দীর্ঘ দিন যাবত স্কটল্যান্ড গ্রেট ব্রিটেন থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীনতার দাবি করে আসছিল। কিন্তু এ দাবির পক্ষে ঠিক কত শতাংশ মানুষের সায় ছিল তা জানার কোন ব্যবস্থা ছিল না। তবে স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টির পক্ষ থেকে প্রচারণায় বিশ্ববাসীর কাছে মনে হয়েছিল যে হয়তো অধিকাংশ স্কটিশ জনগণই স্বাধীনতার পক্ষে রয়েছে। কিন্তু দেখা গেছে গত বৃহস্পতিবার অনুষ্টিত স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার পক্ষ্যে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের ফলাফলে ‘না’ পক্ষ বিজয় লাভ করেছে। স্কটল্যান্ডবাসীর পক্ষ থেকে এই মতামতের ফলাফল বিশ্ববাসীকে বিষ্মিত করেছে। কেননা আধুনিক বিশ্বে স্বাধীনতার পক্ষে ব্যাপক জোয়ার বইছে। এক গত শতাব্দীতেই বিশ্বের মানচিত্রে অনেক রাষ্ট্রের নাম যুক্ত হয়েছে। আরো বহু ভূ-খণ্ড স্বাধীনতার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। অনেক দেশে স্বাধীনতার দাবিতে যুদ্ধও চলমান আছে। সে দিক বিবেচনা করলে বিনা যুদ্ধে স্বাধীনতা পাওয়ার এই সুবর্ণ সুযোগ হাতের কাছে পাওয়ার পরেও তারা একে হেলায় কেন প্রত্যাখ্যান করলো তা অন্যদেরকে বিষ্মিত না করে পারে না।
স্কটল্যান্ডবাসীর এই রূপ সিদ্ধান্তের কারণ কী? স্বাধীনতার নামে বিশ্বে যে আবেগের জোয়ার বইছে তাতে অধিকাংশ স্কটল্যান্ডবাসীরাই কেন সাড়া দেয় নি? স্বাধীনতা বিপক্ষে অধিকাংশ স্কটিশদেরকে রায় দেওয়ার ব্যাপারে কী মনস্তত্বটা কাজ করতে পারে- এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা অত্যন্ত জরুরি।
মূলত ধর্ম ও জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে জাতিতে জাতিতে আলাদা হয়ে যাওয়ার মানসিকতা মানুষের পুরনো স্বভাব। এটা এক ধরনের মোহে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এর ফলাফল ঐ অর্থে মানুষের জন্য সুখ বয়ে আনতে পেরেছে খুব কম ক্ষেত্রেই। অর্থাৎ একান্তই কোন দেশের হাতে শোষিত না হলে ভাঙ্গন কখনোই সুখকর হয় না। এ ক্ষেত্রে পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা উদাহরণযোগ্য। কিন্তু ভারত ভেঙ্গে জন্ম নেওয়া পাকিস্তান আজও সুখী হতে পারে নি।
সম্ভবত স্কটল্যান্ডবাসীর মনস্তত্বে কাজ করেছে যে, একটি শক্তিশালী দেশ থেকে আলাদা হওয়াটা একটা আবেগ, কিন্তু এই আবেগের ফল নিজেদেরকে দুর্বলই করে দিতে পারে। ব্রিটেন বিশ্বের বুকে অন্যতম শক্তিশালী একটি দেশ। ব্রিটেনের উন্নয়নে তাদের উন্নয়ন নিহিত আছে। ব্রিটেনের মর্যাদার সাথে তাদের মর্যাদাও বৃদ্ধি পায়। তাছাড়া ব্রিটেনকে আজকের অবস্থানে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে স্কটিশদের অবদানও অসামান্য। সুতরাং আবেগের বশে স্বাধীন হয়ে গেলে আবেগ ব্যতীত তাদের বাস্তবিক লাভটা কী?
তাছাড়া যেহেতু ব্রিটেনের উত্থানকাল থেকেই স্কটিশরাও তাদেরই সাথে ছিল সেহেতু তারা নিশ্চয় ভাল করেই জানে যে, ব্রিটিশরা আজকের অবস্থানে আসতে গিয়ে বিগত প্রায় তিন শতাব্দী পর্যন্ত তাদের অধীনস্ত অঞ্চলের উপর ‘ডিভাইড এন্ড রুল’ নীতি প্রয়োগ করে আসছিল। এই নীতি প্রয়োগের কারণেই অন্যান্য জাতিগুলো দুর্বল হয়ে ব্রিটেনসহ অন্যান্য ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর পদানত হতে বাধ্য হয়েছে। সুতরাং এই সত্যকে জেনে শুনেই কিভাবে নিজেদের পায়ে কুড়াল মেরে তারা নিজেদেরকে দুর্বল করতে পারে?
স্কটল্যান্ডবাসীর এই অভাবনীয় সিদ্ধান্ত নিশ্চয় পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের স্বাধীনতাকামীদের ভাবনার ক্ষেত্রে নতুন করে একটি ধাক্কার সৃষ্টি করবে। নিশ্চয় তারা ভেবে দেখবে স্বাধীনতা তাদেরকে বায়বীয় লাভ ছাড়া বাস্তবিক ক্ষেত্রে কি উপহার দিতে পারে। একান্তই বাধ্য না হলে তাদের উচিৎ ঐক্যবদ্ধ থেকে শক্তিশালী হওয়া। স্কটল্যান্ডবাসী নিশ্চয় ভাল করেই জানে, ‘ইউনাইটেড উই স্ট্যান্ড, ডিভাইডেড উই ফল’ এবং তাদের গৃহীত সিদ্ধান্ত উদাহরণ হিসেবে কাজ করবে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



