
বইয়ের নামঃ কবি
লেখকঃ তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রকাশনীঃ স্কাই পাবলিশার্স
পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ ১০৮
রিভিউঃ
আমার পড়া বইয়ের তালিকায় এই প্রথম তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা কোন বই যোগ হলো!দীর্ঘ সময় নন-ফিকশনে আটকে থাকার কারনেই এমনটা হয়েছে,তবে এই একটা বইয়ের মাধ্যমে তার লেখার প্রেমে পড়ে গেলাম।আবার একদিক দিয়ে ভাবলে-এই বইগুলো এখন পড়েই ভালো হয়েছে,কারন এখন যেভাবে অনুভব করতে পারি,লেখার গভীরতার জালে আটকা পড়তে পারি তখন হয়তো এমনটা হতো না।
যাই হোক,আমার বই পড়ার গল্প জানাতে এই লেখা না,বরং জানাতে এসেছি নিতাই চরণের গল্প বলতে।নিতাই চরণের কবি হওয়ার গল্প বলতে।
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের "কবি" উপন্যাসটি ১৯৪১ ইং সালে প্রবাসী মাসিক পত্রে মুদ্রিত হওয়া একটি ছোট গল্পের বিস্তৃত রূপ।যা পরবর্তীতে ১৯৪২ ইং সালে পাটনা থেকে প্রকাশিত প্রভাতী পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হয়।এবং সবশেষ ১৯৪৩ ইং সালে এটি প্রথম গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়।
নিতাই চরণ,সমাজের চোখে নিচু বর্গের একজন মানুষ।চোর ডাকাত বংশের ছেলে,খুনির দৌহিত্র, সিঁদেল চোরের পুত্র।ছোটবেলায় "গোবরে পদ্মফুল" নামে একটি প্রবাদ পড়েছিলাম।আমাদের গল্পের প্রধান চরিত্র নিতাইও তেমনি।বাল্যকাল থেকেই ছিল কবিগান শোনার নেশা।আর নেশা থেকেই তার মাঝে কবিত্ব প্রতিভার জন্ম হয়।
বংশীয় পেশা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ে,আশ্রয় নেয় রেল স্টেশনের পাশের বসতিতে।কুলিগিরির কাজ নেয়। সবকিছুই করে স্টেশনের পয়েন্টসম্যান রাজন/রাজার সাথে বন্ধুত্বের সুবাদে।যদিও কবিয়াল হওয়ার পর,এ কাজটা ছেড়ে দেয় সে।
রাজার আত্মীয়া ঠাকুরঝির সাথে সেখানেই পরিচয় নিতাইয়ের।সেখানেই ভালোলাগা।ঠাকুরঝি রোজ দুধ বিক্রি করতে এ গ্রামে আসতো।একদিন রাজা ঠাকুরঝিকে আলকাতরার সাথে তুলনা করলে,ঠাকুরঝির মন খারাপ করে বেরিয়ে যায়।নিতাইয়েরও খারাপ লাগে বিষয়টা।তাইতো সে রচনা করে-
"কালো যদি মন্দ তবে কেশ পাকিলে কাঁদ কেনে?
কালো কেশে রাঙা কুসুম হেরেছ কি নয়নে?"
প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থায় যখন বর্ন বৈষম্য প্রকট,তখন কোন লেখকের মানসিক দৃষ্টিভঙ্গি কতটা উন্নত হলে এমন অভিব্যক্তি প্রকাশ পায়, বলতে পারেন?
ঠাকুরঝির প্রেমে পড়ে যায় নিতাই।কিন্তু ঠাকুরঝি যে বিবাহিত! তাহলে?
"চাঁদ তুমি আকাশে থাক-আমি তোমায় দেখব খালি,
ছুঁতে তোমায় চাইনাকো হে-সোনার অঙ্গে লাগবে কালি।"
সমাজ ব্যবস্থাটাকে ভাঙতে পারেনি নিতাই,পারেনি মনের মানুষ ঠাকুরঝি কে নিয়ে ঘর ছেড়ে পালাতে।তাই তো,ঠাকুরঝিকে ভালোবেসে লীলাটা অসমাপ্ত রেখে নিজেই গ্রাম ছেড়ে চলে যায়,তবুও ভালো থাকুক ভালোবাসা!
"আমি ভালবেসে এই বুঝেছি
সুখের সার সে চোখের জল রে।"
গ্রাম থেকে বেরিয়ে নিতাই যোগ দেয় ঝুমুর দলে।মূলত সেখানেই তার কবি প্রতিভার পূর্ণ বিকাশ ঘটে।সেই ঝুমুর দলেরই এক মেয়ে,নাম বসন্ত; দীর্ঘ কৃশতনু গৌরাঙ্গী। অদ্ভুত সুন্দর চোখের অধিকারী এ মেয়েটি খুব চঞ্চল।কথাবার্তায় চটুল।রয়েছে অল্প সময়ে সহজেই মানুষকে আপন করে নেবার ক্ষমতা।নিতাইয়ের সাথেও ভাব করতে বেশি দেরি হয়নি তার।নিতাইও ভালোবেসেছিল তাকে।একসাথে আজীবন থাকার স্বপ্ন দেখেছিল।কিন্তু চাইলেই তো আর সুখের সন্ধান লাভ করা যায় না!
রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন,"অলৌকিক আনন্দের ভার বিধাতা যাহারে দেন,তার বক্ষে বেদনা অপার।"
নিতাইয়ের ক্ষেত্রেও তাই ঘটল।
ভাবতে পারেন,কি ঘটেছিল নিতাইয়ের জীবনে?
যদি জানা না থাকে,পড়তে পারেন বাংলা সাহিত্যের এই অমূল্য রত্নটি।পড়া শেষ হলে যা আপনাকে নিয়ে যাবে অন্য এক ভূবনে, হয়তো আপনার মনেও বেজে উঠবে-
"হায়-জীবন এত ছোট কেনে?
এ ভূবনে?"
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে ডিসেম্বর, ২০১৬ দুপুর ১:৪৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



