর বাংলা একটি সম্পূর্ণ প্যাকেজ। এর মধ্যে রয়েছে বাংলা ওয়ার্ড প্রসেসর, অনুবাদ, অৰর চিঠি, কি-বোর্ড ম্যানেজার, কনভার্টার, ক্যালেন্ডার, বাংলা টাইপ টিউটর, অভিধান ইত্যাদি। িি.িধশংযড়ৎনধহমষধ.পড়স সাইট থেকে যে কেউ সম্পূর্ণ সফ্টওয়্যারটি ডাউনলোড করতে পারবেন।
লেখনী: সফটওয়্যারটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান কম্পিউটার ভিলেজ। এটি উইন্ডোজ ভিত্তিক সফটওয়্যার। এর সাথে একটি টেক্সট কনভার্টার রয়েছে, যার মাধ্যমে অন্য সফটওয়্যার দিয়ে তৈরি করা ডকুমেন্ট লেখনীর ফন্টে পরিবর্তন করা যাবে।
প্রবর্তন: বর্তমানে প্রবর্তনের ব্যবহারকারীর সংখ্যা খুব বেশি নয়। এর নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হচ্ছে কম্পিউটার সার্ভিসেস। এর মাধ্যমে বেশ কয়েকটি কি বোর্ড লেআউট ব্যবহার করা যায়। বংশী: এই সফটওয়্যারটির মাধ্যমে ফোনেটিকালি বাংলা লেখা যায়।
একুশে ওয়ার্ড: এই সফটওয়্যারটির মাধ্যমে শুধু মাইক্রোসফট ওয়ার্ডে বাংলা লেখা যায়। সফটওয়্যারটির নির্মাতা রবিন উপটন। সফটওয়্যারটি যে কেউ িি.িশঁংযবু.ড়ৎম থেকে ডাউনলোড করে নিতে পারবেন। আল্পনা: সফটওয়্যাটির দুটি ভার্সন আল্পনা প্রফেশনাল এবং আল্পনা এক্সপি। এর ডেভেলপার মোঃ সামসুদ্দোহা রনজু।
বাংলা 2000: এর মাধ্যমে ফোনেটিকালি বাংলা লেখা যায়। এর প্রোগ্রামার হচ্ছে আমিরম্নল ইসলাম মানিক এবং ডিজাইন করেছেন আবদুস শাকিল। বাংলা ওয়ার্ড: সফটওয়্যারটির মাধ্যমে ফোনেটিক কীবোর্ড দিয়ে বাংলা লেখা যায়। আর যুক্তাৰর তৈরীর জন্য এফ1 এবং যুক্তাৰর ভাঙ্গার জন্য এফ2 চাপতে হবে। ব্যক্তিগত ব্যবহারকারীদের জন্য এটি ফ্রী।
বাংলা টাইপার: এই সফটওয়্যারটির মাধ্যমে মাউস ক্লিক করে বাংলা লেখা যায়।
একনজরে এগুলোই বাংলা সফটওয়্যার। তবে এগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। যেকারনে এক সফটওয়্যারের ফন্টে টাইপ করা ডকুমেন্ট অন্য সফটওয়্যারের ফন্টে কাজ করেনা। ইউনিকোড সমর্থিত ফন্ট ব্যবহার করে এ ধরনের সমস্যা দুর করা সম্ভব বলে জানিয়েছেন এ সংশিস্নষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
মোবাইলে বাংলা
সম্প্রতি বাংলাদেশে শুরম্ন হয়েছে মোবাইলে বাংলা ব্যবহার। বর্তমানে প্রায় সব মোবাইল ফোনের নিজস্ব অপারেটিং সিস্টেম রয়েছে। জাভা এমআইডিপি 2.0 অপারেটিং সিস্টেমযুক্ত মোবাইল ফোনগুলো ইউনিকোড সমর্থন করে। আর তাই ইউনিকোড সমর্থক ফন্ট ব্যবহার করে এসব মোবাইলে বাংলা ব্যবহার সম্ভব বলে জানিয়েছেন মোসত্দফা জব্বার।
দেশে প্রথম বাংলা এসএমএস চালু করে সিটিসেল। এই পদ্ধতিতে সিটিসেল ব্যবহারকারীরা মোবাইলে ইংরেজি কোড টাইপ করে এবং তা একটি নির্দিষ্ট নম্বরে প্রেরন করে। পরবতর্ীতে সেখান থেকে কোডগুলো বাংলা ইমেজে কনভার্ট হয়ে কাংখিত গ্রাহকের কাছে পৌছে যায়।
কিছুদিন আগে একটেল চালু করে বাংলা এসএমএস। এজন্য একটেল ব্যবহারকারীদেরকেও একটি সফঠওয়্যার ব্যবহার করতে হয়। এই সফটওয়্যারটি একটেলের ওয়েবসাইট থেকে ডাউনলোড করে নিতে হয়। শুধুমাত্র জাভা এমআইডিপি 2.0 সমর্থক সেটগুলোতেই এই সফটওয়্যার কাজ করে। তবে মোবাইলে বাংলার ব্যবহার শুধু ম্যাসেজ আদান প্রদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
কম্পিউটার অপারেটিং সিস্টেমে বাংলা
30 জানুয়ারি মাইক্রোসফট প্রকাশ করেছে উইন্ডোজ এক্সপির বাংলা ইন্টারফেস। ইন্টারনেট সুত্রে জানা গেছে, উইন্ডোজ এর এই বাংলা ইন্টারফেস পরীৰামুলকভাবে বাজারে ছেড়েছে তারা। এটি উইন্ডোজ এক্সপি সার্ভিস প্যাক 2 এ ব্যবহার করা যাবে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, 2003 সালের সেপ্টেম্বর মাসে মাইক্রোসফট তার উইন্ডোজের বাংলা ইন্টারফেস তৈরির সিদ্ধানত্দ নেয়। এসময় বাংলা বানান, অনুবাদ ইত্যাদি কাজে মাইক্রোসফটকে সাহায্য করে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠান একুশে ডট অর্গ ও ভারতের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়। এই প্রসঙ্গে একুশে ডট অর্গ এর কমর্ী শরিকুল ইসলাম আজাদ জানান, ভারতেকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়ায় এই ইন্টারফেসে বাংলাদেশের ধাঁেচ তারিখ, সময়, মুদ্রার মান ইত্যাদি দেয়া হয়নি। মাইক্রোসফটের সুত্রে জানা যায়, তাদের পরবতর্ী অপারেটিং সিস্টেম উইন্ডোজ ভিসতার সম্পূর্ণ বাংলা সংস্করন থাকবে। গত মাসে জনপ্রিয় সার্চ ইঞ্জিন গুগলও বাংলা ইন্টারফেস চালু করে। গুগল ডট কম ডট বিডি (িি.িমড়ড়মষব.পড়স.নফ) শীর্ষক উক্ত ইন্টারফেসের সব লোগো ও অপশন বাংলায় পরিবর্তন করা হয়েছে। তবে উইন্ডোজ কিংবা গুগল এর আগেই সাদামাটা এক বাংলা ডেস্কটপ সফটওয়্যার তৈরি করে এশিয়ান বিশ্ববিদ্যালয় অব বাংলাদেশের তিন ছাত্র। এফ. এম. আরিফ মাহমুদ, এন. এম. হাসনাত তানভীর ও মে. নজরম্নল ইসলাম খানের এই সফটওয়্যারটি পুরো উইন্ডোজ ইন্টারফেসের উপর একটি বাংলা আসত্দরন বসিয়ে দেয়।
বাংলা স্পেলচেকার
বাংলা বানান শুদ্ধিকরণ, বাক্য পরীৰা এবং শব্দকে বর্ণানুক্রমিকভাবে সাজানো যাবে কম্পিউটারে। আর এতোসব কাজ করার একটি পূর্ণাঙ্গ সফটওয়্যার 'শব্দলেখ'। যেটি তৈরি করছেন জাহিদুল ইসলাম রবি। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। জাহিদুল ইসলাম রবি ডিজিটাল বাংলা প্রসঙ্গে বলেন, আমার তৈরি স্পেল চেকারটি টাইপ করা ডকুমেন্টের বানান পরীৰা করে এবং বানান ভুল হলে ডিকশনারি থেকে সঠিক শব্দের পরামর্শ তালিকা তৈরি করে। ব্যবহারকারী প্রয়োজনে পরামর্শ তালিকা থেকে শুদ্ধ বানানটি পরিবর্তন করতে পারেন অথবা এড়িয়ে যেতে পারেন।
ওপেনসোর্সে বাংলা
লিনাক্স নির্ভর বাংলা অপারেটিং সিস্টেম তৈরি হয়েছে অনেক আগেই। স্বেচ্ছাশ্রমে আগ্রহী কয়েকজন তরম্ননের সংগঠন অংকুর ইতিমধ্যে রেডহ্যাট, ফেডোরা কোর, সুসি ও নপিক্স নামক লিনাক্স ওএস এর বাংলা ইন্টারফেস তৈরি করে ফেলেছে। গত বছরের সফটওয়্যার মেলায় তারা লিনাক্স বাংলা লাইভ সিডিও প্রকাশ করে। এ সম্পর্কে বিসত্দারিত তথ্য পাওয়া যাবে িি.িধহশঁৎনধহমষধ.ড়ৎম সাইটে। ওপেন সোর্স ভিত্তিক অফিস প্যাকেজ ওপেন অফিসের বাংলা তৈরি করেছে সেচ্ছাসেবী সংগঠন একুশে। তারা ওয়েবসাইট ব্রাউজার ফায়ার ফক্স ও ই-মেইল আদা-প্রদানের সফটওয়্যার থান্ডারবোর্ডেরও বাংলা ভার্সন তৈরি করেছে। এসব সফটওয়্যার পাওয়া যাবে নহ.ড়ঢ়বহড়ভভরপব.ড়ৎম সাইটে। ইন্টারনেটে বাংলা বর্তমানে প্রায় সবকটি বাংলা জাতীয় দৈনিকের ওয়েবসাইট রয়েছে। এসব ওয়েবসাইট সম্পূর্ণ বাংলাতে তৈরি। ইত্তেফাকের ওয়েবসাইটটি (িি.িরঃবভধয়.পড়স) সাজানো হয়েছে ডায়নামিক ফন্ট ব্যবহার করে। ফলে সাইটটি ব্রাউজ করার জন্য কোন প্রকার বাংলা ফন্ট বা সফটওয়্যার ডাউনলোডের প্রয়োজন হয় না। বর্তমানে বিভিন্ন বিষয়ের ওয়েবসাইট রয়েছে যা বাংলায় তৈরি। তবে এসব সাইটের সার্চ ইঞ্জিনগুলোতে বাংলা কাজ করে না।
চাই প্রমিত সমাধান
ওপেন সোর্স নির্ভর বাংলা সফটওয়্যারও তৈরি হচ্ছে দেশে। তবে এই ওপেনসোর্সবাদীরা প্রচলিত বাংলা লেখার সফটওয়্যারগুলোকে বলছেন 'আবর্জনা'। তারা বোধহয় জানেনা আশির দশক থেকে আজ পর্যনত্দ লাখ লাখ কম্পিউটারে ব্যবহার হয়ে আসছে এসব সফটওয়্যার। এগুলো 'আবর্জনা' কিনা তা জানতে চায়না সাধারন মানুষ। তাদের আগ্রহ ফলাফলের প্রতি। তাই আসুন নিজেকেই সেরা ভেবে অন্যের গায়ে কাঁদা ছোড়া বন্ধ করি। কাঁেধ কাঁধ মিলিয়ে ডিজিটাল বাংলাকে নিয়ে যাই বহুদুর। ( প্রতিবেদনটি 20 ফেব্রুয়ারী দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদক: মো. আরাফাতুল ইসলাম)
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৬ সকাল ৮:১২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



