
চিত্রঃ MIRA SCHOR
খুন কখনও ঝোঁকের বশে করতে নেই। খুন করতে হয় অত্যন্ত সূক্ষ্ম পরিকল্পনা নিয়ে। ঠাণ্ডা মাথায়। খুন করার পর কোনরূপ অনুশোচনায় ভোগা যাবেনা। খুন করার পর যদি থানায় গিয়ে পুলিশের কাছে কান্নাকাটি করে আত্মসমর্পণ করা লাগে তাহলে সেই খুন করার কোন অর্থ আর থাকেনা। খুন করে নির্লিপ্ত থাকতে পারার মাঝেই প্রকৃত সার্থকতা। খুন করা অত্যন্ত শৈল্পিক একটি ব্যাপার। খুন চাইলেই সবাই করতে পারেনা। আমি আজকে রাতে একটা খুন করবো।
লিংকন আমার খুব ভাল একটি বন্ধু। গতকালই বিয়ে করেছে। সন্ধ্যায় চায়ের দোকানে বসেছি আড্ডা দিতে। মাইকেল গেছে লিংকনকে বাসা থেকে নিয়ে আসার জন্য। এতবড় ছেলেকে বাসায় গিয়ে নিয়ে আসার কোন মানে হয়না। কিন্তু লিংকনের ব্যাপারটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। ওকে ওর পরিবার থেকে শুরু করে বন্ধু মহল সবাই ছোট বাচ্চাদের মতো করে স্নেহ করে। এর বিশেষ কারণ হলো ওর মস্তিষ্ক বিগত কয়েক বছর যাবত বাচ্চাদের মতো আচরণ করতে শুরু করেছে। এমন এক অবস্থা যে টয়লেটে গেলেও বাড়ির সবাই অস্থির হয়ে পড়ে। এই বুঝি ছেলেটা টয়লেটের মধ্যে পা পিছলে পড়ে গেলো।
আমি একটা সিগারেট ধরিয়ে খুনের পরিকল্পনাটা নিয়ে ভাবছি। মায়াকে বলে দিয়েছি যেন বিউটি পার্লার থেকে বউ সেজে বাসায় অপেক্ষা করে। মায়া, আমার স্ত্রী। আজকে আমাদের বিবাহ বার্ষিকী। আমরা পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করেছিলাম। প্রেমের সফল পরিণতি যাকে বলা যেতে পারে। যদিও সেটা ছিলো আমাদের উভয়ের জন্যই বিরাট দুঃসাহসিক একটা কাজ। কিন্তু আমাদের জন্য আসলে পালিয়ে বিয়ে করা ছাড়া অন্য কোন উপায়ও আর ছিলোনা। মায়াকে খুব বেশী রূপসী বলা যাবেনা। কিন্তু ওর নামের সাথে চেহারার ভীষণ মিল রয়েছে। ওকে দেখলেই মায়ার বাঁধনে জড়িয়ে যেতে মন চাইবে। ভীষণ মায়াবী একটা চেহারা। গোধূলি আকাশের মতোই মায়াবী। অপার্থিব একটা আকর্ষণ রয়েছে।
মাইকেল লিংকনকে সাথে করে নিয়ে এসেছে। কিন্তু তাতে বিশেষ লাভ হলোনা। আজকে আর লিংকনের সাথে আড্ডা দেয়া হলোনা। আসার সাথে সাথেই বাড়ি থেকে ওর ফোন এসেছে। ওকে এক্ষুনি বাড়ি ফিরে যেতে হবে। নতুন বউয়ের সৌজন্যে চটপটি রান্না করা হয়েছে। লিংকনকে বউয়ের সাথে বসে চটপটি খেতে হবে। আমি আর মাইকেল ওকে একটা রিক্সায় উঠিয়ে রিক্সা ওয়ালার হাতে ভাড়া বুঝিয়ে দিলাম। সাথে ওর হাতে একটা সিগারেট ধরিয়ে দিলাম। রিক্সায় বসে থাকা লিংকনকে দেখে মনে হচ্ছে যেন বেহেশত থেকে কোন ফেরেশতা নেমে এসে পৃথিবীর রিক্সায় চড়ে বসেছে। কোন পুরুষ মানুষ এত সুন্দর হতে পারে আমার ধারণার বাইরে। আল্লাহ পাক মনে হয় তাঁর সমস্ত রূপ ওর মধ্যেই দিয়ে দিয়েছে। এই মুহূর্তে যে কোন মেয়েই লিংকনকে দেখলে প্রেমে পাগল হয়ে যাওয়ার দশা হবে। বন্ধু আমার উদাস ভঙ্গীতে আকাশের দিকে তাকিয়ে সিগারেট টানছে। লিংকনের চলে যাওয়ার পর আমিও মাইকেলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমার বাড়ির দিকে রওনা হোলাম।
মায়াকে বউ সাজে অপূর্ব লাগছে। বিয়ের সময় বেচারী বউ সাজতে পারেনি। প্রতিটা মেয়ের জীবনেই একবার বউ সাজার খুব শখ থাকে। কিন্তু মায়ার জীবনে সেটা পূরণ হয়নি। হয়ত আমার সাথে এভাবে পালিয়ে বিয়ে না করলে ওর জীবনের এই শখ থেকে বঞ্চিত হতে হতোনা। মায়া আমাকে দেখেই জড়িয়ে ধরলো। আমিও ওকে বুকের কাছে জড়িয়ে ধরে ওর রাঙা ঠোঁটে চুমু খেলাম।
কী ব্যাপার তুমি আমার জন্য কিছু আনোনি ?
হ্যাঁ এনেছিতো।
কই দেখাও কি এনেছো ?
এখনই দেখাবোনা। তার আগে তুমি আজকে নাচবে; তারপর তোমার উপহার পাবে।
কি বলছো ! নাচবো মানে ?
হ্যাঁ তুমি আজকে রাতে নাচবে। আমি তোমার নাচ দেখে মুগ্ধ হবো। তুমি নাচতে নাচতে তোমার শাড়ি খুলে ফেলে একদম নগ্ন হয়ে যাবে। আমি তোমাকে খুব করে তখন আদর করবো।
যাহ !
যাহ ! নয়। তোমাকে সত্যি সত্যি আজকে রাতে নাচতে হবে। আমি রাজা বাদশাহদের মতো করে বসে থেকে তোমার নাচ দেখবো।
মায়া আমার চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। আমার চোখে এই মুহূর্তে কি কাজ করছে সেটাই বোঝার একটা চেষ্টা। ওর নিঃশ্বাস ক্রমশ উষ্ণ হয়ে আসছে।
কই নাচা শুরু করে দাও !
মায়া নাচছে। আমি বসে বসে মায়ার নাচ দেখছি।
লিংকনের প্রথম স্ত্রী নাচের শিল্পী ছিলো। মেয়েটা যেমন নাচতে পারতো, তেমনই ছিলো রূপ। মেয়েটার এমনই রূপ ছিলো যে চেহারার দিকে তাকানো যেত না। তাকালেই চোখ ঝলসে যাওয়ার উপক্রম হতো। প্রকৃতি সব সময় তাঁর ভারসাম্য রক্ষা করে চলে। এই কারণেই হয়তো দুইজন অপরূপ রূপের অধিকারী মানুষ এক হয়েও শেষ পর্যন্ত আর একসাথে টিকে থাকতে পারেনি। ওদের বিবাহিত জীবনের ইতি ঘটাতে বাধ্য হয়। লিংকনের একটা মেয়ে আছে। মূলত মেয়েটার জন্যই ওকে আবারও বিয়ে করতে হলো। তবে এবার প্রকৃতি তাঁর ভারসাম্য ঠিকই রক্ষা করেছে। ওর প্রথম স্ত্রীর নাম ছিলো কেয়া। মাঝেই মাঝেই লিংকন কেয়ার কথা খুব বলে। কেয়াকে কখনও হয়ত ওর পক্ষে ভোলা সম্ভব হবেনা। তবে সময় মানুষকে সবকিছু ভুলিয়ে দেয়। হয়ত লিংকন একসময় কেয়াকে সম্পূর্ণ ভুলে গিয়ে সুখের সংসার গড়তে পারবে।
মায়া নাচতে নাচতে ওর পরনের লাল শাড়ি খুলে ফেলে সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে গেছে। এখনই সময়। সবকিছুই পরিকল্পনা অনুযায়ী এগুচ্ছে। আমি ওকে বুকের কাছে জড়িয়ে ধরে ছুরিটা একদম গলায় বসিয়ে দিলাম। ওর রক্তে আমার পুরো মুখ ভিজে গেলো। মেঝেতে পড়ে গিয়ে থর থর করে কাঁপছে মায়ার পুরো নীথর শরীরটা। মায়ার চোখ আমার দিকে বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। এই চোখের আকর্ষণেই একদিন আমি ওকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম। নাহ ! কিছুতেই আজকে আর এই চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারছিনা। ছুরি দিয়ে ওর চোখ দুটি উপড়ে ফেললাম। বেসিন থেকে মুখ ধুয়ে এসে একটা সিগারেট ধরিয়ে বসেছি মায়ার রক্তাক্ত মৃত শরীরের পাশে।
আজকে হঠাৎ করেই রাতে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ঝির ঝির বৃষ্টি। এমন বৃষ্টি হলে সারারাত ধরেই এভাবেই বৃষ্টি হতে থাকবে। যদি মুষল ধারে বৃষ্টি হতো তাহলে কিছুক্ষণ হয়েই থেমে যেতো। কিন্তু এই বৃষ্টি দেখেই বোঝা যাচ্ছে আজকে রাতে আর বৃষ্টি থামছে না। ঠাণ্ডা বাতাসও বইতে শুরু করে দিয়েছে। বেশ শীত শীত লাগছে। আজকের রাতটা লিংকনের খুব ভাল ভাবেই কাটবে। নতুন বউয়ের শরীরের সাথে শরীর মিলিয়ে ঘুমাবে। তৃপ্তির ঘুম। আহ ! এমন ঘুম কতদিন ঘুমাইনা। আমি মায়ার নগ্ন মৃত শরীরের পাশে শুয়ে কিছুক্ষণ ওকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে থাকলাম। লিংকন একবার ওর স্ত্রী কেয়ার এক নাচের অনুষ্ঠানে আমকে নিয়ে গিয়েছিলো। সেখানেই কেয়ার সাথে আমার প্রথম পরিচয়। কেয়ার নাচ দেখে আমার কাছে মনে হচ্ছিলো যেন কোন স্বর্গের দেবী নাচের মুদ্রার মাধ্যমে স্বর্গের বর্ণনা নিখুঁত ভাবে প্রকাশ করছে। স্বর্গে যাওয়ার আগেই যদি স্বর্গের পরিতৃপ্তি পাওয়া যেতো ! নাচ শেষ হবার পর অনুষ্ঠানে উপস্থিত দর্শকরা সবাই যখন করতালি দিচ্ছিলো আমি তখন মনে মনে ভাবছিলাম শালা ! লিংকনকে যদি কখনও খুন করতে পারতাম তাহলে আমার মনঃটা শান্ত হতো। ওকে খুন করে দেবীর পায়ে বলির ভেট দিয়ে পূণ্য লাভ করতে পারতাম।
শরীরে ভীষণ কাঁপন অনুভব করছি। এক কাপ চা খেতে পারলে এই মুহূর্তে মন্দ হতোনা। কিন্তু এখন নিজে নিজে চা বানিয়ে খেতে ইচ্ছা করছেনা। মায়া বেঁচে থাকলে ওকে বললেই চা বানিয়ে দিতো। আমার খুব চায়ের নেশা। তাই কখনও চাওয়া বা না চাওয়ার আগেই মায়া আমাকে চা করে দিতে কুণ্ঠিত হয়নি। খুব ভুল হয়ে গেছে মায়াকে মারার আগে ওর হাতের এক কাপ চা শেষবারের মতো খেয়ে নেয়া উচিৎ ছিলো। যাই হোক এখন নিজের চা নিজেকেই বানিয়ে খেতে হবে। আমি চা বানিয়ে এনে একটা সিগারেট ধরিয়ে মায়ার সামনে এসে বসেছি। আমার এই ঘন ঘন সিগারেট খাওয়া নিয়ে ছিলো ওর যত আপত্তি। অবশ্য শুধু সিগারেট কেন আরও অনেক কিছুইতেই ওর আপত্তি ছিলো। আমার বাবা-মার প্রতিও ওর অভিযোগের কমতি ছিলোনা। ঠিক একই ভাবে ওর প্রতিও আমার বাবা-মায়ের অভিযোগের কমতি ছিলো না কোনদিন। আজ থেকে সকল অভিযোগের সফল সমাপ্তি করে দিয়েছি। এবার মায়া তুমি পারলে আমার সিগারেট খাওয়া বন্ধ করে দেখাও পারলে। একের পর এক সিগারেট টানছি আর মায়ার মৃত শরীরে সেইসব জ্বলন্ত সিগারেট নিভাচ্ছি। মনের ভেতর একটা পৈশাচিক আনন্দ কাজ করছে।
বাইরে বৃষ্টির তীব্রতা কিছুটা বেড়েছে। আমার বার বার লিংকনের আজকের সন্ধ্যার চেহারাটা খুব মনে পড়ছে। কেয়ার সাথে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ার পর থেকেই বেচারার মাথাটাই কেমন যেন বিগড়ে যেতে শুরু করলো। শেষ পর্যন্ত ছেলেটার মাথা পুরোই এলোমেলো হয়ে গেলো। এখন ওর আচরণ পুরোই বাচ্চাদের মতো। মাঝে মাঝে অবশ্য বিরাট দার্শনিকদের মতো কথা বলতে শুরু করে দেয়। মানুষকে নাকি চার মাত্রার এক ভিন্ন জগত বানাতে হবে। যেখানে মানুষের সবকিছু তার নিয়ন্ত্রণে থাকবে। আবেগ, অনুভূতি, ক্ষোভ, ঘৃণা, ভালোবাসা, রাগ, অভিমান, সুখ, দুঃখ সবকিছুই মানুষের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। তবেই মানুষের শরীর পাবে চির মুক্তি। ওর মেয়েটাকে নাকি এখন থেকেই চার মাত্রার জগত তৈরি করে দেবে। যেন বেঁচে থাকার কোন গ্লানি ওর মেয়ের ভেতর কখনওই কাজ না করে। আমরা বন্ধুরা ওর এইসব কথা শুনে খুব হাসাহাসি করি। কিন্তু আজকে আমার মনে হচ্ছে আসলে ওর কথাই ঠিক।
চার মাত্রার একটা জগত কেমন হতে পারে ? ছুরি দিয়ে মায়ার শরীর কেটে কেটে তারই একটা চিত্র আঁকার চেষ্টা করছি। প্রথমে বুকের অংশটা কেটে নেয়া যাক। মেয়েদের বুকের সৌন্দর্য থেকে পুরুষদের পরিত্রাণ পাওয়ার মাঝে হতে পারে দ্বিতীয় ধরণের মুক্তি। চোখ হলো মুক্তির প্রধান অঙ্গ। এটাকেতো উপড়ে ফেলেছিই। এবার হাত, তারপর পা। এবার নিতম্বের অংশটুকুও কেটে ফেলা যাক। নাচের কিছুটা মোহ এই অংশটাতেও কাজ করে অনেকাংশেই। মাথার চুলগুলো শুধু বাদ থাকুক। কিছু স্মৃতি ধরে রাখা উচিৎ। নতুবা মস্তিষ্ক নতুন দিনের প্রত্যয় নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে বার বার পথচলায় হোঁচট খাবে। মায়ার নাভিটা ভীষণ সুন্দর। সকল সৌন্দর্যের কেন্দ্রস্থলকে কেটে দিতে পারলেই কেবল মাত্র চার মাত্রার জগত তৈরি করা সম্ভব। নাভির উপর ছুরিটা গেঁথে দিয়ে একটা সিগারেট ধরিয়েছি।
হঠাৎ মোবাইলটা বেজে উঠলো। মোবাইলের রিংটোনটা মায়াই বেছে দিয়েছিলো।
বধূয়া আমার চোখে জল এনেছে হায় ! বীনা কারণে ...
হ্যালো কেয়া। কেমন আছো তুমি ?
মাহিন, লিংকন বিয়ে করেছে। আমার মেয়েটার এখন কী হবে মাহিন ? মাহিন, তোমরা সবাই আমাকে ক্ষমা করে দিও। আর শোন আমার মেয়েটাকে কখনও আমার সম্পর্কে কিছুই বলোনা। মাহিন, তোমরা সবাই খুব ভাল থেকো।
লাইনটা কেটে যায়নি। তবু ওপাশ থেকে কেয়ার আর কোন সাড়া নেই। হ্যালো ! হ্যালো !! কেয়া ? কেয়া শোন, আমি তোমাকে ভীষণ ভালোবাসি। কেয়া ?
বাইরে বৃষ্টির তীব্রতা ক্রমশ বাড়তে শুরু করেছে। মাঝে মাঝেই প্রচন্ড আওয়াজ করে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। হাতে সিগারেট পুড়ছে কিন্তু সেই সিগারেটে শেষবার টান দেয়ার আজ আর কোন ইচ্ছাই করছেনা। আমি মৃত মানুষের মতো দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছি আমার স্ত্রী, আমার ভালোবাসার মায়ার টুকরো টুকরো শরীরটার দিকে।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা ডিসেম্বর, ২০১৫ রাত ২:১৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




