জেইন ক্লিমেন্স দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, স্যাম যে দীর্ঘ সময়ের জন্য চলে যাচ্ছে এব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই তাঁর মনে । একটা বাইবেল বের করলেন তিনি এবং অপর প্রান্ত ধরে শপথ নিতে বললেন তিনি, কখনো তাস বা মদ স্পর্শ করবে না স্যাম । সে প্রতিজ্ঞা রেখেছিলেন স্যাম ক্লিমেন্স ।
অল্প কিছুকাল সেইন্ট লুইতে ছিলেন মার্ক টোয়েন । এবং এ সময় সেইন্ট লুই ইভনিং স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকায় করেছেন তিনি । উদ্দেশ্য নিউ ইয়র্কে যে বিশ্বমেলা শুরু হবে তা দেখার মতো টাকা জমানো । রেলগাড়ি সবে পৌঁছেছে সেইন্ট লুইতে, তবে 1853 সালের ট্রেন ছিল যথেষ্ট মন্থর গতির, সেইন্ট লুই থেকে নিউ ইয়র্ক পৌঁছতে কয়েকদিন লেগে যেতো । পামেলাকে লেখা একটা চিঠির ভগ্নাংশ পাওয়া গেছে যা মার্ক টোয়েন এই মেলা সম্বন্ধে লিখেছেন,
"দোতলার গ্যালারির দৃশ্য ভারি সুন্দর, পৃথিবীর সব দেশের নিশান উড়ছে, রোজ মেলায় প্রায় ছ'হাজার লোক আসছে, (হ্যানিবালের জনসংখ্যার প্রায় দ্বিগুন ), প্রবেশমুল্য পঞ্চাশ সেন্ট,প্রায় তিন হাজার ডলারের মতো রোজগার মেলার ।ল্যাটিং অবজার্ভেটরিতে গিয়েছিলাম আমি (280 ফিট উঁচু),আশপাশের পুরো শহর দেখা যায় সেখান থেকে । ক্রোটন আকুয়াডাক্টও কাছেই । হারলেম নদীর বুক চিরে বসানো হয়েছে লোহার পাইপ । আটত্রিশ মাইল দুরের ওয়েস্টচেস্টারে একটা আস্ত নদীর গতিপথ ঘুরিয়ে দেয়া হয়েছে" । পরবর্তীকালে যে একজন বড় লেখক হবেন তার কিছুটা আভাস পাওয়া যায় এইসব চিঠি থেকে ।
কিন্তু স্যামির মাথায় যে পোকা ছিল ছোটবেলা থেকে, সেটা বের হবার নয় । তা হচ্ছে মিসিসিপি নদীর পাইলট হওয়া (এখনকার এরোপ্লেনের এর পাইলট হওয়ার মতো ব্যাপার ছিলো মিসিসিপি স্টিমবোটের হালধরার যোগ্যতা অর্জন করা ) । স্যামির দুই বন্ধু বোয়েনদের দুই ভাই মিসিসিপির পাইলট হয়েছিল । লেফটেনান্ট লুই হার্নডনের লেখা ব্রাজিল একটা রিপোর্ট পড়ে আঠারোশো সাতান্নো সালে মিসৌরির কিওকুক শহরে পৌঁছুলেন স্যাম ক্লিমেন্স, উদ্দেশ্য ব্রাজিলে যাবেন কোকোর ব্যবসা করতে ।
কিন্তু কিওকুকে এসে ধাক্কা খেতে হল স্যামিকে, ব্রাজিলের শিগগির উদ্দেশ্যে ছাড়বে এমন কোন জাহাজ নেই, এমন আগামী কয়েক বছরে নাও পাওয়া যেতে পারে ! তখনই স্যামির মনে পড়ল ছোটবেলার স্বপ্নটা, ব্রাজিল না যেতে পারলে কি হয়েছে, মিসিসিপি নদীর সারেঙ হতে অসুবিধা কী?
জেটিতে দাঁড়িয়ে থাকা পল জোন্স স্টিমারের ক্যাপ্টেন হোরেস বিক্সবিকে ধরে বসলেন স্যাম, শিক্ষানবিশ হিসেবে নিতে হবে তাঁকে । হোরেস বিক্সবি অনেকবার বোঝাবার চেষ্টা করলেন স্যামকে, মানুষের মাথা নষ্ট করার মতো যতো পেশা আছে নদীর সারেঙ হওয়া তার মধ্যে অন্যতম, আর তাছাড়া শিক্ষানবিশদের কমকরে হলেও পাঁচশো ডলার দিতে হয়ে ওস্তাদকে । স্যাম জানাল পাঁচশো ডলার দিতে সে খুশি মনেই রাজি আছে এর মধ্যে দুশো সে এখনই দেবে, আর তিনশো লাইসেন্স পাওয়ার পর মজুরি থেকে শোধ করবে । বিক্সবি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, তারপর রাজি হলেন ।
সেই মুহুর্তেই স্যামকে পল জোন্স জাহাজের হাল ধরতে দিলেন বিক্সবি, মাল তোলা শেষে ঘাট থেকে বেরিয়ে আসছিলো তখন স্টিমারটা । আপেলের খোসা ছাড়ানোর মতো করে পাশের জাহাজটার গা ঘেঁষে চলাতে বললেন বিক্সবি, ব্যাপারটা অহেতুক বিপদজনক মনে হল স্যামের কাছে, তাই বেশ দুর দিয়ে চালাতে লাগলেন ।
রাগে ফেটে পড়লেন বিক্সবি, নিজেই গিয়ে দাঁড়ালেন গিয়ে হুইলে । পড়ে বুঝেছেন টোয়েন আসলে বিক্সবি গোয়াঁর্তুমি করেননি, আড়াই লক্ষ ডলার দামের জাহাজখানা এমনভাবে চালাতে হবে যেন বরফের উপর দিয়ে দাগ আঁকা পথে স্কেটিং করা হচ্ছে , এরকম চুলচেরা হিসাবের অভ্যাসের ফলেই বিপদের সময় জাহাজকে রক্ষা করা যায় ।
আসলে মিসিসিপি নদীর পাইলট পারবর্তীকালের লেখক মার্ক টোয়েন তৈরি করেছে, মার্ক টোয়েন ছদ্মনামটাও জাহাজী জীবন থেকে নেয়া । মার্ক টোয়েন কথাটার অর্থ হচ্ছে দুই ফ্যাদম বা বারো ফুট পানি, নদীর পানি মাপতে মাপতে জাহাজীরা বলে মার্ক ওয়ান...নাইন, নাইন,...মার্ক টোয়েন...মার্ক টোয়েন... মার্ক টোয়েন কথাটা জাহাজীদের কানে মধু বর্ষন করে, কারন এতোটুকু গভীরতা স্টিমারচলার জন্য নুন্যতম প্রয়োজন ।
জাহাজের জীবন মার্ক টোয়েনকে কে পরিপক্ক করেছে, পরে তিনি বলেছেন, জীবনে এমন কোন চরিত্র দেখেননি তিনি, জুয়ারি, ভাগ্যাম্বেষী, লটবহর আর দাসদাসী সহ দক্ষিনের প্ল্যান্টেশন মালিক, ধর্ম প্রচারক, খনিজীবি, চাষী, ছোট ব্যাবসায়ী, যাদের সাথে স্টিমারের ডেকে আগেই দেখা হয়নি তাঁর, । চলার পথে মানুষের মিছিল দেখেছেন এই শিক্ষার্থী পাইলট, যিনি উত্তরকালে হবেন বিখ্যাত লেখক ।
আঠারোশো উনষাট সালে পাইলটের সনদ পান স্যাম ক্লিমেন্স । সময়টা ছিলো তাঁর জন্য খুবই রোমাঞ্চকর কোন সন্দেহ নেই, দক্ষিনে নিউ অর্লিয়ান্স আর উত্তরে শিকাগো পর্যন্ত ছিল স্টিমারের গতিপথ । তাঁর সবচেয়ে আনন্দকর সময় ছিলো, মা জেইন ক্লিমেন্সকে সেইন্ট লুইতে স্টিমারে বড়বোন পামেলার বাড়িতে নিয়ে যাওয়া । পামেলার স্বামী উইল মোফেট, সেইন্ট লুই শহরে কমিশন মার্চেন্ট হিসেবে বেশ নাম করেছিলেন । নদীর জীবনের অভিজ্ঞতাই ফুটে উঠেছে লাইফ অন দ্য মিসিসিপি বইতে । অ্যাডভেঞ্চার অভ হাকলবেরি ফিন এও পটভুমি হিসেবে বড় অংশ জুড়ে আছে মিসিসিপি নদী ।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা মার্চ, ২০০৭ রাত ১০:৫৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



