![]()
বুবুর সংসারে আমি হোলাম একজন অবাঞ্চিতের মতো আশ্রয়ী। বুবুর অশেষ করুনায় এই অধমের একটা থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। না হলে ফুটপাথেই দিনযাপন করতে হতো। আমার আয় রোজগার বলতে সামান্য দুইটা টিউশন করে মাসে পাই মাত্র পাঁচ হাজার টাকা। তাও আবার বুবুর সংসারে থাকি বলে খাওয়ার খরচ বাবদ বুবুর খরচের খাতে জমা দিয়ে দিতে হয়। অবশ্য আমার হাতখরচের জন্য বুবু আমাকে কিছু সালামী দেন। তাও বুবুর মহানুভবতা দেখে সেই সালামী আমি বিনা শ্রমে নিতে লজ্জা পাই বিধায়, বুবুর হাজারো অনিচ্ছা থাকা স্বত্বেও; বুবুর কাপড় চোপড় গুলো ধুয়ে দেই। আমার বুবু খুব সাধারন একজন মহিলা। পোশাক বলতে খাঁটি দেশজ শাড়ি। দেশজ শাড়ি বলেই যে, সস্তা হবে সেটা ভাবার কোন অবকাশ নেই। সবগুলো শাড়িই অনেক দামী। তাই আমাকে অত্যন্ত সাবধানতা অবলম্বন করেই ধুতে হয় সেগুলো। নতুবা পান থেকে চুন খসলেই আর হাতখরচ পাওয়া যাবেনা।
বুবুর সংসারে আমার জন্য বিশেষ স্বাধীনতা হলো অনেক বেলা পর্যন্ত ঘুমাতে পারা। কিন্তু আজ বুবুর হাক ডাকের কারনে খুব ভোরেই ঘুম ভেঙে গেল। এমনিতে আমার বুবু একজন পরহেজগার মহিলা। মাথায় সবসময় ঘোমটা পরেন যেন চুলগুলো দেখা না যায়। হাতে তজবী থাকে সবসময়। কিন্তু আজ বুবুকে দেখে আমার নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিনা। মাথায় ঘোমটার লেশ মাত্র নেই। মনে হচ্ছে যেন এইমাত্র বিউটি পার্লার থেকে সাজুগুজু করে এসেছেন। কিন্তু এত ভোরে পার্লার খোলা থাকার কথা না ! অবশ্য বুবু চাইলে সবই সম্ভব। তিনি অশেষ ক্ষমতার অধিকারিণী। তিনি চাইলে চব্বিশ ঘন্টা পার্লার সার্ভিস চালু থাকবে। জানতে চাইলাম বুবু এত ভোরে ? কোন পার্টি আছে কিনা ?
বুবু বলল বেশি কথা না বলে যেন জলদি তৈরি হয়ে নেই। এক্ষুনি বুবুর সাথে নেপচুন গ্রহে যেতে হবে। এত জায়গা থাকতে নেপচুন গ্রহে কেন যাবেন ? অবশ্য বুবু বিনা কারনে কোন কিছুই করেন না। তিনি যা করেন সংসারের ভাল মন্দের কথা বিবেচনা করেই করেন। তাই কোন প্রশ্ন না করে তৈরি হয়ে নিলাম। নেপচুন গ্রহে যাওয়ার এমন সৌভাগ্য আর হয়ত জীবনে নাও হতে পারে। এই জীবনে খুব শখ ছিল একবার সুন্দরবন ঘুরে আসব কিন্তু সেটাই যখন আর হলো না তখন নেপচুন গ্রহে যাওয়ার এমন লোভনীয় প্রস্তাব কিছুতেই হাত ছাড়া হতে দেয়া যায়না।
কিন্তু বুবুর যাত্রার জন্য নেপচুন গ্রহ থেকে কোন রকেট পাঠানো হল না। তবু যেতে হবে। বুবুর মান সন্মান বলে কথা। তাই বুবু তার দক্ষিন অঞ্চলের জায়গাটুকু বেঁচে দিলেন। বুবুর বুদ্ধির প্রশংসা না করেই পারিনা। জায়গা বেচলেন তাও মঙ্গল গ্রহের কাছে। পাছে নেপচুনের কাছে বেচলে যদি জাত চলে যায়! যাই হোক রকেটের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমি বুবুর সাথে রকেটে চড়ে বসেছি। রকেটে আমাদের নিয়ে উড়ে চলেছে।
রকেটের ভেতর আমি আর বুবু। এমনিতেই বুবুর খুব ঘন কথা বলার অভ্যাস রয়েছে। এখন রকেটে সময় না কাটার কারনে যেন ঠাকুরমার ঝুলি খুলে বসেছেন। আর আমার মতো একজন বুবুর একনিষ্ঠ শ্রোতা পেয়ে যেন কথা বলার উৎসাহ আরও বেড়ে গেল। বুঝলি অপু এই বুবু যেদিন থাকবেনা সেদিন বুঝবি তোর বুবু কি ছিল। আমি দেখেই রকেটে চড়তে পারলি। এখন থেকে ইচ্ছে হলেই রকেটে করে যে কোন গ্রহে ঘুরে আসতে পারবি। তোর মতো বোকা না হলে কি বনে বাদারে কোন মানুষ ঘুরে বেড়ায় নাকি! ঘুরে বেড়াতে হলে চলে যাবি প্লুটো অথবা প্ল্যানেট এক্সে। ওখানে এলিয়েন আছে। দেখবি গেলেই তোকে কত সমাদর করে। এলিয়েনরা হলো আমাদের প্রভুর মতোই। আমাদের আদি স্বত্বা। তাই যত উনাদের কাছাকাছি থাকবি ততই সংসার জীবনের জন্য মঙ্গলকর। এখন তুই যেয়ে ঘুমা। আমি একটু খাওয়া দাওয়া করব।
আমার ঘুমুতে যাওয়ার সঙ্গে বুবুর খাওয়া দাওয়ার সম্পর্কটা রহস্যের মতো ঠেকল। কি এমন খাবেন যে লুকিয়ে খেতে হবে। তবু বুবুর আদেশ শিরোধার্য। তাই কথা না বাড়িয়ে ঘুমাতে চলে গেলাম। কিন্তু আসলে ঘুমের অভিনয় করে পেছন থেকে উঁকি দিয়ে রইলাম কৌতূহল দূর করার জন্য। কৌতূহল বা সন্দেহ যাই বলি না কেন খুব খারাপ রোগ। এই যেমন উঁকি দিয়ে যা দেখতে পেলাম সেটা আমার জন্য খুব হিতকর নয়। কৌতূহল না থাকলে এমন একটি দৃশ্য দেখতে হতো না। এই জিনিস জীবনে আমি এই প্রথম দেখলাম। তরল জাতীয় একটা পানীয়। এই জাতীয় পানীয়র সাথে আমি পরিচিত নই। খাওয়ার পর থেকেই দেখলাম বুবু যেন আমার ষোল বছরের কিশোরীর মতো রূপের অধিকারিণী হয়ে গেলেন। বুবুর বয়স ঠিক কত হবে তা আমার জানা নেই। কিন্তু আমার সমান একটি ছেলে ও মেয়ে আছে বুবুর। খালু মারা যাওয়ার পর বুবুর ছেলে-মেয়েরা প্রবাসেই জীবন যাপন করে আসছে। অবশ্য এটা বুবুর পারিবারিক ঐতিহ্য। প্রবাসে জীবন যাপন করাকেই তিনি অধিকতর মঙ্গল জনক বলে বিশ্বাস করেন। অনেকেই অবাক হয় যে বুবুর স্বামীকে কেন আমি খালু বলে ডাকি? আমি নিজেও মাঝে মাঝে এই সম্পর্কের হিসাবটা মেলাতে পারিনা। এই হিসাব আমার কাছে বড়ই জটিল লাগে! তাই কে যে খালু আর কে যে বুবু সেটা বুঝে উঠতে পারি না।
রকেটের ভেতর থাকলে একটা সমস্যা। বাইরের কিছুই চোখে পরে না। পুরো আবদ্ধ অবস্থায় থাকতে হয়। সাথে করে ক্যামেরা নেয়ার পরেও কোন ছবি তুলতে পারছিনা। খুব ইচ্ছে ছিল উপর থেকে পৃথিবীর একটা ছবি তোলার কিন্তু সেটা আর হলো না। তবে বুবু নির্দেশ দিয়ে দিয়েছেন যেন উনাকে ছাড়া অন্য কোন ছবি না তোলা হয়। বুবু যাই করবেন তারই ছবি তুলতে হবে। বুবুর ছেলে বুবুর জন্য বিলেত থেকে এই ডিজিটাল ক্যামেরাটা পাঠিয়েছেন। সেখানে অন্য কোন ছবি তোলার প্রশ্নই আসেনা। বুবু আয়েশ করে একটা পান মুখে দিলেন। সাথে সাথে ঠোঁট রক্তাক্ত লাল বর্ণ ধারন করল। বুবু বলল কইরে অপু ? তোল তোল আমার ঠোঁটের একটা ছবি তোল। আমি বাম থেকে, ডান থেকে বিভিন্ন এঙ্গেলে বুবুর পান খাওয়া ঠোঁটের ছবি তুলছি।
ফটোশেসন শেষ হবার আগেই আমাদের রকেট নেপচুনের মাটিতে এসে থামল। কাঁধে ক্যামেরা ঝুলিয়ে আমি রকেট থেকে বুবুর পেছন পেছন নেমে এলাম। আমাদের রিসিভ করতে নেপচুন গ্রহের রাজা ইয়াংশু তার খানসামা অতিশুকে পাঠিয়েছেন। রাজা নিজে আসেন নি সেটা হয়ত মেনে নেয়া যেতে পারে কিন্তু বুবুর মত এত সন্মানী একজন মানুষকে রিসিভ করতে সামান্য খানসামাকে কেন পাঠানো হলো ? নেপচুনের সেনাপতি এলেও সান্তনা পাওয়া যেত। খানিক পরে বুঝলাম। এখানের রীতি হলো নেপচুনে যে যেই উদ্দেশ্য নিয়ে আসে তার জন্য তেমন রাজকীয় ব্যবস্থাই গ্রহন করা হয়। বুবুর উদ্দেশ্যটা অবশ্য আমি নিজেও পরিষ্কার ভাবে জানিনা। তাই আগ থেকেই কিছু অনুমান করতে পারছিনা। অবশ্য ভোজন রসিক হিসেবে বুবুর বেশ খ্যাতি রয়েছে। হয়ত নেপচুনের রাজা এমনটাই ধরে নিয়েছেন।
আমরা খানসামার সাথে ইয়াংশু রাজার রাজমহলে প্রবেশ করলাম।
পুরো নেপচুন গ্রহে ইউক্যালিপটাস গাছ দেখে বুবুর মন প্রাণ জুড়িয়ে গেল। ফাঁকে ফাঁকে গাছের সাথে নিজেকে জড়িয়ে ধরে কিছু ছবিও তুলিয়ে নিলেন আমাকে দিয়ে। এমন অঙ্গভঙ্গি করে ছবি তুললেন যেন সিনেমার নায়িকায়েও হার মানায়! বাড়ি ফিরে গিয়ে একটা ইউক্যালিপটাসের বাগান করার ইচ্ছে পোষণ করলেন বুবু। এই নিয়ে রাজ্যের মালীর সাথে একটা অল্প পরিসরের বৈঠকও সেরে নিলেন। চুক্তি হলো যে নেপচুন থেকে এলিয়েনরা গিয়ে বুবুর বাড়িতে বাগান করে দিয়ে আসবে। বিনিময়ে বুবুকে তার পুকুরের চাষের থেকে কিছু তেলাপিয়া মাছ তাদের দিতে হবে। বুবু যেন মেঘ না চাইতেই জল পেলেন। তাই অল্প কিছু তেলাপিয়া মাছের বদলে আবেগের বশবর্তী হয়ে পুরো পুকুর দিয়ে দেয়ার জন্য চুক্তি বদ্ধ হয়ে গেলেন। পেছনে দাঁড়িয়ে থেকে বুবুর বুদ্ধির প্রশংসা না করেই পারলাম না। ক্যামেরা দিয়ে এই ঐতিহাসিক চুক্তি সাক্ষরের ছবি তুলে রাখলাম। যেন স্মৃতি হয়ে চিরদিন বুবুর মানসপটে অবস্থান করার সুযোগ পাই। অবশ্য হাতখরচটাও এই সুযোগে বাড়িয়ে নেয়া যাবে।
রাজদরবারের মাঝে বিশাল এক জলাধার। এলিয়েন রাজা ইয়াংশুর সিংহাসনের কাছে যাওয়ার জন্য মাঝে একটা সেতু রাখা হয়েছে। পুরো সেতু কসমিক রশ্মি দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। সেতু দেখে বুবুর চোখে জল চলে এসেছে। বুবুর মনের কথা ইয়াংশু রাজা বুঝতে পারলেন। কিন্তু রাজাও কম চতুর নন। তিনি বুবুকে বললেন আপনি আমাদের অতিথি হয়ে এসেছেন। আগে আসুন খাওয়া দাওয়ার পর্বটা সেরে নিন। তারপর আপনাকে পুরো নেপচুন ঘুরিয়ে দেখান হবে। কিন্তু দয়া করে এই সেতুর উপর চড়বেন না। এটা কোন মানুষের জন্য তৈরি করা হয়নি। এখানে শুধু মাত্র এলিয়েনরাই হাটতে পারে। কোন মানুষের পক্ষে হাটা সম্ভব নয়। কারন মানুষরা মাটি দিয়ে তৈরি। আর মাটির এমন কিছু পদার্থ আছে যার সাথে কসমিক রশ্মির বিক্রিয়া অত্যন্ত বিপদ জনক। সাস্থের জন্য ক্ষতিকারক।
রাজার এমন কথায় বুবু মনে প্রচন্ড আঘাত পাওয়ার বদলে যেন বরং খুশিই হলেন। বুবু রাজার কাছে মাটির বদনাম শুরু করে দিলেন। আসলেই মহামান্য রাজা ইয়াংশু দেখুন না, আমরা মারা যাওয়ার পর আমাদের মাটি চাপা দেয়া হয়। কেন আমাদেরকেও যদি এলিয়েনদের মতো করে হিমাগারে কাঁচের ঘরের ভেতর ফরমালিন দিয়ে রাখা হতো তাহলে আমরাও অমরত্বের সাধ পেতাম। এই কথা শোনার পর রাজা অট্টহাসিতে ফেটে পরলেন। রাজার সেই হাসিতে বুবুর প্রতি পরিহাস নয় বরং করুনা লক্ষ্য করলাম।
যাই হোক আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো খাবার টেবিলের কাছে। রাজকীয় সব খাদ্যের আয়োজন করা হয়েছে। আমি আর বুবু খুব আয়েশ করে খেতে বসেছি। কোনটা রেখে কোনটা খাবো এমন এক অবস্থা। তাই ভেবে পাচ্ছিনা। খাওয়া দাওয়ার পর্ব শেষ হতেই রাজা ইয়াংশু বুবুর মাথায় মুকুট পরিয়ে দিলেন। নূড়ি পাথর দিয়ে তৈরি মুকুটে বুবুকে স্বর্গের অপ্সরার মতোই লাগছিল। মুকুট পরা অবস্থায় রাজার পাশে দাঁড়ানো অবস্থায় বুবুর একটা ছবি তুলে রাখলাম। এই ছবিটা বাড়ি ফিরে আমি নিজ খরচে বুবুকে বাঁধাই করে উপহার হিসেবে দিব বলে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম। হাজার হোক আমার মতো এক অধমকে নেপচুন গ্রহে ভ্রমন করিয়ে সৌভাগ্যের যে দরজা বুবু খুলে দিলেন, তার জন্য আমি চিরঋণী হয়ে রইলাম আমার বুবুর কাছে।
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে মে, ২০১৫ রাত ১১:৩৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



