somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ধর্মভীরু সাধারণ মানুষের সীমাহীন মুর্খতার জন্য কে দায়ী?

১৬ ই অক্টোবর, ২০১৫ সন্ধ্যা ৬:০৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আজকের একটি জাতীয় দৈনিকের ধর্ম পাতায় পাঠকের প্রশ্ন ছিল-

-ঘড়ি কোন হাতে পরতে হয়?
-রাতে নখ কাটতে শরীয়তে নিষেধাজ্ঞা আছে কিনা?
-অমুসলিম বাবুর্চির রান্না করা খাবার খাওয়ায় নিষেধাজ্ঞা আছে কিনা?
-শরীরে ইনজেকশন নিলে কি অজু ভঙ্গ হবে?
-অজ্ঞান অবস্থায় যে নামাজ কাযা হয়ে যায় তা কি পরে পড়তে হবে?

যারা প্রশ্নগুলো করেছেন তাদের ব্যাপারে শেষে বলব, যারা এ বিষয়ে ফতোয়া দেন বা দিচ্ছেন আগে তাদের প্রসঙ্গে বলি।

যারা উপরোক্ত প্রশ্নগুলোর উত্তর দিবেন আমাদের সমাজে তারা পরিচিত মাওলানা, মৌলভী, আলেম সাহেব হিসেবে। সওয়াল-জবাব বিষয়টিকে সৃষ্টি ও আজ পর্যন্ত টিকিয়েও রেখেছেন এরাই। এর সাথে ইসলামের কতখানি সম্পর্ক তা আমি মাপতে যাবো না, কারণ সেটা আমার অনধিকার চর্চা। ফতোয়া নিয়ে কথা বলার অধিকার সবার নেই। এ নিয়ে কথা বলার জন্য আপনার প্রথমত যেটা লাগবে তা হলো আরবীয় পোশাক ও দাড়ি, দ্বিতীয়ত কোর'আনের কিছু আয়াত ও হাদীসের বাণী হুবহু মুখস্ত থাকা, তৃতীয়ত আরবী ব্যাকরণ সম্পর্কে বিশেষ করে উচ্চারণরীতি সম্পর্কে বিশেষ পাণ্ডিত্য। এই সব যদি ঠিকঠাক থাকে তাহলেই আপনি একজন প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবীদ হতে পারবেন আর তখন অন্যান্য বিষয়ের ফতোয়াবাজী করার সাথে সাথে ফতোয়া নিয়েও ফতোয়াবাজী করার অধিকার লাভ করবেন। তাই ফতোয়া নিয়ে কথা বলে নিজ কপালে নাস্তিক বা কাফের ট্যাগ ধারণ করতে আপাতত আমি রাজি নই। আমার কথা উত্তরদাতাকে নিয়ে।

মানুষ অজ্ঞ। তারা নামাজ জানে না, কালাম জানে না, কোর'আন জানে না, হাদীস জানে না, আরবী জানে না, দোয়া জানে না, দরুদ জানে না, শরীয়ত জানে না, মারেফত জানে না, ইজমা জানে না, কিয়াস জানে না, তওহীদ জানে না, রিসালাত জানে না, কী যে জানে না তা-ই জানে না। অন্যদিকে আলেম সাহেবরা, ইমাম সাহেবরা, ওয়ায়েজরা কী জানেন না তা খুজে বের করা মুশকিল। তারা কোর'আনের একটা আয়াতের দশটা করে ব্যাখা জানেন, একটা হাদীসের দশ জায়গার দশ রকমের বর্ণনা জানেন, যুগ যুগ ধরে তাদের পূর্বসুরীরা নিরন্তর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ চালিয়ে, তর্ক-বিতর্ক করে যে মাসলা-মাসায়েলের পর্বত নির্মাণ করেছেন তাকে এরা ধারণ করেন। বিশাল ফিকাহ শাস্ত্র তাদের ঠোটের আগায় এসে থাকে। কোন নবীকে কীভাবে নির্যাতন করা হয়েছে, কোন নবীকে সত্য বলার কারণে হত্যা করা হয়েছে, কোন নবীর কোন অনুসারীর বুকে পাথর চেয়ে নির্মম শাস্তি দেওযা হয়েছে সে ইতিহাসও তাদের পেটে ভুটভাট করছে। যখন তখন তারা সেগুলোকে উদগীরণ করে নিজেদের জ্ঞান জাহির করেন।
এত জ্ঞানের অধিকারী হয়ে তারা কি নিশ্চুপ বসে থাকতে পারেন? পারেন না। তাই তারা জাতির প্রশ্ন শুনেন, চিন্তা করেন, উত্তর দেন। এমন কোনো প্রশ্ন নাই যার উত্তর তারা দিতে পারেন না। আমার দীর্ঘ ২০ বছরের জীবনে কোনো মোল্লার কাছে ফতোয়া জিজ্ঞাসা করে উত্তর পাওয়া যায় নি এমন ঘটনা একটাও দেখি নি। কারণ সম্ভবত তারা সর্বজ্ঞ। তারা সর্বসেরা। তাদের জ্ঞানের কোনো শেষ নেই। কোনো পরিধি নেই। তাদের কোনো ভুল নেই। কোনো অপরাধ নেই।

অতএব বোঝা গেল, সাধারণ মানুষ যতখানি অজ্ঞ, মোল্লারা ঠিক ততখানিই বিজ্ঞ। অন্যদিকে এই মহান বিজ্ঞজনেরা যেহেতু ইসলামী জ্ঞানের ধারক ও বাহক, সুতরাং তাদের কোনো অপরাধও নেই। তারা ফুলের চেয়েও নিষ্পাপ, সূর্যের চেয়েও প্রতাপশালী। কিন্তু রাত না থাকলে যেমন দিনের মূল্য কেউ দিতো না, অসুন্দর না থাকলে সুন্দরের মূল্য বুঝতো না, তেমনই অজ্ঞ সাধারণ মানুষ যতদিন আছে, ততদিনই বিজ্ঞরা এক্সট্রা সম্মানের অধিকারী হয়ে বাচতে পারবে। অজ্ঞরা যদি একবার বিজ্ঞদের মুখাপেক্ষী হওয়া ছেড়ে দেয়, নিজেদের সমস্যার সমাধান নিজেরাই করে নিতে শিখে, ধর্মীয় বিষয়ে নিজেরাই কোর'আন-হাদীস বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করে তাহলে এদের জ্ঞানসমুদ্র শুকিয়ে মরা জলাশয়ে পরিণত হবে অল্প দিনেই। সুতরাং আর যাই হোক- অজ্ঞ মানুষ তাদের প্রয়োজন। আপনি অজ্ঞদের দলে থাকলে তাদের মঙ্গল। আপনি জানেন না, আপনি বুঝেন না- এ কথা তাদেরকে স্বর্গের সুখ প্রদান করে। এরপর জানার জন্য যখন তাদের দুয়ারে কড়া নাড়েন তখনই কেবল তারা জ্ঞানের প্রকৃত সার্থকতা উপলব্ধি করেন। নিজের অজান্তেই বলে উঠেন- আলহামদুলিল্লাহ।

তাদের নিজেদের জ্ঞানকে সার্থক করার জন্য তাই দরকার আপনার জ্ঞানকে অবমূল্যায়ন করা। আপনাকে ছোট করা, খাটো করা। এ কারণে আপনার মতো বা আমার মতো সাধারণ মানুষ যখন ইসলাম নিয়ে কোনো বক্তব্য পেশ করতে চায়, মাকড়শার জালে আটকে পড়া জাতিটিকে বন্ধন ছিন্ন করে মুক্ত করতে চায় তখন তারা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েন। তাদের আশঙ্কা প্রশ্ন হয়ে মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে- তোরা ইসলামের কী বুঝিস? ইসলাম এত সহজ? তোরা আরবী জানিস? মুখে দাড়ি আছে?
আসলে তারা ইসলাম নিয়ে ভাবেন না, ভাবেন নিজেদের স্বার্থ নিয়ে, সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে। কথিত বিজ্ঞ সম্প্রদায়ের ওই স্বার্থের বেদিতে বলি হয় কথিত অজ্ঞ সম্প্রদায়। তবু এই অজ্ঞরা ইসলাম শিখতে কথিত বিজ্ঞদের কাছেই যাবে, এবং প্রতারিত হবে। পতঙ্গ যেমন আগুনের শিখা দেখে ঝাপিয়ে পড়ে, তারাও ঝাপিয়ে পড়বে। তাদেরকে বাচাবে কে যখন তারা নিজেরাই নিজেদেরকে আগুনের মাঝে সোপর্দ করছে?

পত্রিকার ধর্ম পাতায় প্রকাশিত পাঠকদের প্রশ্নগুলো আরেকবার পড়ার অনুরোধ করছি। প্রশ্নগুলো পড়ুন, বারবার পড়ুন। ওই প্রশ্নগুলোর মাঝেই বর্তমান মুসলিম জাতির স্পষ্ট চিত্র ফুঠে উঠেছে। সমস্ত পৃথিবী যখন এ জাতির শত্রুতে পরিণত হয়েছে, প্রতিদিনই পৃথিবীর কোথাও না কোথাও যে জাতি নির্যাতিত হচ্ছে, লাঞ্ছিত হচ্ছে, অনেক জায়গায় নিজেরাই নিজেদেরকে ধ্বংসের নেশায় মাতাল হয়ে আছে, তখন এই জাতির ধর্মভীরু মানুষগুলো জাতির নিশ্চিত ধ্বংস দেখেও বিচলিত নয়, যতখানি বিচলিত ঘড়ি ডান হাতে পরতে হবে নাকি বাম হাতে, অজ্ঞান অবস্থায় নামাজ কাযা হলে আবার নামাজ পড়তে হবে কিনা, অমুসলিম বাবুর্চির হাতের রান্না খাওয়া যাবে কিনা- এই সিদ্ধান্তহীনতা নিয়ে। এদের এই কূপমণ্ডূকতা, এই অজ্ঞতা, এই মুর্খতা তথা এই হাস্যকর অবস্থার জন্য কাদের দায়ী করবেন? আল্লাহকে? রসুলকে? ইসলামকে? নাকি এদের অজ্ঞতাপূর্ণ ও মুর্খতায় ভরা এসব প্রশ্নের উত্তর দেবার জন্য যারা নিরন্তর ফিকাহর পাতা মুখস্ত করে চলেছে সেই বিজ্ঞজনদের?
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই অক্টোবর, ২০১৫ সন্ধ্যা ৬:১৬
১১টি মন্তব্য ৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

এগারটি বছর পার হয়ে গেল…. কিছু পরিসংখ্যান নিয়ে একাদশতম বর্ষপূর্তি পোস্ট

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:৪১



পূর্বের বর্ষপূর্তি পোস্টের লিঙ্কঃ দশম বর্ষপূর্তি পোস্ট

সামহোয়্যরইনব্লগে গত ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৫ তারিখ রাত ১১টা ২৬ মিনিটে প্রকাশিত হয় আমার প্রথম কবিতা, বক্ষমাঝে থাকবে তুমি। বলা যায় খুব দ্রুতই, মাত্র তৃতীয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

ক্যায়া হুয়া ? হুক্কা হুয়া; হুক্কা হুক্কা হুক্কা হুয়া

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:২৫


২৪ বছর ধরে ঢাবিতে অনার্স পড়ছে; তা-ও নাকি ভাষা শিক্ষা বিভাগে উর্দূ নিয়ে !!! আজতক তার পড়া শেষ হয় নাই !!! এ ভার্সিটিতে নাম লিখালে পন্ডিত মশাই'রা কি কোনও... ...বাকিটুকু পড়ুন

দুঃখ খচিত পতাকা আমার

লিখেছেন এম ডি মুসা, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:২৪


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পবিত্র প্রাঙ্গণে
আজ হঠাৎ কার ছায়া নামে?
কার দুঃসাহসী কালো হাত
ইতিহাসের বুকের ওপর আঁকে পরাধীনতার নাম?

যে নাম একদিন ভাষার কণ্ঠ রুদ্ধ করতে চেয়েছিল,
যে শাসন একাত্তরে ছড়িয়েছিল মৃত্যুর অন্ধকার
আজ কেন তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশ হতো হায়দ্রাবাদ

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৫৫

।।হায়দারাবাদের নিজাম।।


১৯৪৭ সাল ভারতবর্ষের মুসলমানরা যখন নির্যাতনের শিকার অনেকগুলো গণহত্যা হয়েছিল দাঙ্গা হয়েছিল। ১৯৪৬ সালে বা তারও আগে এই মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ রাজনীতি শুরু করেছিল কংগ্রেসের রাজনীতি দিয়ে তিনি কংগ্রেসের... ...বাকিটুকু পড়ুন

ডাক্তার আসিবার পূর্বে রোগীটি মারা গেলো

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:৩৩



বাংলাদেশে ডাক্তারদের অবহেলায় কি পরিমাণ প্রাণ অকালে ঝরে গিয়েছে তা কল্পনাতীত। এবং আমাদের দেশের ডাক্তার এই অপরাধে নূন্যতম অনুশোচনা বোধ করে না।

ডাক্তারদের অবহেলার কারণে দেশের পাঠ্য বই ইংরেজি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×