
একটা ঘটনা শেয়ার করি। আমার কলিগ মারিয়া, মধ্য বয়সী সিঙ্গেল মাদার। চৈাদ্দ ও সাত বছরের দু'টো বাচ্চা তাঁর। স্কুল জীবনের সুইটহার্টের সাথে পনেরো বছর সংসার করার পর ডিভোর্সের পর হাঁটে দু'জনে। স্কুল গ্রেজুয়েশানের পর সংসার বাচ্চা পালনে পুরোপুরিই সময় দেয় তাই পড়াশোনা বা চাকরী কিছুই করা হয়ে উঠেনি মারিয়ার। স্বামী কঠিন পরিশ্রম করে পড়াশোনা, চাকরী, সম্পত্তি, বাড়ি, গাড়ি সবই সামলেছে এক হাতে। তারপর ডিভোর্সের পর কানাডার আইন অনুযায়ী স্বামীর করা সমস্ত সম্পত্তির অর্ধেক মারিয়া পায়। সাথে প্রতি মাসের ভরনপোষন, বাচ্চার জন্য চাইল্ড সাপোর্ট তো আছেই।
কানাডার আইন অনুযায়ী স্বামী স্ত্রী ডিভোর্সের ক্যাচাল বা মারামারি কাটাকাটি যাই করো না কেন বাচ্চাদের ব্যাপারে নো কম্প্রোমাইজ। বাচ্চা মানেই দু'জনের দায়িত্ব। দু'জনেই তাদের দেখভাল ও খরচ দিতে বাধ্য। তবে যে ইনকাম বেশী করে সে বেশী টাকা দিবে আর যার কাছে বাচ্চা থাকবে সে বাচ্চার ফাইনানন্স মেইনটেইন করবে।
যা বলছিলাম, মামলায় আরো রায় হয় যে যেহেতু মারিয়া তার কেরিয়ার সেক্রিফাইস করেছে স্বামীর পড়াশোনা ও চাকরীর জন্য তাই স্বামীর চাকরীর টাকার উপরও তার অধিকার আছে। তাই মারিয়া আবার তার কেরিয়ার শুরু করবে এবং স্বামী তার সব পড়াশোনার খরচ বহন করবে যতদিন পর্যন্ত না সে আয় শুরু করে।
আর আমাদের দেশ ঠিক তার উল্টা। বাচ্চা মানে একাই মায়ের দায়িত্ব, বাচ্চা পয়দা করেই বাপের দায়িত্ব শেষ। একমাত্র সংসার টিকলেই দায়িত্ব তায়িত্বের কথাবার্তা হবে, সংসার না টিকলে কিসের পোলাপাইন আর কিসের স্ত্রী। যখন খুশী স্ত্রীকে তিন তালাক দিয়া ঘাড় ধরে বিদায় করলেই স্বামী বা বাবার দায়িত্ব শেষ। সমাজ ধর্ম রাস্ট্র স্বামীদেরকে দায় মুক্তি দেয় তালাকের সাথে সাথেই।
ইসলামের শরিয়া অনুযাী তিনমাসের ইদ্ধতকালীন কিছু খরচাপাতি দেয়ার কথা বা দেনমোহরের টাকাও দেয়ার কথা এবং বেশীর ভাগই পুরুষ তা দেয় না। এবার তালাকের পর বউ বাচ্চাগুলা মরলো নাকি বাঁচলো এ নিয়া বাপু বাপেরই মাথা ব্যাথা নাই সেখানে রাস্ট্র সমাজের কি আসে যায়। বাচ্চাদের ভরনপোষন দেবার বিধান হয়তো আছে কিন্তু বেশীর ভাগ বাপই এর ধার ধারে না।
গত বছর মুক্তি পেলেও এ বছর নেটফ্লিক্সে আসার কারনে আবারো আলোচনায় আসে ইমরান হাসমি ও ইয়ামি গৈাতম অভিনিত হিন্দি মুভি "হক"। ১৯৭৮ সালে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের সাহা বানু ও মোহাম্মদ আহমেদ খান মামলার সত্য ঘটনার উপর নির্মিত ছবিটি। একজন অসহায় মা বাচ্চাদের খরচের প্রাপ্য হক আদায়ের জন্য লড়াইয়ে নামে। যেখানে তাঁর স্বামী তথা বাচ্চাদের বাবা স্বনামধন্য ধনী উকিল অথচ খরচের সামান্য ক'টা টাকা দিতেও তার আপত্তি। ভদ্রলোক কোনভাবেই চিন্তা করেনি এ বাচ্চাগুলো তার, তাদের দেখভালের দায়িত্ব সম্পূর্ন তার, উপার্জনহীন সামান্য শিক্ষিত অসহায় এ মায়ের নয়।
কিন্তু বাস্তবতা হলো সাত সাতটা বছর একজন অসহায় মা এ ন্যায্য অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের কারনে অপমান অপদস্থ হতে হয় সমাজ, আদালত, রাস্ট্র, ধর্ম, আলেম সমাজ সহ প্রতিটি স্থানে। এমন কি উকিল স্বামী তাঁর জীবনকে আরো বিষিয়ে তোলার সব বন্দোবস্ত করে প্রতিটি ক্ষেত্রে। আজ থেকে ৫৫ বছর আগে একজন নারী কিভাবে এতো অসামন্জস্য, এতো এতো অন্যায়ের বিরুদ্ধে একা লড়াই করেছে তা এ যুগেও চিন্তা করা যায় না। যদিও যুগ প্লাটেছে কিন্তু নারীর এ হেনেস্তা একই রকম আছে উপমহাদেশগুলোতে।
ধর্মকে ব্যবহার করে কিভাবে পুরুষশ্রেনী অন্যায় করে যাচ্ছে তা দেখিয়েছে এ মুভিতে। প্রথম স্ত্রীর আবেগ ভালোবাসা দায়িত্বশীলতাকে তোয়াক্কা না করে দ্বিতীয় বিয়ে, প্রতিবাদী হলেই তিন তালাক, ডিভোর্সী মানেই সমাজ সংসারে অচ্ছুৎ, সন্তানদের প্রতি দায়িত্বহীনতা, অমানবিকতা এমন অনেক অসাম্জস্য অন্যায় চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছে মুভিতে।
তারপর এ মুভি দেখে আমাদের সমাজ জেগে উঠে হইহই করে উঠলো যেন এরকম কিছু যে সমাজে ঘটে তা এ প্রথম জানলো। কি ভয়ংকর অন্যায় চলছে নারীর প্রতি!!!! তারপর.... লেপ মুড়ি দিয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়লো আর বিবি তালাকের ফতুয়া খুঁজতে লাগলো।
সোহানী
জানুয়ারী ২০২৬
বি:দ্র: ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি অনেকদিন পর ব্লগে আসার জন্য। ব্যাস্ততায় ব্লগে আসা সত্যিই কঠিন। তারপরও সবাইকে ধন্যবাদ আমাকে না ভুলে যাবার জন্য।
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই জানুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৯:৪৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



