শিক্ষায় আমরা কতটা এগিয়ে এ নিয়ে হয়ত অনেক তর্ক-বিতর্ক রয়েছে আমাদের সকলের মাঝে। ২০১৩ সালে প্রকাশিত এক রিপোর্ট অনুসারে আমাদের দেশের সাক্ষরতার হার ৬০ শতাংশের কাছাকাছি। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে আমাদের দেশে প্রায় ৮০ টি, অন্য দিকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে ৩২ টি (তথ্য ভুল হলে ক্ষমা করবেন, আমি অন্তত হিসেবে তথ্যগুলি প্রদান করেছি)। এর বাইরেও আমাদের দেশে রয়েছে কলেজ সমূহ যারা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সম্মান শ্রেনীতে ছাত্র ভর্তি নিয়ে থাকেন।
সবমিলিয়ে বলা চলে উন্নয়নের দিকে এগিয়ে চলেছি আমরা। ছেলেবেলায় আমার গ্রামের স্কুলের এক শিক্ষক বলেছিলেন "শিক্ষিত হবার আগে প্রয়োজন শিক্ষার অর্থ উপলব্ধি করা।" কথাটি হয়তবা আমাদের অনেকের কাছেই কঠিন মনে হতে পারে। তবে যদি একটু সহজ করে বলা যায় যে শিক্ষার অর্থ উপলব্ধি বলতে আমরা বুঝি যে, কেন আমরা পড়াশুনা করি? বা পড়াশুনা করে আমরা কি করতে চলেছি? আমি নিশ্চিত যে আপনারা সকলেই এর উত্তর ভিন্ন ভিন্ন দেবেন। কেউ হয়ত বলবেন- “নিজেকে আলোকিত করার জন্য” অথবা, “পড়াশুনা করে ভল চাকুরি করে দেশের উন্নয়নের জন্য” অথবা, “মা-বাবাকে খুশি করার জন্য” ইত্যাদি। এবং আশ্চার্যের বিষয় এই যে প্রত্যেকেই তার নিজ নিজ দৃষ্টিকোন থেকে সঠিক। নিজেকে আলোকিত করে, মাতা-পিতার মুখ উজ্জ্বল করে, সকলে এক হয়ে দেশের জন্য কাজ করার লক্ষেই হয়ত আমরা পড়াশুনা করছি। তবে আমরা সকলে কি এক হতে পেরেছি? আমাদের দেশের নানান শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও মাধ্যম থেকে পড়া শেষ করে আমরা হয়তবা দেশকে আমাদের সর্বচ্চটি দিতে পারিনি। এর কারন স্বরুপ যদি আমি আপনাদের প্রশ্ন করি তাহলেও অনেক উত্তর আসবে- যেমনঃ রাজনৈতিক অস্থিরতা, দূর্নীতি, অসচেতনতা, অশিক্ষা ইত্যাদি। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন যে বিষয়টি আপনি বলেন নি তা হল আমাদের শিক্ষার বিভাজন, যা আমাদের দেশের মানুষের মাঝে বিভাজন তৈরি করে দিয়েছে।
এবারে নজর দেওয়া যাক আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সচরাচর শোনা যায় এমন কিছু কথার দিকে-
“প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা হয় না, ওখানে হয় শুধু সনদ বিক্রির ব্যবসা”
“পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলে-মেয়েগুলি অনেক আনস্মার্ট, ঠিকমত কথাও বলতে পারে না”
“ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধিনে যারা পড়ছে তারা সবাই আদুভাই কিসিমের লোক, কারন ওদের অনেক সেশন জট”
একবার উপরের লাইনগুলির দিকে খেয়াল করে দেখুনতো প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সম্পর্কে প্রতিটির শিক্ষার্থীদের একটি বিরুপ ধারনা রয়েছে। এইসকল শিক্ষার্থীরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া শেষ করে দেশের উন্নয়নের লক্ষে কাজ করবে তখন আপনার কি মনে হয় তারা একে অন্যকে তাদের প্রাপ্য সম্মান দিতে পারবেন? উত্তটি হল “না”।
এবারে এই বিভাজনের কারন বের করা যাক............ এর জন্য আমরা সবাই চলেন গিয়ে দাড়াই কলাভবনের সামনে। মূল গেইট থেকে বের হয়ে আসা ছেলে-মেয়েদের সাথে কিছুক্ষন কথা বলা যাক, করা যাক কিছু প্রশ্ন যেমন- আপনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগে কথায় পড়ালেখা করেছেন? ইংরেজী মাধ্যম নাকি বাংলা মাধ্যম? বেশির ভাগ উত্তরই আপনি পাবেন “বাংলা মাধ্যম”।
এবার যাওয়া যাক আই বি এ (ইনস্টিটিউট অব বিসনেজ এডমিনিস্টেসন) এর সামনে, মূল গেইট থেকে বের হয়ে আসা ছেলে-মেয়েদের সেই একই প্রশ্ন করা যাক। আপনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগে কথায় পড়ালেখা করেছেন? ইংরেজী মাধ্যম নাকি বাংলা মাধ্যম? এবারে যে উত্তরটি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে তা হল “ইংরেজী মাধ্যম”
তবে এর অর্থ কি এই যে যাদের পরিবারের সামর্থ রয়েছে ভাল স্কুলে পড়াবার তারাই তাদের পছন্দের বিষয়ে পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে আর বাকিরা সাধারন বিষয় গুলির সাথে সমঝতা করবে?
এখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি অনূষদের উদাহারন তুলে ধরা হয়েছে তবে আপনি এই চিত্র দেখতে পাবেন দেশের অন্যান্য সুনামধ্যন্য বিদ্যাপিঠেও। আপনাদের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে তবে কি গরিবের সন্তানেরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে না? বুয়েটে কি শুধু বড়লোকরাই পড়ে? দেশের অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবাই কি ধনীর সন্তান? হয়ত না। তবে আমাদের দেশীয় শিক্ষার বানিজ্যিকিকরনের ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে অনেক কমে এসেছে দরিদ্র শিক্ষার্থীর সংখ্যা। শুধু তাই নয় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক অনুষদে এখন নেওয়া হচ্ছে মাত্রাতিরিক্ত টিউসন ফি, যা দরিদ্র শিক্ষার্থীদের শিক্ষা গ্রহনকে প্রায় অসম্ভব করে দিয়েছে।
আজ এই টিউসন ফিস এর ভার বহন করতে না পেরে যখন একজন দরিদ্র শিক্ষার্থী জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে একটি কলেজে তার শিক্ষা সম্পন্ন করতে ভর্তি হচ্ছে তখন সে হয়ে যাচ্ছে আদু ভাই। তার মেধার কোন মূল্যই যেন থাকছে না সমাজের কাছে। আর আশ্চার্যজনকভাবে তাদেরকে ঠাট্টা করছে ওই সকল শিক্ষিত ছেলেমেয়ে যারা তাদের রেখে যাওয়া স্থানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছেন।
আমাদের দেশের এই অগনিত সংখ্যক শিক্ষারর্থীর ভার মুস্টিমেয় কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় দিয়ে সামলানো সম্ভব না। এই চাপকে কিছুটা কমাতে এগিয়ে এসেছে আমাদের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলি। বিগত দশকে তারা প্রচুর পরিমানে শিক্ষার্থীদের ডিগ্রী প্রদান করতে সক্ষম হয়েছে, এবং ওই সকল শিক্ষার্থীরাও খুঁজে নিতে সক্ষম হয়েছে নিজেদের জন্য উপর্যুপুরি জীবিকা। অনেক ক্ষেত্রে তারা তাদের কাজে ছাড়িয়ে যাচ্ছে বিদেশী শিক্ষার্থীদেরও।
অল্পকিছু প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের উদাহারন তুলে সনদ বানিজ্যের মত কথা বলে আমরা শুধু মাত্র তাদের নিরুৎসাহিতই করছি না বাঁধা তৈরি করছি আমাদের দেশের সকল শিক্ষার্থিদের এক হতে। এখানেও একটি লক্ষ করার বিষয় যে এই কাজটিও করছেন সমাজের শিক্ষিত ব্যক্তিবর্গ।
দেশিয় মাধ্যমিক শিক্ষা মাধ্যমঃ
এতক্ষন আমাদের দেশের শিক্ষার মাধ্যম নিয়ে অনেক সমালোচনা হল। এবার বলা যাক কিভাবে তৈরি হল এই বিভাজন, যা আমাদের উচ্চশিক্ষায় অধ্যায়নরত শিক্ষার্থীদের ভেতরে বিভাজন তৈরি করে দিয়েছে।
আমাদের শিক্ষার মাধ্যম রয়েছে দুইটি ১. বাংলা মাধ্যম ২. ইংরেজী মাধ্যম। বর্তমানে বাংলা মাধ্যমকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে, সাধারন বাংলা মাধ্যম ও ইংরেজী ভার্সন। ইংরেজী ভার্সনে একজন শিক্ষার্থী ঐ সকল বিষয়ই পড়বে যা বাংলা মাধ্যমের একজন শিক্ষার্থী পড়ে তবে তারা তা ইংরেজীতে পড়বে।
শহুরে শিক্ষা ও গ্রাম্য শিক্ষা নামে দুটি শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের দেশে প্রচলিত। কাগজে কলমে এর অস্তিত্ব না থাকলেও আমরা এর অস্তিত্ব খুব ভালভাবেই অনুভব করতে পারি। বর্তমানে আমাদের দেশের মা-বাবারাও এই বিষয়টি অত্যান্ত ভালভাবে অনুধাবন করতে পেরেছেন যে আজ যদি তারা তাদের বাচ্চাকে ভাল ও ব্য্যবহুল স্কুলে ভর্তি করাতে না পারেন তবে তারা ভবিষ্যতে ভাল কোথাও চান্স পাবে না। উদাহারন স্বরুপ ভিকারুননিসা স্কুলের লম্বা লাইনের দিকে আমরা তাকাতে পারি। একটি গ্রামের স্কুলের সপ্তম শ্রেনীতে যে বই পড়ানো হয় ভিকারুননিসা স্কুলের সপ্তম শ্রেনীতে সেই একই বই পড়ানো হচ্ছে। তার পরও কেন মা-বাবা তাদের সন্তানদের ভিকারুননিসা স্কুলে ভর্তি করাতে চাচ্ছেন? কারন সেখানে শিক্ষার অন্যান্য সুযোগ সুবিধা অনেক বেশি। বাংলাদেশের শিক্ষকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা না থাকায় পাঠদানের রীতিতেও পার্থক্য থাকছে। যে কারনে শহরের স্কুলগুলিকে আমরা বলছি ভাল স্কুল আর গ্রামের শিক্ষার্থীদের করা হচ্ছে অবমূল্যায়ন।
আমাদের কেউ বলে দেয় নি যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য তোমাকে অমুক স্কুল বা অমুক কলেজ থেকে পড়তে হবে। আমাদের কেউ বলেনি ইংরেজী মাধ্যমের ছেলেদের চুল খাড়া করা থাকবে আর বাংলা মাধ্যমের ছেলেদের চুল থাকবে শোয়ানো। আমাদের কেউ বলেনি এখানের ছেলেদের মুখে ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি থাকবে আর অন্যখানের ছেলের থাকবে না। কিন্তু আমাদের শিক্ষামাধ্যম নিঃশব্দে আমাদের কানে কানে হয়ত এই কথাগুলি হয়ত ঠিকই বলেছে। আর এভাবেই চলতে থাকলে এই চিত্র আরো গভিরভাবে সকলের সামনে ফুটে উঠবে।
অর্থাৎ শিক্ষা মাধ্যম নিয়ে আলোচনার পর আমরা দেখছি আমাদের দেশে পাঁচ ধরনের শিক্ষা মাধ্যম রয়েছে- ১. বাংলা মাধ্যম ২. ইংরেজী মাধ্যম ৩. ইংরেজী ভার্সন ৪. শহুরে মাধ্যম ৫. গ্রাম্য মাধ্যম।
আপনারা এ নিয়ে গবেষণা করলে হয়ত আরো দু-একটি মাধ্যম খুঁজে বের করতে পারবেন।
আমাদের বন্ধুপ্রতিম একটি দেশ জাপান, যারা দীর্ঘ ২৩৩ বছর বিশ্বথেকে নিজেদেরকে দূরে রেখেছিল(১৬০৩-১৮৬৮)। পরবর্তীতে তারা যখন নিজেদেরকে উন্মুক্ত করল বিশ্বের কাছে তখন তারা নতুন শিক্ষা নীতি প্রনয়ন করে। যে নীতিতে জানানো হয় জাপানে শিক্ষার মাধ্যম হবে একটি এবং ধনী দরিদ্র নির্বিশেষে সেই মাধ্যমে পড়াশুনা করবে। এর ফলশ্রুতিতে আজ জাপানের প্রতিটি মানুষ একই ভাবে চিন্তা করে, একই পদ্ধতিতে মাথা নোয়ায়(বাও করে)। তাদের উন্নয়নের গতীও আমাদের থেকে অনেকগুন বেশি। আজ আপনার কি মনে হয় না আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা একিভূতকরনের প্রয়োজন? যার ফলে আমাদের একজন “ভাইজান ভাল আছেন” আর আরাকজন “ইয়ো ম্যান” বলে সম্বোধন করবে না।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


