বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) ২০১০ সালে বেড়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়ায় এফডিআইয়ে উচ্চ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। আর বর্তমানে বিদেশি বিনিয়োগের দিক দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে দ্বিতীয় ও সারা বিশ্বে ১১৪তম স্থানে বাংলাদেশ অবস্থান করছে।
বিশ্বের বিনিয়োগের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানা যায়। ইউনাইটেড ন্যাশনস কনফারেন্স অন ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আংকটাড)-এর এই প্রতিবেদন বাংলাদেশ বিনিয়োগ বোর্ড গতকাল মঙ্গলবার এ দেশে প্রকাশ করে।
বিশ্ব বিনিয়োগ প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১০ সালে এফডিআইয়ের ৫০ শতাংশেরও বেশি হয়েছে উন্নত দেশগুলোতে। আর বিশ্বে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে ২২৮ বিলিয়ন ডলার। এর পরই রয়েছে চীন। দেশটিতে ১০৬ বিলিয়ন ডলার এফডিআই হয়েছে গত বছর। তবে গত বছর বিনিয়োগে নতুন মাত্রা যোগ করেছে অর্থনীতির নতুন শক্তি হংকং। দেশটিতে বিনিয়োগের পরিমাণ ৬৯ বিলিয়ন ডলার, যা বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ বিনিয়োগ।
প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০০৯ সালে বাংলাদেশে এফডিআই এসেছিল ৭০০ দশমিক ১৬ মিলিয়ন ডলার। ২০১০ সালে বাংলাদেশে আগের বছরের তুলনায় ৩০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়ে এফডিআই এসেছে ৯১৩ দশমিক ৩২ মিলিয়ন ডলার। ২০১০ সালে বিনিয়োগ বাড়ায় বিশ্বে বিনিয়োগ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ছয় ধাপ এগিয়ে ১১৪তম স্থানে অবস্থান করছে। ২০০৯ সালে বিশ্বে বিনিয়োগের দিক দিয়ে ১৪১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১২০তম।
২০০৯ সালের তুলনায় ২০১০ সালে দক্ষিণ এশিয়ার শুধু তিনটি দেশে এফডিআই বেড়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশে বেড়েছে ৩০ শতাংশ বিনিয়োগ। আর দক্ষিণ এশিয়ার ভারত, পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশ দ্বিতীয় স্থানে অবস্থান করছে। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে এফডিআই প্রবৃদ্ধির দিক দিয়ে এগিয়ে আছে মালদ্বীপ। ২০০৯ সাল থেকে ২০১০ সালে ৪৬ শতাংশ বেশি এফডিআই এসেছে দেশটিতে।
জানা যায়, বাংলাদেশের এফডিআইয়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ হয়েছে টেলিযোগাযোগ খাতে। ২০০৯ সালে এ খাতে ২৫০ দশমিক ১৪ মিলিয়ন ডলার এলেও ২০১০ সালে এ খাতে বিনিয়োগ হয়েছে ৩৫৯ দশমিক ৮২ মিলিয়ন ডলার। ২০১০ সালে টেঙ্টাইল, ব্যাংকিং, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি এবং কৃষি খাতে এফডিআই বাড়লেও খাদ্য খাতের এফডিআই কমে গেছে। ২০০৯ সালে খাদ্য উৎপাদনে ২৪ দশমিক ৫৪ মিলিয়ন ডলার এফডিআই এলেও ২০১০ সালে অর্ধেক কমে ১২ দশমিক ৭৭ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। তবে ২০১০ সালে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও পেট্রোলিয়াম খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ বেড়েছে। ২০০৯ সালে এসব খাতে যেখানে এফডিআইয়ের পরিমাণ ছিল ৫১ দশমিক ১৫ মিলিয়ন ডলার ২০১০ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৯২ দশমিক ০৬ মিলিয়ন ডলার।
২০১০ সালে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ এসেছে সিঙ্গাপুর থেকে। দেশটি থেকে এ দেশে বিনিয়োগের পরিমাণ ৩১৭ দশমিক ১৯ মিলিয়ন ডলার। এর পরই যুক্তরাজ্য থেকে এসেছে ১০৫ দশমিক ৬৮ মিলিয়ন ডলার। এ ছাড়াও নেদারল্যান্ড (৬৪ দশমিক ৯২ মিলিয়ন ডলার), হংকং (৬৩ দশমিক ৮৪), যুক্তরাষ্ট্র (৫৬ দশমিক ৯৫), ভারত (৪৩ দশমিক ১৯), দক্ষিণ কোরিয়া (৪০), নরওয়ে (৩৯ দশমিক ১৬), সংযুক্ত আরব আমিরাত (২৪ দশমিক ৫), জাপান (২১ দশমিক ৭৯) থেকেও বিনিয়োগ এসেছে।
রাজধানীর বিনিয়োগ বোর্ড কার্যালয়ে বিশ্ব বিনিয়োগ প্রতিবেদন (ডাবি্লউআইআর) আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. ইসমাইল হোসেন। তিনি জানান, ১৯৯১ সাল থেকে বিনিয়োগ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হচ্ছে। এবারের প্রতিবেদনের বিশেষ দিক হচ্ছে, হংকংয়ে এফডিআইয়ের পরিমাণ বেড়েছে। আর দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ভারত ও পাকিস্তানের ওপরে রয়েছে। বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাবে সারা বিশ্বেই বিনিয়োগের ওপর প্রভাব পড়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ম্যানুফ্যাকচারিং খাত থেকে বাংলাদেশে সেবা খাত বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বিনিয়োগ বেড়েছে।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের বিনিয়োগ বোর্ডের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. এস এ সামাদ বলেন, ঐতিহাসিকভাবেই বাংলাদেশে কম বিনিয়োগ হয়ে আসছে। রপ্তানি আয়, আমদানি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং জনসংখ্যার তুলনায় এফডিআই অতি নগণ্য। দক্ষিণ এশিয়ার যে কোনো দেশের চেয়ে বর্তমানে বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি ভালো উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভারত নিজেরাই বিনিয়োগ করতে চায়, পাকিস্তানের অবস্থানও ভালো নয়। এসব কারণের পাশাপাশি বর্তমান সরকারের নানা কর্মসূচির ফলে বিনিয়োগ বেড়েছে। বিনিয়োগ বোর্ডের নির্বাহী চেয়ারম্যান বলেন, চলতি ২০১১-২০১২ অর্থবছরে বাংলাদেশে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশ অর্জন করা খুবই সহজ হবে যদি এফডিআই ৩০ থেকে ৩২ শতাংশ বৃদ্ধি পায়।
প্রাইভেটাইজেশন বোর্ডের চেয়ারম্যান ড. মির্জা আবদুল জলিল বলেন, যারা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেছে, তারা অনেক লাভ করছে। ফলে তারা বাংলাদেশ থেকে ফিরে যায়নি। এতে প্রমাণিত হয়, বিশ্বের যেকোনো দেশের চেয়ে বাংলাদেশে বিনিয়োগের পরিস্থিতি ভালো।
এক প্রশ্নের জবাবে জানানো হয়, বাংলাদেশে যে হারে এফডিআই আসছে, তা নগণ্য। প্রাকৃতিক সম্পদ বিশেষ করে তেল-গ্যাসে বিনিয়োগ সহজ করায় ভবিষ্যতে এফডিআই আরো বৃদ্ধি পাবে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



