ফাতেমা ( রাঃ ) সমপর্কে মহানবী ( সাঃ )বলেছেন যে, ''ফাতেমা আমারই দেহের অংশ অতএব যে তাঁকে কষ্ট দান করবে সে যেন আমাকেই কষ্ট দিল । ''
হাদীসে বর্ণিত আছে-নবী করিম ( সাঃ ) কোথাও যাবার সময় কন্যা ফাতেমার কাছ থেকে সকলের শেষে বিদায় নিতেন এবং ফিরে এসে প্রথমেই ফাতেমার সাথে সাক্ষাৎ করতেন ।
ফাতেমা ( রাঃ ) এর প্রতি নবীজীর হৃদয় এত স্নেহসিক্ত ছিল ; কন্যার অদর্শনে তিনি একটি দিনও সহ্য করতে পারতেননা । তাই তিনি জামাতা হজরত আলীর ( রাঃ ) বাড়ীতে গমন করতেন । কিন্ত তাহার মনে খুবই আশা ছিল যদি জামাতার বাড়ীখানা তাহার গৃহের পাশে হতো ! কিন্ত তাহার গৃহের কাছে কোন গৃহ অবশিষ্ট ছিলনা । তবুও বাড়ী ওয়ালা 'হারেজ'যখন নবীজীর (সাঃ ) মনের কথা জানতে পারলেন তখন তিনি পুরাতন এক ঘরের ভাড়াটিয়াকে অন্যত্র পাঠিয়ে দিয়ে হজরত আলী ও ফাতেমাকে ( রাঃ ) ভাড়া দিলেন । এই গৃহখানা নবীজীর গৃহের কাছেই ছিল । এখন তিনি সর্বদাই কন্যাকে চোঁখের সম্মুখে দেখতে পাবেন বিধায় বাড়ী ওয়ালা হারেজের জন্য প্রাণ ভরে দোয়া করেছিলেন ।
অভাব অনটনকে নিত্য সঙী করিয়াই হজরত আলী ও ফাতেমার ( রাঃ ) সংসার চলত ।
হিজরতের পূর্ব পর্যন্ত আলী ( রাঃ ) রাসূলুল্লাহ (সাঃ ) এর সাথে একই পরিবারভুক্ত ছিলেন । হিজরতের পর তাহার মা'কে নিয়ে আলী ( রাঃ ) সামান্য যাহা উপার্জন করতেন তাতে মা-ছেলের কোন রকম দিন চলে যেতো । কিন্ত বিয়ের পর সংসারে বড়ই অভাব দেখা দিল । সারা দিন পরিশ্রমের পর যা কিছু জোগাড় করতেন তা দিয়েই সকলের খোরপোষের ব্যবস্থা করতেন ।
একদিন এমনও হয়ে ছিল যে সারা দিন ঘুরে ঘুড়েও কোথাও কাজের সন্ধান পেলেননা । অথচ ঘরে অল্প পরিমাণ খাবারও মজুদ নেই । অবশেষে রাত্রবেলা একটি কাজ জোটালেন । গভীর রাতে কিছু জিনিস-পত্র নিয়ে বাড়ী ফিরলেন । ফাতেমা ( রাঃ ) অধির অপেক্ষায় স্বামীর জন্য দরজার সামনে বসে আছেন । তিনি নিকটে এসে ক্লান্ত পরিশ্রান্ত স্বামীর কপালের ঘাম মুছে দিয়ে শোবার ব্যবস্থা করে দিলেন । পরে খাওয়া-দাওয়া তৈরী করে স্বামীকে খাওয়ালেন , নিজেও খেলেন । এমতবস্থায় ভোরের আলো দরজা ভেদ করে গৃহে প্রবেশ করল ।
হজরত আলী ( রাঃ ) দুঃখ করে বলতেন '' হে আল্লাহ আমাকে কষ্ট দাও অসুবিদা নেই কিন্ত নবী দুলালী ফাতেমাকে কেন কষ্ট দিচ্ছো ''?
একবার হজরত ফাতেমার অসুস্থতার খবর শোনে নবীজী ( সাঃ )দেখতে আসলেন । ঘরের ভিতর থেকে ফাতেমা বললেন '' বাবা ! আমার দেহে একখানা চাদর ছাড়া অন্য কোন বস্ত্র নেই '' । কন্যার কথা শোনে নবীজী তাহার মাথার পাগড়ীখানা গৃহের ভিতর ছুঁড়ে মারলেন এবং বললেন ''মা ! চাদরখানা পরিধান করে পাগড়ী দিয়ে মাথা ও দেহ আবৃত কর । অতঃপর নবীজী ( সাঃ ) গৃহে প্রবেশ করলেন ।
একবার ঈদের সময় মদীনার ঘরে ঘরে ঈদের আনন্দের ধুম পড়ে গেল । কিন্ত আলী ও ফাতেমার ( রাঃ ) গৃহে ঈদের কোন আনন্দ দেখা গেলনা । আলী (রাঃ ) সকালেই কাজে চলে গেছেন । এবং ফাতেমা ( রাঃ ) গৃহের কাজে ব্যাস্ত । হঠাৎ তাঁহার শিশূ পুত্রদয় ইমাম হাসান-হোসাইন ( রাঃ ) বাহির থেকে এসে নতুন জামা-কাপড়ের আবদার করতে লাগলেন । মা'ফাতেমার মুখ থেকে ফসকে বেড়িয়ে গেল ''বাবারা তোমাদের জামা এখনও তৈরী হয়নি , তৈরী হয়ে গেলে লোক এসে দিয়ে যাবে-এখন খেলা করতে যাও ''। এর পর পর ফাতেমা চিন্তায় পড়ে গেলে যে , ছেলেরা যখন ফিরে আসবে তখন তাঁদের কাছে মিত্যাবাদি হিসাবে চিহ্নিত হবেন । তখন তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করতে লাগলেন , ''হে আল্লাহ তুমি তাদের অন্তর থেকে জামার কথা ভুলিয়ে দাও ''।
যাক একটু হাসান-হোসাইন মহা খুশী হয়ে একটা কাপড়ের বেগ হাতে নিয়ে মা'য়ের কাছে এসে বলতে লাগলেন ''মা ! একজন সুদর্শন লোক এই কাপড় গুলো দিয়ে গেছেন '' । ফাতেমা ( রাঃ ) এই মূল্যবান কাপড় দেখে বুঝতে পারলেন যে, আল্লাহ তায়ালা হজরত জিব্রঈল ( আঃ ) এর মারফতে এই গুলো পাঠিয়েছেন । আল্লাহর এই পবিত্র দান তিনি খুশী মনে পুত্রদয়কে পরিয়ে দিলেন ।
হজরত আলী ও ফাতেমা ( রাঃ ) এর সংসারে পার্থিক সুখ সমপদ ঐশ্চর্য এবং ভোগ বিলাসের অভাব থাকলেও পারসপরিক প্রেম -ভালবাসার অভাব ছিলনা । স্বামী-স্ত্রীর মাঝে গভীর ভালবাসার জন্য তাহাদের সংসারটি স্বর্গ সুখে পরিণত হয়ে ছিল ।
তাহাদের মধ্যে কখনও যে মান অভিমান বা মনোমালিন্য হয়নি তা নয় । কেননা তাহারাও তো মানুষ । মানুষের মাঝেও ভুল ভ্রান্তি ইত্যাদি হতে পারে , এটা স্বাভাবিক ব্যাপার ।
একদিন কোন একটি বিষয় নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর কথোপকথনের সময় হজরত ফাতেমা ( রাঃ ) আলী কে (রাঃ ) একটা বড় কথা বলে ফেললেন । তাতে হজরত আলী একটু ব্যথিত হলেন এবং অভিমানে বাহিরে চলে গেলেন । এমন কি রাত্রেও বাড়ী ফিরলেননা । রাসূলুল্লাহ ( সাঃ ) এই খবর শোনে আলীর খোঁজে বাহির হয়ে গেলেন । একটু পর দেখতে পেলেন অদূরে আলী ( রাঃ ) ধুলাবালির উপড় শোয়ে আছেন । নবীজী ( সাঃ ) স্নেহ ভরে মজা করে ডাক দিলেন '' হে আবু তুরাব ( ধুলাবালির জনক ) উঠ-ঘরে চল '' । এর পর নবীজী তাদের স্বামী-স্ত্রীর মান -অভিমান মিটিয়ে দিলেন ।
অন্য একদিনের ঘটনা ঃ হজরত আলী ( রাঃ ) ফাতেমার (রাঃ ) মতের বিরূদ্ধে একটা কাজ করে ফেলেছিলেন । ইহাতে অসন্তুষ্ট হয়ে ফাতেমা ( রাঃ ) বাবার বাড়ী চলে গেলেন । কিছুক্ষন পর হজরত আলীও এসে উপস্থিৎ । দুনুজনই নবীজীর কাছে নিজেদের অভিযোগ পেশ করলেন । নবীজী দুনুজনের কথা শোনে ফাতেমাকে ( রাঃ ) বললেন ,'' মা' ! তোমার আরও ধৈর্য অবলম্বন করা উচিত , আলীকে তোমার সকল কথা মানতে হবে এটা কেমন কথা ''?
ফাতেমা ( রাঃ ) পিতার কথা শোনে ভীষন লজ্জিত হয়ে ঘরে ফিরে আসলেন । হজরত আলী ( রাঃ ) স্ত্রীকে তাঁর পিতার সামনে এরকম লজ্জিত হতে দেখে অনুতপ্ত হয়ে প্রতিজ্ঞা করলেন যে , আর কোন দিন তাহার মতের বিরূদ্ধে কোন কাজ করবেননা ।
প্রকৃতপক্ষে হজরত ফাতেমা ( রাঃ ) মহানবী (সাঃ ) এর আদর্শ অনুসরণ ও আনুগত্যকারিদের মধ্যে ছিলেন এক মূর্ত প্রতীক ।
জাতীয় কবি কাজি নজরূল ইসলামের একটি কবিতার একাংশ আবৃতি করে শেষ করছি ।
''নবী নন্দিনী ফাতেমা মোদের সতী নারীদের রাণী,
যাঁর ত্যাগ সেবা স্নেহ ছিল মরূভূমে কওসর পানি,
যাঁর গূণ-গাথা ঘরে ঘরে প্রতি নর-নারী আজো গায় '' ।।
( বিঃ দ্র ঃ- কোন অমুসলিম কিংবা কোন অবিশ্বাসি কপটদের মন্তব্য নিস্প্রয়োজন )
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



