বিরিশিরি বাংলাদেশের নেত্রকোনা জেলার দুর্গাপুর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী একটি গ্রাম। নেত্রকোনা থেকে ত্রিশ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এখানে ঘুরে আশা নিয়েই আজকের আয়োজন।
প্রথম দিন
২৩ নভেম্বর ২০১২, এক রোদ উজ্জল দুপুরে বের হলাম, লক্ষ্য নেত্রকোনার বিরিশিরি। সাথে আমার সহধর্মিণী সুমনা। ঘোরাঘুরি করতে আমি এবং আমার সহধর্মিণীর অনেক জায়গাই বাকি আছে বাংলাদেশে। ঢাকা মহাখালি বাসস্ট্যান্ড থেকে সরাসরি বিরিশিরিবাস যায়। আমার অবস্থান গাজীপুর বিধায় গাজীপুর চৌরাস্তা থেকে বাসে চড়ি। এখান থেকে ময়মনসিংহের ভাড়া দুইশত টাকা। দুই ঘণ্টায় পৌঁছে গেলাম ময়মনসিংহ। ময়মনসিংহের ব্রিজ মোড় থেকে সরাসরি বাস যায় বিরিশিরিতে। কিন্তু সপ্তাহ খানেক আগে মাঝ রাস্তায় একটা বেইলি ব্রিজ ভেঙ্গে যাওয়ায় বাস সরাসরি বিরিশিরিতে গেলনা।
চল্লিস টাকা করে বাসের টিকিট কাটলাম। ছোট মুড়ির টিন মতো বাস। ভিতরে ছাঁদে সমান মানুষ। ছাদের ভাড়া অর্ধেক বিধায় ছাঁদে উঠার আগ্রহের কমতি নেই। কিছুদূর যাবার পর শুরু হোল ঝাঁকুনি। ভয়ঙ্কর রাস্তা...এমনভাবে বাস চলছিলো আর ঝাঁকুনি দিচ্ছিলো যে মনে হচ্ছিলো আমরা রোলার কোস্টারে আছি। রাস্তার পিচ উঠে গিয়ে শুধু পাথর আর বালি। একে তো রাস্তার অবস্থা করুন তার উপর কিছু দূর পরপরই বাস থামে। গাড়ির ভিতরের অবস্থা আরও খারাপ। আমরা যে বাসে চরেছিলাম সেটার ছাঁদ ছিল নড়বড়ে। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল এই বুঝি ছাঁদ ভেঙ্গে যাবে। এই রাস্তার লোকাল বাসগুলির অবস্থা নাকি এরকমই। তাই আমার পরামর্শ ঢাকা টু বিরিশিরির সরাসরি বাসে চরবেন, কারন এই বাসগুলি ময়মনসিংহ পার হবার পর আর তেমন একটা স্টপেজ দেয় না।
ঘণ্টা দেড়েক পর পূর্বধলার আহমেদনগর নামক জায়গাতে বাস থেমে গেল। পাশেই ভাঙ্গা বেইলি ব্রিজ। এসব ব্রিজের বহন ক্ষমতা ৫ টন। শোনা গেল পাথর, বালি বা চুনাপাথর বোঝাই ২০ টনি ট্রাক এখান দিয়ে পারাপার হয়। আর তাই মাঝে মাঝে এসব এলাকার বেইলি ব্রিজগুলি ভেঙ্গে যায়। ভাঙ্গা ব্রিজটি একটি ছোট খালের উপর নির্মিত। বাঁশ দিয়ে ক্ষণস্থায়ী একটা ব্রিজ বানানো হয়েছে। খাল পার হয়ে ওপার যাওয়ার পর রিকশা নিলাম। পাথর বালুর রাস্তা। ভারী ব্যাগ থাকায় রিকশা নিয়েছি, নইলে এমন রাস্তায় কাউকে শাস্তি দেবার জন্যই শুধু রিকশায় চড়িয়ে দেয়া যায়। বিশ টাকা ভাড়া দিয়ে সামান্য একটু রাস্তা পার হয়ে পূর্বধলা চৌরাস্তা নামক স্থানে পৌঁছলাম । আবার ৩৫ টাকা করে টিকিট কাটলাম বিরিশিরির জন্য। প্রায় ৩০ মিনিট অপেক্ষার পর বাস ছাড়ল। এবার রাস্তা কিছুটা ভালো। রাস্তা তৈরির কাজ চলছে। শুনলাম কয়েক মাসের মধ্যে রাস্তা ভালো হয়ে যাবে।
ঘণ্টা দেড়েক পর বিরিশিরি বাজারে পৌঁছলাম। তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। বাজারের একেবারে পাশেই আমাদের থাকার জায়গা ‘স্বর্ণা গেস্ট হাউস’। এখানে ফ্রেশ হয়ে বাইরে বের হলাম । কয়েকটা দোকান নিয়ে ছোট্ট বাজার বিরিশিরি। দুএকটা দোকানে উপজাতিদের পোশাক পাওয়া যায়। কিছু কেনাকাটা করলাম। গেস্ট হাউসেই খাবারের বেবস্থা ছিল।
দ্বিতীয় দিন
হাত ঘড়িতে সকাল সাতটা। সকালটা দেখেই বুঝলাম সামনে সুন্দর কিছু মুহূর্ত অপেক্ষা করছে। গেস্ট হাউস থেকে বের হয়েই বাজার সংলগ্ন সোমেশ্বরী নদীর পাশ দিয়ে হাঁটলাম।
এখানেই শান্ত-স্বচ্ছ সোমেশ্বরী। ধীরে বয়ে চলা এ নদীটি অসাধারণ সুন্দর। শান্ত-নিবিড় সোমেশ্বরী ধীরলয়ে বয়ে চলছে। ওপারে উপচে পড়া সবুজের হৃদয়কাড়া হাতছানি। উত্তরের হিমেল হাওয়া এবং সোমেশ্বরীর স্বচ্ছ জলধারা নিমিষেই যেন সব ক্লান্তি দূর হয়ে যাবে। সোমেশ্বরীর গভীরতাও অবিশ্বাস্য রকমের কম। এই নদীতে কয়লা পাওয়া যায়। গ্রামবাসীরা পানির নিচে ডুব দিয়ে তুলে আনে কালো সোনা। এই কয়লা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার হয় কল-কারখানায়। রপ্তানি পণ্য হিসেবে এর সম্ভাবনা প্রবল।
বিরিশিরি বাজারের পাশেই ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী কালচারাল একাডেমী’ ঘুরে দেখলাম। ছুটির দিন বিধায় এখানকার জাদুঘরটি দেখতে পেলাম না।
আদিবাসীদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বহু প্রাচীন ও মনোগ্রাহী। এ সকল জনগোষ্ঠী আদিকাল হতেই স্থানীয় সহযোগিতা নিয়ে তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে চর্চার মাধ্যমে লালন ও সংরক্ষণ করে আসছে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য বৈশিষ্টপূর্ণ আঞ্চলিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের লক্ষ্যে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা ও আনুষঙ্গিক বিষয়াদি সম্পর্কে ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন ২০১০’ কার্যকর করা হয়। উক্ত আইন অনুসারে বর্তমানে বিরিশিরি কালচারাল একাডেমী পরিচালিত হচ্ছে।
সকাল সাড়ে আটটার দিকে পূর্বনির্ধারিত মোটরসাইকেল ওয়ালা এসে হাজির। বিরিশিরিতে আপনি চার থেকে পাঁচশো টাকা দিয়ে ঘুরতে পারবেন সব দেখার জায়গা। আপনি রিকশা চড়েও ঘুরতে পারেন। তবে মোটর সাইকেলই ভালো। মোটর সাইকেল চালকই গাইডের মতো আপনাকে ঘুরে ঘুরে দেখাবে। বিরিশিরি বাজারের পাশেই সোমেশ্বরী নদী। এর উপর মস্ত বড় একটা ব্রিজ। ব্রিজ পার হয়ে দুর্গাপুর থানা শহরের ভিতর দিয়ে রানিখং মিশনের দিকে চললাম। কিছুক্ষণ যাবার পর আবার সোমেশ্বরীর দেখা মিলল । নদীটি ঘুরে এসে আবার আমাদের পথ আটকাল।
সোমেশ্বরী নদী পার হতে হবে। নদীর খুব সামান্য অংশতেই পানি আছে। নদীটা অনেকটাই জাফলং এর নদীর মতো। স্বচ্ছ পানি, তলদেশ স্পষ্ট। পার্থক্য শুধু জাফলং এর পাথর। অবশ্য নদীর বেশিরভাগ অংশ সবাই হেটেই পার হয়। অল্প একটু জায়গা নৌকায় পার হতে হবে।
শীতের দিন বিধায় নদীর বেশিরভাগ অংশে বালুর চর। এই নদীর পানি অনেক স্বচ্ছ। কিছু লোক বালুর চর খুড়ে কয়লা তুলছে। ছোট একটি খেয়া নৌকাতে করে মোটর সাইকেল সহ পার হলাম। ওপার গিয়ে আবার মোটর সাইকেল জার্নি শুরু। এখানকার বেশিরভাগ রাস্তা ইট বিছানো। ফলে এসব রাস্তায় রিকশাতে না চড়াই ভালো। এরপর একটা উচু পাহাড়ের উপর রানিখং মিশন ও সেন্ট জোসেফের গির্জা দেখলাম।


দুর্গাপুর উপজেলা পরিষদ থেকে ৬ কিলোমিটার উত্তরে কাল্লাগড়া ইউনিয়নের উত্তর পূর্ব সীমান্তে সোমেশ্বরী নদীর কোল ঘেঁষেই পুরো মিশনটি একটি উচু পাহাড়ে অবস্থিত। ১৯১০ সালে এ রাণীখং মিশনটি স্থাপিত হয়। ইহা খ্রীষ্টিয় ক্যাথলিক ধর্মপল্লী। ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের একটি উপাসনালয়। সুরম্য একটি গীর্জাসহ একটি দাতব্য চিকিৎসালয়, দুইটি স্কুল ও একটি পোষ্ট অফিস আছে। ইহা ছাড়া মিশনের ভিতরে শান্তিনিকেতন নামে একটি বিশ্রামাগার আছে, যেখান থেকে প্রকৃতিকে আরো নিবিড়ভাবে উপভোগ করা যায়।
প্রকৃতির অপরুপ লীলাভূমি রাণীখং মিশন। পাহাড় চুড়ায় গড়ে উঠা মিশনটির পূর্ব পার্শ্ব দিয়ে বয়ে গেছে খরস্রোতা পাহাড়ী নদী ‘সোমেশ্বরী’। মিশনটির সম্মুখে বিস্তির্ণ সাদা সিলিকা বালি। ছোট বড় সারি সারি টিলা-পাহাড় মিশে গেছে দিগন্ত জুড়ে। পা বাড়ালেই ভারতের মেঘালয় রাজ্য। এখান থেকেই উপভোগ করা যায় পাহাড় আর মেঘের লুকোচুরি খেলা আর নীলিমায় ভেসে যাওয়া বনবিহার।
বিজয়পুর সীমান্ত ফাঁড়ি
উচু একটা পাহাড়ে বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড এর সীমান্ত ফাঁড়ি। অনেক নিচ দিয়ে সোমেশ্বরীর স্রোত ভারতের দিকে চলে গেছে। যতদূর চোখ যায় শুধু পাহাড় আর পাহাড়। একটা বিষয় লক্ষণীয় এই অঞ্চলের অপেক্ষাকৃত উচু ও দুর্গম পাহারগুলো ভারতের সীমানায় অবস্থিত। এখানে অনেকক্ষণ বসে কাটালাম।


বিজয়পুর চিনামাটির পাহাড়
বিভিন্ন রংয়ের মাটি, পানি ও প্রকৃতির নয়নাভিরাম সৌন্দর্য মনকে বিমোহিত করে। সাদা, গোলাপী, হলুদ, বেগুনি, খয়েরী, নিলাভ বিভিন্ন রংয়ের মাটির পাহাড় চোখকে জুড়িয়ে দেয়। সাদামাটি এলাকা জুড়ে আদিবাসীদের বসতি।
ছোট বড় টিলা-পাহাড় ও সমতল ভূমি জুড়ে প্রায় ১৫ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ৬০০ মিটার প্রস্থ এই খনিজ অঞ্চল। খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী ১৯৫৭ সালে এই অঞ্চলে সাদামাটির পরিমাণ ধরা হয় ২৪ লাখ ৭০ হাজার মেট্রিক টন, যা বাংলাদেশের ৩শ’ বৎসরের চাহিদা পুরণ করতে পারে। খনিগুলো থেকে মাটি খনন করায় এসব হ্রদের সৃষ্টি হয়েছে।
বিরিশিরির মূল আকর্ষণ হচ্ছে এ পানি। চীনামাটির পাহাড়, যার বুক চিরে জেগে উঠেছে এই নীলচে-সবুজ পানির হ্রদ। সাদা মাটির মাঝে রঙটাকে যেন আরও বেশি গাঢ় করে দিয়েছে।
একজন স্থানীয় ছোট ছেলে এসে বলল ‘’লিল পানি দেখবেন?’’ পরখনেই বুঝলাম ও আসলে নীল পানির কথা বলছে। সেটার অবস্থান প্রথম পাহাড়টা থেকে মিনিট পাচেকের হাটা পথের দূরত্ব। এখানকার পানির রঙ ফিরোজা, আকাশীও বলা যায়। চিনামাটির সাথে বৃষ্টির পানির রাসায়নিক বিক্রিয়ায় পানির রঙ এরুপ হয়েছে।
বেলা আড়াইটার মধ্যে আমাদের মিশন শেষ।


কমলা রানি দিঘী
বিরিশিরি ইউনিয়ন পরিষদের পাশেই কমলা রাণী দিঘী। এই কমলা রাণী দিঘী সাগর দিঘী নামেও পরিচিত। দিঘীটি পুরোপুরি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেলেও এর দক্ষিণ পশ্চিম পাড় এখনও কালের স্বাক্ষী হয়ে আছে। ১৫ শতকের শেষ দিকে সুসং দুর্গাপুরের রাজা জানকি নাথ বিয়ে করেন কমলা দেবী নামে এক সুন্দরী নারীকে। রাণী কমলা দেবী যেমনি রূপেগুণে সুন্দরী ছিলেন তেমনি ছিলেন পরম ধার্মিক। রাজা জানকি নাথও ছিলেন পরম প্রজা হিতৈষী। রাণীর গর্ভে একপুত্র সন্তান জন্ম নেয়। পুত্রের নাম রাখা হয় রঘুনাথ। রাজা জানকি নাথ প্রজাদের মঙ্গলার্থে পানির অভাব নিবারণের জন্য একটি পুকুর খনন করেন। কিন্তু পুকুরে আর পানি উঠল না। রাজা পড়লেন মহা চিন্তায়। একরাতে রাজা স্বপ্নে দেখেন রাণী কমলা দেবী যদি পুকুরের মাঝখানে গিয়ে পূজো দেন তাহলে পুকুরে পানি উঠবে। রাণী কমলা দেবী প্রজাদের মঙ্গলার্থে পুকুরের মাঝখানে গিয়ে পূজোয় বসলেন। সহসা চারিদিক দিয়ে পানি উঠতে শুরু করল। কিন্তু রাণী আর পানি থেকে উঠে এলেননা। পানিতে একাকার হয়ে মিশে গেলেন তিনি। কিন্তু এখন আর কোনও দিঘী নেই, আছে শুধু দিঘীর পাড়।
দুপুরে গেস্ট হাউসে লাঞ্চ সেরে বিকেলে দুরগাপুর বাজারটা ঘুরে দেখলাম।

যেভাবে যাবেন
ঢাকা মহাখালি বাস স্ট্যান্ড থেকে সরাসরি বিরিশিরির বাসে চরবেন। ৫ থেকে ৬ ঘণ্টার রাস্তা। রাতে হোটেলে কাটিয়ে পরদিন ভোরে মোটর সাইকেল/রিক্সায় ঘুরে বিকেলে আবার ধাকার উদ্দেশে রওনা দিবেন। আমরা যে মোটর সাইকেল এ ঘুরেছিলাম তাকে পাবেন 01824078218 নাম্বারে। উনি খুব আন্তরিক মানুষ।
বিরিশিরিতে থাকার ভালো জায়গা YWCA, YMCA ইত্যাদি রেস্ট হাউস। এছাড়া নিচের লিঙ্কে আরও হোটেলের নাম পাবেন। আগেই বুকিং দিবেন।
http://durgapur.netrokona.gov.bd/hotel
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে জানুয়ারি, ২০১৫ রাত ৮:৪২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




