
একাত্তরের দালালেরা সম্পাদনায় শফিক আহমেদ
মুক্তিযোদ্ধা সংহতি পরিষদ
এই সমাধি নির্মাণ করেছিল পাকিস্থানী বাহিনীর এক লক্ষ সশস্ত্র জন্তু আর তাদের এদেশীয় দোসর ৭ লক্ষ বিশ্বাসঘাতক দালাল। ’৭১ এর ১৬ ডিসেম্বর এই সমাধি ক্ষেত্রে জীবনের অঙ্কুরোদগম হয়েছিল।

কিন্তু সেদিন থেকেই অযোগ্য, অকৃতজ্ঞ আমরা নিজেরাই আরেকটি সমাধি গড়ার কাজ শুরু করেছি-মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আর চেতনাকে বিকৃতি আর বিস্মৃতির গর্ভে সমাধিস্থ করার কাজ। স্বাধিনতার পর থেকেই ইতিহাসের জঘন্যতম গণহত্যার দায়ে দায়ী যুদ্ধাপরাধী পাকসেনা এবং দেশীয় দালালদের মানবতা ও ন্যায় বিচারের সমস্ত দাবীকে উপেক্ষা করে বিনা তদন্তে বিনা বিচারে ছেড়ে দেবার কাজ শুরু হয়। তারপর পুনর্বাসনের নানা পর্যায় পেরিয়ে সেদিনের সেই ফেরারী খুনী দালালরাই আজ আমাদের সরকার সমাজ, রাজনীতি আর অর্থনীতির সর্বক্ষেত্রে সর্বোচ্চ আসনে প্রবল প্রতাপে আসীন হয়ে স্বজনহারা দেশবাসীকে দুঃশাসনের শত শৃংখলে আবদ্ধ করেছেন। যে নরমেধযজ্ঞে তিরিশ লক্ষ নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবীদের অকল্পনীয় নৃশংসতায় নির্মৃল করা হয়েছে, সেই হত্যাযজ্ঞের সাথে জড়িত একজন সামরিক অফিসারের বিচারও আমরা করিনি। স্বদেশে আমরা গগনচুম্বী সৌম্য সৌধ গড়েছি ’৭১ এর অনিঃশেষিত প্রাণ মহীদানের স্মরণে। প্রতিদিন টেলিভিশনের পর্দায় স্মরণ সঙ্গীতের মূর্চ্ছনার সাথে সাথে প্রদর্শিত হয় সেই সৌধ। কিন্তু তারপরেই হয়ত উপায়হীন আক্রোশের সাথে আমাদের দেখতে হয়, নাম না জানা শহীদের গণকবরের উপর নির্মিত সৌধের পাদদেশে সহাস্যে দাঁড়িয়ে একাত্তরের প্রমাণিত খুনী দালাল মন্ত্রীর মর্যাদায় বিদেশী অভ্যাগতদের স্বাগত জানাচ্ছে। বুদ্ধিজীবী হত্যাকারী দালালরা আজ আমাদের জাতীয় পতাকা পুড়িয়ে দেয়। হত্যা পরিকল্পনার মূল কেন্দ্র পাকিস্তানে গিয়ে ঘোষণা করে আসে, বাঙালী জাতি ’৭১-এ স্বাধীনতা পেয়ে আজ অনুতপ্ত। বাঙালীর অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে উঠে আসা যে জয়বাংলা শ্লোগানে একদিন প্রকম্পিত হয়েছিল বাংলাদেশের আকাশ বাতাস, তাকে আজ স্থানচ্যুত করেছে বিজাতীয় ভাষার নিরাশ্রয় শব্দের কঙ্কাল।
অনেক সময় মুদ্রিত বিষয় এমনভাবে পাওয়া যায় যে, সেটিকে তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা ইতিহাস রচনার সাধারণ নীতিমালার অন্তর্ভূক্ত হয়না। উদাহরণ স্বরূপ, প্রাক্তন মন্তী আনোয়ার জাহিদের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। ’একাত্তরের ঘাতক ও দালালরা কে কোথায়’ রচনার পর আমাকে অনেকের কাছেই এই প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছে যে, তাতে আনোয়ার জাহিদের নাম নেই কেন। সমালোচকদের মতে আনোয়ার জাহিদ একাত্তরে ক্যান্টনমেন্টে মুরগী সরবরাহ করতেন। জাতীয় সংসদের অধিবেশনে বিরোধীনেত্রী শেখ হাসিনাও এই প্রসজ্ঞটি উল্লেখ করে তাঁকে বিদ্রুপ করেছেন। ’৭২ এর এপ্রিলে দৈনিক গণকন্ঠে ’দালাল আনোয়ার জাহিদকে গ্রেফতার করা হচ্ছে না কেন?’ এই শিরোনামে একটি লেখা প্রকাশিত হয়েছিল। এতে বলা হয়, আনোয়ার জাহিদ স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় একটি গুন্ডাবাহিনী তৈরী করে গ্রামের গরীব কৃষকদের কাছ থেকে মুরগী, সবজী, গরু ইত্যাদি জোরপূর্বক কেড়ে নিয়ে ক্যান্টনমেন্টে সরবরাহ করতেন। যদিও আনোয়ার জাহিদ এই লেখার প্রতিবাদ করেননি তবু এই লেখাটিকে গ্রন্থে পুনর্মুদ্রিত করার সময় শোভনীয়তা ও বস্তুনিষ্ঠতার প্রশ্ন দেখা দেয়। এই কারণেই ওই লেখাটির প্রসংগ প্রথম গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়নি। আনোয়ার জাহিদ অবশ্য ভাসানী ন্যাপের তৎকালীন সভাপতি মশিউর রহমান যাদু মিয়ার সাথে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সফররত পি পি পি নেতা মওলানা কাওসার নিয়াজীর সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। এই খবরটি একাত্তরের সংবাদপত্রে মুদ্রিত হয়েছিল।
এ সমস্ত প্রতিবন্ধকতাকে অতিক্রম করা গেলে দালালদের কর্মকান্ড সম্পর্কে আরও অনেক তথ্য সমৃদ্ধ গ্রন্থ রচনা করা যেতে পারে। বস্তুতঃ একাত্তরের দালালদের ঘৃণ্য কার্যকলাপ সম্পর্কে যা কিছু জানা যায়, তার একটি অত্যন্ত অকিঞ্চিৎকর অংশমাত্র এ পর্যন্ত মূদ্রিত হয়েছে। আমি আশা করব, অগ্রজ গবেষকবৃন্দ এ বিষয়ে তাঁদের যোগ্যতাকে নিয়োজিত করবেন।
এখান থেকে ডাউনলোড করতে পারেন
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৬ রাত ১১:০১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




