ইসলাম আরবে এলেও তা এসেছে সারা দুনিয়ার মানুষের জন্য। ইসলাম একটি সার্বজনীন ধর্ম। এটা শুধু আরবদের ধর্ম নয়। এই দীনের একটি নাম দীনুল ফিতরাহ বা প্রাকৃতিক দীন। এটা যেমন উষর মরুতে বসবাসকারী ঢিলে-ঢালা পোশাক পরিহিত মানুষের জন্য তেমনি এটা বরফ ঢাকা সুদূর সাইরেবিয়ার মোটা কাপড়ে আবৃত মানুষের জন্যও। একই সাথে সেটা আফ্রিকার মানুষের জন্য, এশিয়ার মানুষের জন্য, ইউরোপের মানুষের জন্য। অর্থাত সব ধরনের আবহাওয়া, সব ধরনের খাদ্যাভ্যাস, সবধরনের পোশাক পরিহিত মানুষের জন্য এই ইসলাম। কেউ যদি সেটাকে শুধু আরবের কিংবা শুধু আফ্রিকার বানিয়ে ফেলে তবে তারা এর সার্বজনীনতাকে অস্বীকার করলো, ইসলামকে খাটো করে ক্ষুদ্র গণ্ডিতে আবদ্ধ করলো। এ ধরনের ধ্যান-ধারণায় যারা বিশ্বাসী তারা মুখে যতই ধর্মের জিকির তুলুক তারা সেই ধর্মের মহিমাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। তারা কূপমণ্ডূক, বর্জনীয়।
ইসলামের বিধানগুলো এমনই যে এটা সমস্ত মানবজাতিকে একজাতিতে পরিণত করার পক্ষে। অর্থাত একই আদম হাওয়ার ঔরস থেকে আগত সাদা, কালো, বাদামী, শ্যামলা সবাইকে ভাই ভাইয়ে পরিণত করা পক্ষপাতী। তার মানে এই নয় সবাইকে সাদা হতে, সবাইকে কালো হতে হবে অথবা সবাইকে বাদামী হতে হবে কিংবা সবাইকে শ্যামলা হতে হবে। তার মানে এই নয় যে সবাইকে কোন নির্ধারিত অঞ্চলের পোশাকই পরতে হবে, নির্ধারিত অঞ্চলের খাদ্যাভ্যাসে অভ্যস্ত হতে হবে। নির্ধারিত অঞ্চলের আবহাওয়া, সে অনুযায়ী তাদের পোশাক-পরিচ্ছদ, গায়ের রং রেখেই তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। এগুলোর উর্ধ্বে উঠেই যখন তারা বিভেদ-ব্যবধান ভুলতে সক্ষম হবে তখন তাদের মধ্যে বিরাজ করবে ঐক্য, সমৃদ্ধি ও শান্তি। তারা পরিণত হবে ভাই-ভাইয়ে। এরই নাম ইসলাম। অন্যদিকে যারাই সেই ব্যবধানকে অস্বীকার করে শুধুমাত্র কোন একটা অঞ্চলের পোশাককে( উদাহরণ, সাইবেরিয়ার মানুষকে আরবের পোশাক পরানো), খাদ্যাভ্যাসকে (ইউরোপ-আমেরিকানদেরকে ভাত খাওয়ানো) জোর করে চাপিয়ে দিতে চাইবে, মনে রাখতে হবে সেটা হবে অযৌক্তিক, অর্ধার্মিক, অনৈসলামিক। মনে রাখতে হবে তারা ইসলামের মূল উদ্দেশ্য সম্বন্ধে অজ্ঞ। তারা যদি সেটা নিয়ে বাড়াবাড়ি করে তবে তাদেরকে প্রতিহত করতে হবে, বর্জন করতে হবে। কেননা তাদের এ আচরণ প্রকৃতি বিরুদ্ধ, বাস্তবতা বিবর্জিত। সেটা ইসলামের অপর নাম দীনুল ফিতরাহ এর বিপরীত কোন কিছু। ইসলাম যুক্তির ধর্ম। রসুলাল্লাহ বলেছেন, আমার ধর্মের ভিত্তি দাড়িয়ে আছে যুক্তির উপর। অতএব যা অযৌক্তিক তাকে ধর্মের বিধান বলে চাপিয়ে দেওয়া অন্যায়, অনৈসলামিক।
প্রশ্ন হচ্ছে এমনও দেখা যায় যে কিছু কিছু বিষয়ে কোন কোন ব্যাখ্যাকারীরা ইসলামের দৃষ্টিতে হারাম বলে ফতোয়া দেয়। এসব ক্ষেত্রে দেখা যায় তারা হাদিসের উল্লেখও করে। হাদিস ও ইতিহাস নিয়ে কথা হচ্ছে সেগুলোর সব নির্ভযোগ্য নয়। নির্ভরযোগ্য হচ্ছে শুধুমাত্র আল্লাহর কোরান। হাদিস বহু লোক বহুভাবে বিকৃত করেছে, নিজেদের সুবিধার্থে নিজেদের মত করে বানিয়ে নিয়েছে। এ সম্বন্ধে তথ্যাভিজ্ঞ ও সচেতন ব্যক্তি মাত্রই জেনে থাকবেন। তাছাড়া বহু সঠিক হাদিস ইসনাদের অভাবে বাতিল হয়ে গেছে আবার ইসলামের মৌলিক আকীদার সাথে সাংঘর্ষিক হাদিসও সহী হাদীসের গ্রন্থে লিপিবদ্ধ হয়েছে। তাই সব ক্ষেত্রে হাদিসের উপর নির্ভর করতে গেলে সমস্যা বাড়তে থাকবে। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে আল্লাহর রসুল বলেছেন, আমার কোন কথা কোরআ'নের কথাকে রদ করবেনা কিন্তু কোর'আনের কথা আমার কথাকে রদ করবে।
একথা সন্দেহাতীত যে আল্লাহর অভিপ্রায় হচ্ছে সব ধরনের অন্যায়- অত্যাচার, অবিচার ও দাঙ্গা-হাঙ্গামা, রক্তারক্তি (ফাসাদ ও সাফাকুদ্দিমা) নির্মূল করে মানবজাতিকে আবার একজাতিতে পরিণত করার মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে ইবলিসের চ্যালেঞ্জে বিজয়ী হওয়া। সেটা করতে হলে মানবজাতিতে বিদ্যমান ভৌগোলিক পার্থক্য, গায়ের রং, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক-পরিচ্ছদের ব্যবধান গোছানো প্রয়োজনীয় নয়, বরং সেগুলোকে স্বীকার করে নিয়েই ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। যারা সেই পার্থক্যগুলোকে সামনে তু্লে ধরে মানুষে মানুষে দূরত্ব বৃদ্ধি করার পক্ষপাতি তারা আর যাই হোক আল্লাহর পক্ষে কাজ করছে না, করছে শয়তানের পক্ষ হয়ে। সেই হিসেবে ভৌগোলিক ভিন্নতার জন্য যেসব পার্থক্য রয়েছে, পালা-পার্বন রয়েছে, উতসব রয়েছে সেগুলো সার্বজনীন ধর্ম ইসলাম স্বীকার করে। স্বীকার করে না কেবল কূপমণ্ডূক ও গোড়াপন্থীরা। তবে কথা হচ্ছে এর মানে এই নয় যে সেসব উতসবের নামে করা অপচয়, অশ্লীলতা, বেলেল্লাপনাকেও ইসলাম স্বীকার করে নেয়। এখন যদি উতসবের নামে, পালা-পার্বনের নামে সেসব ক্রিয়া-কলাপ চলে তবে সেই ক্রিয়া-কলাপই নিষিদ্ধ হবে। মাথাব্যথার জন্য মাথা কাটা কোন চিকিতস্যা হতে পারে না। তেমনি দা-বটি দিয়ে মানুষ মাছ-তরকারী কাটার পাশাপাশি মানুষ খুনও করা যেতে পারে। মানুষ খুন করা যেতে পারে বলে দা-বটি হারাম হতে পারে না। মানুষ খুন করাটাই এক্ষেত্রে হারাম।
শুভ বাংলা নববর্ষ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


