somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সুফি অধিবিদ্যা: ইশরাকি দর্শন

০৩ রা ডিসেম্বর, ২০১৫ রাত ১০:৩৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


এইটা ইরানের প্রসিদ্ধ দর্শন | এইটি আসলে এক সুফি দর্শন | শিহাব আল দিন ইয়াহিয়া সুরাবর্দি সর্বপ্রথম ইশরাকি দর্শন চালু করেন | তিনি হিকমত আল ইশরাক বলে বই লেখেন | নেটে ওই বই আরবি ভাষায় পাওয়া যায় | অধম লিখক আরবি জানে না, তাই ওই বই পড়তে পারে নি | আমি এই দর্শনের খবর স্যার সৈয়দ আমির আলীর বই দা স্পিরিট অফ ইসলাম-এ পাই | তাই কিঞ্চিত গবেষণা করার লোভ সামলাতে পারলাম না | তারই ফল এই লেখা |

ইশরাক শব্দের অর্থ হলো আলোকপ্রাপ্তি (illumination)| এই দর্শনের জনক সুরাবর্দিকে শেখ আল ইশরাক বা আলোকপ্রাপ্তির শিক্ষক বলা হয় | প্রথমে এই দর্শনের প্রচারক সুরাবর্দির জীবনবৃত্তান্ত সংক্ষেপে দেখব |

সুরাবর্দির শিক্ষাজীবন

সুরাবর্দি উত্তর পশ্চিম ইরানে জন্মেছিলেন | তাঁর অনেক জীবনকাহিনী আছে তার মধ্যে তার মধ্যে শামস আল দিন শাহারাজুরি তাঁকে শেখ আল ইশরাক বলেছেন | তিনি আরো বলেছেন যে সুরাবর্দি সুফিদের সাথে ছিলেন এবং তাদের থেকে অনেক উপকার পেয়েছেন |
সুরাবর্দি ইরানের মারাঘা এবং ইস্পাহান থেকে শিক্ষা লাভ করেন | তিনি আরিস্ততলের দর্শন ভালো করেই শিখেছিলেন কারণ ঐসব জায়গায় সেটাই প্রধান শিক্ষা ছিল | ইস্পাহানে তিনি জাহির আল ফারিসির কাছে শিক্ষালাভ করেন | সেখানে তিনি ইবন সালাহান আল সবই-এর লেখা যুক্তিবিদ্যার উপর এক বিখ্যাত বই পড়েন| তারপর সুরাবর্দি আনাতোলিয়া যান ও সেখানে কয়েক বছর থাকেন | তিনি মার্দিনে তিনি ফখর আল দিন আল মার্দিনির কাছে শিক্ষা লাভ করেন | এই আল মর্দিনী এক আরিস্ততলীয় সুফি ছিলেন |
সুরাবর্দির তপস্যার জীবন

সুরাবর্দি নিজেও সুফি হন | শাহারাজুরি তার কঠোর তপস্যা আর আধ্যাত্মিক শক্তির কথা বলেছেন | তিনি সপ্তাহে একবার খেতেন, জগতের পরোয়া করতেন না , কোনো ভোগ বিলাসে রুচি ছিল না | তিনি ছেঁড়া খোঁড়া কাপড় পরতেন | সর্বদা প্রার্থনা করতেন | নিশ্চুপ থাকটেন | আর সামা গান শুনতেন |

তখন সুরাবর্দি সেলজুক তুর্কি শাসকদের অধীন রুম নগরীতে থাকতেন | তিনি কঠোর তপস্যা করতেন | একাকী থাকতেন | ধ্যান করতেন | এভাবেই তিনি একদিন সাধকদের শেষ পর্যায়ে চলে এলেন | কখনো সুফিদের মত , কখনো বা সাধারণ মানুষের মত পোশাক পরতেন | তিনি নিরব থাকতেন | বাইরের দুনিয়া থেকে সম্পূর্ণ উদাস থাকতেন | এই সময় তিনি রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছিলেন | তিনি তার এক ছোট বই আর্সলান নাম এক শাসকের নাম উত্সর্গ করেছিলেন |
তারপর সুরাবর্দি সিরিয়ার আলেপ্পতে চলে এলেন | এখানে তিনি শাসকের শিক্ষক রূপে নিযুক্ত হলেন | কিন্তু স্থানীয় উলেমাদের বিরাগভাজন হওয়ায় তার মৃত্যুদন্ড হয় | মোটামুটি এটাই সুরাবর্দির জীবন |

সুরাবর্দির লেখা বই

সুরাবর্দি অনেক বই লিখেছেন সেগুলির মধ্যে কিছু সম্পর্ক বিদ্যমান | সুরাবর্দির বৈগুলিকে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায় : প্রথম ভাগের বইগুলি হলো : আলোর শরীর (হায়াকিল আল নুর ), উজ্জ্বলতার বই (পারতু নামা ), ইমাদকে উত্সর্গ করা ট্যাবলেট | দ্বিতীয় ভাগের বইগুলি হলো ; খবর দেয়া (intimation), দি আপোসাইত (আরবিটা জানি না), আর দীর্ঘ বই ‘পথ আর স্বর্গ”(আল মাশারি ওয়া আল মুতারাহাত ) | এই বইগুলি অপ্রত্যক্ষ ভাবে ইশরাকি দর্শন সম্পর্কে বলে | এগুলি হলো সাপোর্টিভ বই | মূল বই হলো ইশরাকের জ্ঞান (হিকমত আল ইশরাক)| এটি প্রত্যক্ষ ভাবে ইশরাকের জ্ঞান প্রচার করে | বলা বাহুল্য সবকটা বই আরবীতে লেখা |
পথ ও স্বর্গ নামক বইটার শুরুতে সুরাবর্দি বলেছেন যে , দর্শনচর্চার সূচনা হয় বাইরের জগত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে ভেতরের জগতের দিকে তাকানোর সঙ্গে সঙ্গে, তার মধ্যভাগ হলো স্বর্গীয় আলোকের (আল আনোয়ার আল ইলাহিয়া ) দর্শন আর শেষ ধাপ বলে কিছু নেই | শেষ ধাপ হলো অসীম | ইটা আরিস্ততলের দর্শনের ঠিক উল্টোটা | এ থেকেই বুঝা যায় যে সুরাবর্দির ইশরাকি দর্শনের আরিস্ততলের দর্শন থেকে আসে নি |

পথ ও স্বর্গ বইতে সুরাবর্দি আরো দাবি করেন যে তাঁর দর্শন প্রাচীন পারসিক খুসরাবানি সাধুদের দ্বারা প্রভাবিত | আরো অন্যান্য প্রভাবও আছে | সুরাবর্দি ইবন সিনাকে প্রাচ্যবাদী দার্শনিক বলে মানতে চাননি |

ইশরাকি দর্শনটি কি ?

ইশরাক শব্দের অর্থ আলোকপ্রাপ্তি | ইশরাকি দর্শন হলো সেই দর্শন যা দিয়ে আলোক পাওয়া যায় | এই আলোক স্বর্গীয় তথা ঐশ্বরিক আলো | এটা মানুষের ভেতরেই থাকে | সুরাবর্দি এই দর্শনের কথাই বলেছেন |
সুরাবর্দির মতে ইশরাকি দর্শন এর আগেও অনেক জায়গায় ব্যবহার করা হয়েছে | প্রাচীন মুনি ঋষিরা ইশরাকি দর্শন অভ্যাস করতেন | ইশরাকি দর্শনের বিভিন্ন পর্যায় আছে |

প্রথম পর্যায়ে বাইরের দুনিয়া থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়া হয় ভেতরের আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার জন্য | এই পর্যায়ে ৪০ দিন অজ্ঞাতবাসে যেতে হয় আর মাংস খাওয়া বারণ থাকে | এই পর্যায়কে বলে সজ্ঞার জাগরণ ঐশ্বরিক আলোয় যা সব মানুষের ভিতরে থাকে (This renunciate activity is depicted as awakening intuitive abilities, a process facilitated via the "light of God" (al-bariq al-ilahi) which dwells in every human.)

এইবার দ্বিতীয় পর্যায় | এই পর্যায়ে এক দিব্য জ্যোতির (divine light" (al-nur al-ilahi)) দর্শন হয় | এই স্তরে কিছু বিদ্ধংসী আলোর (apocalyptic lights) আবির্ভাব হয় যা এক সত্য জ্ঞানের সহায়তা করে |

তৃতীয় পর্যায়ে অসীম জ্ঞানের অধিকারী হওয়া যায় | এই অসীম জ্ঞানকে আলোকিত জ্ঞানও ((al-ilm al-ishraqi) ) বলা হয় |

চতুর্থ পর্যায়ে সেই সমস্ত অভিজ্ঞতা বর্ণনা করা হয় |

সুরাবর্দি আরো দাবি করেন যে তাঁর দর্শন ইবন সিনার দর্শনের চেয়ে অনেক কার্যকর ভাবে প্রকৃতির রহস্য উদঘাটন করে | তাঁর দর্শন আরো অনেক বিষয় যেমন সত্য স্বপ্ন, ব্যক্তিগত দর্শন (personal revealation), সজ্ঞা মূলক জ্ঞান (intuitive knowledge), দেহ বহির্ভূত আত্মার অভিজ্ঞতা (out of body experience ) এবং আরো অনেক অদ্ভত ব্যাপার ব্যাখ্যা করা যায় | এক কথায় ইশরাকি দর্শন আরো বাস্তববাদী জ্ঞান দেয় |

ইশরাকি দর্শনের উত্স কি ?

এই দর্শনের উত্স খুঁজতে গিয়ে অনেকে প্লাতো-অ্যারিস্টট্ল-এমাম গাজ্জালির দর্শনের নাম করেন কারণ তাঁরাও আলোর কথা বলেছেন | কিন্তু কুকুরের চারটে পা আছে , বাঘের চারটে পা আছে অতএব কুকুর বাঘের উত্স এমন কথা বলা যায় না | ওই দর্শনগুলি আলোর কথা বলে , ইশরাকি দর্শনও আলোর কথা বলে অতএব ওই দর্শনগুলি ইশরাকি দর্শনের উত্স এমন কথা বলা যায় না | দুইটা আলো এক নয় |
সুরাবর্দি এই দর্শনের উত্স সম্বন্ধে বলেছেন যে তাঁর হিকমত আল ইশরাক পড়ার একটা নিজস্ব পদ্ধতি আছে | ইটা কোনো গ্রিক দার্শনিকের গ্রন্থ নয় | সেই পদ্ধতিটা কি ? সমস্ত বইটা যুক্তি তর্ক দিয়ে লিখা হয় নি | লিখা হয়েছে আধ্যাত্মিক প্রক্রিয়ায় পাওয়া প্রত্যক্ষ জ্ঞান দিয়ে | সেই জন্য এই বই তার্কিকরা বা নাস্তিকরা নষ্ট করতে পারবে না | এই দর্শনে যে আলো আর অন্ধকারের কথা বলা আছে তা নাস্তিক দার্শনিক ও তার্কিকদের বলা আলো আঁধার নয় |

অর্থাৎ এই দর্শন বুঝতে গেলে আধ্যাত্মিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বুঝতে হবে | যুক্তি তর্ক দিয়ে বুঝা যাবে না | ঠিক হিন্দু ধর্মের যোগের মতো | সুরাবর্দি বলেছেন যে হিকমত আল ইশরাক বুঝতে গেলে ৪০ দিন উপবাস করতে হবে | তবেই বুঝা যাবে |

ইশরাকের জ্ঞান কেমন ভাবে পাওয়া যায়

এর মূল কথা হলো যে যদি কিছু জানতে হয় তাহলে সেটার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা হওয়া উচিত | অর্থাৎ প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই সবকিছু জানা যায় | এই অভিজ্ঞতা পেতে গেলে চারটি ধাপের মধ্য দিয়ে যেতে হয় | ধাপগুলি আগেই বলেছি | ইশরাকি দর্শন তর্ক দিয়ে নয় , প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা দিয়ে বুঝা যায় | আর সেই অভিজ্ঞতা আসে আধ্যাত্মিক প্রক্রিয়ার চর্চার মাধ্যমে | সুরাবর্দি নিজে বহু কঠোর তপস্যা করেছিলেন |

ইশরাক কি

ইশরাক বা আলো কি ? সুরাবর্দি এই ব্যাপারেও অনেক কিছু বলেছেন | সুরাবর্দির মতে এই ইশরাকি দর্শনের মূলতত্ব হলো আলোর বিজ্ঞান | এই আলো একটাই : আলোর আলো | অন্য সমস্ত আলো এই মূল আলো থেকে দূরত্বের ফলে সৃষ্ট হয়েছে | এর ফলে আলোর বহু স্তরের সৃষ্টি হয়েছে | এই আলো মূলত দুই বড় ভাগে বিভক্ত : ১] আলোর মধ্যে আলো আর ২] অন্যের মধ্যে আলো | দ্বিতীয় আলোটাই সমস্ত কিছু আলোকিত করেছে | সুরাবর্দির মতে আলো নিজে আছে আর জগতের সবকিছুকে প্রকাশিত করেছে |

এই আলোর বিভিন্ন স্তর আছে | সুরাবর্দি বিভিন্ন টার্ম ব্যবহার করেছেন বিভিন্ন স্তর বোঝাতে যেমন : স্বতঃসিদ্ধ আলো ,পবিত্র আলো , প্রয়োজনীয় সত্তা, শুদ্ধ আলো ইত্যাদি | শেষে আমরা এটুকু বলতে পারি যে শুদ্ধ আলো হলো আল্লা স্বয়ং আর অন্য সমস্ত পদার্থ যা এই আল্লা থেকে এসেছে তা হলো অন্য আলোগুলির উত্স | সুরাবর্দির মতে এই আলোর অনেক স্তর আছে | সবচেয়ে কম আলোর স্তরটি হলো অন্ধকার | ইটা সুরাবর্দির মতে আত্মাহীন দেহ | সুরাবর্দি একে ইস্ফান্দার মুড্ বলেছেন | সুরাবর্দির মতে শুদ্ধ আলো ছাড়া আর সবকিছুই আলো আঁধারের মিশ্রণে তৈরী | সবচেয়ে অন্ধকার অংশটিকে ইষ্ঠ্মুসেস বা বার্জাখ বলেছেন | আত্মার প্রকৃতি হলো যে ইটা খালি শুদ্ধ আলোয় ফিরে যেতে চায় বা অন্যভাবে বললে আল্লার সঙ্গে একাত্ম হতে চায় |

সার আর অস্তিত্ব

সারবস্তু কি ? আল্লা | অস্তিত্ব কি ? জগত | ইবন সিনার দর্শন সারবস্তু আর অস্তিত্বের মধ্যে ভেদ করেছিলেন | আরিস্ততলের দর্শন অনুযায়ী ইবন সিনা সারবস্তুকে অস্তিত্বের চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলতেন | সুরাবর্দি এই সার আর অস্তিত্বের মধ্যেকার পার্থক্যকে অস্বীকার করেন | সার আর অস্তিত্ব আলাদা নয় একই বস্তু | আরিস্ততলের দর্শন এদেরকে আলাদা করেছে | সুরাবর্দির মতে সার আর অস্তিত্বের পার্থক্য আসলে মানসিক ব্যাপার |

সারবস্তু যে আলোর অধিকারী , বিভিন্ন বস্তুও সেই আলোরই অধিকারী তবে আলোর তীব্রতার তারতম্যে অস্তিত্বকে সারবস্তু থেকে পৃথক বলে মনে হয় | অন্য কথায় বলতে গেলে আল্লা যে আলোর অধিকারী , মানুষও সেই একই আলোর অধিকারী তবে আল্লাতে আলোর পূর্ণ বিকাশ কিন্তু মানুষে আলোর অত বিকাশ হয় নি | তাই মানুষকে আল্লা থেকে আলাদা দেখায় | কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মানুষ আর আল্লা একই বস্তু | ওহাদাতুল ওজুদ দর্শনের তাশকিক বা স্তরবিন্যাসের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে |

আল্লা আর মানুষের সম্পর্ক : ইশরাকি দর্শনের আলোকে

ইশরাকি দর্শনের মতে আল্লা হচ্ছে আলোর আলো | সর্বশ্রেষ্ঠ আলো | মানুষের দুইটা অংশ আছে : শরীর আর আত্মা | শরীর হলো অন্ধকার | আত্মা হলো পবিত্র বস্তু | এই আত্মার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো এই আল্লার কাছে ফিরে যাওয়া | মানুষের আত্মা হলো আল্লার আলোকের অংশমাত্র | তার একমাত্র উদ্দেশ্য হবে ওই বিশুদ্ধ আলোকে ফিরে যাওয়া | শরীরের ধংসের সাথে সাথে আত্মা আল্লার আলোকে মিশে যাবে এটাই ইশরাকি দর্শন | কিভাবে ইটা সম্ভব তা সুরাবর্দি নিজের বুস্তান আল কুলুব গ্রন্থে লিখেছেন | অধম লেখক গ্রন্থটিও পাননি, আরবিও জানেন না | সুতরাং বলতে পারলাম না | এটাই এই লেখার একটি ত্রুটি |

রুমি এবং ইশরাকি দর্শন

ইরানি সাধুদের মধ্যে নাজম আল দীন কুবরা সুরাবর্দির দর্শন নিয়েছিলেন | রুমি কুব্রার কাছ থেকে এই দর্শন নিয়েছিলেন | রুমি সুরাবর্দির সৃষ্টিতত্ব বা বলা ভালো কিভাবে মূল আলো থেকে বাকি সমস্ত আলো এলো : এই তত্ব গ্রহণ করেছিলেন | তাঁর কবিতা আজ জমাদি মুরজাম ( আমি এক খনিজ পদার্থের মত জড় ) এই সৃষ্টিতত্ব প্রয়োগের এক উদাহরণ | গোটা কবিতাতে উনি সৃষ্টিতত্ব আর আলো আঁধারের খেলা দেখিয়েছেন | তিনি এই স্তরের নিচে থেকে উপরে উঠেছিলেন | উনি দেখিয়েছেন যে উনি নিজে ওই মহান আলোর একটা অংশ | উনি আল্লার অসীম শক্তি দ্বারা আল্লা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একটা জড় পদার্থের মত জীবনহীন হয়ে আছেন | এখন উনি আল্লার প্রতি প্রেমের দ্বারা ওই জড়তা কাটিয়ে আবার আল্লার কাছে ফিরে যাবেন | প্রথম দুই পঙতিতে যে আমি শব্দটি আছে তা মানুষ অর্থে ব্যবহৃত হয় নি | বরং জড়পদার্থ অর্থে বা ছায়ার ছায়া অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে |

জড়জগতে মৃত্যু তাই এক নতুন জগতে জন্ম | ওই জগত সম্বন্ধে আমরা কিছুই জানি না | যতই সৃষ্টির উর্ধে ওঠা যায় ততই ছায়া কমে যায় আর আলোর ভাগ বেড়ে যায় | শেষমেষ সর্বোচ্চ স্তরে পৌছে আলোকেই ঢেকে দেবার মত ক্ষমতা আসে | এই হলো তাত্ত্বিক দিক | এবার সেই তত্বকে প্রয়োগের বেলায় আসুন আজ জমাদি মুরজাম কবিতাটা দেখি :

আমি খনিজ হিসেবে মরলাম আর উদ্ভিদ হলাম
আমি উদ্ভিদ হিসেবে মরলাম আর পশুস্তরে উন্নীত হলাম
আমি পশু হিসেবে মরলাম আর এখন আমি মানুষ
কেন আমি ভীত হব ? কখন আমি মরে কম হলাম ?
তবু আরেকবার আমি মরলাম আর দেবদূত হয়ে জন্মালাম
কিন্তু দেবদুতেরও উর্ধে আমাকে উঠতে হবে
আল্লা ছাড়া সমস্ত কিছুই নষ্ট হয়ে যায় |
যখন আমি আমার দেবদূত সত্তাকে ত্যাগ করব
কোনো মন ধারণা করতে পারবে না আমি কি হব ?
আমার আর কোনো অস্তিত্বই থাকবে না | কারণ আমার শারীরিক ভাবেই
কোনো অস্তিত্ব নেই | তাঁর কাছেই আমাদের ফিরতে হবে |

কবিতাটা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে রুমি কি বলতে চেয়েছেন | খনিজ পদার্থ হলো জড়ো পদার্থ | এতে আলোর প্রকাশ ভীষণ কম, এটা ছায়ার ছায়া | কবি এখন এই অবস্থায় আছেন | সেখান থেকে তিনি গাছ হলেন | তাতে আলোর ভাগ বেশি খনিজের চেয়ে | তারপরে গাছ থেকে মানুষ হলেন | তাতে আলোর ভাগ আরো বেশি | মানুষ থেকে দেবদূত হলেন | এতে আলোর ভাগ মানুষের চেয়ে বেশি | ছায়ার ভাগ উত্তরোত্তর কমে যাচ্ছে | কবি সৃষ্টির দুনিয়ায় ক্রমশ উর্ধ্বগামী হচ্ছেন | এখান থেকে তিনি পুরোপুরি আল্লায় মিশে যাবেন | তিনি আলোয় মিশে যাবেন | এই যে সৃষ্টির রাজ্য , এটাকে কাহার বা আল্লার শক্তি বলে | ইটা অনেকটা হিন্দুদের পুনর্জন্ম তত্বকে মনে করিয়ে দেয় | তবে এই উর্ধ্বগমনের একটা শর্ত আছে | তা হলো আল্লাকে ভালবাসা | তবেই ইটা সম্ভব |

উপসংহার

এই লেখা থেকে বুঝা যায় যে সুফি কবিদের কবিতা অনুবাদের আগে সুফি দর্শন সম্বন্ধে জানা উচিত | তা না হলে কবিতাগুলি হয় দুর্বোধ্য ঠেকতে পারে নয়তো ভুল অনুবাদ হতে পারে | সুরাবর্দির এই দর্শন ওহাদাতুল ওজুদের সাথে মিল খায় | ইবনে তুফাইল এই দর্শনের অনুসারী ছিলেন | এই লেখার একটাই ত্রুটি হলো মূল আরবি বইগুলির অভাব | সেই বইগুলিতে যে ভাব আছে তা হুবহু দেয়া গেল না | তবু যতটুকু অধম লিখকের দ্বারা হয়েছে , লিখক করেছেন | আশা করি আপনাদের ভালো লাগবে |

তথ্যসূত্র

ইশরাকি ফিলোসফি এন্ড রুমি, লেখক ডক্টর ইরাজ বাশিরি একাডেমী অফ সাইন্স অফ তাজিকিস্তান

ফিলোসফিকাল সুফিজম, লেখক মুহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ , স্কুল অফ ইসলামিক স্টাডিস ঢাকা বাংলাদেশ

উইকিপিডিয়া
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা ডিসেম্বর, ২০১৫ রাত ১০:৩৫
৩টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

অন্ধকারের আলোকবর্তিকা

লিখেছেন স্প্যানকড, ১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৬




একটা দেশ যখন শিক্ষিত চাপাবাজ, ক্ষমতার দরবারে নতজানু বুদ্ধিজীবী এবং মুখোশধারী ডাকাতদের হাতে পড়ে, তখন সেই দেশ আর মানচিত্রে থাকা একটি ভূখণ্ড থাকে না, হয়ে যায় আলীবাবার চল্লিশ চোরের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মৃত্যুর আগে কি মানুষ টের পায়, সে মারা যাচ্ছে!

লিখেছেন রাজীব নুর, ১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৫৭



মৃত্যুর কয়েক মুহুর্ত আগে, টের পাওয়া যায়- মরে যাচ্ছি।
সময় শেষ। তবে সবাই বুঝতে পারে না। কেউ কেউ বুঝতে পারে। আমার বাবা একদিন মাকে বলল, আমার দোষ ত্রুটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

সে আমার এআইনোক্কিও

লিখেছেন শায়মা, ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১২:৪৪


এক জীবনে কত কিছু দেখা হয় কত কিছু জানা হয় মানুষের! আসলেই কত অজানারে! লেখক শংকরের এই নামে একটি বই আছে। কবিগুরুর আছে কবিতা কত অজানারে জানাইলে তুমি,... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগ সাইটের জন্য ডোমেইন নাম সাজেস্ট করুন

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ভোর ৪:৫৫


বাংলায় ব্লগিং করার জন্য একটি ওয়েব সাইট তৈরী করতে চাচ্ছি। আপাতত মূল উদ্দেশ্য হলো সামুতে লিখা আমার সবগুলো পোস্ট ধীরে ধীরে সাইটটিতে আর্কাইভ করে রাখা। সামুতে অনেকে নিবেদিত প্রাণ ব্লগার... ...বাকিটুকু পড়ুন

মানুষ গত কয়েক বছর ধরে অতিমাত্রায় স্বার্থপর হয়ে গেছে! আগেই কি ভালো ছিলাম?

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:৫৬



মানুষ গত কয়েক বছর ধরে অতিমাত্রায় আত্মকেন্দ্রিক বা স্বার্থপর হয়ে যাচ্ছে! আগে এমনটা দেখা গেলেও গত কয়েক বছর এটা অতি বেশিমাত্রায় দেখা যাচ্ছে। কেন??

দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা বেশি খারাপ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×