somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

স্বল্প সময়ে, পাহাড়-জঙ্গলে(কলকাতা থেকে)

০৫ ই ডিসেম্বর, ২০১৬ রাত ১০:৫১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


হাতে মাত্র ৫ দিন ছু্টি, কিন্তু মন চাইছে পাহাড়-জঙ্গলের মিলিত স্বাদ পেতে৷ দু’দিন পাহাড়, দু’দিন জঙ্গলের কম্বো ট্রিপ- ডেস্টিনেশন লাটাগুড়ি ও চিবো৷
শিয়ালদহ থেকে কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেসে জলপাইগুড়ি বা এনজেপিতে না নেমে এগিয়ে গেলাম আরও একঘণ্টা পথ৷ মালবাজার স্টেশন৷ সেখান থেকে লাটাগুড়ি পৌঁছতে সময় লাগে মাত্র ২০-৩০ মিনিট৷ এখানে শুধুই সবুজের সমাহার৷ কখনও সারি সারি বৃক্ষের ঘন জঙ্গল, কখনও আবার গাঢ় সবুজ কার্পেট বিছানো চায়ের বাগান৷ আছে আঁকাবাঁকা পথে বয়ে চলা নদীর কলতান, মাঝেমধ্যে আবার মেঘ ছুঁয়ে থাকা পাহাড়ের ইশারা৷ মনকে বোঝানো দায়৷ সবকিছু খুব কাছ থেকে অনুভব করতে চায়৷ প্রকৃতির টানেই পথচলা৷
লাটাগুড়িতেই সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গা গরুমারা জাতীয় উদ্যান৷ গরুমারা জাতীয় উদ্যানে মোট পাঁচটি ওয়াচ টাওয়ার৷ যাত্রাপ্রসাদ, মেদলা, চুকচুকি, চন্দ্রচূড় ও চাপড়ামারি৷ জঙ্গলে গেলে দেখা মিলবে গন্ডার, হাতি, বাইসন, লেপার্ড, বিভিন্ন রকমের হরিণ, পাইথন, হনুমানের৷
মেদলা-তে মোষের গাড়িতে জঙ্গল সাফারি খুবই রোমাঞ্চকর৷ একদিকে চায়ের বাগান অন্যদিকে ঘন জঙ্গল, মাঝখানে সরু রাস্তা৷ মোষের গাড়িতে করে একরাশ আশা নিয়ে উদ্বিগ্ন চোখে চেয়ে থাকা, কখন দেখা যাবে হাতি কিংবা গন্ডার৷ সাপ, লেপার্ডের আতঙ্ক কিন্তু এড়ানো যাবে না৷ সাফারি শেষে দেখানো হয় ট্রাইবাল ডান্স৷ প্রকৃতির সঙ্গে নিজেকে আরও একাত্ম করতে চাইলে এটা মিস করা যাবে না৷ মেদলায় সবচেয়ে আকর্ষণীয় হল জঙ্গলের গা দিয়েই বয়ে চলা মূর্তি নদী৷ যা মূর্তি ও জলঢাকা নদীর সংগমস্থল৷ সেখানে প্রায়ই হাতি ও গন্ডারের নদী পারাপারের দৃশ্য চোখে পড়ে৷


নানারকমের জন্তুজানোয়ারের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের পাখির কলতান শুনতে চাইলে অবশ্যই যেতে হবে চুকচুকিতে৷ যাত্রাপ্রসাদ, চুকচুকি, চন্দ্রচূড় ও চাপড়ামারিতে জঙ্গল সাফারি হয় জিপে চড়ে৷ প্রথমদিন লাটাগুড়ি পৌঁছে যে কোনও দু’টি ওয়াচ টাওয়ার ঘুরে নেওয়া যায়৷ তবে হ্যাঁ, মেদলা ১২ মাস খোলা থাকে, কিন্তু বাকি ওয়াচ টাওয়ারগুলো ১৫ জুন থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বন্ধ থাকে৷ পরের দিন প্ল্যান মূর্তি নদী, ঝালং, বিন্দু, সামসিং, সুনতালেখোলা, রকি আইল্যান্ড৷
লাটাগুড়ির জঙ্গলের গা ঘেঁষে বয়ে চলা মূর্তি নদীকে খুব কাছ থেকে পেলে মন্দ লাগে না৷ ছোট্ট নদী যা গরুমারা ন্যাশনাল পার্কের গা দিয়ে বয়ে গিয়েছে এবং মিশেছে জলঢাকা নদীতে৷ নদীতে জলের গভীরতা খুবই কম৷ নদীর ঝকঝকে ঠান্ডা জলে পা ভেজানোর অনুভূতিই আলাদা৷ কিছুটা সময় মূর্তি নদীতে কাটিয়ে চাপড়ামারি জঙ্গলের মাঝখানের রাস্তা দিয়ে চলে গেলাম ঝালং৷
জলঢাকা নদীর গা ঘেঁষে ছোট্ট গ্রামের নাম ঝালং৷ জলঢাকা নদীর ওপর অবস্থিত হাইড্রো ইলেকট্রিসিটি প্রোজেক্ট ‘বিন্দু’৷ খুব কাছেই ভারত-ভুটান সীমান্ত৷ জলঢাকার ওপর এই হাইড্রো ইলেকট্রিসিটি প্রোজেক্ট ভারত ও ভুটানের মধ্যে যোগস্থাপন করে চলেছে৷ জলস্রোত বরফের মতো শুভ্র, চারপাশের শান্ত, কোমল পরিবেশে জলঢাকার তীক্ষ্ণ গর্জন মনে ভয়ের আবেশ ঘটায় তবু মন মানে না, ইচ্ছে করে আরও কাছ থেকে দেখি, দেখেই যাই৷ প্রকৃতির ভয়াবহ সৌন্দর্য মন ছুঁয়ে যায়৷ মূর্তি নদী পেরিয়ে কিছু দূর যেতে চারপাশে চোখে পড়ে অসংখ্য রবার গাছ, এবং গাছ থেকে রবার চাষ পদ্ধতি বেশ কৌতূহলসৃষ্টি করে৷ ঝালং থেকে সামসিং হয়ে সুনতালেখোলা৷
সামসিং এমন একটি জায়গা যেখানে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য চোখজুড়ানো৷ খুব শীতল, চিত্রানুগ স্থান৷ যেখানে চারপাশে শুধু চায়ের বাগান, মাঝে মাঝে বয়ে চলেছে ঝরনা, চা-বাগানের মাঝে একটা-দু’টো মাথা উঁচু করে থাকা গাছ, দূরে সবুজ পাহাড়, নীল আকাশ৷ ঠিক যেন ছবি৷ সৌন্দর্য পেরিয়ে পৌঁছলাম সুনতালেখোলা৷ সুনতালেখোলা একটা ছোট্ট ঝরনার নাম, তার ওপর এক অদ্ভুত ঝুলন্ত ব্রিজ৷ হাতে সময় থাকলে একদিন সেখানে থাকতেও পারেন৷ সামসিং থেকে ২ কিমি দূরে রকি আইল্যান্ড৷ সেখান থেকে মূর্তি নদী, জঙ্গল সমস্ত মিলিয়ে আবার প্রকৃতি তার রূপবদল করে হাজির৷
জঙ্গল, নদীর স্বাদ নিয়ে মন যখন পাহাড় ছুঁতে চায় পাড়ি দিলাম চিবো৷ লাটাগুড়ি থেকে তিন-চার ঘণ্টার পথ৷ সমতল ছাড়িয়ে পাহাড়ের কোলে ঠান্ডা-কোমল পরিবেশ, নির্জনতার ছোঁয়া পেতে পৌঁছলাম চিবো পাহাড়ে৷ কালিম্পং থেকে ৬ কিমি ওপরে৷ পাহাড়ের গায়ে নির্জন, নিরিবিলি ছোট্ট গ্রাম৷ চারপাশে শুধুই মেঘে ঢাকা পাহাড়, ঘন ঝাউয়ের জঙ্গল, বয়ে চলা ঝরনা, আর রংবেরঙের ফুল৷ এখান থেকে দেখা মেলে কাঞ্চনজঙ্ঘা রেঞ্জ৷ ক্ষণে ক্ষণে প্রকৃতির রূপ পরিবর্তন, কখনও ঘন কালো মেঘ, কখনও বৃষ্টি, কখনও আবার হালকা রোদ৷ জঙ্গল পেরিয়ে হালকা শীতে পাহাড়ের নির্জনতা একাকিত্বকে বরং দূরেই সরিয়ে দেয়৷ মনে স্মৃতির হাতছানি, কখনও আবার সকলে মিলে জমিয়ে আড্ডায় পাহাড় জমজমাট৷


পরের দিন সকালে সাইটসিয়িং৷ পাইনভিউ নার্সারি, হনুমান মন্দির, ডেলো হিল, দুরপিন দারা মনাস্ট্রি৷ পাইনভিউ নার্সারিতে হরেকরকম ক্যাকটাস, তাদের বিচিত্র গঠন৷ তারপর ৩০ মিনিট পথে পাহাড়ের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে গেলাম ডেলো পাহাড়ে৷ পাহাড়ের গায়ে ডেলো পার্কে ঝাউয়ের জঙ্গল, সাজানো বাগান, পার্ক থেকে পাহাড়ের শোভা সব মিলিয়ে অপূর্ব৷ এরপর হনুমান পার্ক ও দুরপিন দারা মনাস্ট্রি ঘুরে সন্ধেবেলা ফেরা৷ পরের দিন চিবো থেকে রওনা দিয়ে এনজিপি৷ সময় লাগে ৫-৬ ঘণ্টা৷ তবে হাতে যদি ছুটি বেশি থাকে কালিম্পং থেকে যাওয়া যায় গ্যাংটক, দার্জিলিং, চারধাম, লোলেগাঁও৷ পাহাড়, জঙ্গল মিলিয়ে অল্প ছুটিতে এই ছোট্ট ট্রিপ মন ভাল করতে বাধ্য৷

কীভাবে যাবেন: লাটাগুড়ি যেতে গেলে শিয়ালদহ থেকে কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেসে নিউ মাল জংশন৷ অথবা যে কোনও ট্রেনে (পদাতিক, দার্জিলিং মেল, তিস্তা-তোর্সা) এনজিপি পৌঁছে সেখান থেকে গাড়িতেও লাটাগুড়ি যাওয়া সম্ভব৷

কোথায় থাকবেন: লাটাগুড়িতে থাকার জায়গা অনেক৷ থাকতে পারেন অরণ্য রিসর্ট-এ৷ জঙ্গলের কোলে এখানে থাকার ব্যবস্হা খুবই উন্নত ও নিরাপদ৷ জঙ্গলের সমস্ত রোমাঞ্চিত মুহূর্তের সম্মুখীন হতে চাইলে এই রিসর্ট সেরা৷ কালিম্পং-এ থাকুন চিবো ইন-এ৷ পাহাড়ের গায়ে একটা পুরো বাড়ি নিজেদের৷ পাহাড়ের নির্জনতায় সকলে মিলে নিজেদের মতো করে কাটানো যায়৷

কী খাবেন: লাটাগুড়িতে অবশ্যই খান বরোলি মাছ৷ তিস্তার জলে এই মাছ বড়ই সুস্বাদু৷ তবে দুর্লভও বটে৷ পেলে অবশ্যই খাবেন৷ চিবোতে পাহাড়ের হালকা ঠান্ডায় ধোঁয়া ওঠা মোমো, ফ্রায়েড চিকেন বেশ তৃপ্তিদায়ক৷
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই ডিসেম্বর, ২০১৬ রাত ১০:৫২
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

”আমার রাজনীতির রূপরেখা” -- জিয়াউর রহমান

লিখেছেন প্রামানিক, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:০০


শহীদুল ইসলাম প্রামানিক
আমি তখন দৈনিক দেশ পত্রিকায় চাকরি করি। এটা আমার দ্বিতীয় চাকরি। প্রথম চাকরি নিয়েছিলাম ব্রিটিশ আমলের প্রকাশিত দৈনিক আজাদ পত্রিকায়। আজাদ পত্রিকাটি ব্রিটিশ আমলে মুসলমানের পক্ষের একমাত্র... ...বাকিটুকু পড়ুন

শহীদ জিয়া ২৭ মার্চের ভাষণে 'জয় বাংলা' বলেছিলেন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:১১





সূত্রঃ আমার রাজনীতির রূপরেখা
লেখকঃ জিয়াউর রহমান
পৃষ্ঠাঃ ১৭৭

...বাকিটুকু পড়ুন

ওরা জিডিপি আর সেমিকন্ডাক্টরে ব্যস্ত , আমরা ব্যস্ত গোরুর জিয়াফত নিয়ে ....।

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৩৫


গতকাল মামার ফোন এল দুবাই থেকে, রাতের বেলা। বললেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে গরু জবাই করে জিয়াফত খাওয়ার খবর এখান পর্যন্ত পৌঁছে গেছে, ব্যাপার কী? আমি বললাম, মামা, ওরা গরুর মাংস... ...বাকিটুকু পড়ুন

মীর জাফর ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঐতিহাসিক চুক্তি! যে চুক্তির জন্য বাংলার স্বাধীনতার সূর্য ২০০ বছরের জন্য অস্তমিত হয়েছিল!

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৪২


আমরা পলাশী যুদ্ধের কথা জানি। কিন্তু এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে যে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি হয়েছিল মীরজাফর ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্ণধার লর্ড ক্লাইভের এর সাথে সেটা সম্পর্কে খুব কমই... ...বাকিটুকু পড়ুন

যার যার ধর্ম, তার তার উৎসব....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:১০


যার যার ধর্ম, তার তার উৎসব....

“ধর্ম যার যার, উৎসব সবার”- শুনতে চমৎকার, জনপ্রিয়ও বটে। কিন্তু কথাটি কি ধর্মীয় বিশ্বাসের বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সংগতিপূর্ণ?
আমার কাছে তা নয়। এধরণের বাণী... ...বাকিটুকু পড়ুন

×