somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বাংলা আমার অহঙ্কার

০৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ বিকাল ৪:২৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

“ছোট ভাইটিকে আমি/কোথাও দেখি না,/নরোম নোলক পরা বোনটিকে/আজ আর কোথাও দেখি না!/কেবল পতাকা দেখি,/কেবল উত্সব দেখি,/কেবল স্বাধীনতা দেখি,/তবে কি আমার ভাই আজ/ঐ স্বাধীন পতাকা?’’

জনৈক কবি তার কবিতায় পরম যতনে বিজয় ও স্বাধীন পতাকাকে তুলে ধরেছেন এভাবে। সত্যি তাই, এই বিজয় লাখো প্রাণের বিনিময়ে পাওয়া। প্রিয়জন হারিয়ে, পতাকা নিয়ে, পতাকা দেখে বেঁচে থাকার প্রত্যয় ত্রিশ লাখ শহীদের স্বজনদের। সেই পতাকা, সেই বিজয়, সেই সার্বভৌম বাংলাদেশে আজ বিজয় দিবস। সুদীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধ করে আমরা জায়গা করে নিয়েছি মানচিত্রে।

স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ হিসেবে, বাঙালি জাতি হিসেবে আজ আমরা তকমাপ্রাপ্ত। বাঙালি সিলমোহর আমাদের শরীরে। কিন্তু কতটা বাঙালি আমরা! কতটা মর্যাদা দিই আমাদের অর্জিত পতাকাটাকে কিংবা বাংলা ভাষাকে। লম্বা বাঁশের মাথায় পত পত করে যখন পতাকাটা ওড়ে, মনে হয় একেই বুঝি বলে স্বাধীনতা। একেই বুঝি বলে বিজয়। ছোট্ট এক টুকরো কাপড়! তার কত ব্যাখ্যা, কত বিশ্লেষণ। কেউ বলে তরুণদের সবুজ প্রাণের লাল রক্ত। কেউ বলে বাংলাদেশের সবুজ ধানি জমিতে টুকটুকে লাল সূর্য। আমি বলি নববধূর হাতে সবুজ পাতা মেহেদির লাল রং। সব মিলিয়ে বাঙালি হৃদয়ের সংমিশ্রণ এই পতাকা। এই পতাকাকে কি আমরা তার ন্যায্যমূল্য দিতে পেরেছি? যখন বোনের ছোট্ট মেয়েটি স্কুল থেকে ফিরে বলে, আজ বাংলাদেশের ফ্ল্যাগ ড্রইং শিখেছি। ফ্ল্যাগ অর্থ জিজ্ঞেস করলে সে বলতে পারে না। বুঝিয়ে দেয় ওই যে গ্রিনের মাঝে রেড সার্কেল। স্কুলে এসেম্বলি করার সময় স্যালুট করি ওইটা। আমি তাকে ধরিয়ে দিই পতাকা। সে বলে, হ্যাঁ হ্যাঁ কারেক্ট, পতাকা। সেই পতাকা ড্রইং করেছি। এর পর পরই সে তার মাকে উদ্দেশ করে বলে—মাম্মি, মুঝে ভুক লাগা। বয়স তার পাঁচ পেরোয়নি এখনও। আমার সঙ্গে আলাপচারিতার পাঁচ মিনিট সময় সে বাংলা শব্দ বলেছে পাঁচটি, বাকিগুলো ইংরেজি ও হিন্দি।

এই যদি হয় অবস্থা, তাহলে কেন এই আড়ম্বরপূর্ণ শহীদ দিবস বা আন্তর্জাতিক মাভৃভাষা দিবস। স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস পালন? বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দিয়ে এসেছেন। সেখানে আমরা দেশের মাটিতে বাংলায় কথা বলতে লজ্জা পাই। কথার মধ্যে দু’একটা ইংরেজি শব্দ না জুড়ে দিলে ক্ষ্যাত আখ্যা পেতে হয়। কিন্তু বইমেলা-২০১২-তে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন আঠার মিনিট পাঁচ সেকেন্ড বাংলায় বক্তৃতা করেন, সেখানে তিনি একটিও ইংরেজি বা অন্য ভাষার শব্দ ব্যবহার করেননি। শুধু এবারই নয়, প্রতিবছর তিনি বইমেলাসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বাংলায় বক্তৃতা দেন। অথচ আমাদের জাতীয় সংসদে ভুলভাল ইংরেজি কথার ঝড় ওঠে। আর সাধারণ জনতার মঞ্চের কথা তো বাদই দিলাম।

যে ভাষার জন্য যুদ্ধ করেছি, সেই ভাষা ব্যবহারে কেন এত আপত্তি! বাচ্চাকে বাংলা না শিখিয়ে ইংরেজির প্রতি বেশি আগ্রহী করে তুলছি। এমনকি তার শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোর বাংলা নামের আগে ইংরেজি শিখাই। মাথা কোনটা বললে বোঝে না, হেড বললে বোঝে। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ভুলভাল ইংরেজি ও হিন্দি ভাষা চর্চা করে। এই হিন্দিপ্রীতির একমাত্র কারণ স্যাটেলাইট চ্যানেল। স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলোতে কোনো সংবাদও প্রচারিত হয় না যে, তা থেকে তারা সাধারণ জ্ঞান অর্জন করবে। শুধু সিরিয়াল ও সিনেমা দেখে হিন্দি ভাষা শেখে।

এখন এই ভাষা থেকে রেহাই পেতে দেশে যেন আরেকটা যুদ্ধ প্রয়োজন। তাই স্বদেশপ্রীতি তথা ভাষাপ্রীতি বাড়ানোর জন্য আমাদের তরুণদের দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

অনেকে বলেন বাঙালিরা চার দিনের দেশপ্রেমিক—একুশে ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবসে, ছাব্বিশে মার্চ স্বাধীনতা দিবসে, ষোল ডিসেম্বর বিজয় দিবসে আর পহেলা বৈশাখ নববর্ষে। সত্যি কি তাই! এই অপবাদ মেনে নেয়া যায় না। আমরা মনে-প্রাণে বাঙালি হতে চাই, যাকে বলে ষোলোআনা বাঙালিয়ানা।

বাংলাদেশে জন্ম নিয়ে বাংলাদেশী হয়ে যারা বাংলা ভাষাকে অমর্যাদা করে ইংরেজি ভাষার স্তুতি গায়, তাদের জন্য কবি আবদুল হাকিমের বঙ্গবাণী কবিতার শেষ কয়েক চরণ উল্লেখ করি—“যেসব বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী/সেসব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি/দেশী ভাষা বিদ্যা যার মনে ন জুয়ায়/নিজ দেশ তেয়াগী কেন বিদেশ ন যায় কিংবা মাতা-পিতামহ ক্রমে বঙ্গে ত বসতি/দেশী ভাষা উপদেশ মনে হিত অতি।’’

অথবা শিল্পী আবদুল লতিফের কথা ও সুরে বলতে হয়— “কইতো যাহা আমার দাদায়/কইছে তাহা আমার বাবায়/এখন কও দেখি ভাই/মোর মুখে কি অন্য ভাষা শোভা পায়? ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়...।’’

সত্যি তাই, মুখের ভাষার জন্য একমাত্র বাঙালি জাতি জীবন দিয়েছে। সেই বাঙালিই এখন বাংলা ভাষাকে অমর্যাদা করে। তাই তো কথায় আছে স্বাধীনতা অর্জন করা সহজ, কিন্তু রক্ষা করা কঠিন। অর্জিত স্বাধীনতা রক্ষা করার দায়ভার বাঙালি জাতির। কিন্তু তা না করে বাংলা ভাষাকে জগাখিচুড়ি ভাষায় পরিণত করছে। এফএম রেডিও’র চ্যানেলগুলোতে হিন্দি বাংলা ইংরেজি মিলিয়ে কি যে এক নতুন ভাষার সৃষ্টি হয়েছে, তা বলার নয়। কিন্তু অনেকেই হয়তো জানেন না যে, বাংলা ভাষা সবচেয়ে সমৃদ্ধশালী ভাষা। যার অনেক প্রতিশব্দ ও সমার্থক শব্দ রয়েছে। তাহলে কেন আমরা অন্য ভাষার দ্বারস্থ হই। আমাদের ভাষাকে ব্যবহারের মাধ্যমে আমাদেরই উচিত তাকে সর্বস্তরে প্রচলন করা। তা না করে আমরা নিজেরাই নিজেদের বিপদ ডেকে আনছি।

বিশেষ বিশেষ দিনে দেশের বিভিন্ন ফ্যাশন হাউস বর্ণিল পোশাকের সম্ভার সাজায়, যেমন—একুশে ফেব্রুয়ারিতে সাদা-কালো, ছাব্বিশে মার্চ ও ষোলই ডিসেম্বরে লাল-সবুজ, পহেলা বৈশাখে লাল-সাদা প্রভৃতি। এটা দোষের কিছু নয়। কিন্তু এটা কোনো উৎসবও নয়। মুক্তিযুদ্ধ করার সময় বিশেষ কোনো পোশাক ছিল না, ছিল না হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান ভেদাভেদ। সবাই একসঙ্গে একাত্ম হয়ে ছিনিয়ে এনেছে স্বাধীনতা। সেই স্বাধীনতা কোনো বিশেষ পোশাকে নয়, মনে-প্রাণে ধারণ করার বিষয়। গানের ভাষায় বলতে হয়—“সাদা কাপড় পরলে যেমন মনটা সাদা হয় না/চকচক করলে যেমন সোনা তারে কয় না/আগে মনটা সাদা করে নে না।’’ তেমনি অঙ্গে বাঙালি ঐতিহ্যের পোশাক জড়ানোর আগে মনটাকে বাঙালি করে তুলতে হবে, তবেই স্বাধীনতার মর্যাদা পাবে। তবেই বাংলা ভাষার মর্যাদা দেয়া হবে। তবেই সার্থক হবে আমাদের এই বিজয় অর্জন।

সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ বিকাল ৪:২৬
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বাঁধনের কেন ফেমিকন লাগে !!!

লিখেছেন অপলক , ২৬ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:৩৪



বাঁধন এখন বন্ধন মুক্ত। মিডিয়া পাড়ায় সরব উপস্থিতি। উপর মহলের ডাকে সারা দিতে হয়। কাজেই ফেমিকন লাগতেই পারে। মানে ফেমিকনের এ্যাড করা লাগতেই পারে। মিডিয়া আইকন হিসেবে জনসচেতনাতা বাড়াতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে ফিরে আসো

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ২৬ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৬


সময়ের সাথে সাথে নিজেকে বদলে নিতে হয়,
তোমার শরীর জুড়ে যখন
অভিজ্ঞতার গল্প পাঠের আসর,
তখনও ছেলে ভোলানো ছড়ায়
নিজেকে ভোলালে চলে?

আঁজলা ভরে সময়ের যন্ত্রণাকে পান কর,
পান কর সত‍্যকে।
পান কর... ...বাকিটুকু পড়ুন

“উন্নয়নের দুর্ভিক্ষে বাংলাদেশ”

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ২৬ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৪:৫৮



বাং/লাদেশের মূর্খ জনগণ উন্নয়নের চেয়ে কথিত ফ্যাসিবাদকে বড় করে দেখেছে কিন্তু “উন্নয়নের দুর্ভিক্ষ” কি জিনিস তা দেখেনি।

দেখতে থাকুক….। আর ভাতের দুর্ভিক্ষ শুরু হলে বলে…..।

ফ্যাসিবাদ দূর করতে গিয়ে উন্নয়নই "নাই"... ...বাকিটুকু পড়ুন

মঞ্জুর চৌধুরীর ছোট গল্প "নভেম্বরের শেষ বৃষ্টি"

লিখেছেন মঞ্জুর চৌধুরী, ২৬ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:১৩

নভেম্বরের শেষ বৃষ্টি
মঞ্জুর চৌধুরী

নীরা কথাটা বিশ্বাস করতে পারছে না। তাঁর স্বামী আরমানের আরেক মেয়ের সাথে সম্পর্ক ছিল? এই আরমান কিনা সবসময়ে আবৃত্তি করতো "এই হাত ছুঁয়েছে নীরার মুখ, আমি কি... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী

লিখেছেন ইসিয়াক, ২৭ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:০৭



আমাদের সেই পুরনো ভিটেটার অস্তিত্ব  এখন আর নেই। তবে বুকের গহীনে ভিটেমাটির মায়াটুকু  ঠিক আগের মতোই রয়ে গেছে। কত স্মৃতি, কত গান, কত গল্প-কোলাহল,  মান- অভিমান ! চাইলেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

×