somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্পঃ বদলে যাওয়া রঙ( পর্ব ১)

০৯ ই নভেম্বর, ২০১৫ রাত ৮:৪৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


শরতের শেষ বিকেলে আলো আঁধারের মাঝে অব্যস্ত অলস ভাবে হাঁটতে ভীষণ ভালো লাগছে , ব্যস্ততা ছিল তারপরও তড়িঘড়ি করতে ইচ্ছে হোল না , প্রকৃতির প্রতিটি সূক্ষ্ম মুহূর্তকে মর্মে মর্মে অনুভবে আলাদা আনন্দ আছে । এই আনন্দ ভোগের জন্য প্রায়ই অলস ভাবে হেঁটে বেড়াই আমি । রাস্তায় পড়ে থাকা শুঁকনো পাতা গুলোর ক্রাশ ক্রাশ শব্দে অন্য রকম একটি ছন্দ যুক্ত হয়েছে প্রকৃতিতে । থেকে থেকে হিমশীতল উত্তরী বাতাস বইছে শীতের আগমনী বার্তা নিয়ে । শীতের দেশে চারটি ঋতু - গ্রীষ্ম , শরত , শীত আর বসন্ত , মাঝে হেমন্ত আর বর্ষা নেই । শরত আমার ভীষণ প্রিয় - চারপাশে রং এর ছড়াছড়ি , হলুদ লাল সবুজ , প্রকৃতি এ সময়ে এক অসামান্য রূপ ধারণ করে , সবুজ ঘাসের উপর হলদে পাতায় ছেয়ে স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয় । প্রকৃতির এই শোভা দেখতে দেখতে ভুলেই যাই নিজেকে , সমস্ত কাজ আর জাগতিক সম্পর্ক গুলোও আবছা হয়ে আসে ।

হঠাৎ ফোন বেজে উঠলো - ফোনটা ধরতেই ওপাশ থেকে বিরক্তির সুরে শ্যামল বলে উঠলো -
- কি ব্যাপার , তুমি কোথায় কেয়া ? কতক্ষণ থেকে অপেক্ষা করছি ।
- এইতো প্রায় চলে এসেছি, ট্রাফিকে আটকে ছিলাম অনেক্ষন , আসছি , চিন্তা করো না ।

আজকাল বেশ দক্ষ অভিনেত্রীও হয়ে উঠেছি ,মনের অজান্তেই পরিবেশের সাথে খাপ রেখে গল্প সাজিয়ে তাতে অভিনয়ও করে ফেলি , অতি সহজ ভাষায় বলতে গেলে - তাৎক্ষনিক মিথ্যে কথায় বেশ পারদর্শী হয়ে উঠেছি । এই মাত্র শ্যামলের সাথে যেটা বললাম , আমিতো মোটেই ট্রাফিক জ্যামে ছিলাম না । আসলে সবকিছুর সাথে নিজেকে মানিয়ে নেয়ার জন্য কতো কি না করতে হয় । বিভিন্ন সময় বিভিন্ন চরিত্রে দক্ষ ভাবে অভিনয় করতে পারলেই জীবন প্রবাহ বোয়ে চলে সার্থক ভাবে । যে'ই এখানে দক্ষ অভিনয় করতে ব্যর্থ ,তারই প্রবাহে গতিবিঘ্ন ঘটে ।

হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম ইউনিভার্সিটি , তারপর সোজা চলে গেলাম বেজমেন্ট লাইব্রেরিতে । ওখানেই আমাদের স্টাডি রুম বুক করা ছিল । টার্ম টাইমে ইউনিভার্সিটির লাইব্রেরি চব্বিশ ঘণ্টাই খোলা থাকে ।

শ্যামল ভীষণ রেগে আছে , আমি একঘণ্টা লেট । আমরা একটা এম্পায়রিকাল রিসার্চ করছি সাউথ এশিয়ান কমিউনিটি তে ডিভোর্স এর হাড় বৃদ্ধির কারণ ও এর সোশাল ইমপ্যাক্টের উপড় । শ্যামল কলকাতার ছেলে , ভীষণ পড়ুয়া এবং ভীষণ পাঞ্চুয়াল । এই রিসার্চটা নিয়ে ও ভীষণ সিরিয়াস , আমিই মাঝে মাঝে অমনোযোগী হয়ে পরি । আমার মনটা বিভিন্ন খানে ছুটে বেড়ায় , মনটাকে একটি জায়গায় বন্দি করাটা ভীষণ দুঃসাধ্য হয়ে পরে কখনো সখনো । শ্যামলকে খুশি করার জন্য বললাম ,

- এই জানো পাঁচ জনকে পেয়ে গেছি , ইন্টারভিউ দিতে রাজি হয়েছে । তুমি কাউকে পেয়েছ ?
- না , আমার তো আসলে ওরকম পরিচিত কেউ নেই এখানে । তোমার উপর ডিপেন করেই তো আমি এই প্রজেক্টে এসেছি ।
- ঠিক আছে চিন্তা করো না শ্যাম , সব ম্যনেজ হয়ে যাবে ।

শ্যামলের পড়া ছাড়া আর কোন কিছুতেই আগ্রহ নেই , এমন কি আমি যে এত সুন্দরি একটি মেয়ে বসে আছি ওর সামনে , ওর তাতে কোনই বিকার নেই । কখনো ভালো করে চোখ মেলেও দেখেনি আমাকে । ছেলেরা সাধারণত সুন্দরি মেয়ে দেখলে বোকার মতো আচরণ করতে শুরু করে - আর এটাই তো স্বাভাবিক । কিন্তু এই ছেলেটি একদমই অন্যরকম । এইতো সেদিন তূর্যের অফিসের পার্টিতে নতুন জয়েন করা আইরিশ একটি মেয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল তূর্য , আর ঐ সময়টাতে তূর্য মানে আমার স্বামী ভদ্রলোকটি একেবারেই বোকার মতো আচরণ করছিলো । আমি মনে মনে ভীষণ হাসছিলাম ওর কাণ্ড কীর্তি দেখে । আর শ্যামল একেবারেই অন্য রকম , আসলে , ও একটু অন্যরকম বোলেই একসাথে কাজটা করতে কোন অসুবিধা হচ্ছে না ।

বেশ অনেক্ষন হয়ে গেলো লাইব্রেরিতে , ঘড়ীর দিকে তাকিয়ে দেখি রাত নটা বাজে । ফোন খুলতেই তূর্যের টেক্সট ম্যাসেজটা চোখে পড়লো - ও লিখেছে আজ রাতে ওর বাড়ি ফিরতে দেরি হবে , কাজ শেষে ওরা কোলিকরা সবাই পাবে যাবে আর আজ যেহেতু ফ্রাইডে নাইট কাল আর অফিসের ঝামেলা নেই । আমারও মনে হোল বাসায় না ফিরে কিছুক্ষণ বাইরেই কাঁটিয়ে যাই , শ্যামলকে বললাম,

- শ্যাম , চলো বাইরে কোথাও ঘুরে আসি , মাথাটা কেমন জানি ইনফরমেশনে প্যাক্ট হয়ে আছে , একটু রিলেক্স এর প্রয়োজন ।
- ঠিক আছে চলো যাওয়া যাক ।

রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ করে শ্যামল বলল ,
- কেয়া , আমার ডরমিটরি তো একদমই কাছে , তুমি চাইলে আমরা ওখানেও কিছুটা সময় কাঁটাতে পারি । আসলে পাব জায়গাটা এতো কেওটিক যে ওখানে বেশিক্ষণ থাকলে আমার মাথা ধরে যায় ।

- হুম ঠিকই বলেছ , চলো নাহয় তোমার ডরমিটরিতেই যাই ।

ছেলেটা ভীষণ অমায়িক, মাঝে মাঝে আমি বুঝতেই পারি না আমি একটি ছেলের সাথে কথা বলছি নাকি মেয়ের সাথে । হাঁটতে হাঁটতেও ও আমাদের প্রজেক্ট নিয়েই কথা বলছে । আমার পার্সোনাল ব্যাপারেও ওর কোন আগ্রহ নেই আর ওর নিজের ব্যপারেও কখনো কিছু বলেনি । ইউনিভার্সিটি থেকে দশ মিনিটের হাঁটার পথ ওর ডরমিটরিটি । ওখানে পৌঁছে , আমি তো অবাক ! - সুন্দর করে গোছানো , একেবারে টিপটপ পরিপাটী । ছেলেদের ঘরও এতো সুন্দর গোছানো থাকে ! ভাবাই যায় না । শ্যামল আমাকে জিজ্ঞেস করলো ,

- অনেক পুড়নো একটি ব্র্যান্ডি আছে , চলবে তোমার ? নাকি গতানুগতিক ভালো মেয়েদের মতো হোয়াইট ওয়াইনই চাই তোমার ?

আমি একটু অবাক হয়ে গেলাম , এতো উদাসীন একটি মানুষ কি করে খেয়াল করলো যে আমি হোয়াইট ওয়াইন ছাড়া কিছু খাই না । আমি প্রতিউত্তরে বললাম ,

- ভালো মেয়েরা যা খায় সেটাই দাও ।

কিছুক্ষণের মধ্যেই শ্যামল ওয়াইন গ্লাসে করে দু গ্লাস ওয়াইন নিয়ে আসলো । এবং স্বাভাবিক ভাবেই কথা বলতে শুরু করলো প্রজেক্ট নিয়ে । আমি ওকে থামিয়ে বললাম তুমি তোমার বাড়ির কথা বল , প্রজেক্ট নিয়ে পরে কথা বলা যাবে । ও থেমে গেলো আর আমার দিকে তাকিয়ে ছিল । ইতিমধ্যেই , আমি কয়েক চুমুক ওয়াইন নিয়ে ফেলেছি । হঠাৎ করেই আমি ওর চোখের ভিতর অজানা অন্ধকারচ্ছন্ন রাস্তা দেখতে পেলাম , মনে হোল দমকা ঝোড় হাওয়ায় আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিলো । তারপর আর কিছুই মনে নেই ।

চোখ মেলে যখন তাকালাম , তখন নিজেকে হাসপাতালের বিছানায় দেখতে পেলাম , পাশে তূর্য আমার হাত ধরে বসে আছে । ওকে জিজ্ঞেস করলাম ,

- আমার কি হয়েছে ? আমার সারা শরীরে এতো ব্যাথা কেন ?
- তোমার কিছু হয়নি কেয়া , তুমি ভালো আছো । তুমি বেঁচে আছো ।

তূর্যর চোখে কখনো পানি দেখিনি আমি , ওর গাল বেয়ে পানি ঝরছে , ঠোঁট কাঁপছে । তখনই আমি বুঝতে পারছিলাম কাল রাতে কি কি হয়েছিলো আমার সাথে । আমার চোখে পানি দেখে , ও নিজেকে সামলে নিয়ে আমাকে ওর বুকে টেনে নিলো , আপ্রাণ চেষ্টা করছে আমাকে শারীরিক আর মানসিক ভাবে সারিয়ে তোলার । ও যে আমাকে এতোখানি ভালোবাসে সেটা আমি আগে এতোটা গভীরভাবে উপলব্ধি করিনি কখনো। চিৎকার করে বলতে ইচ্ছা হচ্ছিলো ,

- তূর্য আমি তোমাকে ভীষণ ভালোবাসি , অনেক অনেক ।
কিন্তু গলা দিয়ে একটি শব্দ বের হোল না । কখনো এই কথাগুলো মুখে বলিনি আমি , আজও বলতে পারিনি । চোখে চোখে বলেছি অনেক বার কিন্তু এই অতি আবেগি অনুভূতিকে প্রকাশ করার সুযোগ্য কোন শব্দ পাইনি কখনো । একমাত্র এই জায়গা গুলোতে আমি দক্ষ অভিনেত্রীর কাজটি সম্পন্ন করতে পারিনি কখনোই ।

আমাদের পাঁচ বছরের দাম্পত্য জীবনে আমরা বেশিভাগ সময়ই ব্যস্ততায় কাটিয়েছি , যার যার ক্যারিয়ার আর স্টাডিজ নিয়ে । মা হওয়ার সময়টুকুও বের করতে পারিনি এই পাঁচ বছরে । আজ , এতো এতো পড়াশুনা পিএইচডি সব কিছু অর্থহীন মনে হচ্ছে , মনে হচ্ছে অযথাই এতো কিছু করা । জীবনটা কেমন যেন সাদামাটা হয়ে গেছে , প্রকৃতির রং গুলো এখন আর ওভাবে উপলব্ধি করতে পারি না । বেশিভাগ সময়ই ঘড় অন্ধকার করে বসে থাকি বিমর্ষ হয়ে ...

[ ছবি সূত্র - গুগল , ঘটনার চরিত্র গুলো সম্পূর্ণ কাল্পনিক । আজকাল অনেক রেপ কেইস নিয়ে পড়াশুনা করার ফলে এই প্লটটি মাথায় এলো বলে লিখে ফেললাম । ]





সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে মে, ২০১৮ বিকাল ৫:১৯
৪৫টি মন্তব্য ৪১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Sajna

লিখেছেন আরমান আরজু, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৩১



Sajna
Love is sacred;
Commences from the intense mystery of pure souls.
Has a beginning, but no end;
Here, only peace prevails.
So, love—
Solely for the sincere and the disenchanted,
Not for the pharisaic.
...বাকিটুকু পড়ুন

বিপ্লব সংহতি দিবস সফল ও সার্থক হোক.....

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:১১



আজকে নাকি বিপ্লব সংহতি দিবস। দল ক্ষমতায় থাকলে অনেক রকমের দিবস পালিত হয়। আওয়ামী লীগের সময় শেখ জামাল-কামালের বিবাহ দিবস, শিশু শহীদ শেখ রাসেলের সুন্নাতে খৎতা দিবস আরো কতো কি?... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঝাল্লাগে ভাল্লাগে- ২

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৯


"যে-রাঁধুনী জানে তার তরকারিতে স্বাদ হয়নি, সে নিমেষে লঙ্কার কৌটো উপুড় করে দেবে। তারপর অতিথি যখন কান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে হাঁউমাউ করবে, রাঁধুনী তখন মিটিমিটি হেসে বলবে—‘একটু ঝাল বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

চা এর আড্ডা।

লিখেছেন নাহল তরকারি, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:১৬



শনিবার
৭ নভেম্বর ২০২৬
২২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২৬ জমাদিউল আ. ১৪৪৮ হিজরি

কিছু মুহূর্ত কখনো হারিয়ে যায় না, সময়ের স্রোতে শুধু স্মৃতি হয়ে মনের গভীরে জমা থাকে।

২০১১ সাল। তখন আমি ইন্টারে পড়ি। নানীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

২৪'র ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে দেশে ডানপন্থা ও মৌলবাদী চেতনা-রাজনীতির চরম উত্থান

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০৮ ই নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:২৩



২৪-এর ৫ আগস্টের পর দেশ দীর্ঘদিনের স্বৈ/রাচারী শাসন থেকে মুক্ত হয়েছিল ঠিকই; কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেশ চলে গিয়েছিল বিপুল সংখ্যক ডা*নপন্থী বা মৌ*লবাদী চেতনা বা রাজনীতির ধারক-বাহক-সমর্থকদের কবলে।
হ্যাঁ, হাসিনার পতনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×