চট্টগ্রাম থেকে ফিরে
কম্পিউটারের সামনে বসে আছে তারা। কানে হেডফোন, হাতে কী-বোর্ড আর চোখে কালো চশমা। কম্পিউটারে তাদের কাজের পরিধি কম্পোজ থেকে শুরম্ন করে ই-মেইল চেক, চ্যাট কিংবা জটিল হিসাব কষা পর্যনত্দ। দেখতে আমাদের মতো হলেও আধাঁর দুনিয়ার বাসিন্দা তারা। চোখে দৃষ্টি নেই তাদের, তবে আছে মনোবল। সেই মনোবলের জোরে শ্রবনশক্তি আর কী-বোর্ড ব্যবহার করে কম্পিউটার চালাচ্ছে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীরা।
বন্দর নগরী চট্টগ্রামে সর্ব প্রথম এই কার্যক্রমটি চালু করেছে ইয়ং পাওয়ার ইন সোশ্যাল অ্যাকশন (ইপসা)। তারা এজন্য প্রতিষ্ঠা করেছে ইপসা আইসিটি এন্ড রিসোর্স সেন্টার ফর দ্যা ডিজেবল (আইআরসিডি)।
শুরম্নর কথা
ডিসেম্বর 2005 থেকে চাঁন্দগাও আবাসিক এলাকায় অবস্থিত ইপসা'র প্রধান কার্যালয়ে শুরু হয় দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্য কম্পিউটার শিা কার্যক্রম। প্রথম ব্যাচে নেয়া হয় 6 জন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিাথর্ীকে। তাদেরকে বর্তমানে বেসিক কম্পিউটিং, ইন্টারনেট ব্যবহার, ডেইজি, লিডারশিপ এবং স্পোকেন ইংলিশ শিা দেয়া হচ্ছে। 5 মাস মেয়াদী এই প্রশিনের পরবতর্ী ব্যাচ শুরু হবে 15 জন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী নিয়ে। এ প্রসঙ্গে উক্ত প্রশিন কেন্দ্রের দৃষ্টি প্রতিবন্ধী প্রোগ্রাম সমন্বয়কারী ভাস্কর ভট্টাচার্য বলেন, আমরা এই প্রশিৰনের মাধ্যমে লিডার তৈরির দিকে নজর দিচ্ছি। যাতে করে এখানে প্রশিৰনপ্রাপ্তরা স্ব স্ব এলাকায় একইধরনের কার্যক্রম চালাতে পারে।
শ্রবনই সব
প্রশিৰন কেন্দ্রে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীরা কম্পিউটার চালাচ্ছে শ্রবনশক্তির উপর নির্ভর করে। এজন্য ব্যবহার করা হচ্ছে বিশেষ স্ক্রীন রিডিং সফটওয়্যার। এটি কম্পিউটার চালু হওয়ার সাথে সাথে সমসত্দ ইন্টারফেসটিকে শব্দে রূপানত্দর করে। ফলে স্টার্ট মেনু্য থেকে টাইম প্রোপার্টিজ পর্যনত্দ সব কিছুই শুনতে পায় প্রতিবন্ধীরা। আর কম্পিউটারের বিভিন্ন লোকেশনে যেতে তারা ব্যবহার করে কী-বোর্ডের বিভিন্ন বাটন। এ প্রসঙ্গে প্রতিবন্ধী শিৰাথর্ী সেলিনা আক্তার বলেন, 'আমরা বিশেষ পদ্ধতিতে কী-বোর্ডে আঙ্গুল রাখি এবং শব্দের দিকে ধ্যান দেই। এভাবে শিৰতে গিয়ে প্রথম দিকে বেশ সমস্যা হয়েছে। তবে এখন মানিয়ে গেছি।'
বাংলা সমস্যা
ইপসা'র প্রশিৰন কেন্দ্রে ব্যবহৃত স্ক্রীন রিডিং সফটওয়্যারটি বাংলা ভাষা সাপোর্ট করে না। আর তাই কিছুটা সমস্যার মধ্যে আছে এই প্রশিৰন কার্যক্রম। বিশেষ করে প্রতিবন্ধীরা কম্পিউটারে নিজস্ব ভাষা বাংলা ব্যবহার করার সুযোগ পাচ্ছে না। এ প্রসঙ্গে প্রশিন কেন্দ্রের সহকারী সমন্বয়কারী শাহেদা খানম নেলি বলেন, ভারত ইতিমধ্যে প্রতিবন্ধীদের জন্য লিখন ও শ্রবনযোগ্য বাংলা সফটওয়্যার তৈরি করেছে। কিন্তু আমরা এধরনের কোন বাংলা সফটওয়্যার পাই নি। ফলে এখানকার শিৰাথর্ীরা কম্পিউটারে বাংলা লিখতে পারছে না।
প্রতিবন্ধীদের জন্য বাংলা স্ক্রীন রিডিং সফটওয়্যার তৈরি জরুরী হয়ে পড়েছে বলে জানান ভাস্কর ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, বাংলা ছাড়া আমরা অনেকটাই অচল। আশা করছি দেশের তথ্য প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা স্ক্রীন রিডিং বাংলা সফটওয়্যার তৈরির দিকে নজর দেবে। এজন্য যেকোন ধরনের সহযোগিতা করতে ইপসা প্রস্তুত।
মিউজিক কম্পোজার
ইপসার প্রশিৰন কেন্দ্রের 6 শিৰাথর্ীর স্বপ্ন অনেক। কেউবা কম্পিউটার শিখে একটি সুন্দর চাকরি চায়, আবার কেউবা কম্পিউটারে মিউজিক কম্পোজ করতে চায়। এদের মধ্যে একজন মোখলেসুর রহমান। মুরাদপুর সরকারী অন্ধ বিদ্যালয়ের শিক তিনি। কম্পিউটার শেখার কারন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমি ছোটবেলা থেকেই গান গাই। ভবিষ্যতে কম্পিউটারে নিজের গানের মিউজিক কম্পোজ করার ইচ্ছা আছে। একইসাথে বিদ্যালয়ের অন্ধ ছাত্রদের কম্পিউটার শেখাতেও আগ্রহী তিনি।
অপর প্রতিবন্ধী শিৰাথর্ী লিটন চন্দ্র নাথ বলেন, কম্পিউটার ব্যবহার করে কম্পোজ থেকে শুরু করে সংবাদপত্র, ই-মেইল, চ্যাট কিংবা পাঠ্যপুস্তক সবই লিখেতে, পড়তে ও শুনতে পারছি আমরা। এটা আমাদের জন্য অনেক বড় পাওয়া।
কম্পিউটার শেখার ফলে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের লেখা-পড়ার সুবিধা অনেক বাড়বে বলে মনে করেন প্রতিবন্ধী শিৰাথর্ী রাশেদুজ্জামান চৌধুরী। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমানে কম্পিউটার হচ্ছে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের চোখ। বিশ্বের সব ভালো ভালো বইয়ের ডিজিটাল সংস্করন রয়েছে। কম্পিউটারের ব্যবহার জানলে প্রতিবন্ধীরা সহজেই তাদের প্রয়োজনীয় বইগুলো থেকে জ্ঞান আহরন করতে পারবে।
পুরোটাই ফ্রি!
'আমরা প্রতিবন্ধীদের সমপূর্ণ বিনা খরচে কম্পিউটার প্রশিৰন দিচ্ছি'- জানালেন ভাস্কর ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, নুন্যতম এইচএসসি পাশ যেকোন প্রতিবন্ধী শিৰাথর্ী আমাদের এখান থেকে কম্পিউটার প্রশিৰন নিতে পারবেন। আমরা তাদেরকে দুপুরের খাওয়া ও বাসা থেকে আসা-যাওয়ার খরচও দিয়ে দেবো। এই প্রসঙ্গে শিৰাথর্ী আল-আমিন বলেন, পুরো ফ্রিটা আমাদের জন্য একটি বিশেষ সুযোগ। কারণ এমনিতেই সমাজের কাছে আমরা বোঝার মতো। তাই এখানে আসা যাওয়ার খরচ যোগাড় করাটা অতটা সহজ নয়। তাছাড়া প্রশিৰন কেন্দ্রের বর্তমান পরিবেশও আমাদের জন্য সহায়ক।
উল্লেখ্য ইপসা সম্পুর্ন বিনামুল্যে প্রতিবন্ধীদের কম্পিউটার প্রশিন দিচ্ছে। তাদেরকে কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে জাপান ভিত্তিক ডেইজি ফর অল। প্রশিন শেষে প্রতিবন্ধীদেরকে কম্পিউটার সরবরাহ করাও জরুরী বলে মনে করছে ইপসা কতৃপ। এ প্রসঙ্গে ভাস্কর ভট্টাচার্য বলেন, কম্পিউটার শুধু জানলেই হবে না, সেটা ব্যবহারের সুযোগও থাকতে হবে। তাই প্রশিৰন শেষে প্রতিবন্ধীদের বিশেষ ব্যবস্থায় কম্পিউটার দিতে পারলে আরো ভালো হতো।
(প্রতিবেদনটি 13 মার্চ, 2006 তারিখে দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত হয়েছে।)
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



