somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

চট্রগাম থেকে - ১৪ই জুন

১৫ ই জুন, ২০০৭ বিকাল ৩:৩৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

গতকালের দুর্ভাগা বন্ধুদের দেখতে যাবার জন্য আজ আমরা দিন শুরু করেছি চট্রগ্রাম মেডিকেল কলেজ থেকে। মনে খুবই আশা; গতকালের কোমায় থেকে লোকটি হয়তো আজ জ্ঞান ফিরে পাবে। লোকে লোকারণ্য ওয়ার্ডের প্রবেশ মুখেই দেখা হলো হুমায়ুনের সাথে, সে শোনালো এক দু:সংবাদ। গতকাল রাতেই লোকটি চলে গেছে ইহধাম ছেড়ে। হুমায়ুনের ভাইয়ের এক্স-রে রিপোর্ট পাওয়া গেছে। নিতম্বের হাড় থেতলে গেছে, ডান পা চূর্নবিচূর্ন। সেখানে থাকাকালীনই দেখা হলো চট্রগামের দুজন ব্লগারের সাথে; যাদের একজন মেডিকেল ছাত্র, তার সহায়তায় হুমায়ুনের ভাইটি চিকিৎসকের মনোযোগ পাবে, এটুকু অন্তত: নিশ্চিত হওয়া গেলো।

ক্যান্টনমেন্টের মাঝে লেবুবাগান ছিল আমাদের পরবর্তী গন্তব্য। সেখানে বিধস্ত এলাকায় ছড়িয়ে আছে আহত ও ক্ষতিগ্রস্থ মানুষেরা। রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট সাহায্য নিয়ে পৌঁছে গেছে আগেই, এখন প্রথম আলো ও গ্রামীনফোনের রিলিফ সামগ্রীপূর্ণ বাহনগুলোও দেখা যাচ্ছে।

শেষ নিঁখোজ ব্যক্তিটির জন্য খোঁজাখুঁজি চলছিল। বালুময় টিলার মাঝখান দিয়ে হেঁটে আসার সময় ভূমিধ্বসের ধ্বংসলীলা আরো ব্যাপকভাবে চোখে পড়ল। পন্ঞ্চাশজনের মতো অগ্নিকর্মী ও সেনাবাহিনীর জওয়ানেরা পানির তোড়ে বালু, কাদা শিকড় বাকড় সরাচ্ছে খুঁজছে, নূরজাহানের দেহ। পাওয়া যাবে কি না কে জানে! টিলার ওপর বসে থাকা ছোট্ট মেয়ে ফাহিনূর কান্নায় ভেঙে পড়ে জানতে চাইল, "আমার মাকে কি পাওয়া যাবে না?" মা ও ছোট ভাই বোনকে সে হারিয়েছে, বেঁচে আছে শুধু ভূমিধ্বসে পঙ্গু বাবা আর বারো বছর বয়সী ছোট ভাই। সম্ভবত: আগামী দিনগুলোতে গার্মেন্টস কর্মী ফাহিনূরের যৎসামান্য আয়েই চলতে হবে পরিবারটিকে। মাত্র দেড়মাস আগে তারা কিনেছিল নিজেদের একটি বাসা; আশায় বুক বেধেছিল একটি নতুন গর্বিত জীবনের। কে বলবে, এখন তাদের ভবিষ্যত কি?

এই একটি জায়গাতেই মারা গেছে আঠারো জন, পাঁচ-ছয়টি বাড়ির একটিও অবশিষ্ট নেই। এখানে ভূমিধ্বসের ঠিক আগে আগে বড় একটি গাছ ভেসে একজন লোক চাপা পড়ে। তাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসে সবাই। ঠিক তখনই ধ্বসে পড়ে পাহাড়, ঘটনাস্থলেই মারা যায় সব কজন।

বড়, সুখী আরেকটি পরিবার বাস করত এখানেই। পুরো ঘটনা আমরা শুনতে পারিনি, লুকিয়ে চোখ মুছে ফেলেছি, বেঁচে থাকা লোকটির ছিল আট সন্তান, বেঁচে আছে মাত্র দুজন।

এই দূর্ভাগা মানুষগুলোকে আমরা আর কি বলে সান্তনা দিতে পারি? স্নেহময় কিছু বাক্য আর তাদের জন্য কিছু সময় হয়ত লাঘব করবে কিছুটা যাতনা। সেই বাক্যগুলো গঠন করা যে এত কঠিন তা কে জানত?

একটু সামনে এগিয়ে গিয়ে দেখা গেল মানুষজন লম্বা সারিতে দাঁড়িয়ে আছে একটু রিলিফ পাবার আশায়। মুড়ি, চাল, ডাল, তেল আর পানি, পরিমানে অপর্যাপ্ত, সবাই হয়তো পাবেনা। বেলাল নামের এক বালককে আমরা পেলাম সেখানে। মা, বাবা ও দু'বোনকে হারিয়ে এখন সে পুরোপুরি একা। এক কাকা যশোর থেকে তাকে নিতে এসেছে। দূর্ভাগা এই বালককে আমি একটুক্ষন জড়িয়ে ধরে থাকলাম, মন ভেঙে যাওয়া তার কথাগুলো শুনলাম। বললাম পড়ালেখা করে বড় হও, মানুষ হও, মা তাতেই শান্তি পাবে।

সম্ভবত: সবচাইতে মন খারাপ করা মুহূর্তটি ছিল সন্তানহারা এক মায়ের সাথে কথা বলার সময় তার হাহাকার, "আমারে আর কেউ মা কইয়া ডাকবো না..."। দু'সন্তান ছিল তার, দুজনই মৃত।

আমি আরো বলে যেতে পারতাম, এ গল্পের কোন শেষ নেই। শত দু:খের মাঝেও আমাদের মনে দাগ কেটে গেছে এই সব হারানো মানুষগুলোর মনোবল ও বিশ্বাস। হঠাৎ করে এক বিশাল শুণ্যতার মাঝে এসে পড়বার পরেও তারা সেই বিশ্বাস হারায়নি, আশার বুক বেঁধেছে আরেকটি জীবন শুরু করবার।

আগামীকাল এখানে আমাদের শেষদিন। আমরা চেষ্টা করবো হুমায়ুনকে পুনর্বাসিত করতে, নতুন একটি বাসস্থান ও জীবনধারনের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো দিয়ে যেতে। সে আমাদের একজন নতুন করে পাওয়া ভাই, তাকে আমরা ভুলে যেতে পারিনা। তার আমাদেরকে প্রয়োজন; যেমনটি প্রয়োজন সেই বিধবার, ফাহিনূরের, বেলালের এবং নাম না জানা আরো অনেকের।

আমরা নিশ্চিত যে আমরা আসল মানুষগুলোকে খুঁজে পেয়েছি, আমাদের সাহায্য যাদের আসলেই দরকার। তাদের সামনে এখন শুধুই আঁধার, কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি আমাদের সাহায্য তাদের আবার ফিরিয়ে দিতে পারে জীবনের রংধনুগুলো। আমার অনুরোধ, আমাদের পাশে থাকুন।
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মুসা নবী এবং ফেরাউন

লিখেছেন রাজীব নুর, ৩০ শে জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮



মুসার নবীর নির্দেশ অমান্য করে এবং আল্লাহর অবাধ্য হওয়ার কারণে-
লোহিত সাগরে ডুবে ফেরাউনের করুণ মৃত্যু হয়। হজরত মুসা আলাইহিস সালাম এমন এক ফেরাউনের আমলে জন্মগ্রহণ করেছিলেন- যিনি রামেসিস... ...বাকিটুকু পড়ুন

যুদ্ধ ও প্রেমের দিন

লিখেছেন মোঃ মাইদুল সরকার, ৩০ শে জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪১




অরুনিমা, এখন যুদ্ধ চলছে চারদিকে
তাই হুটহাট ঘর থেকে বের হবেনা, আমার অপেক্ষায় থেকো না বাগানে বসে
কখন যে বোমারু বিমান বোমা ফেলে দেয় বলা তো যায় না।

তৃতীয় বিশ্ব যুদ্ধের দামামা বেজে... ...বাকিটুকু পড়ুন

৭২০১৪

লিখেছেন ডি এইচ তুহিন, ৩০ শে জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৫৮

"ভাই, এইখানেই নামবেন?"

হেল্পার ছেলেটা দরজার হাতল ধরে আমার দিকে ঠিক এমনভাবে তাকালো, যেন আমি জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটা করতে যাচ্ছি। বাসের ভেতরের হলদে আলোয় ওর মুখটা কেমন বিবর্ণ দেখাচ্ছিল। চোখের... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের ডায়েরী- ১৯২

লিখেছেন রাজীব নুর, ৩০ শে জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১৯



বিএনপি সরকার দেশে ক্ষমতায় আসতে না আসতেই দেশে প্রতারকের সংখ্যা বেড়ে গেছে।
প্রতারক সব আমলেই ছিলো। কিন্তু বিএনপির আমলে যেন প্রতারকের উৎসব শুরু হচ্ছে। দেশে বেড়ে গেছে মারামারি।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার পছন্দের বাংলা গানগুলো

লিখেছেন রূপক বিধৌত সাধু, ০১ লা জুলাই, ২০২৬ রাত ১:১১


অনেকদিনের ইচ্ছে পছন্দের বেশকিছু গান নিয়ে একটা পোস্ট দেব। দেওয়া হয়নি, কারণ, বিষয়টা সময়সাপেক্ষ। আজ হুট করে বসেই পড়লাম। রবীন্দ্র সঙ্গীত, নজরুলগীতি, লালনগীতিসহ নানান ধরনের গানের একটা তালিকা করছি,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×