
কেন আমি রবীন্দ্র সংগীতে ফিরে ফিরে যাই? বা ফিরে ফিরে আসি? রবীন্দ্রসঙ্গীত আমার এতোই প্রিয় যে, পৃথিবীর প্রায় সব সংগীতের সমঝদার শ্রোতা হয়েও আমি আবার ফিরে ফিরে আসি রবীন্দ্র সংগীতেই।
কুমিল্লা রেলষ্টেশনের মাহমুদ বুক ষ্টলের ফেরদৌস মাহমুদ মিঠু ভাইয়ের কাছ থেকে একসময় অনেক সংগীতের স্বরলিপির গ্রন্থ ক্রয় করেও হারমোনিয়াম নিয়ে বসি ওই রবীন্দ্র সংগীত গাইতেই।
আরেকটি বিষয়: যখন আমার মন বড়ই বিচলিত থাকে, তখন আমি হারমোনিয়াম নিয়ে সচরাচর বসি না। রবীন্দ্রনাথ নিজে হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সংগীত থেকে শুরু করে পাশ্চাত্য সংগীত, লোকসংগীত, শ্যামাসংগীতসহ সব সংগীতেরই মুগ্ধ শ্রোতা এবং গায়ক ছিলেন। আমার কাছে একটি গ্রন্থ ছিল: গায়ক রবীন্দ্রনাথ। 2002 সালে আমার প্রথম সংসার ভাঙ্গনের সময় অনেক কিছুর সঙ্গে তাও হারিয়েছে। ঢাকার শাহবাগের আজিজ মার্কেটে গিয়ে এটি আবার কিনতে চেয়েও পাইনি।
রবীন্দ্রনাথ-নজরুল সম্পর্কে একটি কথা প্রায়ই আমি বলি যে, এই দুই মহান কবি জন্মেছেনও পরাধীন ব্রিটিশ ভারতে এবং মারাও গেছেন ওই পরাধীন ব্রিটিশ ভারতেই। রবীন্দ্রনাথ মারা যান 1941 সালে এবং কাজী নজরুল ইসলাম নির্বাক হোন 1942 সালে। নজরুল যদিও 1976 সালে মারা যান, কিন্তু 1942 সালের পর তিনি কোনো কিছু সৃষ্টি করতে পারেননি। পরাধীন ভারতেই তারা যেসব সৃষ্টি করে গেছেন, আজকে আমরা স্বাধীন রাষ্ট্রে বসেও তা কল্পনা করতে পারি না।
কিন্তু আমি কেন কোথাও কখনো রবীন্দ্র সংগীত গাই না? এর অবশ্যই অনেক কারণ রয়েছে। প্রথমত আমি কোনো বাদ্যযন্ত্রই ভালো বাজাতে পারি না। এসরাজ, তানপুরা, পিয়ানো তো দূরে থাক, হারমোনিয়ামও কখনো ভালো করে শিখতে পারিনি। কুমিল্লার সংগীতশিল্পী দুলাল চৌধুরী আমাকে বিনা পয়সায় অনেকবারই শেখাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আমি সময়ও তখন বের করতে পারিনি। এমনকি বাঁশি, একতারা, দোতারা, তবলা এসবও শিখতে পারিনি।
আমার বাবার বড় ভাই সিরাজ উদ্দিন জ্যাঠা একতারা, দোতারা বাজিয়ে বাজিয়ে এতো ভালো গাইতে পারতেন! অবর্ণনীয়। কিন্তু তাদের গান রেকর্ডের কোনো লক্ষ্যই ছিল না। তারা গান গাইতেন তাদের স্রষ্টাকে কাছে পাওয়ার জন্য। তখন যদি বুঝতাম: বাড়ির কাছে আরশীনগর সেথা এক পড়শী বসত করে, তাহলে তো ওই জ্যাঠার সঙ্গই ছাড়ি না আমি। সিরাজ উদ্দিন জ্যাঠাকে চিনলাম আমি তখন, যখন তিনি আর বেঁচে নেই।
আজ যে এতো লেখাপড়া শিখেছি, জ্যাঠার জ্ঞান এবং লক্ষের কাছে অতি তুচ্ছ আমার এ বিদ্যার্জন। আমার বাবাকে তার জীবদ্দশায় আমি তবু কিছুটা চিনেছিলাম। কিন্তু জ্যাঠাকে বিন্দুমাত্রও চিনতে পারিনি। তিনি ছিলেন এক অসম্ভব শক্তিধর সাধক। আমি কিছু লেখাপড়া করেছি বলেই এটা আজ ধরতে পেরেছি। যদি এসব লেখাপড়াও না করতাম, তাহলে কোনোদিন বুঝতেই পারতাম না যে, জ্যাঠা আমার এমন আধ্যাত্মিক জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন।
একসময় আমার তবলা শেখার ভীষণই ইচ্ছে হলো।এক গুরুর কাছে শিখলামও কিছুদিন। কিন্তু পরে আবার একই সমস্যা দেখা দিলো। সময় বের করতে পারছিলাম না। আর ততদিনে আবার খোল শেখার নেশায় পেলো। চারণ সাংস্কৃতিক গোষ্ঠির এক শিল্পীকে একবার পথসভায় খোল বাজিয়ে গণসংগীত গাইতে দেখলাম । শিল্পীর নাম এখন আর মনে নেই। যেমন ছিল তার খোল বাদন, তেমনি তার গায়কী। সেই থেকেই খোল শেখার নেশায় পেয়েছিল।
ওই সময় আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষককে আমার খালিকণ্ঠে গাওয়া রবীন্দ্র সংগীত শোনালাম। তিনি বললেন, আপনি রবীন্দ্র সংগীত ভালো গাইলেও গণসংগীতই বেছে নেন। কিন্তু আমার মন পড়ে থাকলো রবীন্দ্র সংগীতেই। তাই খোঁজ শুরু করলাম রবীন্দ্রনাথ কী কী গণসংগীত রচনা করেছেন। রবীন্দ্রনাথের ‘গীতবিতান’ তো বরাবরই আমার সঙ্গেই থাকতো। তাই রবীন্দ্রনাথের দেশের গানগুলো কণ্ঠে তুলে নিতে লাগলাম। তখনই খোঁজ পেলাম রবীন্দ্রনাথের ‘বিধির বাধন কাটবে তুমি তুমি কি এমনি শক্তিমান’ গানটির।এটি রবীন্দ্রনাথের একটি জনপ্রিয় গান হলেও এটির তখন কোনো স্বরলিপি খুঁজে পেলাম না। একজনের কাছে গেলাম গানটি বাজিয়ে আমাকে শোনানোর জন্য। তিনি ছাত্রদের রবীন্দ্র সংগীত শেখান। কিন্তু আমার মনে হলো তিনি সঠিকভাবে গানটির সুর তুলতে পারছিলেন না।
ততদিনে আবার আমার কাছে হারমোনিয়াম নেই। মুক্তাপাল শানু-র একটি হারমোনিয়াম ছিলো আমার কাছে। এটি প্রয়োজনেই নিয়ে গেলেন শানু-র মা মাসিমা। অবশ্য তখন হারমোনিয়ামটির কয়েকটি রীডেই সমস্যা দেখা দিয়েছিল। তিনি কুমিল্লার রানীরবাজারের কামাল ভাইয়ের দোকানে হারমোনিয়ামটি দিলেন টিউন করতে। আমি তখন নাহিদা আক্তার নিঝুমের হারমোনিয়ামটি নিয়ে এলাম।
নিঝুম কুমিল্লায় উদীচী করতেন। 2004 সালের আগেই। তারও অনেকদিন পরে দেখলাম রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস অবলম্বনে ছবি সত্যজিৎ রায়ের ‘ঘরে বাইরে’। এ ছবিতে রবীন্দ্রনাথের ‘বিধির বাধন কাটবে তুমি, তুমি কি এমনি শক্তিমান’ গানটির যথার্থ ব্যবহার দেখলাম কিশোর কুমারের কণ্ঠে। আমি আবারও এ গানের প্রেমে পড়ে গেলাম। শান্তিদেব ঘোষ -এর গাওয়া রবীন্দ্র সংগীত আমি যেভাবে নিমগ্ন হয়ে শুনতে পারি, অন্য অনেকের গাওয়া তেমন পারিনি অনেকদিনই।
কুন্দললাল সায়গলের রবীন্দ্র সংগীতের রেকর্ড নেই আমার কাছে। কনিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, সুচিত্রা মিত্র, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, দেবব্রত বিশ্বাস, সুবিনয় রায়, চিন্ময় চট্টোপাধ্যায়, সাগর সেন, আশা ভোসলে, কিশোর কুমার, সাদী মোহাম্মদ, নীলিমা সেন, অশোকতরু বন্দ্যোপাধ্যায়, কবীর সুমন, পাপিয়া সারোয়ারদের দুর্লভ রবীন্দ্র সংগীতের সংগ্রহ আমি হারিয়েছিলাম আমার প্রথম সংসার ভাঙ্গনের সময়।
সাগর সেনের গানগুলো আমার ঢাকার বন্ধু আবিদ হোসেন সংগ্রহ করে দিয়েছিল। সাদী মোহাম্মদ/ মহম্মদ সংগ্রহ শুরু করেছিলাম 1993 সাল থেকে। আমার ছোট বোন মনিকারও প্রিয় ছিল সাদী মহম্মদ। কিশোর কুমারের গাওয়া রবীন্দ্র সংগীত সংগ্রহ শুরু হয়েছিল 1994 সাল থেকেই। কিন্তু দুর্লভ এই রবীন্দ্র সংগীতের সংগ্রহ আমি হারিয়েছিলাম। রীতিমত নির্বাক হয়ে গিয়েছিলাম কষ্টে। আমি ভাবতেও পারিনি এ জীবনে এমন আক্রমণেরও শিকার হবো কোনোদিন।
আমার বাবা-মা কোনোদিনও আমাকে আমার শিল্পচর্চা কিংবা বাঁচার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করেননি। আমার মেজ আপার হারমোনিয়ামের মাধ্যমেই চর্চা ছিলো 1996 সাল পর্যন্ত। কিন্তু সামান্য টাকার সংকটে পড়ে মেজ আপা একসময় তার এতো ভালো রীডের হারমোনিয়ামটি বিক্রি করতে বাধ্য হলেন। তখন আমি অনেক কষ্টই পেয়েছিলাম।1991 সালে ঢাকায় কাদেরী কিবরিয়ার গাওয়া গানের অডিও ক্যাসেট কিনে 2002 সাল পর্যন্ত রাখতে পেরেছিলাম।
আজকাল স্বাগতালক্ষী দাশগুপ্ত, শ্রীকান্ত আচার্য্য, অদিতি মহসিন, মনোময় ভট্টাচার্য্য, শৌণক চট্টোপাধ্যায়, মনীষা ও মনোজ মুরলী নায়ারই অধিকই শোনা হয়। শ্রাবণী সেনও শুনি। যেমন এই মুহূর্তে শুনছি ইমন চক্রবর্তী। 1992 সাল থেকে 2010 সাল পর্যন্ত রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা অনেক শুনেছি। এমনকি তার রবীন্দ্র সংগীতের ভিডিওগুলো পর্যন্ত সংগ্রহ করেছি।
কিন্তু আজকাল শ্রেয়া গুহ ঠাকুরতার রবীন্দ্র সংগীতের গায়কী আমাকে উন্মাতাল করে দেয়। আর আমাদের বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অদিতি মহসিনের গাওয়া রবীন্দ্র সংগীত কেন যে অতিরিক্তই ভালো লাগে। অকল্পনীয় দরদপূর্ণ তার গায়কী। যেন তিনি স্বর্গ থেকে মর্তে নেমে এসে তার গান শেষ করেন। অথবা যেন তিনি স্বর্গে বসেই নিমগ্ন হোন রবীন্দ্র সংগীত গাওয়ায়। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ বেঁচে থাকলে তাকে অবশ্যই কোনো না কোনো বর দিতেন: অন্তত এটা আমার মনে হয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে তাকে না জানলেও এমন মতামত না প্রকাশ করেও পারলাম না। এতে অনেক গুণী রবীন্দ্র সংগীতশিল্পী মনে কষ্ট পেলে আমি অবশ্যই ক্ষমা চাই কিংবা তাদের অভিসম্পাত থেকে মুক্তি চাই।
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৮ দুপুর ১২:৫৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



