রাস্তার পাশেই ছোট্ট একটা চায়ের দোকান, জহুরুল হক হলের হলের ঠিক সামনেই। কয়েকজন লোক(রিকশাওয়ালা টাইপের) বসে চার খাচ্ছিল আর বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করছিল। সজীব মাত্র হলের গেট থেকে বের হয়েছে, চায়ের দোকানে এসে বসেছে এক কাপ চা খাবে বলে। এমন সময় কথাপ্রসঙ্গে এক রিকশাওয়ালা অন্য একজন কে ছোট্ট একটা সিগারেট দেখিয়ে বললো, ""ভাই, জিনিসটা ছোট হইলে কি অইব মূল্য কিন্তু অনেক"। সজীব বেঞ্চ থেকে উঠে লোকটার হাত থেকে সিগারেট টা নিয়ে মাটিয়ে ফেলে দিলো। সিগারেট টা কে পা দিয়ে পিষতে পিষতে বললো, "আমার জীবনটা ও ছোট, কিন্তু তার মূল্য এর চাইতেও বেশী" বলেই হন হন করে চলে গেল, দোকানদার মামা চা সাধলেও সে থামলো না। আর রিকশাওয়ালা টা হা করে সজীবের দিকে চেয়েই রইলো, সজীবের কথার মাথা-মুন্ডু কিছুই না বুঝার কারনে সে ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল।
সজীব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালের মাষ্টারস এর ১ম বর্ষের ছাত্র। মেধাবী ছাত্র।জহুরুল হক হলে থাকে। ক্লাস, টিউশন, বন্ধুবান্ধব এই নিয়ে ভালই চলে যায়। বাবা মা গ্রামে থাকে। প্রতি মাশে টিউশন থেকে ৭ হাজার টাকা পেয়ে ৪ হাজার টাকা বাবা মা'র জন্য পাঠিয়ে দেয়, বাকিটা দিয়ে তারা টেনে-টুনে চলে যায়।
২ বছর আগের কাহিনী, হঠাত করেই কাশতে কাশতে রক্ত বের হয়ে আসে মুখ থেকে। সজীব অজ্ঞান হয়ে যায়। হলের রুমমেট রা ধরাধরি করে ডাক্তার এর কাছে নিয়ে যায়। ডাক্তার চেকয়াপ করে রিপোর্ট দেয়, "সজীবের ব্লাড ক্যান্সার"। অনেক দূর গরিয়ে গিয়েছে, হয়তো আর বেশিদিন বাচবে না, ২/৩ বছরের মত বাচবে। সেই থেকেই সজীব সিগারেট খাওয়া বন্ধ করে দেয়। আগে প্রচুর সিগারেট খেত সজীব। বলতে গেলে চেইম স্মোকার ছিল। দিনে ১০/১২ টা ও হয়ে যেত। এখন সেই জিনিসটাকে দেখলেই গা ঘিন ঘিন করে। অন্য কাউকে টানতে দেখলেও আপত্তির শেষ থাকেনা।
গরীব বাবা মা গ্রমে থাকে, সর্বদা তার টাকার অপেক্ষায়। বুড়ো বাবা মাকে সজীব খুব ভালোবাসে, বাবা ফোন করে বলে,
-বাজান, এই টাকা দিয়া তো সংসার চলেনা
-আর কয়েকটা দিন আব্বা। তারপর আমি বড় চাকরী করমু। বড় বাড়ি কিনমু, তোমাগোরে এইখানেই লয়া আমু। তোমরা সুখে থাকবা
-বাজান কবে আইবো এই দিন
-বেশী না আব্বা আর দুই বছর
গরীব বৃদ্ধ বাবা ফোন দিলেই এই বলে সান্তনা দেয় সজীব। সজীবের ক্যান্সারের কথা তার বাবা মা কেউই জানেনা। বৃদ্ধ বাবা মা কে খুব ভালোবাসে সজীব। তাদের কষ্টের জীবনে আর নতু করে কষ্টের যোগ করতে চায়না সে। তাই তাদের আশ্বাস দিয়ে যায়।
সজীব তখন মাষ্টারস ফাইনাল ইয়ারে। বের হতে আর কয়েকদিন, এই সময় সে অনেক বড় একটা কোম্পানী তে চাকরীর অফার পেল। সে তার বাবাকে ফোন দিলো,
-আব্বা আমি চাকরী পাইছি
-হাচা বাজান?
-হ আমি এই মাসের বেতন পায়াই বাড়িত তে তোমাগোরে শহরে লয়া আমু
-ঠিক আছে বাজান(কাদতে কাদতে)
সজীবের বাবা খুব বড় স্বপ্ন দেখে ফেললো। গ্রামের সবাইকে বলে বেড়াতে লাগোলো তার ছেলে চাকরী পেয়েছে, তার আর দুঃখ থাকবোনা তাদের, তাদের ছেলে তাদের ঢাকা নিয়া যাইবো।
এদিকে সজীব ও চাকরীতে জয়েন করেছে। এখনো বাসা নেয়নি, হলে থেকেই যাতায়াত করছে, তার ও চিন্তা প্রথম মাসের মাইনে পেয়েই বাবা-মাকে ঢাকা নিয়ে আসবে। চাকরীর ১৫ দিন যেতে না যেতেই সজীব ক্রমশ অসুস্থ হয়ে যেতে থাকলো, প্রায় সা দিন বিছানায় পরে থাকার পর তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলো। কয়েকদিন আইসিউ তে থাকার পর সজীব এই ধরনীর মায়া ত্যাগ করলো?।
সজীবের বাবা মা'কে কেউই তার মৃত্যুর খবর দেয়নি। তারা এখনো মনে মনে রঙিন স্বপ্ন দেখছে, তারা ঢাকা যাবে ছেলের সাথে বড় বাড়িতে থাকবে।
হঠাৎ গাড়ির শব্দ পেল সজীবের বাবা। সে ভাবলো তার ছেলে তাদেরকে নিতে গাড়ি নিয়ে এসেছে। দৌড় দিয়ে ঘরের বাইরে গেল, এটা গাড়ি নয় এ্যম্বুল্যান্স। গাড়ি থেকে সাদা পোষাক পড়া কয়েকজন মানুষ নামলো সাথে একটা লাশ। সজীবের বাবা ভয় পেয়ে গেল,
হুম লাশটা তার ছেলের, সজীবের মা ছেলের লাশকে ধরে কাদতে লাগলো, সজীবের বাবা লাশের পাশে বসে রইলো কোন শব্দ নেউ মুখে। অধিক শোকে বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেছে। চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ছে, আর ভাবছে সজীবের ফোনের সেই কথাগুলো,
"বড় বাড়ি, বড় গাড়ি, বড় বাড়ি, বড় গাড়ি"
মুখ দিয়ে বিড় বিড় করে এগুলোই বলতে লাগলো সজীবের বাবা। রাত হয়ে গিয়েছে সজীবের বাবা এখনো লাশের পাশে বসে বির বিড় করেই চলেছে।
দূরে কোথাও একটা কুকুরের ঘেউ ঘেউ ডাকের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে, শব্দটা আস্তে আস্তে বাতাসে মিলিয়ে গেল।
বড় বাড়ি, বড় গাড়ি আর দেখা হলনা।অপ্রাপ্তিতেই সমাপ্তি হয়ে গেল।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


