somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

যে অতীত সু চি মুছে ফেলতে চান

১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ সন্ধ্যা ৭:১৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

জেনারেল মিন অং হ্লাইয়াং এবং সু চি—উভয়েই জাতিঘৃণার প্রকাশ ঘটাতে গিয়ে কার্যত বার্মার রাজনৈতিক ইতিহাসকেই অস্বীকার করছেন। সু চির বাবা জেনারেল অং সানের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক সহযোগী ছিলেন একজন মুসলমান আবদুল রাজ্জাক। রাজ্জাক তখন বার্মা মুসলিম লিগের সভাপতির দায়িত্বও পালন করছিলেন। জেনারেল অং সানের গঠিত বার্মার স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তীকালীন মন্ত্রিসভার শিক্ষা ও পরিকল্পনামন্ত্রী ছিলেন রাজ্জাক এবং ১৯৪৭-এর ১৯ জুলাই জেনারেল অং সানের সঙ্গে যে ছয়জন মন্ত্রী খুন হয়েছিলেন, তাঁদের অন্যতম ছিলেন তিনি। আজও বার্মা ১৯ জুলাই রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘শহীদ দিবস’ হিসেবেই পালন করে থাকে। সু চি কীভাবে শহীদ দিবসের স্মৃতিগাথা থেকে রাজ্জাকের নাম মুছবেন?
কেবল আবদুল রাজ্জাকই নন, সু চির বাবা এবং বার্মার ‘জাতির পিতা’ জেনারেল অং সানের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহযোগীদের মধ্যে আরও অনেক মুসলমান ছিলেন।অং সান রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন ১৯৩৩ সালে। আরইউএসইউ প্রতিষ্ঠার বছরই (১৯৩০) তাতে সাধারণ সম্পাদক ছিলেন এম এ রাশিদ। ওই সময় অং সানের প্রধান রাজনৈতিক সহযোদ্ধা হয়ে ওঠেন এম এ রাশিদ ও উ নু। অং সান আরইউএসইউতে ১৯৩৬ সালে ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন আর সে বছর তাতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন এম এ রাশিদ। রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়ে রাশিদ, অং সান এবং উ নু ছিলেন তিন প্রাণের বন্ধু।এম এ রাশিদকে অং সান বলতেন ‘রাশিদ ভাই’। অং সানের অস্বাভাবিক মৃত্যুর দিন পর্যন্ত এই তিনজনের রাজনৈতিক বন্ধুত্ব বজায় ছিল। উল্লেখ্য, ১৯৪৭ সালে বার্মার সংবিধানের অন্যতম খসড়াকারীও ছিলেন রাশিদ। পরবর্তীকালে তিনি দেশটির শ্রমমন্ত্রীও হন।

১৯৩৬ সালে রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতারা। মাঝের উঁচু চেয়ারে আসীন ব্যক্তিটি হলেন এম এ রশীদ। ডানে সু চির বাবা অং সান এবং বামের ব্যক্তিটি হলেন ভবিষ্যতের সেনাশাসক জেনারেল উ নু। এই নেতারাই বার্মার স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্রপুরুষ। অথচ এই অসাম্প্রদায়িক গৌরবের অতীত আজ মুছে ফেলতে চায় দেশটির শাসকেরা।
অথচ আজ সেই অং সানের কন্যা বার্মাতে মুসলমান রোহিঙ্গাদের অস্তিত্বই অস্বীকার করছেন। সেনাবাহিনীও বলছে, রোহিঙ্গা বলে বর্মায় কোনো বৈধ জাতিসত্তাই নেই এবং ছিলও না।
বার্মা সরকার এবং সে দেশের সেনাবাহিনী বর্তমানে বেশ জোরেশোরেই বলে থাকে, আরাকানের রোহিঙ্গারা সে দেশের নাগরিক নয়, বাংলাদেশ থেকে যাওয়া মানুষ।
এই দাবি যে কত স্ববিরোধী, তা বহুভাবেই প্রমাণযোগ্য। আন্তর্জাতিক পরিসর থেকে সু চি ও বার্মার সেনা কমান্ডারদের যেকেউ জিজ্ঞাসা করতে পারেন যে ১৯৪৮ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত সুলতান মাহমুদ, আবুল বাশার, আবদুল গাফ্ফার, জোহরা বেগম প্রমুখ যে আরাকানের মুসলিমপ্রধান এলাকাগুলো থেকে এমপি নির্বাচিত হয়ে দেশটির পার্লামেন্টে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন বছরের পর বছর (মন্ত্রীও হয়েছিলেন!), সেটা কীভাবে সম্ভব হলো? এই ব্যক্তিরা কীভাবে নির্বাচনে দাঁড়ালেন? আকিয়াবের এমপি সুলতান মাহমুদ যে উ নুর নেতৃত্বে গঠিত ১৯৬০-এর কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন, সেটা কোন জাতিসত্তা পরিচয়ে?

এমনকি ১৯৯০-এ যখন সামরিক বাহিনীর অধীনেই বার্মায় বহুদিন পর প্রথমবারের মতো বহুদলীয় নির্বাচন হলো (যে নির্বাচনে অং সান সু চির দল নির্বাচিত হয়েও সরকার গঠন করতে পারেনি), তখন খ মিং (শামসুল আনোয়ার, বুথিডং-১), মো. নুর আহমেদ (বুথিডং-২), উ চিট লুইঙ (ইব্রাহিম, মংডু-১), ফজল আহমেদ (মংডু-২) প্রমুখ রোহিঙ্গারা কীভাবে উত্তর আরাকান থেকে পার্লামেন্টে নির্বাচিত হতে পারলেন? কীভাবে তখন আরাকানের রোহিঙ্গারা (আটটি আসনে) নিজস্ব রাজনৈতিক দল (ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস পার্টি) থেকেই প্রার্থী হতে অনুমতি পেয়েছিল? আইন অনুযায়ী ওই নির্বাচনে ‘বিদেশি’ ছাড়া সবাইকেই ভোট দিতে দেওয়া হয়েছিল। তাহলে বুথিডং ও মংডুর এই রোহিঙ্গারা কাদের ভোটে নির্বাচিত হয়েছিলেন?


এ পর্যায়ে এ-ও উল্লেখ করতে হয়, বার্মার ১৯৯০-এর নির্বাচনে বিজয়ী ওপরের চারজন রোহিঙ্গা এমপির মধ্য থেকে শামসুল আনোয়ারকে অং সান সু চি ১৯৯৮ সালে রোহিঙ্গাদের প্রতিনিধি হিসেবে ‘পিপলস পার্লামেন্ট’-এ যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানান এবং শুধু এই ডাকে সাড়া দেওয়ার কারণে তাঁর ৪৭ বছরের জেল হয়েছিল। এমনকি শামসুল আনোয়ারের পুত্র-কন্যাদেরও ১৭ বছর করে সাজা দেওয়া হয়। অথচ সু চি উত্তর আরাকানে রোহিঙ্গাদের কোনো রূপ উপস্থিতির কথা অস্বীকার করে যাচ্ছেন।
বার্মার মুসলমান নেতৃত্বকে মুছে দেওয়ার প্রক্রিয়ায় এ বছরের ২৯ জানুয়ারি হত্যা করা হয় ব্যারিস্টার উ কো নিকে। সু চির আজকের অবস্থানের পেছনে তাঁর অবদান অস্বীকারের উপায় নেই। যখন সন্তানদের বিদেশি নাগরিকত্ব থাকার অজুহাতে সামরিক জান্তা অং সান সু চির সাংবিধানিক পদ গ্রহণে বাধা তৈরি করে, তখন একটা উপায় বের করেন সংবিধান বিশেষজ্ঞ কো নি। সামরিক জান্তার সংবিধানের ভেতরই তিনি বিকল্প সরকারপ্রধান হিসেবে সু চির জন্য স্টেট কাউন্সেলর পদ সৃষ্টির পথ দেখিয়ে দেন। দীর্ঘদিন সু চির আইনি উপদেষ্টার দায়িত্ব পালনের পর ২০১৩ সালে সরকারি দল এনএলডিতে যোগ দেন। সামরিক বাহিনীর সমালোচনা এবং রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া ১৯৮২ সালের আইনের সমালোচনা করাই হয়তো ছিল তাঁর অপরাধ। সাবেক এক সেনা গোয়েন্দা কর্মকর্তার নির্দেশে গুলি করে তাঁকে হত্যার মধ্যে দিয়ে বার্মার জাতীয় রাজনীতিতে মুসলমানদের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ইতিহাসও আপাতত অবসিত হয়। ঘটনার এক মাস পর অনুষ্ঠিত স্মরণসভায় সু চি এই হত্যাকাণ্ডকে সন্ত্রাসী কাজ বলে কো নি-কে শহীদ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। আজ সন্ত্রাসীরা তাঁর বন্ধু হয়েছে, আর বন্ধু হয়েছে শত্রু।[/sb

prothom-alo.
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ সন্ধ্যা ৭:১৭
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মুহাম্মদ আলি জিন্না

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১১:৩৫



১৮৭৬ সালে করাচিতে এক দুষ্ট বালকের জন্ম হয়।
এবং ৭৬ বছর বয়সে দীর্ঘদিন যক্ষা রোগে ভূগে- দেশ ভাগের পরের বছর মারা যান। এই দুষ্ট বালক'ই পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা। নাম তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

মতামত পোস্ট: ২২ সালে লিখেছিলাম: যে শঙ্কা ছিলো তা আজকের বাস্তবতা

লিখেছেন অর্ক, ০৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১:৩১



আমাদের কওমি জননী সত্যি কি অসাম্প্রদায়িক? হলে কতোটা? প্রশ্ন থাকলো সবার কাছে। তেতুল হুজুর মাওলানা শফি খুব ভক্তিভরে তাকে কওমি জননী উপাধি দিয়েছিলেন। এমনি এমনি তো আর নয়। অত্যন্ত মহব্বত... ...বাকিটুকু পড়ুন

"রিকন্সিলিয়েশান"....ইহা কি খায় নাকি মাথায় দেয়?

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ০৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:০০



সত্যি সত্যিই তাদের সুযোগ ছিলো ২৫ শে মার্চ এর পর যাবতীয় অপকর্ম জনগণের কাছে স্বীকার পূর্বক,
/মুক্তিযুদ্ধে তাদের দ্বারা নৃশংসতার শিকার জনগণের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা,
/তাদের ক্ষতিপূরণ দিয়ে এবং,
/সব... ...বাকিটুকু পড়ুন

সেরা লেখক

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৮:৪৭



বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ভালো লেখক এক কথায় - হুমায়ূন আহমেদ। হুমায়ূন আহমেদের লেখা উপন্যাস মধ্যাহ্ন বা দেয়াল - এর পাশাপাশি রাখার মতো বাংলাদেশে আর কোনো উপন্যাস আছে কিনা আমার জানা... ...বাকিটুকু পড়ুন

=ডায়াটে একদিনের খাবার=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:৫১

ডায়াটের প্রথম দিকে-একদিনের খাবার। বর্তমানে আমাদের দেহে রোগসুগের অভাব নাই। ডায়াবেটিস, প্রেসার, ক্যান্সারসহ নানাবিধ রোগ বলা নাই কওয়া নাই শরীরে এসে বাসা বাঁধে।

আর এসব রোগের একমাত্র কারণ আনহেলদি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×