
নীল বিদ্রোহ মূলত কৃষক আন্দোলন যা নীল চাষিরা শুরু করেন এবং ১৮৫৯ সালে সমগ্র বাংলায় তা ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরে । আর এই বিদ্রোহের পিছনে কাজ করে অর্ধ শতাব্দী পূর্বে নীল চাষ আইন প্রণয়ন । ১৮৫৯ সালে নীলচাষীরা নীল গাছের একটি চারা বপন করতে অস্বীকৃতি জানান । অর্ধ শতাব্দী ধরে নৃশংসতার শিকার জনগোষ্ঠীর কাছে কৃষকদের দাবি নাটকীয়ভাবে শক্তিশালী রুপ ধারন করে । সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল এই বিদ্রোহ বাংলার প্রধান ধর্মীয় গোষ্ঠীদের সমর্থন লাভে করে । বিশেষত চাঁদপুরের হাজি মোল্লা যিনি ঘোষণা দেন নীলচাষ থেকে ভিক্ষা উত্তম । কৃষকদের এই আন্দোলন সম্পূর্ণই একটি অহিংস প্রতিরোধ ছিল।
১৭৭৭ সালে বাংলায় প্রথম নীল চাষ শুরু হয়েছিল এবং লুইস বোনার্ডকে প্রথম নীলকর মনে করা হতো । উনিশ শতকের প্রথম ভাগে ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লবের ফলে সেখানকার বস্ত্র শিল্পে নীলের চাহিদা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায় । বাংলায় ব্রিটিশ ক্ষমতা সম্প্রসারণের সাথে সাথে নীল চাষের এলাকা বর্ধমান, বাঁকুড়া, বীরভূম, মুর্শিদাবাদ এলাকায় বিস্তৃত করে । নীলকররা কৃষকদের উৎকৃষ্ট জমিতে নীল বুনতে বাধ্য করতো । নীল ছাড়া অন্য কোনো শস্য উৎপাদন করতে দিতেন না । দাদনের টাকা নেওয়ার সময় শর্তসাপেক্ষে চুক্তিপত্রে টিপ সই দিতে হতো আর চুক্তি অনুযায়ী কাজ না করলে চাষির ওপর চালানো হতো অকথ্য অত্যাচার । ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দে সরকার এক আইন জারি করেছিল যাতে নীলকররা আরও শক্তিশালী এবং আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন । নীল চাষ করতে না চাইলে কৃষকদের ওপর বিভিন্নভাবে নির্যাতন চালানো হতো । যেসব কৃষক অত্যাচারের ভয়ে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যেতেন তাদের ভিটেমাটিতে নীল চাষ করা হতো । কারও কারও গৃহ বাড়ি আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হতো । প্রতিটি নীলকুঠিতে ছিল কয়েদখানা । অত্যাচারের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় নীল চাষের বিরুদ্ধে চাষীরা ঐক্যবদ্ধ হতে শুরু করে এবং চারদিকে দেখা দিয়েছিল বিদ্রোহের সুত্রপাত ঘটে।[৩] মধ্যবিত্ত সমাজ কৃষকদের আকুন্ঠ সমর্থন দিয়েছিল। হরিশ্চন্দ্র মুখোপাধ্যায়, তার সংবাদপত্র দি হিন্দু প্যাট্রিয়ট-এ গরীব কৃষকদের দুর্দশার কথা তুলে ধরেন। এরপর, দীনবন্ধু মিত্র নিবন্ধ পাঠ করেন এবং নীল দর্পণ নাটকের মাধ্যমে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তুলে ধরেন । নাটকটি ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি করে ।
তৎকালীন নদীয়া বর্তমানে বাংলাদেশের যশোর জেলায় চৌগাছায় সর্বপ্রথম বিদ্রোহ দেখা দেয় বিষ্ণুচরণ বিশ্বাস এবং দিগম্ভর বিশ্বাসের নেতৃত্বে । বিদ্রোহ দ্রুত বর্ধমান বাঁকুড়া, বীরভূম মুর্শিদাবাদ পাবনা ও খুলনায় ছড়িয়ে পড়ে । কিছু নীলকরের বিচার করা হয় এবং ফাঁসি দেওয়া হয় । কৃষকরা বহু নীলকুঠি ভেঙে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেন । নীলকরদের মাল বহনের যোগাযোগের রাস্তা বন্ধ হয়ে যায় । সশস্ত্র কৃষকরা সরকারি অফিস স্থানীয় ম্যাজিস্ট্রেটের কোট কাচারি প্রভৃতির ওপর আক্রমণ চালায় । এই বিদ্রোহে হিন্দু মুসলমান কৃষকরা ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধভাবে যোগ দিয়েছিলেন । নীল বিদ্রোহ কঠোরভাবে দমন করা হয় । ব্রিটিশ সরকারের ও কিছু জমিদারের সমর্থন নিয়ে পুলিশ এবং সামরিক বাহিনীর দিয়ে কিছু কৃষকের উপর অত্যাচার করা হয় । যদিও এই বিদ্রোহ ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় যাতে প্রায় পুরা বাংলা জড়িয়ে পড়ে । নদীয়ার বিশ্বাস ভাতৃদ্বয়, পাবনার কাদের মোল্লা, মালদার রফিক মণ্ডল জনপ্রিয় নেতা ছিলেন ।
ঐতিহাসিক যোগেশচন্দ্র বাগলএর বর্ণনা মতে কৃষকদের নীল বিদ্রোহের অহিংস আন্দোলন সিপাহী বিদ্রোহের চেয়ে বেশী সফল হয়েছিল । বিদ্রোহের ঘটনার খবর ইংল্যান্ডে পৌঁছে যায় । এবং এটি নিয়ে পার্লামেন্টে প্রকাশিত হওয়ার দরুন চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে । ব্রিরিশ পার্লামেন্ট কৃষকদের দুরবস্থার বিষয় নিয়ে ইংরেজ শাসকদের কাছে কৈফিয়ত তলব করে এবং বিদ্রোহ ও অসন্তোষের কারণ অনুসন্ধানে একটি কমিটি গঠন করেন । কমিটি সবকিছু তদন্ত করে নীল গাছের দাম বাড়িয়ে দেয় আর তাতে লাভের পরিমান কমে গেলে নীলকররা কারখানাগুলো বিক্রয় করতে বাধ্য হন । ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে নীলের উৎপাদন কমে যাওয়ায় নীলকররা এই বাবস্যা বন্ধ করে দেন ।
দীনবন্ধু মিত্র ১৮৫৯ সালে নীল বিদ্রোহ নিয়ে নীল দর্পণ নাটক রচনা করেন । মাইকেল মধুসূদন দত্ত এটি ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করেন এবং এটি প্রকাশ করেন রেভারেন্ড জেমস লং । এটা ইংল্যান্ডে অনেক মনোযোগ আকৃষ্ট করে যেখানে তাদের দেশের মানুষের বর্বরতার তারা স্তব্ধ হয়ে যায় । ব্রিটিশ সরকার পরিহাসের বিচারের মাধ্যমে রেভারেন্ড লং- কে কারাদন্ড ও জরিমানার শাস্তি দেওয়া হয় । কালীপ্রসন্ন সিংহ তার জরিমানার টাকা পরিশোধ করেন ।
তথ্য ইন্টারনেট ।
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই ডিসেম্বর, ২০১৫ সকাল ৯:০২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




