জুয়েল আইচ : শুভ জল্প্মদিন
আজিজুল পারভেজ
যার প্রাণময় উপস্ট্থাপনা আর জাদুর ইন্দ্রজালে মোহাচ্ছল্পম্ন হয় হাজার হাজার দর্শক, যিনি বাংলাদেশকে বহির্বিশ্বে প্রতিনিয়ত উপস্ট্থাপন করে চলেছেন ভিল্পম্ন মহিমায়_বাংলাদেশের জুয়েল খ্যাত সেই নন্দিত জাদুশিল্কপ্পী জুয়েল আইচের আজ জল্প্মদিন।
নিজে কখনো জল্প্মদিনের কোনো আয়োজন করেন না জুয়েল আইচ। মনেও থাকে না তার। কোনো আনুষ্ঠানিকতাও নেই। তবে আজ দুপুরে চ্যানেল আই তার জল্প্মদিন উপল েএকটি বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করছে_যা সরাসরি সমঙ্্রচার করা হবে। স্যাটেলাইট চ্যানেল এটিএন বাংলা ও বাংলাভিশনও বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করছে।
পিরোজপুরের প্রত্যল্পস্ন গ্রাম সমদিকাটির এক সাংস্ট্কৃতিক পরিবারে জল্প্ম জুয়েল আইচের। অতি শৈশব থেকে জাদুর সঙ্গে জড়িয়ে যাওয়া জুয়েলের সবচেয়ে বড় জাদু নিজের জীবন। বাধার পাহাড় পেরিয়ে কী করে স্ট্বপম্নকে সত্যে রহৃপাল্পস্নরিত করতে হয় তিনি নিজেই তার জীবল্পস্ন উদাহরণ।
জল্প্মদিনকে সামনে রেখে গতকাল সকালে ধানমন্ডির বাসায় একাল্পেস্ন কথা হয় জুয়েল আইচের সঙ্গে। জল্প্মদিনের অনুভূতি সমঙ্র্কে তিনি সরাসরি কিছু না বললেও বলেন, যে দিন থেকে বুঝতে পেরেছি মৃতু্য নিশ্চিত, সেদিন থেকে প্রতিটি দিন মহার্ঘ্য। যে দিনটি আনন্দে যায়_সেদিন আমার কাছে বিরাট উপহার। যে দিন কদ্বে যায়_সেদিন মনে হয় কদ্ব পেলাম, তবুও তো বেঁচে ছিলাম। তিনি বলেন, যদি আজ মরে যাই একটুও আপত্তি থাকবে না। জীবনের প্রতিটি দিন আমি উপভোগ করেছি।
মানুষের নির্মল আনন্দের জন্য কম করে হলেও হাজার রকমের ম্যাজিক আইটেম প্রস্টস্নুত করেছেন বিশ্ববরেণ্য এ শিল্কপ্পী। প্রতিনিয়ত নতুন নতুন বিষয় উপস্ট্থাপনেই তার আগ্রহ। তার পরও দুই শতাধিক আইটেম আছে যেগুলো বার বার প্রদর্শন হয়।
জুয়েল বাংলাদেশ তো বটে ব্যাপকভাবে ঘুরেছেন সারা পৃথিবী। বিশ্বের এক প্রাল্পস্ন থেকে অপর প্রাল্পস্ন, এমন কোনো বড় শহর নেই যেখানে প্রদর্শনী করেননি তিনি। কতটি প্রদর্শনী করেছেন? তার পরিসংখ্যান আর দিতে পারলেন না শিল্কপ্পী। তবে সবচেয়ে বেশি প্রদর্শনী করেছেন ইংল্যান্ডে। সেখানকার প্রায় সব শহরের প্রধান প্রধান থিয়েটার হলে প্রদর্শনী করেছেন, যেগুলোতে বিশ্বের সেরা তারকারা প্রদর্শনী করেছেন তাদের সেরা সৃজন কর্ম, যেখানে কোনো বাংলাদেশী এর আগে প্রদর্শনী করেননি। এর মধ্যেও ভারত, জাপান, আমেরিকা ও অস্টেল্ট্রলিয়ার প্রদর্শনীগুলো তিনি খুবই উপভোগ করেছেন। তবে সবচেয়ে বড় প্রদর্শনী হয়েছে ঢাকা স্টেল্টডিয়ামেই। 1996 সালের স্ট্বাধীনতা দিবসের সেই প্রদর্শনীতে লাধিক লোকের সমাগম ঘটেছিল। সুবিশাল স্টেল্টডিয়ামের কোথাও ছিল না তিল ধারণের ঠাঁই। সবখানেই দর্শকরা তার সম্মোহনী মতায় তল্প্ময় হয়ে উপভোগ করেন নান্দনিক জাদু প্রদর্শনী।
আমাদের ঐতিহ্যবাহী জাদুতে নতুন মাত্রা যুক্ত করে বিশ্বসভায় তুলে ধরে জুয়েল আইচ দেশকে সল্ফ্মানিত করেছেন। বিশ্বের নানা জাতির নানা ভাষার মানুষের কাছে তার জাদু অর্জন করেছে বিশেষ জনপ্রিয়তা । স্ট্বীকৃতিস্ট্বরহৃপ রাদ্ব্রীয় একুশে পদকসহ অসংখ্য জাতীয় এবং আল্পস্নর্জাতিক পুরস্ট্কারে ভূষিত হয়েছেন।
ভারতের দিল্ক্নী ও কলকাতার দুটি প্রদর্শনীর কথা বিশেষভাবে মনে আছে জুয়েল আইচের। কলকাতার রবীন্দ্র সদন মঞ্চ তার কাছে স্ট্বপেম্নর মতো। ভাবতেন, যদি একবার সেখানে শো করতে পারতাম। সুযোগটা এলো 1995 সালে। কিল্পস্নু সেখানে গিয়ে এক ধরনের অনাদর ও তাচ্ছিল্যের ভাব ল্য করলেন তিনি। ভাবখানা এমন_পিসি সরকারের কলকাতায় তিনি আবার এসেছেন জাদু দেখাতে। জুয়েল নিজেকে আশ্বস্টস্ন করলেন এই বলে, ওরা হয়তো জানে না পিসি সরকার আমাদের, আমাদের টাঙ্গাইলের সল্পস্নান। আমরা তার উত্তরাধিকার বহন করে চলেছি। প্রদর্শনী শুরু হলো। পর পর তিনটি জাদু প্রদর্শন করলেও তিনি ল্য করলেন দর্শকদের মধ্যে কোনো সাড়া-শ্বন্ধ নেই। অবাক করা কাণ্ড, পৃথিবীর কোথাও এমন ঘটনা ঘটেনি। কিল্পস্নু চতুর্থ জাদু প্রদর্শনের পর বিস্ট্ময়াভিভূত দর্শক এমন উল্ক্নাস দেখালেন, আনন্দবাজার পত্রিকার ভাষায়_তখন মনে হচ্ছিল উড়ে যাবে ছাদ, ভেঙে যাবে দেয়াল।
এক সময়ের কিংবদল্পিস্ন বাঙালি জাদুশিল্কপ্পী পিসি সরকারকে জুয়েল কল্কপ্পনায় গুরুস্ট্থানীয় হিসেবে মান্য করেন। তার মতে, পিসি সরকার না এলে আমি আসতাম কিনা সন্দেহ।
সদাহাস্যোজ্জ্বল মুখচ্ছবির নন্দিত শিল্কপ্পী জুয়েল আইচ আপদমস্টস্নক একজন খাঁটি বাঙালি। আচরণ এবং পোশাক-পরিচ্ছদেও তিনি বাঙালিত্দ্বকেই উপস্ট্থাপন করেন। একজন জাদুশিল্কপ্পী মানেই পাগড়ি, শেরোয়ানি, চোস্টস্ন পায়জামা, জয়পুরি নাগরাই রাজার জুতো_বিশেষ পোশাকধারী শিল্কপ্পী, জাদুশিল্কপ্পীর যে প্রতিচ্ছবি অঙ্কন করে গেছেন পিসি সরকার কিংবা পাশ্চাত্যের কালো আলখাল্ক্না পরা, নরকঙ্কালের ছবি ও হাড়-হাড্ডিসমেত বিশেষ ব্যক্তির যে রহৃপ তা তিনি অনুসরণ করেন না। পিসি সরকারের প্রতি গভীর শ্রদব্দা রেখেই বলেন, তিনি যে রাজার পোশাক পরতেন তা নিজের পোশাক মনে হয়নি। আমার চেতনার মতো মনে হয়নি। দর্শকের কাছে নিজেকে তাদের একজন হিসেবে প্রকাশ করতে চাই। সত্যি মনে করি আমি একজন সাধারণ বাঙালি। একজন বাঙালি তার অতিথিদের সামনে কোনো উৎসবে স্ট্বাভাবিকভাবে যে পোশাক পরে যেতে পছন্দ করে আমি ঠিক সেইভাবে দর্শকের সামনে উপস্টি্থত হই। কখনো হাফ শার্ট, কখনো পাঞ্জাবি-পাজামা, শীতে সোয়েটার-কোর্ট সবই পরি। দর্শকদের বোঝাতে চাই আমি তোমাদের লোক এবং তোমাদের মতোই কেউ একজন।
দেশের জাদুশিল্কপ্প নিয়ে উচ্চাশা পোষণ করেন তিনি। বলেন, দর্শক এখন জাদুশিল্কপ্পকে পজিটিভলি নিয়েছে। সব বয়সী দর্শক তৈরি হয়েছে। সমস্যার দিক নিয়েও কথা বলেন তিনি। তার বক্তব্যে দেশের সামগ্রিক সাংস্ট্কৃতিক সঙ্কটের চিত্রই ফুটে ওঠে। তিনি বলেন, সাংস্ট্কৃতিক বোদব্দা মানুষের হাতে পয়সা নেই। মধ্যবিত্তের জীবনযাপনেই নাভিশ্বাস উঠে যাচ্ছে। দেশে ব্যবসায়ী-শিল্কপ্পপতির প্রথম জেনারেশন ব্যবসা করছে। তারা পড়িমরি করে টাকা উপার্জনে ব্যস্টস্ন। অন্যদিকে নজর দেয়ার মতো সময় এখনো তাদের হয়ে ওঠেনি। সরকার ব্যস্টস্ন তার গদি নিয়ে। শিল্কপ্প-সংস্ট্কৃতিকে যে সহযোগিতা সরকার করছে তা প্রয়োজনের তুলনায় অতি নগণ্য। ফলে শিল্কপ্প সংস্ট্কৃতিতে যে ফুল ফুটছে সেগুলো অকর্ষিত বুনোফুলের মতো কিল্পস্নু সত্যিকার সাংস্ট্কৃতিক বিকাশে সযত্দম্ন কর্ষণ এবং যত্দম্নআত্তি দরকার।
অবিনশ্বর একাত্তরের একজন অসীম সাহসী যোদব্দা জুয়েল আইচ। দেশমাতৃকার স্ট্বাধীনতা যুদব্দে অস্ট্পহাতে অংশগ্রহণের অমিত গৌরবের অংশীদার তিনিও। মেজর জলিলের 9 নল্ফ্বর সেক্টরের আওতায় সরাসরি অংশ নেন যুদব্দে। যুদব্দের মাঠে তের কারণে পায়ে গ্যাংগ্রিন হয়ে গিয়েছিল। ভুগেছিলেন রক্ত আমাশয়ে। মুক্তিযুদব্দে অংশগ্রহণের কারণে নিজেকে বিশ্বের সবচেয়ে সৌভাগ্যবান মনে করেন তিনি। তার মতে, দেশকে স্ট্বাধীন করতে পেরেছি, বোনাস হিসেবে জীবনটাকেও পেয়ে গেছি। যুদব্দের মাঠে মরার সল্ফ্ভাবনা ছিল 90 ভাগ। বিয়োগযল্প্পণার সঙ্র্শমুক্ত ছিলেন না তিনিও। পাকিস্টস্নানি বাহিনীর প্রতিহিংসার আগুনে পুড়ে ভস্ট্ম হয়েছিল তার বসতবাড়ি, সর্বস্ট্ব সঞ্চয়। সেবারই শেষ নয়, স্ট্বাধীন দেশেও আবার সর্বস্ট্ব হারান 1977 সালে। সেবার তার সব সঞ্চয় ছিল তার পাশের গ্রাম জলাবাড়ি বল্পব্দুর বাড়িতে। ডাকাতের আগুনে ধ্বংস হয়ে যায় তার সবকিছু। স্ট্মৃতি ছাড়া '77-এর আগের কোনো উপাদানই আর তার সঞ্চয়ে নেই আর। কিল্পস্নু জীবন জয়ের জাদু জানেন যিনি তাকে ঠেকানো যায়?
জীবনব্যাপী একটি সাধনাই করেছেন জুয়েল আইচ। শৈশবে জাদুর প্রতি প্রলুব্ধ হয়েছিলেন বেদে দল আর সার্কাসের ম্যাজিক দেখে। ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়াকালীন প্রশিণ নিয়েছিলেন পিরোজপুরের শৌখিন ম্যাজিশিয়ান প্রফুল্ক্ন সাহার কাছে। নিজের শৈল্কিপ্পক চিল্পস্না আর কিছু বইয়ের সাহায্যে চলে তার জাদুচর্চা। জনসম েপ্রথম প্রদর্শনী পাশের গ্রাম জলাবাড়িতে 1972 সালে।
স্ট্পী বিপাশা, সাত বছরের কন্যা খেয়াকে নিয়ে জুয়েল আইচের সংসার। বিপাশার সঙ্গে 13 বছরের পরিচয় এবং পরবতর্ীতে ভালোবাসা থেকে জীবন সংসার শুরু 1985 সালে। এর পর থেকে দুজনে দুজনার। জীবনসগ্ধগী হিসেবে, সহকমর্ী হিসেবে। শিল্কপ্পী জুয়েল আইচ সমঙ্র্কে বিপাশার মহৃল্যায়ন_ম্যাজিক আর জুয়েল সমার্থক। ম্যাজিক ছাড়া জুয়েলকে চিল্পস্না করা যায় না। মানুষ হিসেবেও চমৎকার। স্ট্বামী হিসেবে অসল্ফ্ভব ভালো। বাবা হিসেবেও সল্পস্নানের প্রতি বিশেষ যত্দম্নবান।
সৃজনসৃদ্বি আর পড়াশোনার কাজে নিয়ত সময় কাটে জুয়েল আইচের। বছর দুয়েক থেকে গলার সমস্যায় ভুগছেন। কণ্ঠস্ট্বর বল্পব্দ হয়ে গিয়েছিল। তাই চিকিৎসকের রুটিন অনুসরণ করে চলেছেন। যে কারণে প্রদর্শনীও কমিয়ে দিয়েছেন। গত মাসে প্রায় আড়াই ঘণ্টার শো করেছেন চট্টগ্রামে। প্রদর্শনী করতে 19 এপ্রিল যাচ্ছেন আমেরিকাতে। জুনে যাবেন সুইডেন।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



