চলুন ঘুরে আসি ব্লাক হোলের ভিতরে (পর্ব-১)
চলুন ঘুরে আসি ব্লাক হোলের ভিতরে (পর্ব-২)


আপনি খুবই স্বাচ্ছন্দ ফিল করতে করতে আস্তে আস্তে ব্লাক হোলের ভিতরে যেতে থাকবেন। কিন্তু বিষয়টা আপনার জন্য আস্তে আস্তে কস্টদায়ক হতে থাকবে। মানে হচ্ছে মৃত্যুর কাছাকাছি যাওয়ার মতন। আপনি যখনই ব্লাক হোলের ভিতরে যেতে থাকবেন আস্তে আস্তে চারপাশে মহাবিশ্ব আপনার চোখের সামনে ছোট হতে থাকবে। ছোট হতে হতে এক সময় সেটা একটা বিন্দুতে এসে ঠেকে অদ্রশ্য হয়ে যাবে। এই অবস্থায় অন্ধকার ছারা আর কিছুই আপনি দেখতে পাবেন না। এর কারন হচ্ছে আলো যেহেতু আর বের হতে পারছে না তাই আপনিও কোন কিছু দেখছেন না।

এবার আসি Gravitational singularity নিয়ে। ব্লাক হোলের একেবারে কেন্দ্র টাকে বলে Gravitational singularity। এই স্থানে বস্তুর ঘনত্ব এতটাই বেশি থাকে যে সেটাকে অসিম বলেই ধরে নেয়া হয়। এই স্থানে কোন গ্রাভিটি, আলো বা সময় কোন কিছ্ররই কোন পাত্তা নেই। সব কিছুই এখানে এসে ফেইল মারবে। আপনি যতই এই Gravitational singularity এর দিকে যেতে থাকবেন ততই একটা মজার বিষয় ঘটতে থাকবে। সাধারনত আমরা যখন কোন গর্তের মধ্যে পরে যাই আমরা একই অনুপাতে পরতে থাকি। কিন্তু এই ক্ষেতে অভিকর্ষবল সেভাবে কাজ করবে না। আপনাকে ব্লাকহোলটি টানতে থাকবে।


প্রথমে আপনার পায়ের আঙুলগুলো টেনে একেবারে লম্বা করে নিজের ভিতরে নিয়ে নেবে। কিন্তু আপনার বাকি শরির ঠিকই থাকবে। আস্তে আস্তে পায়ের পাতা টান দেবে। পরে হাটু। পরে কোম। এভাবে মাথা পর্যন্ত। ছবিতে যেভাবে দেখছেন সেভাবে। আপনি দেখতে থাকবেন আপনার শরির কিভাবে আস্তে আস্তে লম্বা হতে হতে বিশাল হয়ে যাচ্ছে। এই বিষয়টা ঘটার কারন হচ্ছে ব্লাক হোল আপনাকে ধরে টান দেবে না। আনার শরিরে কোষের ভিতরে থাকা প্রত্যেকটা অনু পরমানুকে টান দেবে। কিন্তু এর ফলে ঠিক কিরকম ফিল হতে পারে বা কি হতে পারে মানুষের শরিরের মধ্যে সেটা বের করার আসলে কোন উপায় নেই। তবে মৃত্যু নিশ্চিৎ সেটা বলা যেতে পারে। আর একটা বিষয় হচ্ছে যেহেতু শরিরে প্রত্যেকটা অনুপরমানুকে টানা হবে সেহেতু মৃত হওয়ার বিষয়ে অনেক বিজ্ঞানি দ্বিমত পোষন করেছেন। তবে স্বাভাবিক ভাবে মৃতই ধরা যায়।

এই ঘটনাকে বিজ্ঞানিরা Spaghettification বলে থাকেন। মাানে হচ্ছে বস্তুকে ভার্টিক্যালি টানবে আবার হরাইজন্টালি সংকুচিত করবে। এই টান এবং সংকোচন এর পরিমান একেবারে সমপরিমানের হবে। ফলে আপনার Spaghettification এর ফলে শরিরের কোন পরিবর্তনই হবে না। কারন একবার টানা আবার সংকোচন এর ফলে কি হতে একটা মানুষের শরিরে সেটার কোন ধারনাই কারো নেই। এমনকি বিজ্ঞানিরা এর পরে কি হতে পারে সেটাও বলতে পারছেন না। এর পরে আমাদের জ্ঞানের পরিধিতে পদার্থবিদ্যা, জীববিদ্যার যে সব বিধি, নিয়ম এবং সুত্র জানি সবই লঙ্ঘিত হবে। কারন প্রথমেই বলেছি ব্লাকহোল বিশ্বভ্রম্মান্ডের কোন ফিজিক্সে নিয়মের ধার ধারেনা।

এবার বলি কিছু কল্পনা প্রসুত কথা বার্তা নিয়ে। মানে হচ্ছে এতক্ষন যা বলেছি পুরোটাই বিজ্ঞানিদের আবিস্কুত বিষয়গুলো প্রচুর ব্যাখ্যা আর গবেষনার মাধ্যমে বিষদ ভাবে সবার কাছে গৃহিত। কিন্তু এখন যা বলবো সেগুলো হতে পারেটাইপ কথা বার্তা। প্রথমত আমরা কথা বলেছি একটা নিস্ক্রিয় ব্লাকহোল নিয়ে। যদি এই ব্লাকহোলটা গতিশিল হত এবং একেবারে একটিভ মানে একটা তারাকে গিলে খাচ্ছে এইটাইপ হত তবে সেটাতে কি হত??

বিজ্ঞানিদের ধারনা এই ধরনের ব্লাকহোল গুলো মহাবিশ্বের মধ্যে একটা ছিদ্রের মতন সৃস্টি করে। এটাকে বলা হয় ওয়ার্মহোল। ছবিতে যেটা দেখতে পাচ্ছেন ঠিক সেরকমই অনেক বিশাল দুরত্বকে সে সর্টকার্ট করে ফেলছে। মনে করেন আপনি একটা পেন্সিল নিয়ে এক টুকরো কাগজের এক প্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্ত পর্যন্ত দাগ টেনে যাবেন। কিন্তু আপনি যদি সেটা না করে কাগজের প্রান্তদুইটিকে ভাজ করে পেন্সিল দিয়ে একটা ছিদ্রকরে ফেলেন তাহলেও কিন্তু হয়ে যাচ্ছে। ওয়ার্মহোল এটাই করছে। এটা শুধু মাত্র ফিজিক্সের সুত্রগুলোকেই লঙ্ঘন করছে না পুরো মহাবিশ্বের চেহারা বদলে দিচ্ছে। এই ব্লাকহোলগুলোর কারনেই কোন ভাবেই এই মহাবিশ্বের আসল পরিমাপ এবং চেহারা দেখা সম্ভব হচ্ছে না। কারন এগুলো এমন ভাবে ফিজিক্সএর সুত্রগুলোকে লঙ্ঘন করেছে যে বিজ্ঞানিদের হতভম্ব করে দিয়েছে।

এখন মনে করেন একটা প্রচন্ড শক্তিশালি ব্লাকহোলের মধ্যে আপনি একটা মহাকাশযান চালিয়ে দিলেন। ঠিক তার উল্টোদিক দিয়ে বের হয়ে গেলেন। কিন্তু মজার বিষয় হচ্ছে ঢোকার সময় ঢুকেছেন আজকের এই দিনে কিন্তু বের হবার সময় বের হয়ে যাবেন হয়ক ৫০০০ বছর আগে যখন মিশরের ফারাও রাজার চিন্তা করছিলেন কিভাবে চমৎকার একটা সমাধি নির্মান করা যায়। ঠিক তখনই আপনি মিশরে আপনার মহাকাশ যান নিয়ে ক্রাশ করলেন। ঘটনা কিছুই ঘটবে না। শুধু আপনাকে আজীবন সেই মিশরের রাজার জন্য পিরামিড বানাইতে হবে। অথবা মায়ানদের সামনে পরলেন। বানিয়ে দিলেন মায়ান সভ্যতা। যদিও কথাগুলো কাল্পনিক কিন্তু আসলে কিন্তু এরকম কিছু একটা হতেও পারে। এমনও হতে পারে গিয়ে পরলেন এমন একটা গ্রহের মধ্যে যেটাতে প্রানিগুলো মোটেই সভ্য হতে পারে নি। ফলে আপনি হয়ে যাবেন তাদের এক বোলার ভুরিভোজের খাদ্য। হতে পারের কোন শেষ নেই কারন কেউই জানে কি হতে পারে এই ব্লাক হোল নামক অন্ধকার গহ্বরের ভিতরে।

মারাত্মক একটা বিষয় হচ্ছে পৃথিবীতে বিজ্ঞানিরা ব্লাকহোল তৈরির চেস্টা চালাচ্ছেন তাদের ল্যাবরটরিতে। এই প্রজেক্টএর নাম Sonic black hole। অনেকে আবার মজা করে ডাকে dumb hole। এই প্রজেক্টের সর্বশেষ সফলতা হচ্ছে তাদের তৈরি ব্লাকহোল থেকে শব্দ বের হতে পারে না। খুবই মারাত্মক এই প্রজেক্টের সফলতার উপর নির্ভর করবে আমাদের পরবর্তি প্রজন্মের মহাকাশ ভ্রমনের ভবিষ্যৎ।
এই ব্লাক হোলের সাথে রিলেটেড একটা প্রশ্ন হচ্ছে বার বার আলো গতির কথা বলছি তাহলে আলোর গতিতে ভ্রমন করতে পারলে কি হবে??

মনে করেন প্রথিবী থেকে আমরা একটা মহাকাশ যানে করে রওনা দিলাম সুর্যের দিকে যেটার স্পিড ৩ লক্ষ কিলোমিটার প্রতি সেকেন্টে। মানে আলোর গতিতে। আমরা সাধারনত গাড়িতে ভ্রমনের সময় দেখেথাকি রাস্তার সামনের দুরের একটা বস্তু আস্তে আস্তে আমাদের দিকে আসতে থাকে। কিন্তু এই ক্ষেতে ঘটবে পুরো উল্টোটা। আপনি সুর্যকে আস্তে আস্তে আপনার থেকে দুরে যেতে দেখবেন। কারন হচ্ছে আপনার দৃস্টিক্ষেত্র বা field of view আস্তে আস্তে বড় হতে থাকবে পুরো মহাবিশ্বের দিকে। কারন মহাবিশ্বের পুরোটাই শুন্যস্থান এবং অসিম।

আলোর গতিতে চলতে থাকলে আপনি আপনার পেছনের বস্তুও চোখের সামনে দেখতে থাকবেন। কেন??
কারন আপনি যখন আলোর গতিতে ছুটতে থাকবেন আপনার তখন পৃথিবী থেকে বিচ্ছুরিত হওয়া আলোর ফোটন কনিকাগুলো যে স্পিডে আপনার দিকে আসছিল সেটাকে আপনি রিচ করবেন। আবার আমার দৃস্টিক্ষেত্র আস্তে আস্তে বড় হতে থাকলে এই আলোর কনিকা গুলোও আপনার চোখের সামনে চলে আসবে। মজার বিষয়হচ্ছে পৃথিবীকে পেছনে ফেলে আপনি আলোর গতিতে রওনা দিলেন দেখা যাবে আপনি সামনের দিকে সুর্যের পাশে পৃথিবীকেও দেখছেন। আপাতত এটুকুনই জেনে রাখেন।
দ্বিতিয় প্রশ্নটা হচ্ছে আমরা এই বিশাল মহাবিশ্বের ঠিক কোন স্থানে আছি?? অথবা আমাদের এই মহাবিশ্বের কেন্দ্রবিন্দু কোনটা বা সিমানা কি আছে কোন??

যদিও উত্তরটা শুনতে আপনার কাছে হাস্যকর লাগবে তারপরও বলছি। এই মহাবিশ্বের কেন্দ্র বা সিমানা সব স্থানে। সবকিছুই এই মহাবিশ্বের কেন্দ্রস্থল। এমনকি আপনিও এই মহাবিশ্বের কেন্দ্র স্থল হিসাবে বিবেচিত হবেন। প্রত্যেকটা জিনিষ যা আমরা দেখেছি যা যার অস্তিত্ব আছে বলে জানি সবকিছুই মহাবিশ্বের কেন্দ্রস্থল। কিভাবে?? আসেন অসাধারন এই জিনিষটা ব্যাখ্যা করি।

এই জিনিষটার নাম দিয়েছেন বিজ্ঞানিরা Cosmological principle। মনে করেন আপনাকেই ধরে নিচ্ছি আমি। আপনি এই পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকেন না কেন অথবা এই মহাবিশ্বের যেখানেই থাকনে না কেন সমস্ত কিছুই আপনার থেকে আস্তে আস্তে বিস্তৃত হচ্ছে মানে দুরে সরে যাচ্ছে আস্তে আস্তে। এই এই বিস্তৃতির পরিমান আনুপাতিক ভাবে একেবারে সমান হারে হচ্ছে।

এটা অনেকটা একটা বেলুন ফোলানোর মতন অবস্থা আরকি। তবে আবার মনে কইরেন না যে একটা বেলুনের মতন সবকিছু প্রসস্থ হচ্ছে যেটার কেন্দ্রে আপনি দাড়িয়ে আছেন। আসলে আপনি দারিয়ে আছে বেলুনটার surface বা পৃস্ঠতলের উপরে। মনে করেন আপনি একটা বেলুনের গায়ে কিছু রঙিন ফোট দিলেন রঙদিয়ে। তার পরে সেটা ফুলাতে শুরু করলেন। কি হবে??
আস্তে আস্তে একটা ফোটা থেকে আর একটা দুরে সরে যেতে থাকবে। কিন্তু সেই ফোটাগুলোর কোন সেন্টার পয়েন্ট থাকবে না।




আরো ভালো করে বোঝার জন্য উপরের ছবিটার দিকে খেয়াল করুন। কিছু ডট দেখতে পারছেন তাই না। আসলে এগুলো একই জিনিষ দুইটা লেয়ারে। প্রথম লেয়ারটা একটু ছোট আর দ্বিতিয় লেয়ারটা তার থেকে ৫ শতাংশ বড়। এখন খুব ভালো করে যদি খেয়াল করেন তাহলে দেখবেন যদি এই লেয়ারের যে একটা একটা বিন্দুকে একই স্থানে আনা হয় তাহলে পুরো চিত্রটিই ওই বিন্দুকে সেন্টা করে ফেলবে। মানে হচ্ছে এই চিত্রের সবগুলো বিন্দুকে যদি আপনি আলাদা আলাদা ভাবে একই স্থানে নিয়ে আসেন প্রত্যেকটিই প্রত্যেকবার পুরো চিত্রটির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিনত হবে। এখন মনে করেন এই চিত্রটির একটা বিন্দু হচ্ছেন আপনি বাকি সব হচ্ছে পরো বিশ্বভ্রম্মান্ডের সকল কিছু। গাছ পালা, ঘর বারি, কোটি কোটি মানুষ, সমুদ্র, এই পৃথিবী নামক গ্রহ সহ সকল কিছু। চিন্তা করেন এই সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুই হচ্ছেন আপনি। প্রত্যেকটা জিনিষই আলাদা ভবে অথাব নিজস্বভাবে এই পুরো বিশ্বভ্রম্মান্ডের কেন্দ্রবিন্দু।

চিন্তা করে দেখেন আপনি নিজেকে কি মনে করছেন বা আপনার বন্ধুবান্ধব, আত্মিয় স্বজন পারা প্রতিবেশি আপনাকে কত ছোট বা খারাপ মনে করছে এটা কোন বিষয়ই না। আপনি নিজের দিকে একটা তাকান আর চারপাশের দিকে তাকান। আপনি এদের সবার মাঝে একটা কেন্দ্রবিন্দুর মতন। যে স্রস্টা এটা এভাবে সৃস্টি করেছেন তিনি এই পুরো সিস্টেমটা এভাবেই সৃস্টি করেছেন যাতে আপনি এই সবকিছুর কেন্দ্র বিন্দু হতে পারেন। তাই কখনোই নিজেকে ছোট মনে করবেন না। কারন কেন্দ্রবিন্দু যখন কোন কিছু শুরু করে তখন সেটা ওই বৃত্তের কিনারা পর্যন্ত পৌছে যায়। তাই আপনি যদি একটু চেস্টা করে নিজের উপরে বিশ্বাস স্থাপন করে শুরু করতে পারেন সেটা হোক যেকোন কিছু আপনি পারবেনই। তাতে কোন ভুল নেই। কারন আপনিই তো এই সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু।
অন্তত বিজ্ঞানিদের এই ক্যালকুলেশন তো সেটাই বলছে। ফিজিক্স সেটাই বলছে। তাই জীবনে খেই হারাবেন না। বিশ্বাস রাখুন নিজের উপরে আর পরতে থাকুন আমার নোট গুলো। অনেক ধন্যবাদ এত বিশাল একটা সিরিজ এত কস্ট করে পরার জন্য।
কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন:
লেখাটার মুল থিম নিয়েছি আমি ইউটিউবের বিখ্যাত চ্যানেল Vsauce এর মাইকেল এর কাছ থেকে। তার এই ভিডিওটাই মুলত আমার লেখার মুল থিম। এছারাও উইকি, বিভিন্ন সাইন্স ভিত্তিক বই এবং ওয়েবসাইট গুলোও প্রচুর সহযোগিতা করেছে।
( এই লেখাটি শুধু মাত্র এই ব্লগের জন্য লিখিত। বিনা অনুমতিতে কপি করা সম্পুর্ন নিষেধ)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


